• ই-পেপার

সাঙ্গু নদী : পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উন্নয়ননির্ভরতা ও পাহাড়কেন্দ্রিক অর্থনীতির রূপকার

৪২ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা : জাতীয় অগ্রাধিকারের সময় এখনই

মো. ইমরান হোসেন, মো. শরিফুল ইসলাম ও প্রবীর চন্দ্র দাস।
৪২ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা : জাতীয় অগ্রাধিকারের সময় এখনই
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমাদের মনোযোগ চলে যায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ভর্তি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং, গবেষণা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা শিক্ষক নিয়োগ—এসব বিষয়ই জনপরিসরের আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জটি খুব কমই আলোচনার কেন্দ্রে আসে। যে ব্যবস্থায় দেশের পাঁচজন উচ্চশিক্ষার্থীর মধ্যে চারজন পড়াশোনা করেন, সেই ব্যবস্থার গুণগত মান, অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রয়োজনীয় জাতীয় মনোযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯। এর মধ্যে ৪২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬৬ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করছেন। শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শিক্ষার্থী ৩৩ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি। বিপরীতে দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার। অর্থাৎ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মূল ভার বহন করছে অধিভুক্ত কলেজব্যবস্থা, অথচ নীতিগত মনোযোগ ও সংস্কার উদ্যোগের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের একটি অংশে।

এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ অর্থায়নে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় ছিল মাত্র ৭০২ টাকা—মাসে প্রায় ৫৮ টাকা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৪১৫ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ১ হাজার ৭৭৮ টাকা। এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্যটির প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার কোথায়, সেই প্রশ্নের প্রতিফলন। যেখানে শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিনিয়োগ সবচেয়ে কম—এই বৈপরীত্য দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেই।

এর প্রতিফলন শ্রমবাজারেও স্পষ্ট। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, অনেক অধিভুক্ত কলেজে একাডেমিক পরিবেশ দুর্বল, শিক্ষক উন্নয়নের সুযোগ সীমিত, গবেষণা কার্যক্রম অপ্রতুল এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার সংযোগ অপ্রতুল। ফলে সমস্যাটি ডিগ্রির সংখ্যা নয়; সমস্যাটি ডিগ্রির গুণগত মান এবং দক্ষতার।

এই প্রশ্নটি এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, ডিজিটাল ও তথ্য-সাক্ষরতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা। উচ্চশিক্ষা যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে রূপান্তর করতে না পারে, তাহলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরো বাড়বে।

এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা সংস্কারকে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বরং যেখানে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, সেই ব্যবস্থাকেই সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। এ জন্য ইউজিসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। উচ্চশিক্ষাকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি হিসেবে নয়; একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন-২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ (১৫–৬৪ বছর বয়সী) রয়েছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি ‘জনমিতিক মুনাফা’ (Demographic Dividend)—একটি বিরল সুযোগ, যা দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন বহুগুণে ত্বরান্বিত হতে পারে।

চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও জাপানের মতো দেশগুলো সময়োপযোগী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশও আজ একই সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তবে এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে যদি মানসম্মত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা না যায়, তাহলে এই জনমিতিক মুনাফাই ভবিষ্যতে বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপের বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি), ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে গুণগত মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো মূলত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। দেশের বৃহত্তম শিক্ষার্থীসমাজ এখনো এই সংস্কারের পূর্ণ সুফল পায়নি।

পর্যায়ক্রমে অধিভুক্ত কলেজগুলোতেও আইকিউএসি প্রতিষ্ঠা, ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়ন, নিয়মিত একাডেমিক অডিট এবং শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক বা প্রোগ্রাম অ্যাক্রিডিটেশনও ধাপে ধাপে চালু করা উচিত, যাতে নির্দিষ্ট একাডেমিক কর্মসূচির মানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়িত হয়।

উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষকতার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে শিক্ষকরা উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রিধারী এবং নিয়মিত গবেষণা ও প্রকাশনায় সম্পৃক্ত। এর বিপরীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও অপ্রতুল। একই সঙ্গে পদোন্নতিতে গবেষণা অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় গবেষণাভিত্তিক একাডেমিক সংস্কৃতি প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি।

তাই শিক্ষকতার মানোন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা অনুদান এবং গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। ভবিষ্যতে সহযোগী অধ্যাপক ও তদূর্ধ্ব পদে পর্যায়ক্রমে পিএইচডিকে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তার আগে প্রয়োজন গবেষণার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণকে শক্তিশালী করতে হবে। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, গবেষণার ফলাফল, শিক্ষক সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মান সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণে তথ্যের ব্যবহার যত বাড়বে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং সংস্কারের কার্যকারিতা তত নিশ্চিত হবে।

পাঠ্যক্রমকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সহায়তা উচ্চশিক্ষার মূলধারায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, গবেষণা পদ্ধতি, একাডেমিক লেখালেখি এবং ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতার ওপর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব এবং মানবিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নয়, প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিশ্চিত করারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উচ্চ উৎপাদনশীল, প্রযুক্তিদক্ষ এবং উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদ তৈরির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। তাই উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়নের কথা বলেছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় ৯ লাখ শিক্ষার্থীকেও একই সংস্কার কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষার এই তিন ধারাকে পৃথকভাবে নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই হবে টেকসই সমাধানের পথ।

শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এটি নির্ধারণ করবে সেই ৪২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী, যারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজ ও মাদারাসায় বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন। তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা শুধু শিক্ষানীতির প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক গতিশীলতা এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়; বরং যেখানে দেশের ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, সেই বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে কিভাবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা যায়। একটি দেশের উচ্চশিক্ষার মান কয়েকটি উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে নয়, বরং তার বৃহত্তম শিক্ষার্থীসমাজের শিক্ষার মান দিয়েই বিচার করা হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি ৪২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত, গবেষণানির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথ অনেকটাই সুগম হবে।

আর যদি তা না করা যায়, তবে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হবে না। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ—৪২ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে আমরা কি সত্যিই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে প্রস্তুত?

লেখক—
মো. ইমরান হোসেন, মো. শরিফুল ইসলাম ও প্রবীর চন্দ্র দাস।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তা।

এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কার

আহমেদ সোহেল বাপ্পী

অনলাইন ডেস্ক
এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কার

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ এক ব-দ্বীপ রাষ্ট্র। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা নিচু সমতলভূমি। ঘন বর্ষা, উজানের ঢল আর ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চাপ এই ভূখণ্ডের নিয়তির অংশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এখানে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো নগরে সামান্য কিংবা মাঝারি বৃষ্টিতেই যখন রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়, তখন সেটিকে নিছক প্রকৃতির খেয়াল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

১২ জুলাই মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার এবং ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর অসংখ্য সড়ক ডুবে যাওয়ার ঘটনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানদণ্ডে ‘অতিভারী বর্ষণ’ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা হলো- এর চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিতেও ঢাকা ডোবে। কারণ শহরের পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিজেই ভেঙে পড়েছে।

ঢাকার সংকটের মূলে আছে হারিয়ে যাওয়া খাল ও জলাধার। একসময় নগরীর চারপাশে অসংখ্য খালবিল জলাধার বৃষ্টির পানি ধারণ করত অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নিয়ন্ত্রণহীন নগর সম্প্রসারণের চাপে সেসবের বড় অংশ ভরাট বা দখল হয়ে গেছে। নগর-পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বারবার সতর্ক করেছেন, টেকসই সমাধানের জন্য দরকার সব সংস্থার সমন্বিত ও বৃহৎ পরিকল্পনা। খণ্ড খণ্ড উদ্যোগে সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সমাধান আসে না।

তার মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কারণ পরিকল্পনা প্রণয়ন আর বাস্তবায়নের মধ্যে বিরাট ফারাক থেকে গেছে। এ বছর বর্ষার আগেই দুই সিটি করপোরেশন শহরের ১৪১টি স্থানকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই উত্তর সিটির এলাকায়। অথচ খাল উদ্ধারের নামে নেওয়া প্রকল্পেও অনিয়মের ছায়া দেখা যায়। মান্ডা-শ্যামপুর-কালুনগর খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পে অনেক অপ্রাসঙ্গিক অবকাঠামো যুক্ত হওয়ায় মূল লক্ষ্যই ঝাপসা হয়ে পড়ে। দখলদারদের সঙ্গে আপস হলে ভবিষ্যতে সব খালই ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরও খাল-জলাশয় দখলের দায়ে কাউকে শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এই পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও দখলদারি সংস্কৃতি অক্ষত থেকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের চিত্র আরো বিস্ময়কর। সাত-আট বছর ধরে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা; ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ডুবে যাওয়ায় নাগরিকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- টাকা গেল কোথায়?

সিডিএর মূল মেগাপ্রকল্পটি ২০১৭ সালে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকায় অনুমোদিত হলেও ২০২৩ সালে তার আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায়। আর মেয়াদ বেড়েছে একাধিকবার। একসময় সিডিএ ও সিটি করপোরেশন নিজেরাই স্বীকার করেছিল, দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতা চললেও এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোনো টেকসই গবেষণা হয়নি। বর্তমানে নতুন করে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে খাল খনন ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা বা সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির কাঠামো এখনো দৃশ্যমান নয়।

এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কারসিলেটের সংকট কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। তবে একই মূল রোগে আক্রান্ত। সুরমা-কুশিয়ারার মতো প্রধান নদীগুলোর নাব্য হারানোয় উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির পানি ধারণ করার ক্ষমতা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট বিভাগের প্রকৌশলীরা। যাঁরা নদীখননে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন, যা এখনো বিবেচনাধীন বলে জানা যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট শাখার নেতা আবদুল করিম কিম দীর্ঘদিন ধরে জরুরি ভিত্তিতে সুরমা খননের দাবি জানিয়ে আসছেন। নইলে প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ হলো, নগরের জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণের স্বাভাবিক ক্ষমতাই কমে গেছে। ফলে সাধারণ বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা আর ঢল নামলেই তা বন্যায় রূপ নেয়।

এখানেই কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি সামনে আসে। স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনা করেছে একাধিক সরকার। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জুলাই গণ অভ্যুত্থানপরবর্তী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এখন ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রতিটি সরকারের আমলেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে আধুনিক নগরায়ণ ও নাগরিক সুবিধার কথা এসেছে। প্রতিটি আমলেই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের জলাবদ্ধতা কোনো একটি সরকারের সমস্যা নয়, এটি দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। যেখানে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বারবার প্রকল্পের সুফল নষ্ট করে দিয়েছে। তাই এ প্রশ্ন ন্যায্য : যারা বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে বা ক্ষমতার অংশীদার হয়ে নাগরিক জীবনের এই মৌলিক ও পূর্বানুমানযোগ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হন, রাজনৈতিক জবাবদিহির সেই দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে? ব্যর্থতার পরও পদত্যাগ, নেতৃত্ব পরিবর্তন বা স্বচ্ছ মূল্যায়নের সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে কেন এত দুর্বল?

জনগণের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খালে-ড্রেনে বর্জ্য ফেলা, জলাশয় ভরাটে নীরব সহযোগিতা, নিয়ম না মানার প্রবণতা- এসব নাগরিক আচরণও সংকট গভীর করে। কিন্তু এই অসচেতনতা দেখিয়ে রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের আইন প্রয়োগ, পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত দায়িত্ব এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে নাগরিকরা কেন প্রায়ই দলীয় আবেগ, স্লোগান বা ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বাস্তব কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, সেই আত্মজিজ্ঞাসাও জরুরি। এটি জনগণকে হেয় করার জন্য নয়, বরং সচেতন নাগরিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা থেকেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিঃসন্দেহে বাড়ছে, কিন্তু সব ব্যর্থতার দায় জলবায়ুর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া অসততা হবে। প্রাকৃতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এক জিনিস, মানবসৃষ্ট নগর-অব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

সমাধানের পথ অজানা নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পানিব্যবস্থাপনা, খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, প্রকল্প ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা, একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা এবং প্রকৃত রাজনৈতিক জবাবদিহি। একটি রাষ্ট্রে একই জনদুর্ভোগ যদি দশকের পর দশক ফিরে আসে, তাহলে সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকে না। তা শাসনব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির সংকটে পরিণত হয়। জনগণ নিজেই যদি ব্যর্থতার হিসাব না চায়, তবে পরিবর্তনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে কীভাবে?

লেখক : প্যারিসপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক

বরিশালের দুর্গম জঙ্গলে সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী

আহসান হাবিব বরুন
বরিশালের দুর্গম জঙ্গলে সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী
সংগৃহীত ছবি

পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমীকরণ, হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছদ্মযুদ্ধ এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণের এই যুগে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের অপরিহার্য শর্ত।

সোমবার (১৩ জুলাই) বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার পূর্ব রহমতপুর ৪১ বীর এক্সারসাইজ এরিয়ায় অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর বিশেষ মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতি এবং দুর্গম জঙ্গলজুড়ে সেনা সদস্যদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ কেবল একটি রুটিন পরিদর্শন ছিল না; এটি ছিল দেশের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর আত্মিক বন্ধনের এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক বার্তা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারি আজ শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রীর এই মহড়া পরিদর্শন এবং সেখানে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

মহড়া চলাকালে তিনি জঙ্গলজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল, অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সেনা সদস্যদের মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

যুদ্ধক্ষেত্র সব সময় সমতল ভূমিতে হয় না। পাহাড়, জঙ্গল, নদী কিংবা জলাভূমি—প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন কৌশল। তাই আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিবেশের অনুকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাবুগঞ্জের বিস্তীর্ণ জঙ্গলজুড়ে সেনা সদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, গোপন চলাচল, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, কৌশলগত অগ্রসর হওয়া এবং শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবেলার বিভিন্ন অনুশীলন প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে মহড়ার বিভিন্ন ধাপ এবং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির উপযোগী প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেবল শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিবেশে মানসিক দৃঢ়তাও গড়ে তোলে।

বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ছোট আকারের চালকবিহীন উড়োজাহাজ গোয়েন্দা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টি-ড্রোন মাল্টি-ব্যারেল সিস্টেমের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। সেনা কর্মকর্তারা তাকে এই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করেন।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন সেই প্রতিরক্ষাকে আরো কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের যুগে এমন সক্ষমতা একটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে।

সামরিক ইতিহাসে একটি বিষয় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে—নেতৃত্বের শক্তি শুধু নির্দেশনায় নয়, উপস্থিতিতেও নিহিত থাকে। মহড়া চলাকালে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গলের ভেতরে কর্মরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করেন। পরে তিনি তাদের সঙ্গে মাটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশে প্রস্তুত করা সাধারণ খাবার গ্রহণ করেন। কৌটার মধ্যে মোম জ্বালিয়ে তৈরি আগুনে রান্না করা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, চিংড়ি মাছ ও ডিমের তরকারি গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা কাছ থেকে অনুভব করেন।

এ ধরনের প্রতীকী উপস্থিতি নেতৃত্ব ও সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে। একজন রাষ্ট্রনেতা যখন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশকে সম্মান জানান, তখন সেটি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মহড়া পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, তিনি একটি সেনা পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। তাই সেনা সদস্যদের কাছে এলে তার শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার বক্তব্যকে মানবিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নেতৃত্বের আবেগগত সংযোগেরও প্রতিফলন।

সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু আধুনিক অস্ত্র কিংবা উন্নত প্রযুক্তিতে নয়; জনগণের বিশ্বাসেও নিহিত থাকে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সংকট মোকাবেলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি বারবার পেশাদারি, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, সেনা সদস্যদের শৃঙ্খলা, দক্ষতা, আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশের মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উদ্ধার অভিযান, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে বাহিনীটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে। এই আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারি, মানবিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো সুনাম, মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন করবে। তিনি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ—সব কিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে থাকা দেশের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, বরিশালের বাবুগঞ্জের জঙ্গল থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তাটি দিলেন, তা একাধারে দেশপ্রেমের, আধুনিকায়নের এবং আত্মবিশ্বাসের। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলীয়ান একটি সেনাবাহিনীই পারে একটি স্বাধীন দেশের পতাকাকে চিরকাল সমুন্নত রাখতে। মাঠপর্যায়ের সৈনিকদের সঙ্গে মাটিতে বসে খাবার খাওয়া যেমন নেতৃত্বের মানবিক ও অনন্য উচ্চতাকে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের কার্যকারিতা পরিদর্শন রাষ্ট্রের কৌশলগত কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে।

পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আগামী দিনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলবে—বাবুগঞ্জের এই মহড়া সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক মূর্ত প্রতীক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল: [email protected]

সংসদ থেকে প্যারিস : দৃশ্যমান মুখ, অদৃশ্য ভিত্তি

জিল্লুর রহমান
সংসদ থেকে প্যারিস : দৃশ্যমান মুখ, অদৃশ্য ভিত্তি

সংসদ থেকে প্যারিস: দৃশ্যমান মুখ, অদৃশ্য ভিত্তি

রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি কিংবা ব্যক্তিজীবন- সব ক্ষেত্রেই আমরা সাধারণত দৃশ্যমান সাফল্যটুকুই দেখি। কে নির্বাচনে জিতলেন, কে সংসদে সামনের সারিতে বসলেন, কে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, কোন নেতা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে করমর্দন করলেন- এসবই শিরোনাম হয়। কিন্তু দৃশ্যমান সাফল্যের নিচে যে অদৃশ্য ভিত্তি থাকে, সেটি সচরাচর আলোচনায় আসে না।

একটি সংসদের শক্তি শুধু আসনসংখ্যায় নয়, সদস্যদের প্রস্তুতি, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধে। একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তবায়নের ক্ষমতায়। একটি কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু যৌথ বিবৃতি বা রাষ্ট্রীয় সফরে নয়, সেই সম্পর্ক থেকে কী বাস্তব সুফল পাওয়া গেল, তার ওপর নির্ভর করে। একইভাবে একজন মানুষের সাফল্যও শুধু তাঁর প্রতিভা বা নেতৃত্বের ফল নয়; এর পেছনে থাকে বহু মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও নীরব সহযোগিতা। এই সপ্তাহের চারটি প্রসঙ্গ আপাতদৃষ্টিতে আলাদা। কিন্তু তাদের ভিতরের প্রশ্নটি এক, দৃশ্যমান মুখের পেছনের অদৃশ্য ভিত্তি কতটা শক্ত?

১. সংসদে সংখ্যার জোর, প্রস্তুতির ঘাটতি

নতুন সংসদে সরকারি দল বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বসেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও একটি বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেছে। নির্বাচনের ফল রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। কিন্তু সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখা এক কথা নয়।

সরকারি দল সংখ্যায় শক্তিশালী, কিন্তু সংসদ পরিচালনা, বাজেট আলোচনা এবং নীতিনির্ধারণী বিতর্কে তাদের অনেক সদস্যের প্রস্তুতির ঘাটতি চোখে পড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাজেটের আয়, ব্যয়, ঘাটতি, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি কিংবা কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক প্রশ্ন অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেকটা বড় মাইক্রোফোনের মতো। সেটি কণ্ঠস্বরকে জোরালো করতে পারে, কিন্তু বক্তব্যের ভিতরে জ্ঞান ঢুকিয়ে দিতে পারে না। দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য হাত তুললে আইন পাস হয়ে যাবে, কিন্তু আইনটি ভালো কি না, সেটি নির্ভর করবে প্রস্তুতি, পর্যালোচনা ও যুক্তির ওপর। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের কাজ শুধু মন্ত্রীদের প্রশংসা করা নয়। তাঁদের দায়িত্ব সরকারকে প্রশ্ন করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং জনগণের স্বার্থে নীতিকে সংশোধনের চাপ সৃষ্টি করা। দলীয় আনুগত্য যদি প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে গ্রাস করে, তাহলে সংসদ দুর্বল হয়। আর দুর্বল সংসদ শেষ পর্যন্ত সরকারকেও দুর্বল করে।

জামায়াতের সমস্যাটি আবার অন্য ধরনের। দলটি দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছে। কিন্তু সংসদে এসে কয়েকজন সদস্যের বক্তব্য ও কর্মকান্ড দলটির সেই ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেউ বাজেটের অঙ্ক নিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন, কেউ ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রসঙ্গ তুলে বিতর্কে জড়িয়েছেন, আবার কেউ জনস্বার্থের বদলে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সুবিধার কথা সামনে এনেছেন। সরকারি অনুদান বা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনের নাম আসার অভিযোগও দলটির ঘোষিত নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যায় না। নতুন সংসদ সদস্যদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতেই পারে। কিন্তু নতুন হওয়া ভুলের ব্যাখ্যা হতে পারে, স্থায়ী অজুহাত নয়। ভোট একটি দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা দিয়ে কীভাবে হাঁটতে হয়, তা শিখতে হয়। নির্বাচনে জয়ী হলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ আইনপ্রণেতা হয়ে যান না। সংসদে যাওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সদস্যদের বাজেট, আইন, নীতি ও সংসদীয় আচরণ সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া।

২. প্রতিশ্রুতির রাষ্ট্র নয়, দরকার কাজের রাষ্ট্র

সংসদের এই প্রস্তুতিহীনতা আসলে রাষ্ট্রের আরও বড় সমস্যারই প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। আমাদের আছে রূপকল্প, মহাপরিকল্পনা, কমিশন, টাস্কফোর্স, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অসংখ্য ঘোষণা।

কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা দ্রুত একটি কমিটি করি। কমিটি প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদন আলমারিতে যায়। এরপর নতুন সমস্যা এলে নতুন কমিটি হয়। আমাদের প্রশাসনিক কল্পনাশক্তি প্রশংসনীয়; বাস্তবায়নশক্তি তুলনায় দুর্বল।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর ‘ডেলিভারি স্টেট’- যে রাষ্ট্র শুধু পরিকল্পনা তৈরি করবে না, ফলাফলও দেবে। নাগরিকের কাছে উন্নয়ন মানে সংবাদ সম্মেলনের ভাষণ নয়। তার কাছে উন্নয়ন হলো হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া, সড়ক সময়মতো শেষ হওয়া, বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকা, বিনিয়োগের অনুমোদন দ্রুত পাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হওয়া।

একজন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে একটি কারখানা করতে চাইলে তাঁকে বহু দপ্তর, অনুমোদন ও বিধির ভিতর দিয়ে যেতে হয়। প্রকল্প একটি, কিন্তু সরকারের দরজা অনেক। প্রতিটি দরজার আলাদা নিয়ম, আলাদা ফাইল এবং আলাদা সময়। ফলে অনেক সময় মনে হয়, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মূলধন অর্থ নয়, ধৈর্য।

একটি কার্যকর রাষ্ট্র গড়তে অগ্রাধিকার পরিষ্কার করতে হবে। কে কোন কাজের জন্য দায়ী, কত দিনের মধ্যে ফল দিতে হবে এবং ব্যর্থ হলে কার জবাবদিহি হবে- এসব নির্ধারণ করতে হবে। শুধু ফাইল নিষ্পত্তির সংখ্যা দিয়ে প্রশাসনের সাফল্য মাপা যাবে না। মানুষের সমস্যার সমাধানই হতে হবে প্রকৃত মানদন্ড।

এখানেই সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ যদি বাজেট না বোঝে, প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন না তোলে এবং মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির মধ্যে না আনে, তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনা কাগজেই থেকে যাবে। রাজনৈতিক সরকার জনগণের ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু ফলাফল তৈরি করে প্রতিষ্ঠান। এই দুইয়ের মধ্যে সেতুটির নাম বাস্তবায়ন।

৩. প্যারিসের সঙ্গে সম্পর্ক, সম্ভাবনার নতুন দরজা

১৪ জুলাই ফ্রান্সের বাস্তিল দিবস। ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শকে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন অর্থ দিয়েছিল। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের কাছে ফ্রান্স শুধু বিপ্লব, সাহিত্য, শিল্প কিংবা ফুটবলের দেশ নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত অংশীদার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্যের গন্ডি পেরিয়ে জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং কৌশলগত সহযোগিতার দিকে এগিয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফ্রান্স নিজেকে একটি ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তি হিসেবে দেখে। বাংলাদেশও এমন এক সময়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তে চাইছে, যখন একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।

দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, টোকিও ও প্যারিস- সবার সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রয়োজন। একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানেই আরেকজনের সঙ্গে বৈরিতা নয়। পররাষ্ট্রনীতি স্কুলের বন্ধুত্বের রাজনীতি নয়, যেখানে একজনের পাশে বসলে অন্যজন অভিমান করবে।

পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থ, ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা। তবে এখানেও প্রশ্নটি একই, ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন। কৌশলগত অংশীদারত্ব, যৌথ বিবৃতি এবং উচ্চপর্যায়ের সফর শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু এগুলোকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং যৌথ উৎপাদনে রূপ দিতে না পারলে সম্পর্ক কাগজেই সুন্দর থাকবে। শুধু পণ্য কেনা বা ঋণ নেওয়া নয়, সক্ষমতা অর্জনই হওয়া উচিত কূটনৈতিক সম্পর্কের লক্ষ্য। বাংলাদেশ যদি ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু বিমান, স্যাটেলাইট কিংবা বড় প্রকল্প কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সম্পর্কটি ক্রেতাবিক্রেতার সম্পর্ক হয়েই থাকবে। বাস্তব অংশীদারত্ব তখনই তৈরি হবে, যখন দুই দেশ জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও দক্ষতা একসঙ্গে গড়ে তুলবে।

৪. সাফল্যের মুখগুলো দৃশ্যমান, হাতগুলো নয়

সংসদ, রাষ্ট্র ও কূটনীতি- সব ক্ষেত্রেই আমরা সাধারণত দৃশ্যমান মুখগুলো দেখি। বিজয়ী নেতা সংসদের সামনের সারিতে বসেন, মন্ত্রী প্রকল্প উদ্বোধন করেন, সরকারপ্রধান চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তাঁদের দিকেই পড়ে। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনে অসংখ্য অদৃশ্য হাত থাকে।

একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনে জয়ী হলে আমরা তাঁর বক্তৃতা শুনি। কিন্তু যে কর্মী রাত জেগে পোস্টার লাগিয়েছেন, যে নারী নিজের উঠানে নির্বাচনি বৈঠক করেছেন, যে তরুণ অপমান সহ্য করেও ভোটারদের কাছে গেছেন- তাঁদের নাম সংবাদে থাকে না।

একটি সরকারি নীতি সফল হলে মন্ত্রী কৃতিত্ব পান। কিন্তু যে কর্মকর্তা তথ্য সংগ্রহ করেছেন, যে প্রকৌশলী মাঠে কাজ করেছেন, যে শিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যন্ত এলাকায় বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁরা অনেক সময় বিস্মৃত হন।

কূটনীতিতেও একই সত্য। রাষ্ট্রপ্রধানের সফর চোখে পড়ে, কিন্তু একটি সফরের পেছনে মাসের পর মাস কাজ করা কূটনীতিক, গবেষক, অনুবাদক, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কথা কেউ মনে রাখে না। ইতিহাস প্রায়ই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কলমটির নাম মনে রাখে; কাগজটি তৈরি করা হাতগুলোর নাম ভুলে যায়। সাফল্যের সবচেয়ে বড় বিপদ ব্যর্থতা নয়, স্মৃতিভ্রংশ। মানুষ যত ওপরে ওঠে, নিচের সিঁড়িটি তত সহজে ভুলে যায়। সে ভাবতে শুরু করে, দরজাটি নিজের বুদ্ধিতে খুলেছে। ভুলে যায়, কেউ হয়তো দরজার কবজা ঠিক করেছিল, কেউ আলো জ্বালিয়েছিল, কেউ পথ দেখিয়েছিল, কেউ ব্যর্থতার দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল। বুদ্ধিমত্তা দরজা খুলতে পারে। প্রতিভা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কৃতজ্ঞতা নির্ধারণ করে মানুষ কতদিন আপনার পাশে হাঁটবে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কৃতজ্ঞতা অনেক সময় ব্যক্তিপূজায় পরিণত হয়। নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা হয়, আবার সাধারণ কর্মীর অবদান সুবিধামতো ভুলে যাওয়া হয়। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কর্মীদের বলা হয়, আপনারাই দলের প্রাণ। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাঁদের অনেককে বলা হয়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসুন।

কৃতজ্ঞতা মানে পদ বা সুবিধা বিলানো নয়। কৃতজ্ঞতা মানে অবদান স্বীকার করা, সম্মান দেওয়া এবং সাফল্যের মালিকানা ভাগ করে নেওয়া। নেতা যদি প্রতিটি অর্জন নিজের নামে লিখে নেন, তবে তিনি অনুসারী তৈরি করতে পারেন, সহযাত্রী তৈরি করতে পারেন না।

শেষ কথা

সংসদ থেকে প্যারিস, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান সাফল্যের চেয়ে অদৃশ্য ভিত্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ও জামায়াত সংসদে কত আসন পেয়েছে, সেটি ইতিহাসের একটি তথ্য। তারা কতটা দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলা দেখাতে পারবে, সেটিই ভবিষ্যতের বিচার। বাংলাদেশেরও পরিকল্পনা, সম্ভাবনা ও আন্তর্জাতিক অংশীদার আছে। এখন প্রয়োজন কাজের রাষ্ট্র, জবাবদিহির সংসদ এবং ফলাফলমুখী কূটনীতি। পরিকল্পনাকে কাজে এবং সম্পর্ককে বাস্তব সুফলে পরিণত করার সক্ষমতা না থাকলে আমরা উদ্বোধনী ফলক পাব, পরিবর্তন পাব না।

আর কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার কিংবা নেতা যেন ভুলে না যান- তাঁদের প্রতিটি সাফল্যের নিচে অসংখ্য মানুষের কাঁধ রয়েছে। নির্বাচনি কর্মী থেকে সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক থেকে শ্রমিক, শিক্ষক থেকে করদাতা- এঁদের শ্রমেই রাষ্ট্রের মঞ্চ তৈরি হয়। প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা কত মানুষ আপনার নাম জানে, তা নয়। সাফল্য আপনার নাম জানার পরও আপনি কতজনের নাম মনে রেখেছেন, সেটিই আসল পরীক্ষা। কারণ কেউ একা শিখরে ওঠে না। প্রতিটি শিখরের নিচে বহু মানুষের হাতে তৈরি একটি অদৃশ্য সিঁড়ি থাকে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ