• ই-পেপার

এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কার

  • আহমেদ সোহেল বাপ্পী

বরিশালের দুর্গম জঙ্গলে সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী

আহসান হাবিব বরুন
বরিশালের দুর্গম জঙ্গলে সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী
সংগৃহীত ছবি

পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমীকরণ, হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছদ্মযুদ্ধ এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণের এই যুগে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের অপরিহার্য শর্ত।

সোমবার (১৩ জুলাই) বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার পূর্ব রহমতপুর ৪১ বীর এক্সারসাইজ এরিয়ায় অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর বিশেষ মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতি এবং দুর্গম জঙ্গলজুড়ে সেনা সদস্যদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ কেবল একটি রুটিন পরিদর্শন ছিল না; এটি ছিল দেশের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর আত্মিক বন্ধনের এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক বার্তা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারি আজ শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রীর এই মহড়া পরিদর্শন এবং সেখানে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

মহড়া চলাকালে তিনি জঙ্গলজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল, অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সেনা সদস্যদের মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

যুদ্ধক্ষেত্র সব সময় সমতল ভূমিতে হয় না। পাহাড়, জঙ্গল, নদী কিংবা জলাভূমি—প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন কৌশল। তাই আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিবেশের অনুকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাবুগঞ্জের বিস্তীর্ণ জঙ্গলজুড়ে সেনা সদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, গোপন চলাচল, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, কৌশলগত অগ্রসর হওয়া এবং শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবেলার বিভিন্ন অনুশীলন প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে মহড়ার বিভিন্ন ধাপ এবং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির উপযোগী প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেবল শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিবেশে মানসিক দৃঢ়তাও গড়ে তোলে।

বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ছোট আকারের চালকবিহীন উড়োজাহাজ গোয়েন্দা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টি-ড্রোন মাল্টি-ব্যারেল সিস্টেমের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। সেনা কর্মকর্তারা তাকে এই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করেন।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন সেই প্রতিরক্ষাকে আরো কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের যুগে এমন সক্ষমতা একটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে।

সামরিক ইতিহাসে একটি বিষয় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে—নেতৃত্বের শক্তি শুধু নির্দেশনায় নয়, উপস্থিতিতেও নিহিত থাকে। মহড়া চলাকালে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গলের ভেতরে কর্মরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করেন। পরে তিনি তাদের সঙ্গে মাটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশে প্রস্তুত করা সাধারণ খাবার গ্রহণ করেন। কৌটার মধ্যে মোম জ্বালিয়ে তৈরি আগুনে রান্না করা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, চিংড়ি মাছ ও ডিমের তরকারি গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা কাছ থেকে অনুভব করেন।

এ ধরনের প্রতীকী উপস্থিতি নেতৃত্ব ও সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে। একজন রাষ্ট্রনেতা যখন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশকে সম্মান জানান, তখন সেটি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মহড়া পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, তিনি একটি সেনা পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। তাই সেনা সদস্যদের কাছে এলে তার শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার বক্তব্যকে মানবিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নেতৃত্বের আবেগগত সংযোগেরও প্রতিফলন।

সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু আধুনিক অস্ত্র কিংবা উন্নত প্রযুক্তিতে নয়; জনগণের বিশ্বাসেও নিহিত থাকে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সংকট মোকাবেলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি বারবার পেশাদারি, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, সেনা সদস্যদের শৃঙ্খলা, দক্ষতা, আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশের মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উদ্ধার অভিযান, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে বাহিনীটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে। এই আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি আরো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারি, মানবিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো সুনাম, মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন করবে। তিনি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ—সব কিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে থাকা দেশের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, বরিশালের বাবুগঞ্জের জঙ্গল থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তাটি দিলেন, তা একাধারে দেশপ্রেমের, আধুনিকায়নের এবং আত্মবিশ্বাসের। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলীয়ান একটি সেনাবাহিনীই পারে একটি স্বাধীন দেশের পতাকাকে চিরকাল সমুন্নত রাখতে। মাঠপর্যায়ের সৈনিকদের সঙ্গে মাটিতে বসে খাবার খাওয়া যেমন নেতৃত্বের মানবিক ও অনন্য উচ্চতাকে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের কার্যকারিতা পরিদর্শন রাষ্ট্রের কৌশলগত কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে।

পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আগামী দিনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলবে—বাবুগঞ্জের এই মহড়া সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক মূর্ত প্রতীক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল: [email protected]

সংসদ থেকে প্যারিস : দৃশ্যমান মুখ, অদৃশ্য ভিত্তি

জিল্লুর রহমান
সংসদ থেকে প্যারিস : দৃশ্যমান মুখ, অদৃশ্য ভিত্তি

সংসদ থেকে প্যারিস: দৃশ্যমান মুখ, অদৃশ্য ভিত্তি

রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি কিংবা ব্যক্তিজীবন- সব ক্ষেত্রেই আমরা সাধারণত দৃশ্যমান সাফল্যটুকুই দেখি। কে নির্বাচনে জিতলেন, কে সংসদে সামনের সারিতে বসলেন, কে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, কোন নেতা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে করমর্দন করলেন- এসবই শিরোনাম হয়। কিন্তু দৃশ্যমান সাফল্যের নিচে যে অদৃশ্য ভিত্তি থাকে, সেটি সচরাচর আলোচনায় আসে না।

একটি সংসদের শক্তি শুধু আসনসংখ্যায় নয়, সদস্যদের প্রস্তুতি, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধে। একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তবায়নের ক্ষমতায়। একটি কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু যৌথ বিবৃতি বা রাষ্ট্রীয় সফরে নয়, সেই সম্পর্ক থেকে কী বাস্তব সুফল পাওয়া গেল, তার ওপর নির্ভর করে। একইভাবে একজন মানুষের সাফল্যও শুধু তাঁর প্রতিভা বা নেতৃত্বের ফল নয়; এর পেছনে থাকে বহু মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও নীরব সহযোগিতা। এই সপ্তাহের চারটি প্রসঙ্গ আপাতদৃষ্টিতে আলাদা। কিন্তু তাদের ভিতরের প্রশ্নটি এক, দৃশ্যমান মুখের পেছনের অদৃশ্য ভিত্তি কতটা শক্ত?

১. সংসদে সংখ্যার জোর, প্রস্তুতির ঘাটতি

নতুন সংসদে সরকারি দল বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বসেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও একটি বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেছে। নির্বাচনের ফল রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। কিন্তু সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখা এক কথা নয়।

সরকারি দল সংখ্যায় শক্তিশালী, কিন্তু সংসদ পরিচালনা, বাজেট আলোচনা এবং নীতিনির্ধারণী বিতর্কে তাদের অনেক সদস্যের প্রস্তুতির ঘাটতি চোখে পড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাজেটের আয়, ব্যয়, ঘাটতি, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি কিংবা কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক প্রশ্ন অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেকটা বড় মাইক্রোফোনের মতো। সেটি কণ্ঠস্বরকে জোরালো করতে পারে, কিন্তু বক্তব্যের ভিতরে জ্ঞান ঢুকিয়ে দিতে পারে না। দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য হাত তুললে আইন পাস হয়ে যাবে, কিন্তু আইনটি ভালো কি না, সেটি নির্ভর করবে প্রস্তুতি, পর্যালোচনা ও যুক্তির ওপর। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের কাজ শুধু মন্ত্রীদের প্রশংসা করা নয়। তাঁদের দায়িত্ব সরকারকে প্রশ্ন করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং জনগণের স্বার্থে নীতিকে সংশোধনের চাপ সৃষ্টি করা। দলীয় আনুগত্য যদি প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে গ্রাস করে, তাহলে সংসদ দুর্বল হয়। আর দুর্বল সংসদ শেষ পর্যন্ত সরকারকেও দুর্বল করে।

জামায়াতের সমস্যাটি আবার অন্য ধরনের। দলটি দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছে। কিন্তু সংসদে এসে কয়েকজন সদস্যের বক্তব্য ও কর্মকান্ড দলটির সেই ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেউ বাজেটের অঙ্ক নিয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন, কেউ ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রসঙ্গ তুলে বিতর্কে জড়িয়েছেন, আবার কেউ জনস্বার্থের বদলে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সুবিধার কথা সামনে এনেছেন। সরকারি অনুদান বা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনের নাম আসার অভিযোগও দলটির ঘোষিত নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যায় না। নতুন সংসদ সদস্যদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতেই পারে। কিন্তু নতুন হওয়া ভুলের ব্যাখ্যা হতে পারে, স্থায়ী অজুহাত নয়। ভোট একটি দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা দিয়ে কীভাবে হাঁটতে হয়, তা শিখতে হয়। নির্বাচনে জয়ী হলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ আইনপ্রণেতা হয়ে যান না। সংসদে যাওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সদস্যদের বাজেট, আইন, নীতি ও সংসদীয় আচরণ সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া।

২. প্রতিশ্রুতির রাষ্ট্র নয়, দরকার কাজের রাষ্ট্র

সংসদের এই প্রস্তুতিহীনতা আসলে রাষ্ট্রের আরও বড় সমস্যারই প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। আমাদের আছে রূপকল্প, মহাপরিকল্পনা, কমিশন, টাস্কফোর্স, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অসংখ্য ঘোষণা।

কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা দ্রুত একটি কমিটি করি। কমিটি প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদন আলমারিতে যায়। এরপর নতুন সমস্যা এলে নতুন কমিটি হয়। আমাদের প্রশাসনিক কল্পনাশক্তি প্রশংসনীয়; বাস্তবায়নশক্তি তুলনায় দুর্বল।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর ‘ডেলিভারি স্টেট’- যে রাষ্ট্র শুধু পরিকল্পনা তৈরি করবে না, ফলাফলও দেবে। নাগরিকের কাছে উন্নয়ন মানে সংবাদ সম্মেলনের ভাষণ নয়। তার কাছে উন্নয়ন হলো হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া, সড়ক সময়মতো শেষ হওয়া, বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকা, বিনিয়োগের অনুমোদন দ্রুত পাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হওয়া।

একজন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে একটি কারখানা করতে চাইলে তাঁকে বহু দপ্তর, অনুমোদন ও বিধির ভিতর দিয়ে যেতে হয়। প্রকল্প একটি, কিন্তু সরকারের দরজা অনেক। প্রতিটি দরজার আলাদা নিয়ম, আলাদা ফাইল এবং আলাদা সময়। ফলে অনেক সময় মনে হয়, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মূলধন অর্থ নয়, ধৈর্য।

একটি কার্যকর রাষ্ট্র গড়তে অগ্রাধিকার পরিষ্কার করতে হবে। কে কোন কাজের জন্য দায়ী, কত দিনের মধ্যে ফল দিতে হবে এবং ব্যর্থ হলে কার জবাবদিহি হবে- এসব নির্ধারণ করতে হবে। শুধু ফাইল নিষ্পত্তির সংখ্যা দিয়ে প্রশাসনের সাফল্য মাপা যাবে না। মানুষের সমস্যার সমাধানই হতে হবে প্রকৃত মানদন্ড।

এখানেই সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ যদি বাজেট না বোঝে, প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন না তোলে এবং মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির মধ্যে না আনে, তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনা কাগজেই থেকে যাবে। রাজনৈতিক সরকার জনগণের ম্যান্ডেট পায়। কিন্তু ফলাফল তৈরি করে প্রতিষ্ঠান। এই দুইয়ের মধ্যে সেতুটির নাম বাস্তবায়ন।

৩. প্যারিসের সঙ্গে সম্পর্ক, সম্ভাবনার নতুন দরজা

১৪ জুলাই ফ্রান্সের বাস্তিল দিবস। ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শকে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন অর্থ দিয়েছিল। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের কাছে ফ্রান্স শুধু বিপ্লব, সাহিত্য, শিল্প কিংবা ফুটবলের দেশ নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত অংশীদার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্যের গন্ডি পেরিয়ে জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং কৌশলগত সহযোগিতার দিকে এগিয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফ্রান্স নিজেকে একটি ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তি হিসেবে দেখে। বাংলাদেশও এমন এক সময়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তে চাইছে, যখন একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।

দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, টোকিও ও প্যারিস- সবার সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রয়োজন। একজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানেই আরেকজনের সঙ্গে বৈরিতা নয়। পররাষ্ট্রনীতি স্কুলের বন্ধুত্বের রাজনীতি নয়, যেখানে একজনের পাশে বসলে অন্যজন অভিমান করবে।

পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থ, ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা। তবে এখানেও প্রশ্নটি একই, ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন। কৌশলগত অংশীদারত্ব, যৌথ বিবৃতি এবং উচ্চপর্যায়ের সফর শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু এগুলোকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং যৌথ উৎপাদনে রূপ দিতে না পারলে সম্পর্ক কাগজেই সুন্দর থাকবে। শুধু পণ্য কেনা বা ঋণ নেওয়া নয়, সক্ষমতা অর্জনই হওয়া উচিত কূটনৈতিক সম্পর্কের লক্ষ্য। বাংলাদেশ যদি ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু বিমান, স্যাটেলাইট কিংবা বড় প্রকল্প কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সম্পর্কটি ক্রেতাবিক্রেতার সম্পর্ক হয়েই থাকবে। বাস্তব অংশীদারত্ব তখনই তৈরি হবে, যখন দুই দেশ জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও দক্ষতা একসঙ্গে গড়ে তুলবে।

৪. সাফল্যের মুখগুলো দৃশ্যমান, হাতগুলো নয়

সংসদ, রাষ্ট্র ও কূটনীতি- সব ক্ষেত্রেই আমরা সাধারণত দৃশ্যমান মুখগুলো দেখি। বিজয়ী নেতা সংসদের সামনের সারিতে বসেন, মন্ত্রী প্রকল্প উদ্বোধন করেন, সরকারপ্রধান চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তাঁদের দিকেই পড়ে। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনে অসংখ্য অদৃশ্য হাত থাকে।

একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনে জয়ী হলে আমরা তাঁর বক্তৃতা শুনি। কিন্তু যে কর্মী রাত জেগে পোস্টার লাগিয়েছেন, যে নারী নিজের উঠানে নির্বাচনি বৈঠক করেছেন, যে তরুণ অপমান সহ্য করেও ভোটারদের কাছে গেছেন- তাঁদের নাম সংবাদে থাকে না।

একটি সরকারি নীতি সফল হলে মন্ত্রী কৃতিত্ব পান। কিন্তু যে কর্মকর্তা তথ্য সংগ্রহ করেছেন, যে প্রকৌশলী মাঠে কাজ করেছেন, যে শিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যন্ত এলাকায় বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁরা অনেক সময় বিস্মৃত হন।

কূটনীতিতেও একই সত্য। রাষ্ট্রপ্রধানের সফর চোখে পড়ে, কিন্তু একটি সফরের পেছনে মাসের পর মাস কাজ করা কূটনীতিক, গবেষক, অনুবাদক, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কথা কেউ মনে রাখে না। ইতিহাস প্রায়ই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কলমটির নাম মনে রাখে; কাগজটি তৈরি করা হাতগুলোর নাম ভুলে যায়। সাফল্যের সবচেয়ে বড় বিপদ ব্যর্থতা নয়, স্মৃতিভ্রংশ। মানুষ যত ওপরে ওঠে, নিচের সিঁড়িটি তত সহজে ভুলে যায়। সে ভাবতে শুরু করে, দরজাটি নিজের বুদ্ধিতে খুলেছে। ভুলে যায়, কেউ হয়তো দরজার কবজা ঠিক করেছিল, কেউ আলো জ্বালিয়েছিল, কেউ পথ দেখিয়েছিল, কেউ ব্যর্থতার দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল। বুদ্ধিমত্তা দরজা খুলতে পারে। প্রতিভা সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কৃতজ্ঞতা নির্ধারণ করে মানুষ কতদিন আপনার পাশে হাঁটবে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কৃতজ্ঞতা অনেক সময় ব্যক্তিপূজায় পরিণত হয়। নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা হয়, আবার সাধারণ কর্মীর অবদান সুবিধামতো ভুলে যাওয়া হয়। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কর্মীদের বলা হয়, আপনারাই দলের প্রাণ। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাঁদের অনেককে বলা হয়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসুন।

কৃতজ্ঞতা মানে পদ বা সুবিধা বিলানো নয়। কৃতজ্ঞতা মানে অবদান স্বীকার করা, সম্মান দেওয়া এবং সাফল্যের মালিকানা ভাগ করে নেওয়া। নেতা যদি প্রতিটি অর্জন নিজের নামে লিখে নেন, তবে তিনি অনুসারী তৈরি করতে পারেন, সহযাত্রী তৈরি করতে পারেন না।

শেষ কথা

সংসদ থেকে প্যারিস, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান সাফল্যের চেয়ে অদৃশ্য ভিত্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ও জামায়াত সংসদে কত আসন পেয়েছে, সেটি ইতিহাসের একটি তথ্য। তারা কতটা দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলা দেখাতে পারবে, সেটিই ভবিষ্যতের বিচার। বাংলাদেশেরও পরিকল্পনা, সম্ভাবনা ও আন্তর্জাতিক অংশীদার আছে। এখন প্রয়োজন কাজের রাষ্ট্র, জবাবদিহির সংসদ এবং ফলাফলমুখী কূটনীতি। পরিকল্পনাকে কাজে এবং সম্পর্ককে বাস্তব সুফলে পরিণত করার সক্ষমতা না থাকলে আমরা উদ্বোধনী ফলক পাব, পরিবর্তন পাব না।

আর কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার কিংবা নেতা যেন ভুলে না যান- তাঁদের প্রতিটি সাফল্যের নিচে অসংখ্য মানুষের কাঁধ রয়েছে। নির্বাচনি কর্মী থেকে সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক থেকে শ্রমিক, শিক্ষক থেকে করদাতা- এঁদের শ্রমেই রাষ্ট্রের মঞ্চ তৈরি হয়। প্রকৃত সাফল্যের পরীক্ষা কত মানুষ আপনার নাম জানে, তা নয়। সাফল্য আপনার নাম জানার পরও আপনি কতজনের নাম মনে রেখেছেন, সেটিই আসল পরীক্ষা। কারণ কেউ একা শিখরে ওঠে না। প্রতিটি শিখরের নিচে বহু মানুষের হাতে তৈরি একটি অদৃশ্য সিঁড়ি থাকে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতায় বন্যার্ত মানুষের পাশে রাষ্ট্র

সিরাজুল ইসলাম
সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতায় বন্যার্ত মানুষের পাশে রাষ্ট্র

প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়, কিন্তু মানুষের কাছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অসীম। একটি সরকার কত বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, কত বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করেছে- এসব যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিক চেহারা প্রকাশ করে।

বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। নদীমাতৃক এই দেশে বর্ষা যেমন আশীর্বাদ নিয়ে আসে, তেমনি কখনো কখনো ভয়াবহ বিপর্যয়ও ডেকে আনে। নদীর পানি উপচে পড়লে শুধু মাঠ-ঘাট ডুবে যায় না, ডুবে যায় মানুষের স্বপ্ন, কৃষকের বছরের পরিশ্রম, নিম্নআয়ের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। ঘরের ভেতর পানি, মাথার ওপর আকাশ, ঘরে খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট—এই বাস্তবতায় একজন সাধারণ মানুষের কাছে তখন রাষ্ট্রই শেষ ভরসা।

চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে সরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সমন্বয় করা হচ্ছে।

দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে- রাষ্ট্র কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে? কারণ বন্যার ক্ষতি শুধু পানির উচ্চতায় মাপা যায় না; মাপতে হয় মানুষের দুর্ভোগ দিয়ে। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ যখন দিনের পর দিন পানিবন্দি থাকে, তখন তার কাছে বড় কোনো ঘোষণা নয়, প্রয়োজন হয় বাস্তব সহায়তা।

এই জায়গায় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খবরের কাগজের শিরোনাম- ‘পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেনা ও নৌবাহিনী’- শুধু একটি খবর নয়, এটি দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রতি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ও ভালোবাসার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা অন্য কোনো জাতীয় সংকটে সেনা ও নৌবাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের রয়েছে দ্রুত মোতায়েনের সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর বিশেষ ব্যবস্থা।

বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় সড়ক ডুবে যায়, নৌযান ছাড়া চলাচল সম্ভব হয় না। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরের ছাদে আশ্রয় নেয়। এসব জায়গায় নৌবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা এবং সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তা মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে আসে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত এলাকাতেও ত্রাণ পৌঁছে দিতে সব বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগ মোকাবিলা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এখানে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।

একটি দুর্যোগের সময় সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় ব্যবস্থাপনায়। কোথায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, কোন এলাকায় খাদ্য প্রয়োজন, কোথায় চিকিৎসা জরুরি, কোথায় উদ্ধার অভিযান চালাতে হবে- এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে ক্ষতি বাড়ে, মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘ হয়।

তবে বন্যার ক্ষতি শুধু বর্তমানের দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।

একজন কৃষকের কাছে একটি ফসল মানে শুধু জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ধান বা সবজি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, ঋণ পরিশোধ এবং জীবনের নিরাপত্তা। কয়েক দিনের বন্যায় অনেক কৃষকের পুরো বছরের পরিকল্পনা ভেসে যায়।

কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার। এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ ত্রাণ দিয়ে একজন কৃষকের তাৎক্ষণিক ক্ষুধা মেটানো সম্ভব, কিন্তু তাকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার, কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রয়োজন। কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে শুধু গ্রামীণ অর্থনীতি নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সরকার যে সহায়াত দেবে তারও সদ্ব্যবহার ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণসামগ্রী লুট করা কিংবা ত্রাণের অর্থ মেরে দেয়া এই দেশে নতুন কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে এই বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তা নাহলে সরকারকে বড় রকমের দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়তে হবে যা রাজনীতিতে তাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে।

বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক দশকে অনেক উন্নতি হয়েছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার সক্ষমতা- অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বন্যার ধরণ আরো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু দুর্যোগের সময় প্রতিক্রিয়া দেখালে হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ একটি দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো- দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া।

রাজনৈতিকভাবেও দুর্যোগ একটি বড় পরীক্ষা। কারণ জনগণ সংকটের সময় সরকারের কার্যকারিতা বিচার করে। সাধারণ মানুষ দেখতে চায়, সরকার শুধু বক্তব্য দিচ্ছে নাকি বাস্তব মাঠে কাজ করছে। তাই ত্রাণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সঠিক মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

একটি সরকার তখনই মানুষের আস্থা অর্জন করে, যখন মানুষ সংকটের মুহূর্তে অনুভব করে- রাষ্ট্র তাকে ভুলে যায়নি। বন্যার পানিতে আটকে থাকা একজন মানুষ যখন নৌকায় করে সরকারি সহায়তা পায়, তখন সেটি শুধু খাদ্য বা ওষুধ নয়; এটি রাষ্ট্রের উপস্থিতির একটি বার্তা হয়ে যায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো- উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটি পূরণ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো সংকটের সময় তার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

আজ বন্যার্ত মানুষের চোখে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা- রাষ্ট্র যেন তাদের পাশে থাকে। সেনা, নৌবাহিনী, প্রশাসন ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই আস্থাই তৈরি করতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয় উন্নয়নের সংখ্যায় নয়, বরং বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি বন্যার্ত মানুষের কাছে ছুটে যান তাহলে সেটি হবে অনেক বড় কাজ, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারি জোটের জন্য হবে বড় রাজনৈতিক পুঁজি।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর

প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ছাড়া কি শুধু সংযোগই যথেষ্ট?

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ছাড়া কি শুধু সংযোগই যথেষ্ট?
সংগৃহীত ছবি

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডর গ্রহণের আগে বাংলাদেশের উচিত এর অর্থনৈতিক, নিরাপত্তাগত এবং কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডরের সম্ভাবনা আবারও আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উঠে এসেছে। এর সম্ভাব্য সুফল আকর্ষণীয়—পরিবহন ব্যয় কমবে, বাণিজ্য বাড়বে, আঞ্চলিক সংহতি জোরদার হবে এবং বিনিয়োগ ও পর্যটনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন এ ধরনের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বের দাবি রাখে।

তবে সংযোগ (কানেক্টিভিটি) নিজেই কোনো অর্থনৈতিক কৌশল নয়। সড়ক ও রেলপথ বাণিজ্যকে সহজ করে, কিন্তু নিজেরা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সৃষ্টি করে না।

বাংলাদেশ এই করিডর থেকে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশের উৎপাদনক্ষম অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, প্রকল্প অর্থায়নের টেকসইতা এবং করিডর যে অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে তার নিরাপত্তার ওপর। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সতর্কভাবে এগোনোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসে চীন থেকে।

সংযোগ বৃদ্ধির সমর্থকদের যুক্তি, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা রপ্তানি বাড়াবে। এটি সম্ভব, তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কাঠামোগত বাণিজ্য বৈষম্য দূর করা যায় না। বরং যেসব দেশের উৎপাদন খাত শক্তিশালী, প্রযুক্তি উন্নত এবং শিল্পভিত্তি বৈচিত্র্যময়, তারাই বেশি লাভবান হয়।

বাংলাদেশ যদি তার রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে না পারে, তাহলে নতুন করিডর হয়তো চীন থেকে আরো বেশি আমদানি সহজ করবে এবং বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়িয়ে দেবে।

সমস্যাটি আরো জটিল, কারণ বাংলাদেশের ও চীনের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে সাদৃশ্য ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানির মূল ভিত্তি তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জুতা এবং অন্যান্য শ্রমনির্ভর শিল্প। অন্যদিকে চীন এসব শিল্পে এখনও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, পাশাপাশি উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্পের পরিসর, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত লজিস্টিকস, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সহজ মূলধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেচীনের বিশাল সুবিধা রয়েছে। শুধু উন্নত সংযোগব্যবস্থা এসব কাঠামোগত ব্যবধান দূর করতে পারবে না।

কানেক্টিভিটি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সেবা দেয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবু পণ্যবাহী রেল, লজিস্টিক পার্ক, গুদামজাতকরণ, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর না হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান সুবিধাভোগী হওয়ার পরিবর্তে কেবল একটি ট্রানজিট দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

প্রকল্পটির আর্থিক দিকও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের বড় ব্যয় থাকে। এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবসম্মত যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস, বাণিজ্যিকভাবে টেকসই পরিচালনা এবং স্বচ্ছ অর্থায়নের ওপর। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ঋণের বোঝা এখনও সহনীয় হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমাহীন নয়।

আন্তর্জাতিক করিডরে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার মানে বন্দর উন্নয়ন, রপ্তানি লজিস্টিকস, জলবায়ু সহনশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিল্প উদ্ভাবনে বিনিয়োগের জন্য কম অর্থ। তাই প্রশ্নটি শুধু সংযোগ ভালো কি না, তা নয়; বরং এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পর্যটনকেও সম্ভাব্য বড় সুফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। উন্নত সড়ক যোগাযোগ ভ্রমণ সহজ করবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পর্যটন শুধু সড়কের ওপর নির্ভর করে না। পর্যটন অবকাঠামো, আতিথেয়তা খাত, গন্তব্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সমান্তরাল বিনিয়োগ না হলে পর্যটনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক বিষয়ই পুরো চিত্র নয়। প্রস্তাবিত করিডরটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাবে, যেখানে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবাধীন। এমন অস্থিতিশীল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা নিরাপত্তা, আইনগত এবং পরিচালনাগত ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক uncertainty (অনিশ্চয়তা), কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং চলমান সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য মোটেই অনুকূল পরিবেশ নয়।

এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু—অমীমাংসিত রোহিঙ্গা সংকট। বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে শরণার্থী প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই বড় আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নিলে এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, মানবিক দায়বদ্ধতার চেয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ধারণা বাস্তব হোক বা না হোক, এটি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

আরো একটি উদ্বেগ হলো, করিডর-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। যদি করিডর থেকে রাজস্ব, কর আদায় বা রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতি অনিবার্য নয়, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত।

বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে এবং চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। তাই চীন প্রস্তাবিত এই করিডর, যা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ও ভারতের সংবেদনশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী এলাকা অতিক্রম করবে, স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক কৌশলগত নজরদারির বিষয় হবে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রায় ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত চীন–লাওস রেলপথ আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করেছে, তবে এর অর্থায়ন কাঠামো এবং তা কতটা টেকসই তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি), যার প্রাথমিক মূল্য ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং পরে বেড়ে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নিরাপত্তা সমস্যা, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দরের প্রথম ধাপ নির্মাণে প্রায় ৩৬১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যার বড় অংশই ছিল চীনা ঋণ। যদিও শ্রীলঙ্কার ঋণ সংকটের পেছনে বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণ ছিল, তবুও প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায় এই প্রকল্পটি সেখানে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এসব উদাহরণ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, চীনা অর্থায়নে নির্মিত সব অবকাঠামো প্রকল্প সমস্যাজনক। বরং এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সফল সংযোগ শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং কঠোর প্রকল্প মূল্যায়ন, স্বচ্ছ অর্থায়ন, শক্তিশালী institution (প্রতিষ্ঠা), বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে।

সুতরাং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে নেওয়া উচিত, ভূ-রাজনৈতিক আবেগের ভিত্তিতে নয়। স্বাধীন অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, স্বচ্ছ অর্থায়ন, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ—এসবই যেকোনো প্রতিশ্রুতির পূর্বশর্ত হওয়া উচিত।

সংযোগ নিঃসন্দেহে উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি আগে নিজের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সুরক্ষিত করতে না পারে, তবে নতুন এই করিডর হয়তো দেশকে আঞ্চলিক সমৃদ্ধির চেয়ে আঞ্চলিক ঝুঁকির সঙ্গেই আরো দ্রুত যুক্ত করবে।