চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডর গ্রহণের আগে বাংলাদেশের উচিত এর অর্থনৈতিক, নিরাপত্তাগত এবং কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডরের সম্ভাবনা আবারও আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উঠে এসেছে। এর সম্ভাব্য সুফল আকর্ষণীয়—পরিবহন ব্যয় কমবে, বাণিজ্য বাড়বে, আঞ্চলিক সংহতি জোরদার হবে এবং বিনিয়োগ ও পর্যটনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন এ ধরনের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বের দাবি রাখে।
তবে সংযোগ (কানেক্টিভিটি) নিজেই কোনো অর্থনৈতিক কৌশল নয়। সড়ক ও রেলপথ বাণিজ্যকে সহজ করে, কিন্তু নিজেরা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সৃষ্টি করে না।
বাংলাদেশ এই করিডর থেকে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশের উৎপাদনক্ষম অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, প্রকল্প অর্থায়নের টেকসইতা এবং করিডর যে অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে তার নিরাপত্তার ওপর। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সতর্কভাবে এগোনোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসে চীন থেকে।
সংযোগ বৃদ্ধির সমর্থকদের যুক্তি, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা রপ্তানি বাড়াবে। এটি সম্ভব, তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কাঠামোগত বাণিজ্য বৈষম্য দূর করা যায় না। বরং যেসব দেশের উৎপাদন খাত শক্তিশালী, প্রযুক্তি উন্নত এবং শিল্পভিত্তি বৈচিত্র্যময়, তারাই বেশি লাভবান হয়।
বাংলাদেশ যদি তার রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে না পারে, তাহলে নতুন করিডর হয়তো চীন থেকে আরো বেশি আমদানি সহজ করবে এবং বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়িয়ে দেবে।
সমস্যাটি আরো জটিল, কারণ বাংলাদেশের ও চীনের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে সাদৃশ্য ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানির মূল ভিত্তি তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জুতা এবং অন্যান্য শ্রমনির্ভর শিল্প। অন্যদিকে চীন এসব শিল্পে এখনও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, পাশাপাশি উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্পের পরিসর, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত লজিস্টিকস, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সহজ মূলধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেচীনের বিশাল সুবিধা রয়েছে। শুধু উন্নত সংযোগব্যবস্থা এসব কাঠামোগত ব্যবধান দূর করতে পারবে না।
কানেক্টিভিটি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সেবা দেয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবু পণ্যবাহী রেল, লজিস্টিক পার্ক, গুদামজাতকরণ, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর না হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান সুবিধাভোগী হওয়ার পরিবর্তে কেবল একটি ট্রানজিট দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
প্রকল্পটির আর্থিক দিকও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের বড় ব্যয় থাকে। এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবসম্মত যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস, বাণিজ্যিকভাবে টেকসই পরিচালনা এবং স্বচ্ছ অর্থায়নের ওপর। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ঋণের বোঝা এখনও সহনীয় হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমাহীন নয়।
আন্তর্জাতিক করিডরে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার মানে বন্দর উন্নয়ন, রপ্তানি লজিস্টিকস, জলবায়ু সহনশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিল্প উদ্ভাবনে বিনিয়োগের জন্য কম অর্থ। তাই প্রশ্নটি শুধু সংযোগ ভালো কি না, তা নয়; বরং এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পর্যটনকেও সম্ভাব্য বড় সুফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। উন্নত সড়ক যোগাযোগ ভ্রমণ সহজ করবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পর্যটন শুধু সড়কের ওপর নির্ভর করে না। পর্যটন অবকাঠামো, আতিথেয়তা খাত, গন্তব্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সমান্তরাল বিনিয়োগ না হলে পর্যটনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক বিষয়ই পুরো চিত্র নয়। প্রস্তাবিত করিডরটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাবে, যেখানে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবাধীন। এমন অস্থিতিশীল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা নিরাপত্তা, আইনগত এবং পরিচালনাগত ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক uncertainty (অনিশ্চয়তা), কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং চলমান সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য মোটেই অনুকূল পরিবেশ নয়।
এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু—অমীমাংসিত রোহিঙ্গা সংকট। বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে শরণার্থী প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই বড় আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নিলে এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, মানবিক দায়বদ্ধতার চেয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ধারণা বাস্তব হোক বা না হোক, এটি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
আরো একটি উদ্বেগ হলো, করিডর-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। যদি করিডর থেকে রাজস্ব, কর আদায় বা রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতি অনিবার্য নয়, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত।
বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে এবং চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। তাই চীন প্রস্তাবিত এই করিডর, যা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ও ভারতের সংবেদনশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী এলাকা অতিক্রম করবে, স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক কৌশলগত নজরদারির বিষয় হবে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রায় ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত চীন–লাওস রেলপথ আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করেছে, তবে এর অর্থায়ন কাঠামো এবং তা কতটা টেকসই তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি), যার প্রাথমিক মূল্য ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং পরে বেড়ে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নিরাপত্তা সমস্যা, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দরের প্রথম ধাপ নির্মাণে প্রায় ৩৬১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যার বড় অংশই ছিল চীনা ঋণ। যদিও শ্রীলঙ্কার ঋণ সংকটের পেছনে বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণ ছিল, তবুও প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায় এই প্রকল্পটি সেখানে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এসব উদাহরণ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, চীনা অর্থায়নে নির্মিত সব অবকাঠামো প্রকল্প সমস্যাজনক। বরং এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সফল সংযোগ শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং কঠোর প্রকল্প মূল্যায়ন, স্বচ্ছ অর্থায়ন, শক্তিশালী institution (প্রতিষ্ঠা), বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে।
সুতরাং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে নেওয়া উচিত, ভূ-রাজনৈতিক আবেগের ভিত্তিতে নয়। স্বাধীন অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, স্বচ্ছ অর্থায়ন, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ—এসবই যেকোনো প্রতিশ্রুতির পূর্বশর্ত হওয়া উচিত।
সংযোগ নিঃসন্দেহে উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি আগে নিজের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সুরক্ষিত করতে না পারে, তবে নতুন এই করিডর হয়তো দেশকে আঞ্চলিক সমৃদ্ধির চেয়ে আঞ্চলিক ঝুঁকির সঙ্গেই আরো দ্রুত যুক্ত করবে।






