ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম পুরোধা ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের আইন অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ছিলেন।
জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স ছিলেন একজন জোতদার (ধনী কৃষক)। তার শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ অনার্স এবং এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৬০ সালের ২৭ মে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আইন পেশা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট থেকে শুরু পরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। আইন অঙ্গনে তার পাণ্ডিত্য শুধু সাধারণ ওকালতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্প ও বাণিজ্য আইন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন। তার নেতৃত্বে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গতি পেয়েছিল।
পড়ুন: ব্যতিক্রমী স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একজন সচেতন পেশাজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ওই সময় হাইকোর্টের আইনজীবীদের ক্ষুদ্র ও সাহসী দলটির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। আইনজীবীদের এ গ্রুপটি তখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠন এবং আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
রাজনীতিতে জমির উদ্দিন সরকারের হাতেখড়ি হয় ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দল গঠনের উদ্যোগ নেন, তখন জমির উদ্দিন সরকার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের (জাগদল) গঠনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব পান। পরে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
জমির উদ্দিন সরকার পাঁচবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার এবং পরে ঢাকা-৯ ও পঞ্চগড়-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন এবং জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ প্রণয়ণের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার তত্ত্বাবধানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে স্বল্পকালীন বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলের খসড়া প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
অষ্টম জাতীয় সংসদে (২০০১-২০০৯) জমির উদ্দিন সরকার জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় তিনি পদাধিকার বলে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। সংসদীয় রীতিনীতি রক্ষায় তার নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা দল-মত নির্বিশেষে প্রশংসিত হয়েছে। সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনে তিনি অত্যন্ত সংযম, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
তার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি উপকূলীয় দেশগুলোর অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন।
পড়ুন: ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখক। ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘স্ট্রংগার ইউনাইটেড ন্যাশনস ফর পিসফুল ওয়েলফেয়ার ওয়াল্ড’, ‘পাল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’, ‘গ্লিমপেসেস অব ইন্টারন্যাশনাল ল’, ‘অষ্টম সংসদে স্পিকার’, ‘দি ল অব দি সি’, ‘ল অব দি ইন্টান্যাশনাল রিভারস এ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্রস’, ‘লন্ডনে বন্ধু-বান্ধব’, ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’ ও ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’ উল্লেখযোগ্য বই।
রাজনীতির নানা সংকটময় সময়ে জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন ভারসাম্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তিনি সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দলীয় অবস্থান থেকে বক্তব্য দিলেও তার অনেক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্ব পেয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি সাদাসিধে জীবনযাপন, ভদ্রতা ও শালীন আচরণের জন্য পরিচিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তার সৌজন্যপূর্ণ আচরণ এবং যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তাকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। দেশের আইনজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন জমির উদ্দিন সরকার। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




