• ই-পেপার

সরকারের সুবিধাজনক অবস্থার অসুবিধা

ফেসবুক, ইউটিউব কেন অফিস করে না বাংলাদেশে?

অদিতি করিম
ফেসবুক, ইউটিউব কেন অফিস করে না বাংলাদেশে?

বাংলাদেশে এখন মতপ্রকাশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়া কেবল স্বাভাবিক জনমতকে প্রভাবিত করছে না, এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বহু মাত্রিক সমস্যা। এখন সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের চরিত্রহননের অন্যতম হাতিয়ার। অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান বাহন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অবাধে চলছে ব্ল্যাকমেল, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার এবং মিথ্যাচার। জনমত পাল্টে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার বটবাহিনী। গুজব, অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে করা হচ্ছে বিভ্রান্ত। শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন রীতিমতো আতঙ্কের নাম। দেশে দেশে তাই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে এসব উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতা ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন অপব্যবহার, সাইবার অপরাধ এবং মিথ্যাচার ঠেকাতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ভারতেও সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো সেই দেশের আইনের আওতায় চলে। ফলে অধিকাংশ দেশই সাইবার অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যেন অসহায়। একদিকে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নেই তেমন কার্যকর আইন, অন্যদিকে ফেসবুক, টুইটার কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। ফলে সাইবার অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। এদের মধ্যে চলতি বছরের জুনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন। ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। ফেসবুক বা ইউটিউব বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে। বাংলাদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতি বছর ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করে মেটা এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে ইউটিউবের আয়ও ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কাজেই বাংলাদেশ ফেসবুক বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক বিশাল বাজার। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এত বড় বাজার আছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য। বাংলাদেশ থেকে এত বিপুল পরিমাণ আয় করলেও বাংলাদেশ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর। এদের নেই কোনো জবাবদিহিতা। এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো আপত্তিকর, অশালীন, দেশের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট পোস্ট করা হলে বাংলাদেশ কেবল ফেসবুককে অনুরোধ করতে পারে, আপত্তিকর কন্টেন্টটি সরিয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের মর্জি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়, এ কনটেন্ট সরাবে কি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরাসরি আপত্তিকর লিংক সরানো, কনটেন্ট ব্লক করার মতো সক্ষমতা নেই দেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির। সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষ বরাবর অনুরোধ পাঠিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা তাদের গাইডলাইন ও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে যায়, এমন সব লিংক বা কনটেন্ট অপসারণ করে বাংলাদেশের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুরোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কাছে যায় তার তিন ভাগের এক ভাগেরও কম অনুরোধে তারা সাড়া দেয়। তাছাড়া এসব কনটেন্ট অপসারণে এত বেশি সময় নেয় যে এটা সরানোর আগেই যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যায়। বাংলাদেশ যেন ফেসবুক, ইউটিউবের কাছে জিম্মি। এসব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম যেন একালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধান আইনে আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে অফিস না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশের আইনের আওতায় আসবে না। যত কঠিন আইন করা হোক না কেন তা শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারের একটি বড় অংশ হচ্ছে বিদেশ থেকে। আইন যতই কঠোর হোক, বিদেশ বসে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে এ আইন কিছুই করতে পারবে না।

তাই সাইবার অপরাধ এবং হিংসাত্মক অপপ্রচার বন্ধের একমাত্র উপায় হলো মেটা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অফিস করতে বাধ্য করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার প্রতিরোধ করেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে কখনো বা সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের দেশে অফিস খুলতে বাধ্য করেছে। মেক্সিকোর কথাই ধরা যাক, মাদক নেটওয়ার্কের জন্য সেদেশে ফেসবুক হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। সরকার বিষয়টি জানার পর ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু ফেসবুক মেক্সিকো সরকারের কথায় কান দেয়নি। অতঃপর ওই দেশের সরকার সাময়িকভাবে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা সেখানে অফিস করতে বাধ্য হয়। জার্মানি ফেসবুক কে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের দেশে অফিস না করলে এবং আইন না মানলে তারা এ প্ল্যাটফর্মকে কার্যক্রম করতে দেবে না। এভাবেই ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনেছে। শুধু তাই নয়. এসব আইনে বিপুল পরিমাণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে, এসব প্ল্যাটফর্মে কোনো কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও হিংসাত্মক পোস্ট হলে তার দায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর বর্তায়। প্রতি বছর মেটা কে মিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হয় এখন। ফলে কোনো অপতথ্য পোস্ট যেন না হয় সেদিকে নজর রাখে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নিজেই। এটাই হলো অপতথ্য প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে আজ যা ঘটছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এত ভয়াবহ না হলেও এর কাছাকাছি অবস্থা ছিল। সেখান থেকে আইন করে, ফেসবুক ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় এনে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভারতে কার্যালয় করতে বাধ্য করেছে। তাদের ভারতীয় আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য প্রকাশ করলে সরাসরি প্রথম এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বলা হয়। এর ফলে কাউকে হয়রানি করা, ব্ল্যাকমেল করা পোস্টগুলো দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামিয়ে ফেলে। ভারতে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রধানত আইনগত নীতিমালা এবং কঠোর সরকারি নির্দেশিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভুয়া খবর প্রতিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০ (ওঞ অপঃ), তথ্যপ্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস এবং ডিজিটাল মিডিয়া এথিক্স কোড) রুলস, ২০২১ (ওঞ জঁষবং, ২০২১) এর মাধ্যমে ভারত মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত রেখেই অপতথ্য, গুজব এবং হিংসাত্মক পোস্ট প্রতিরোধে অনেকটাই সফল হয়েছে। বিভিন্ন দেশ মেটা এবং গুগলের অফিসের শাখা তাদের দেশে করতে বাধ্য করেছে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২০ টাকা ধরে) জরিমানা করেছে আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশন (ডিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও গুগলকে ২১ কোটি ইউরো জরিমানা করেছে ফ্রান্স সরকার। অস্ট্রেলিয়া গত বছর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, চরিত্র হনন এবং হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সব আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। মেটা বা গুগলের কোনো শাখা অফিস নেই বাংলাদেশে অথচ বাংলাদেশের ছয় কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। মেটার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ফেসবুক ব্যবহারের বিশ্বে দশম। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম ব্যবহারকারী দেশ সিংগাপুর, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েলে মেটা অফিস খুলেছে।

কাজেই বাংলাদেশকেও সেই পথে যেতে হবে। সমস্যা সমাধানের উৎসে যেতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে বাধ্য করতে হবে। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাস আমাদের সব অর্জন ধ্বংস করে দেবে।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]

চব্বিশের তাপে তেইশের ‘১-দফা’ ভুলে যাওয়ার অনুতাপ

শায়রুল কবির খান
চব্বিশের তাপে তেইশের ‘১-দফা’ ভুলে যাওয়ার অনুতাপ

দিনটি ছিল ২০২৩ সালের ১২ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সেদিন রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশ থেকে যুগপৎ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। 

সমাবেশে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে ঐতিহাসিক ‘একদফা’ ঘোষণা করেন। তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের মূল বার্তা ছিল—‘দফা এক, দাবি এক—শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। 

স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে তিনি দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। 

বিএনপির এই ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে একই দিনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটগুলোও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে পৃথক সমাবেশ থেকে অভিন্ন একদফার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, ১২ দলীয় জোট বিজয়নগর এলাকায়, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টন এলাকায়, গণফোরাম ও পিপলস পার্টি মতিঝিল এলাকায় এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সমমনা দলগুলো স্ব-স্ব অবস্থান থেকে রাজপথে নেমে আসে। 

জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তেইশের জুলাইয়ের সেই তীব্র গণ-আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংকল্পই মূলত পরবর্তী সময়ে চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের এক মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশের দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে ২০০৭ সালের শেষের দিকে ওয়ান-ইলেভেনের জেনারেল মঈন ও ফখরুদ্দিনের মাইনাস-টু ফর্মুলার সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর ওপর শুরু হয় চরম নির্যাতন, হামলা ও মামলার এক অন্তহীন অধ্যায়। 

দমন-পীড়নের মধ্যেই ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের বর্বর হামলা, ভাঙচুর ও গণগ্রেপ্তার চালানো হয় এবং পরদিন গভীর রাতে গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গোলাপবাগ মাঠের ঐতিহাসিক বিভাগীয় মহাসমাবেশ থেকে প্রধান অতিথি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক ‘১০ দফা’ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, যা যুগপৎ আন্দোলনের এক শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে।

সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের পুরো জুলাই মাস জুড়ে বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচিতে সরকারি পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলা, পাল্টা কর্মসূচি এবং নিষ্ঠুরতম নিপীড়ন চালানো হয়। তেইশের জুলাইয়ের তেমনি এক ভয়াল, অগ্নিঝরা দুপুরে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা আর চারদিকের চরম প্রতিকূলতার মাঝে নয়াপল্টনের মহাসমাবেশে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেদিন দেশের তরুণ সমাজের কাছে তারুণ্যের প্রতীক এবং স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের রক্ত ও নীতির যোগ্য উত্তরসূরি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভাষণ প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে প্রকম্পিত মাইকে বেজে ওঠে। তাঁর সেই অকুতোভয় ও বজ্রকণ্ঠের দিকনির্দেশনা লাখো জনতার ভেতরের সব ভয়কে জয় করে এক অদম্য সাহসের জন্ম দিয়েছিল এবং পুরো নয়াপল্টন ময়দানকে এক ঐতিহাসিক গণজোয়ারে কাঁপিয়ে তুলেছিল।

সেদিন নয়াপল্টনের সেই অগ্নিঝরা দুপুরে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও চরম আবেগে ফেটে পড়েছিল উত্তাল লাখো জনতা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অকুতোভয় বক্তব্য শুনে স্বৈরাচারের পতন এবং গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর লাখো মানুষের চোখ গড়িয়ে জল নেমে এসেছিল। 

আজ অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের অভূতপূর্ব জৌলুসের আড়ালে কি তেইশের জুলাইয়ের সেই সুকঠিন ও রক্তঝরা গণ-আন্দোলন হারিয়ে গেছে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের স্বপ্নে পাগলপারা জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলো কোনোভাবেই ভুলে যাওয়ার নয়। 

শত শত বাধা, নিপীড়ন ও বুলেটের ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে গড়ে ওঠা সেই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দুটি দিন ছিল একেকটি মহাসমুদ্রের মতো—একটি ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ এবং অন্যটি ২০২৩ সালের ১২ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণজোয়ার। 

দীর্ঘ ১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে রাজপথে বিএনপির নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত ফসল এই ১২ জুলাই। এদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মুখ থেকে আসা সেই ঐতিহাসিক ‘১-দফা’ ঘোষণা আজ দলের প্রতিটি নেতাকর্মী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল এক অনন্য প্রেরণা ও অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে তুলনামূলক উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপর ভর করে মধ্যম আয়ের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অগ্রযাত্রায় রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি—উভয়েরই ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের প্রেক্ষাপটে। মুদ্রানীতি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ, সুদের হার এবং তারল্য নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সব সময়ই একটি জটিল চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রধান লক্ষ্য উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ৮ শতাংশের ওপরে এবং কিছু সময় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়ন অর্থনীতিকে আরো নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, তারল্য সংকোচন এবং ঋণ প্রবাহ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা সামগ্রিকভাবে একটি ‘মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক অবস্থান’ নির্দেশ করে।

এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নীতি সুদের হারকে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া, যা গত এক দশকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ স্তরগুলোর একটি। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রেপো ও রিভার্স রেপো ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ডলার প্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টাকার ওপর চাপ কিছুটা কমানো গেলেও অর্থনীতিতে তারল্য সংকোচন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে একটি ‘বেসরকারি খাতকে স্থানচ্যুত করার প্রভাব (crowding out effect)’ সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে সরকারি ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই নীতির সামগ্রিক চরিত্রকে ‘মূল্যস্ফীতি-প্রথম অগ্রাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, এমনকি তা স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও। উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নীতি স্বাভাবিক হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়। বিশেষ করে যখন অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ ঘাটতি বিদ্যমান, তখন অতিরিক্ত সংকোচন প্রবৃদ্ধির গতি আরো ধীর করে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক ধীরে ও তথ্যনির্ভরভাবে সুদের হার সমন্বয় করছে, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে মন্দা ও কর্মসংস্থান সংকোচনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এই দুই চরম অবস্থানের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা থাকলেও উৎপাদন খাতের ওপর চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

এই নীতির সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহে। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে এই প্রভাব আরও তীব্র, কারণ এই খাতগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অর্থনীতির গতিশীলতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন এবং ঋণের উচ্চ ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখছেন।

এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আচরণ পরিবর্তিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। তারা ঝুঁকি এড়াতে সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক প্রবাহকে সীমিত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মূলধন গঠন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মোট বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩১-৩৩ শতাংশের মধ্যে স্থবির থাকায় এটি একটি উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উৎপাদন খাতেও এই নীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্প যেমন তৈরি পোশাক, চামড়া এবং হালকা প্রকৌশল খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের উচ্চ খরচ লাভজনকতা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে এবং বিদ্যমান উৎপাদন সম্প্রসারণও ধীর হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর পড়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকটও এতে ভূমিকা রেখেছে, তবে মুদ্রানীতির কঠোর অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তবে এই নীতির ইতিবাচক দিকও উপেক্ষা করা যায় না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে মানুষের বাস্তব আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে সহায়তা করতে পারে।

বর্তমান নীতির যথার্থতা মূলত এর লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করে এবং সেই দিক থেকে এটি আংশিকভাবে সফল বলা যায়। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো নীতির প্রভাব বাস্তব অর্থনীতিতে পুরোপুরি কার্যকরভাবে পৌঁছাতে না পারা। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এই নীতির প্রভাব অর্থনীতির বাস্তব খাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ঋণ সংকোচন ঘটলেও উৎপাদন কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মুদ্রানীতিকে মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা স্বাভাবিক হলেও এটি একমাত্র বা সর্বোত্তম সমাধান ছিল না। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে একই সঙ্গে উৎপাদন ঘাটতি, বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বিদ্যমান, সেখানে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত বিকল্প গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ ছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারত ‘লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ নীতি’, যেখানে সামগ্রিক ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করার পরিবর্তে কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধা আরো বিস্তৃত করা যেত। এতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ কিছুটা বজায় থাকলেও উৎপাদনশীল খাতের কার্যক্রম ও বিনিয়োগ প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে থেমে যেত না, ফলে অর্থনীতির বাস্তব খাত তুলনামূলকভাবে সচল থাকতে পারত।

এ ছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও নীতির কার্যকারিতা সীমিত করেছে। শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সরবরাহ-পক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধান হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ যেহেতু খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচনির্ভর, তাই একই সময়ে এই খাতগুলোতে সমন্বিত সরকারি হস্তক্ষেপ থাকলে নীতির ফল আরো কার্যকর হতে পারত।

অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বাজারে বিকৃতি তৈরি করেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে এবং পরোক্ষভাবে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধীরে ধীরে আরো নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলে এই ধরনের অকার্যকারিতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরো স্থিতিশীল থাকত।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতার ভিত্তিতে মুদ্রানীতি নির্ধারণ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তুলনামূলকভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কাঠামো থাকলেও সুদের হার পরিবর্তন ধীরে এবং পরিমিতভাবে করা হয়, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় থাকে। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল থাকায় তাদের মুদ্রানীতি তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি সহায়ক।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ২০১৯-২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী সুদের হার দ্রুত বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে তারা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়, যেখানে একসময় দ্বিগুণ অঙ্কেরও অনেক বেশি মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। তবে এর বিনিময়ে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপের মুখে পড়ে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের কারণে বারবার সুদের হার বৃদ্ধি করতে হয়েছে, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক সময় ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবিরতা-স্ফীতিজনিত ফাঁদ’-এর মতো অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি এবং অন্যদিকে নিম্ন প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে বিদ্যমান।

বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের তুলনায় একটি মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। এখানে মুদ্রাস্ফীতি ভারতের তুলনায় বেশি হলেও শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো অতিরিক্ত সংকটপূর্ণ নয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা হলো নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সমস্যা, যা মুদ্রানীতির সুফলকে পুরো অর্থনীতিতে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে বাধা সৃষ্টি করে।

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কেবলমাত্র কঠোরতা বা শিথিলতা নয়, বরং নীতির গুণগত ভারসাম্যই একটি দেশের অর্থনৈতিক সফলতার মূল নির্ধারক। সামগ্রিকভাবে বর্তমান মুদ্রানীতি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি আংশিকভাবে সফল হলেও বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমন একটি অর্থনীতিতে যেখানে সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিদ্যমান, সেখানে শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারে না।

ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং শিল্পনীতি পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ও সুশাসন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার আনা অপরিহার্য। কেবল সুদের হার বৃদ্ধি বা তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতে একটি দ্বৈত-পথ মুদ্রানীতি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে, যেখানে একদিকে কঠোর নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে, অন্যদিকে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের মতো উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রানীতি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকাঠামোই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?

বিশেষ প্রতিনিধি
পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির বৈঠকে পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন খবর স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর নগর পুলিশিং ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে বাংলাদেশও এ উদ্যোগ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এক দেশের জননীতি-সংক্রান্ত উদ্যোগ সম্পর্কে অন্য দেশের আগ্রহী হওয়ায় অস্বাভাবিক কিছু নেই। কোনো নীতি নিজ দেশে প্রয়োগের আগে নীতিনির্ধারকরা নিয়মিতভাবেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য বিচার করেন। কিন্তু বিষয়টি যখন রাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরের নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ শুধু তার সাফল্য জানা নয়; তার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা থেকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা নেওয়া।

বাংলাদেশ যখন একটি ডিজিটাল সক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘সেফ সিটি’ ধারণাটি ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সমন্বিত কমান্ড সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (এএনপিআর) এবং হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরার সমন্বয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের এক নতুন যুগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়—আরো উন্নত প্রযুক্তি, আরো দ্রুত সাড়া এবং আরো নিরাপদ শহর।

বিশেষ করে লাহোরের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পকে সামনে রেখে পাকিস্তানকে প্রায়ই এ ধরনের মডেলের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, এ ব্যবস্থা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু সুফল এনে দিয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরো সমন্বিত হয়েছে, যানবাহন ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটেছে এবং বহু অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব অর্জন অবশ্যই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

তবে কোনো জননীতিকে কখনোই শুধু তার কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। সেটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা কতটা সুদৃঢ় করে—সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য। আর ঠিক এখানেই পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান শিক্ষা বহন করে, যদিও সেটি অনুকরণের উপযোগী মডেল নাও হতে পারে।

‘সেফ সিটি’ প্রকল্প নিয়ে প্রথম ভুল ধারণা হলো— প্রযুক্তি এমন সমস্যার সমাধান করতে পারে, যার মূল কারণ আসলে প্রাতিষ্ঠানিক। নজরদারি অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের পরও পাকিস্তান এখনো সংঘবদ্ধ অপরাধ, নগর সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখোমুখি। নজরদারি প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত পরিচালনা এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রদানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে; কিন্তু পুলিশিং, প্রসিকিউশন এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সমাধান করতে পারেনি। প্রযুক্তি কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু তা কখনোই পেশাদার তদন্ত, স্বাধীন প্রসিকিউশন কিংবা সময়মতো বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। বাংলাদেশও একই ধরনের বহু কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশিক্ষিত তদন্তকারীর ঘাটতি, সীমিত ফরেনসিক সক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থায় মামলার জট—এসব সমস্যার সমাধান শুধু আরো বেশি ক্যামেরা বসিয়ে সম্ভব নয়। বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া ব্যয়বহুল নজরদারি ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন এক উন্নত প্রযুক্তিগত সমাধানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যা পুরনো ও অপরিবর্তিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

দ্বিতীয় উদ্বেগটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ পরিসরের নজরদারি নাগরিক ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্রই বদলে দেয়। আধুনিক ‘সেফ সিটি’ ব্যবস্থা শুধু অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করে না—এটি সাধারণ মানুষের চলাচল, ব্যবহৃত যানবাহন, ভ্রমণের ধরন এবং অনেক ক্ষেত্রে মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের জৈবিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। জননিরাপত্তার বৈধ প্রয়োজনে এ ধরনের সক্ষমতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে তার সঙ্গে সমান শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, নজরদারি প্রযুক্তির সক্ষমতা যখন তা নিয়ন্ত্রণকারী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে দ্রুত বিস্তৃত হয়, তখন কী ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পাকিস্তানের ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, দেশটিতে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য সুরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। নজরদারি কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। নজরদারিতে সংগৃহীত তথ্য কত দিন সংরক্ষিত থাকবে এবং কে বা কিভাবে তা ব্যবহার করতে পারবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর স্বাধীন তদারকিও অনুপস্থিত। এসব উদ্বেগ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তব অপব্যবহারে রূপ নিয়েছে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—নজরদারির ক্ষমতা সম্প্রসারণের আগে কার্যকর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এ শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

দেশটি এখনো ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে নজরদারি কার্যক্রমের স্বাধীন তদারকিও সীমিত। ফলে পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আগেই যদি ব্যাপক নজরদারিব্যবস্থা চালু করা হয়, তবে ভবিষ্যতের কোনো সরকার পর্যাপ্ত জবাবদিহি ছাড়াই সেই ক্ষমতা ব্যবহার করার সুযোগ পেতে পারে।

ইতিহাস এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো সরকারই সাধারণত অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলে না। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই অসাধারণ ক্ষমতাগুলোকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের আওতায় রাখা। জনসাধারণের প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে তা শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্যও সমানভাবে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক থাকে।

স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক সুরক্ষা না থাকলে নজরদারি ব্যবস্থা রাজনৈতিক অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সাংবাদিক, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন কিংবা শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। এ ধরনের অপব্যবহারের সম্ভাবনাই গণতান্ত্রিক সমাজগুলোকে নজরদারির ক্ষমতার সঙ্গে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিতে বাধ্য করেছে।

এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, ‘সেফ সিটি’ প্রযুক্তি ব্যবহারে পাকিস্তান কোনো ব্যতিক্রম নয়। সিঙ্গাপুর, লন্ডন, দুবাইসহ বিশ্বের বহু শহরেই অনুরূপ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পার্থক্য প্রযুক্তিতে নয়; পার্থক্য এর শাসনব্যবস্থায়। যেসব দেশ নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে, তারা সাধারণত তা করেছে শক্তিশালী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অনুপ্রবেশমূলক নজরদারির ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, তথ্য সংরক্ষণের নির্দিষ্ট আইনি সীমা এবং নিয়মিত জনসম্মুখে স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে।
বাংলাদেশেরও উচিত, প্রযুক্তিগত মডেলের পাশাপাশি এসব শাসনব্যবস্থা থেকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা নেওয়া।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—অগ্রাধিকার কী হবে?

‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু ক্যামেরা কেনাই নয়; কমান্ড সেন্টার, সফটওয়্যার লাইসেন্স, সাইবার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিশেষায়িত জনবল এবং নিয়মিত প্রযুক্তি হালনাগাদের জন্যও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব ব্যয় এককালীন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত। ফলে পুলিশের প্রশিক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষাগার, কমিউনিটি পুলিশিং, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে এ প্রকল্পের অর্থায়নের প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সীমিত সরকারি সম্পদসম্পন্ন একটি উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকদের তাই নিজেদের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা উচিত—জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরো এক হাজার নজরদারি ক্যামেরা কি বেশি কার্যকর হবে, নাকি আরো এক শ দক্ষ তদন্তকারী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রসিকিউটর? এর উত্তর মোটেও সহজ নয়।

এর কোনোটির অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। বরং বুদ্ধিমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত জরুরি সাড়া কেন্দ্র, ডিজিটাল অপরাধ মানচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় লক্ষ্যভিত্তিক সিসিটিভি কভারেজ এবং আধুনিক আলামত ব্যবস্থাপনা—এসবই দায়িত্বশীলভাবে বাস্তবায়িত হলে জননিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে। প্রকৃত পার্থক্যটি উদ্দেশ্য ও শাসনব্যবস্থায়। প্রযুক্তি হবে জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের সহায়ক; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প নয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা যদি বাংলাদেশকে ‘সেফ সিটি’ কর্মসূচি বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তবে নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত মনে হওয়ার কারণে পুরো একটি মডেল আমদানি করার প্রলোভন এড়িয়ে চলা। যেকোনো প্রস্তাব প্রথমে সংসদীয় পর্যালোচনা, স্বাধীন গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন, জনপরামর্শ এবং কঠোর ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে শুধু কোন প্রযুক্তি গ্রহণ করবে তা-ই নির্ধারণ করলেই চলবে না; বরং সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কোন কোন আইনি সুরক্ষা অবিচ্ছেদ্যভাবে নিশ্চিত করতে হবে, সেটিও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

সর্বশেষে, একটি নিরাপদ শহরের প্রকৃত মানদণ্ড রাস্তার মোড়ে কতগুলো ক্যামেরা বসানো হয়েছে কিংবা তার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার কতটা আধুনিক—তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা নিজেদের নিরাপদ অনুভব করেন কি না, অথচ সারাক্ষণ নজরদারির মধ্যে থাকার অনুভূতি ছাড়াই; প্রযুক্তি জনগণের আস্থা ক্ষয় না করে বরং তা আরো সুদৃঢ় করে কি না; এবং রাষ্ট্র যত সক্ষম হয়, ততই কি আরো জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, নজরদারি প্রযুক্তি পুলিশিং এবং নগর ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। একই সঙ্গে সেটি এটিও প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি একা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে পারে না।

সুতরাং কার্যক্রম পরিচালনার সাফল্যকে নীতিগত সাফল্য বলে ধরে নেওয়ার ভুল বাংলাদেশের করা উচিত নয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার প্রকৃত শিক্ষা কেবল কিভাবে একটি ‘সেফ সিটি’ গড়ে তুলতে হয়, তা নয়; বরং এমন একটি শহর গড়ে তুলতে যে শক্তিশালী আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি অপরিহার্য—যে ভিত্তি জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম—সেটিই আরো বড় শিক্ষা।

বাংলাদেশ অবশ্যই আরো নিরাপদ শহর পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তাই নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপদ শহর নির্মাণের আগে শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন হয়।