• ই-পেপার

বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর

পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?

বিশেষ প্রতিনিধি
পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির বৈঠকে পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন খবর স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর নগর পুলিশিং ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে বাংলাদেশও এ উদ্যোগ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এক দেশের জননীতি-সংক্রান্ত উদ্যোগ সম্পর্কে অন্য দেশের আগ্রহী হওয়ায় অস্বাভাবিক কিছু নেই। কোনো নীতি নিজ দেশে প্রয়োগের আগে নীতিনির্ধারকরা নিয়মিতভাবেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য বিচার করেন। কিন্তু বিষয়টি যখন রাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরের নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ শুধু তার সাফল্য জানা নয়; তার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা থেকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা নেওয়া।

বাংলাদেশ যখন একটি ডিজিটাল সক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘সেফ সিটি’ ধারণাটি ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সমন্বিত কমান্ড সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (এএনপিআর) এবং হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরার সমন্বয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের এক নতুন যুগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়—আরো উন্নত প্রযুক্তি, আরো দ্রুত সাড়া এবং আরো নিরাপদ শহর।

বিশেষ করে লাহোরের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পকে সামনে রেখে পাকিস্তানকে প্রায়ই এ ধরনের মডেলের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, এ ব্যবস্থা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু সুফল এনে দিয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরো সমন্বিত হয়েছে, যানবাহন ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটেছে এবং বহু অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব অর্জন অবশ্যই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

তবে কোনো জননীতিকে কখনোই শুধু তার কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। সেটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা কতটা সুদৃঢ় করে—সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য। আর ঠিক এখানেই পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান শিক্ষা বহন করে, যদিও সেটি অনুকরণের উপযোগী মডেল নাও হতে পারে।

‘সেফ সিটি’ প্রকল্প নিয়ে প্রথম ভুল ধারণা হলো— প্রযুক্তি এমন সমস্যার সমাধান করতে পারে, যার মূল কারণ আসলে প্রাতিষ্ঠানিক। নজরদারি অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের পরও পাকিস্তান এখনো সংঘবদ্ধ অপরাধ, নগর সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখোমুখি। নজরদারি প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত পরিচালনা এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রদানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে; কিন্তু পুলিশিং, প্রসিকিউশন এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সমাধান করতে পারেনি। প্রযুক্তি কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু তা কখনোই পেশাদার তদন্ত, স্বাধীন প্রসিকিউশন কিংবা সময়মতো বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। বাংলাদেশও একই ধরনের বহু কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশিক্ষিত তদন্তকারীর ঘাটতি, সীমিত ফরেনসিক সক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থায় মামলার জট—এসব সমস্যার সমাধান শুধু আরো বেশি ক্যামেরা বসিয়ে সম্ভব নয়। বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া ব্যয়বহুল নজরদারি ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন এক উন্নত প্রযুক্তিগত সমাধানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যা পুরনো ও অপরিবর্তিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

দ্বিতীয় উদ্বেগটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ পরিসরের নজরদারি নাগরিক ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্রই বদলে দেয়। আধুনিক ‘সেফ সিটি’ ব্যবস্থা শুধু অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করে না—এটি সাধারণ মানুষের চলাচল, ব্যবহৃত যানবাহন, ভ্রমণের ধরন এবং অনেক ক্ষেত্রে মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের জৈবিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। জননিরাপত্তার বৈধ প্রয়োজনে এ ধরনের সক্ষমতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে তার সঙ্গে সমান শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, নজরদারি প্রযুক্তির সক্ষমতা যখন তা নিয়ন্ত্রণকারী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে দ্রুত বিস্তৃত হয়, তখন কী ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পাকিস্তানের ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, দেশটিতে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য সুরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। নজরদারি কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। নজরদারিতে সংগৃহীত তথ্য কত দিন সংরক্ষিত থাকবে এবং কে বা কিভাবে তা ব্যবহার করতে পারবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর স্বাধীন তদারকিও অনুপস্থিত। এসব উদ্বেগ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তব অপব্যবহারে রূপ নিয়েছে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—নজরদারির ক্ষমতা সম্প্রসারণের আগে কার্যকর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এ শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

দেশটি এখনো ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে নজরদারি কার্যক্রমের স্বাধীন তদারকিও সীমিত। ফলে পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আগেই যদি ব্যাপক নজরদারিব্যবস্থা চালু করা হয়, তবে ভবিষ্যতের কোনো সরকার পর্যাপ্ত জবাবদিহি ছাড়াই সেই ক্ষমতা ব্যবহার করার সুযোগ পেতে পারে।

ইতিহাস এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো সরকারই সাধারণত অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলে না। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই অসাধারণ ক্ষমতাগুলোকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের আওতায় রাখা। জনসাধারণের প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে তা শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্যও সমানভাবে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক থাকে।

স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক সুরক্ষা না থাকলে নজরদারি ব্যবস্থা রাজনৈতিক অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সাংবাদিক, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন কিংবা শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। এ ধরনের অপব্যবহারের সম্ভাবনাই গণতান্ত্রিক সমাজগুলোকে নজরদারির ক্ষমতার সঙ্গে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিতে বাধ্য করেছে।

এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, ‘সেফ সিটি’ প্রযুক্তি ব্যবহারে পাকিস্তান কোনো ব্যতিক্রম নয়। সিঙ্গাপুর, লন্ডন, দুবাইসহ বিশ্বের বহু শহরেই অনুরূপ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পার্থক্য প্রযুক্তিতে নয়; পার্থক্য এর শাসনব্যবস্থায়। যেসব দেশ নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে, তারা সাধারণত তা করেছে শক্তিশালী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অনুপ্রবেশমূলক নজরদারির ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, তথ্য সংরক্ষণের নির্দিষ্ট আইনি সীমা এবং নিয়মিত জনসম্মুখে স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে।
বাংলাদেশেরও উচিত, প্রযুক্তিগত মডেলের পাশাপাশি এসব শাসনব্যবস্থা থেকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা নেওয়া।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—অগ্রাধিকার কী হবে?

‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু ক্যামেরা কেনাই নয়; কমান্ড সেন্টার, সফটওয়্যার লাইসেন্স, সাইবার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিশেষায়িত জনবল এবং নিয়মিত প্রযুক্তি হালনাগাদের জন্যও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব ব্যয় এককালীন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত। ফলে পুলিশের প্রশিক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষাগার, কমিউনিটি পুলিশিং, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে এ প্রকল্পের অর্থায়নের প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সীমিত সরকারি সম্পদসম্পন্ন একটি উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকদের তাই নিজেদের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা উচিত—জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরো এক হাজার নজরদারি ক্যামেরা কি বেশি কার্যকর হবে, নাকি আরো এক শ দক্ষ তদন্তকারী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রসিকিউটর? এর উত্তর মোটেও সহজ নয়।

এর কোনোটির অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। বরং বুদ্ধিমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত জরুরি সাড়া কেন্দ্র, ডিজিটাল অপরাধ মানচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় লক্ষ্যভিত্তিক সিসিটিভি কভারেজ এবং আধুনিক আলামত ব্যবস্থাপনা—এসবই দায়িত্বশীলভাবে বাস্তবায়িত হলে জননিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে। প্রকৃত পার্থক্যটি উদ্দেশ্য ও শাসনব্যবস্থায়। প্রযুক্তি হবে জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের সহায়ক; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প নয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা যদি বাংলাদেশকে ‘সেফ সিটি’ কর্মসূচি বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তবে নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত মনে হওয়ার কারণে পুরো একটি মডেল আমদানি করার প্রলোভন এড়িয়ে চলা। যেকোনো প্রস্তাব প্রথমে সংসদীয় পর্যালোচনা, স্বাধীন গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন, জনপরামর্শ এবং কঠোর ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে শুধু কোন প্রযুক্তি গ্রহণ করবে তা-ই নির্ধারণ করলেই চলবে না; বরং সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কোন কোন আইনি সুরক্ষা অবিচ্ছেদ্যভাবে নিশ্চিত করতে হবে, সেটিও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

সর্বশেষে, একটি নিরাপদ শহরের প্রকৃত মানদণ্ড রাস্তার মোড়ে কতগুলো ক্যামেরা বসানো হয়েছে কিংবা তার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার কতটা আধুনিক—তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা নিজেদের নিরাপদ অনুভব করেন কি না, অথচ সারাক্ষণ নজরদারির মধ্যে থাকার অনুভূতি ছাড়াই; প্রযুক্তি জনগণের আস্থা ক্ষয় না করে বরং তা আরো সুদৃঢ় করে কি না; এবং রাষ্ট্র যত সক্ষম হয়, ততই কি আরো জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, নজরদারি প্রযুক্তি পুলিশিং এবং নগর ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। একই সঙ্গে সেটি এটিও প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি একা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে পারে না।

সুতরাং কার্যক্রম পরিচালনার সাফল্যকে নীতিগত সাফল্য বলে ধরে নেওয়ার ভুল বাংলাদেশের করা উচিত নয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার প্রকৃত শিক্ষা কেবল কিভাবে একটি ‘সেফ সিটি’ গড়ে তুলতে হয়, তা নয়; বরং এমন একটি শহর গড়ে তুলতে যে শক্তিশালী আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি অপরিহার্য—যে ভিত্তি জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম—সেটিই আরো বড় শিক্ষা।

বাংলাদেশ অবশ্যই আরো নিরাপদ শহর পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তাই নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপদ শহর নির্মাণের আগে শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন হয়।

ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না
সংগৃহীত ছবি

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ প্রায়ই দাবি করেন, জাতীয় নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শরিকদের হারানো হয়েছে। এটি কেবল বহুল ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং দলটির মৌলিক একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অনীহারই প্রতিফলন। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ভোটার এখনো জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব জামায়াতের হাতে তুলে দিতে আগ্রহী নয় কেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে আইনি প্রতিকার চাওয়ারও অধিকার রয়েছে। এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া এবং আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পথ অনুসরণ না করে বারবার নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বহুবার রাজনৈতিক সংঘাত, অবিশ্বাস ও অস্থিরতার চক্রের মধ্যদিয়ে পাড়ি দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে কাজ করবে। সেসব বর্ণনা বা বক্তব্য নয়, যা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের স্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি করে।  

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। তাদের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে এবং বিষয়টি এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। একই সময়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং বিদেশি সরকার এই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, গণতন্ত্রে নির্বাচনে পরাজয়ের সঠিক জবাব হলো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত পথে প্রতিকার চাওয়া। এমন বক্তব্য বা ইঙ্গিত দেওয়া নয়, যা আবারও অস্থিরতার নতুন চক্র সৃষ্টি করতে পারে।

ইতিহাস আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় 

বাংলাদেশের অন্য যেকোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের তুলনায় জামায়াতে ইসলামী এখনো এমন একটি ঐতিহাসিক দায় বহন করে, যা থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। একই সঙ্গে তাদের বহু নেতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই সেনাবাহিনীর পরিচালিত গণহত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ এবং পরিকল্পিত নিপীড়ন জাতির ইতিহাসে এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে। আলবদর ও আলশামসের মতো সহযোগী বাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের কর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সেই বাহিনীগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার কয়েকটির সঙ্গে যুক্ত বলে বহুলভাবে স্বীকৃত। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড অন্যতম।

এসব কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তোলা অভিযোগ নয়। এগুলো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ এবং স্বাধীনতার পর থেকে ভোটারদের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ও এই উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের দায় অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের ভিত্তিতেই স্থির করতে হবে। তবে এটাও সত্য যে, কট্টরপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা যখনই চরমে পৌঁছেছে, তখন রাজনৈতিক সহিংসতা বহু ক্ষেত্রেই তার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। 

এই ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে কেন কেবল ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বা ধুয়ো তুললে তা জামায়াতের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে খুব বেশি সাড়া জাগাতে পারে না। প্রতিটি নির্বাচনি ব্যর্থতাকে অদৃশ্য কোনো শক্তির ষড়যন্ত্রের ফল বলে তুলে ধরলে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। বরং, সেই আস্থা অর্জন করতে হয় বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহি এবং ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার সৎ সাহসের মাধ্যমে।

জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই বাংলাদেশের শাসনভার পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তবে তাদের উপলব্ধি করা উচিত যে সাংবিধানিক গণতন্ত্রে আন্দোলন, চাপ সৃষ্টি বা নিজেকে নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপনের বয়ানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করা যায় না। একটি সরকারের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে-নিজেদের জন্য অস্বস্তিকর প্রতিটি রাজনৈতিক ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা থেকে নয়। জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আরেকটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা বাস্তবসম্মত নয়; বরং বাস্তবসম্মত হলো নৈতিক জবাবদিহি। 

জামায়াতে ইসলামীর উচিত মুক্তিযুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকারোক্তি দেওয়া। সেই সময়ে লাখো বাংলাদেশির যে দুর্ভোগ ও কষ্ট হয়েছে তা স্বীকার করে দলের অতীত ভূমিকার জন্য আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করা এবং যাদের আস্থা তারা এখন অর্জন করতে চায় সেই জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এতে ইতিহাস বদলে যাবে না । তবে এটি প্রমাণ করবে বাংলাদেশ যে নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, জামায়াত তা উপলব্ধি করে। 

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা উচিত যে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাদের কৌশলের অংশ হবে না। অস্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে অনেক বড় মূল্য দিতে হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাত নয়, বরং নীতি, কর্মসূচি ও জনসেবার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে হবে। 

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এমন রাজনীতি পাওয়ার অধিকার রাখে যা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসকে ভুলে যায় না। কোনো জাতি ইতিহাস মুছে ফেলে নয়, বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে এগিয়ে যায়। জনগণের ভোট ও সমর্থন চাওয়ার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না, কিংবা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তা তৈরি করাও যায় না। বৈধতা অর্জন করতে হয় জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং ভোটারদের আস্থা ও সমর্থনের মাধ্যমে।

জামায়াতে ইসলামী যত দিন না তাদের অতীতের মুখোমুখি হচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতার সব ধরনের রূপকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করছে এবং কথায় ও কাজে প্রমাণ করছে যে তারা একসময় যে প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা করেছিল, একই সাথে আজ সেই প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে-তত দিন জাতীয় নেতৃত্বের দাবিতে তাদের আহ্বান মূল্যায়িত হবে তাদের বক্তব্যের জোরে নয়, বরং ইতিহাসের ভারকে সামনে রেখেই।

ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

হিংস্রতা, মানুষের পশু প্রবৃত্তি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘরের ভিতরে তিন মাস বয়সের শিশুর বিপদের খবরও বড় খবরের অংশ বটে। তবে তাই বলে তা কিন্তু ছোট খবর নয়। যেমন এই খবরটি, যার শিরোনাম ‘বাচ্চারে থামা, নইলে মাইরা ফালামু।’ ভিতরের খবর, আওয়াজটি শুধু হুমকি ছিল না, ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে। ঢাকার মিরপুরের বর্ধনবাড়ি এলাকায় মায়ের পাশে শুয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করছিল। তাতে যুবক স্বামীটির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে তিনি শিশুটির মাকে ধমক দিয়ে শিশুর কান্না থামাতে বলেন। শিশুসন্তানের কান্না থামাতে মা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, সফল হননি। ওই ব্যক্তি তখন শিশুটিকে সত্যি সত্যি গলা টিপে মেরে ফেলেন। যুবকটি ইতিঃপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে জামিনে ছাড়া পান এবং তিন মাসের সন্তানসহ মেয়েটিকে বিয়ে করেন। পরবর্তী ঘটনা সংবাদ হয়েছে গণমাধ্যমে।

ইতালিপ্রবাসী বড় ভাই খুন করেছেন আপন ছোট ভাইকে এবং খুনের ছবি ভিডিওতে ধারণ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সদস্যদের কাছে। কারণ অন্য কিছু নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। বড় ভাই হুমায়ূন কবির ইতালিতে যান ১১ বছর আগে। ছোট ভাইকেও তিনি-ই সেখানে নিয়ে যান, ৩ বছর হবে। বড় ভাই হুমায়ূনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে ছোট ভাই নয়ন আপত্তি করেন। বড় ভাইকে নয়ন যে টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত চান। ছোট ভাইয়ের বড় রকমের এই স্পর্ধা বড় ভাইয়ের পক্ষে হজম করা কঠিন হওয়াতেই ছোট ভাইকে তিনি খুন করেন। মুন্সিগঞ্জ নিবাসী তাদের পিতা দেলোয়ার ফকির স্বভাবতই পুত্র-হত্যার বিচার চেয়েছেন। কিন্তু কার কাছে? উল্লেখ্য ওই পিতার একমাত্র কন্যার স্বামীও থাকেন ইতালিতে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। তবে পালাননি, নিজেই খবর দিয়েছেন পুলিশকে। বয়স তার ৪৭। না, স্ত্রীর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের দুই ছেলেরই। যাদের একজনের বয়স ৫, অন্যজনের ১২। জন্মাবধি তারা অসুস্থ ছিল; আক্রান্ত ছিল অটিজমে। ঘটনা সিডনি শহরের। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশি ভদ্রলোক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ারই আরেক শহর, পার্থে-ঘটা একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা। গত জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি তাদের দুই অটেস্টিক পুত্র (বয়স ১৪ ও ১৬) হত্যা করেন। অসুস্থ সন্তানের দায়ভার সারা জীবন বহন করাতে নিশ্চয়ই তাদেরও আপত্তি ছিল। অনুপ্রেরণাদানকারী এবং অনুপ্রাণিত দুই ঘটনার ভিতর অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি সন্তান-হত্যার পর আর জীবিত থাকেনি। আত্মহত্যা করে পুত্র-হত্যাজনিত গ্লানির অবসান ঘটিয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশির ঘটনাটি যে কিছুটা উন্নত কিংবা মানবেতর; সেটা না-মেনে উপায় নেই।

পাশাপাশি খবর এই রকমের যে কাপাসিয়ার ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে (অর্থাৎ মোট পাঁচজনকে) নেশাজাতীয় দ্রব্যের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে নিজ হাতে জবাই করেন। তার অভিযোগ স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন; এবং প্রেমিকের মাধ্যমে ফোরকানের কষ্টার্জিত টাকা বেহাত হয়ে যেত। এ নিয়ে তিনি নাকি স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেন। তবে ফোরকান নিজেও যে মাদকাসক্ত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নওগাঁর খবর। সেখানে দুই সন্তানসহ এক দম্পতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডের কারণ জমিজমার ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের পিতা, দুই বোন ও এক বোনের ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ওদিকে গণপিটুনিও চলছে। মানিকগঞ্জে শিশুহত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে দুজন। সেই সঙ্গে একজন গুরুতর আহত। ঘটনার বিবরণ এই রকমের : বনপারিল গ্রামের মুকুল মিয়ার ৯ বছর বয়সি কন্যা আতিকা গিয়েছিল প্রতিবেশী এক পরিবারের বিয়েবাড়িতে। বিকালবেলা সে বাড়িতে ফিরছিল। তার কানে ছিল স্বর্ণের দুল, গলায় স্বর্ণের চেইন। ওই দুই বস্তুর লোভেই হবে, তাকে অপহরণ করা হয়। আতিকা নিখোঁজ হয়েছে, এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; মাইকিংও করা হয়। খোঁজাখুঁজিতে বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী এক শিশু জানায় যে নাঈম (১৫) নামের এক কিশোরের সঙ্গে আতিকাকে সে দেখেছে কথা বলতে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নাঈম তার অপরাধ স্বীকার করে এবং তার দেখানো ভুট্টাখেতেই মৃত অবস্থায় আতিকাকে পাওয়া যায়। পুলিশ অভিযুক্ত পুত্র, তার পিতা ও পিতার এক ভাইকে আটক করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষিপ্ত জনতা অভিযুক্ত নাঈমদের বাড়ি ঘেরাও করে। গণপ্রহারে নাঈমের পিতা অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮) নিহত হন। অভিযুক্তের এক ভাইও গুরুতর আহত। নাঈম হেফাজতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন পড়েছিল।

গত ২৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর ছিল এই রকম : ১. চুয়াডাঙ্গায় এক যুবকের (২১) দ্বারা সত্তর-উত্তীর্ণ বৃদ্ধা ধর্ষিত। মহিলা নিজেই মামলা করেছেন। বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি মেয়ের বাড়িতে। ফেরার সময় ভ্যানগাড়ি থেকে নামেন শহরের এক হাসপাতালের সামনে। রাত তখন ১২টা হবে। তার সঙ্গে তরকারি ও মাংসে ভরা একটি ব্যাগ ছিল। পরিচিত এক যুবক এগিয়ে আসেন ব্যাগটি বহন করে মহিলাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন এই প্রস্তাব নিয়ে। মহিলা সম্মত হন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মহিলার অভিযোগ একা পেয়ে যুবকটি তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত যুবকটিকে যথারীতি আটক করেছে পুলিশ। ২. যশোরের কেশবপুরে প্রতিবেশীর বাড়িতে টিভি দেখতে গিয়েছিল এক শিশু। সেখানেই সে ধর্ষিত হয়েছে। ৩. নাটোরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে দুজনকে। তারা পরস্পর পিতা এবং পুত্র। মেয়েটির বাড়ির পাশের দোকানে কাজ করত পিতা ও পুত্র দুজনেই। রাতে নিজেদের বাড়িতে মেয়েটি একাই ছিল। সেই সুযোগে পিতা মেয়েটির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে দোকানে কাজে এসে তার পুত্রও মেয়েটির একাকিত্বের সুযোগ নেয়। এবং আগের রাতে বাবা যা করেছে সকালে ছেলেও সে কাজই সম্পন্ন করেন। [পিতার পথ ধরে আগুয়ান হতে পুত্রের আনুগত্যে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।] ৪. গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। স্থানীয় লোকজন ইমামকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশে সোপর্দ করে। ৫. হবিগঞ্জে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ১০ বছরের এক শিশু বিকালবেলা দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গ্রামেরই এক বাসিন্দা তার এক সঙ্গীর সঙ্গে মিলে শিশুটিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির চিৎকার শুনে লোকজন ধাওয়া করলে বীরপুরুষেরা পালিয়ে যায়। অন্য পাষণ্ডদের মতো এই দুটিও নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের যে সর্বনাশটি ঘটে গেছে তার ক্ষতিপূরণ কী কোনোভাবেই সম্ভব?

গত ৭ জুনের দুটি খবর। ময়মনসিংহের ভালুকায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ গ্রেপ্তার। শিশুটি দোকানে যাচ্ছিল শ্যাম্পু কিনতে। পথিমধ্যে ফালু মিয়া তাকে ফুসলে অন্যত্র নিয়ে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয় খবরটি গাইবান্ধার। সেখানে এক কিশোরীকে তার বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার যুবক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। রাত ১২টার দিকে ওই কিশোরী নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। চারটি যুবক পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলের ধারে নিয়ে যায়। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর চিৎকারে লোকজন তাড়া করলে ধর্ষকদের তিনজন ধরা পড়ে, একজন পালিয়ে যায়।  মানিকগঞ্জের খবর, সেখানে ষাট-পেরোনো এক বৃদ্ধ ভিখারিনীক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মহিলা থানায় গিয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যুবক দুটি গ্রেপ্তার হয়েছে। পরিপূরক খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সেটির মর্মবাণী এই যে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার অভিযুক্তদের শতকরা ৯৮ জনের কোনো শাস্তি হয় না। সংলগ্ন অন্য একটি তথ্য, পানিতে ডুবে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২টি শিশুর মৃত্যু ঘটে।

শিশু ধর্ষণের সংখ্যা যে বাড়ছে সে ব্যাপারটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। একটি দৈনিক পত্রিকা সাম্প্রতিক ৬৮০টি ধর্ষণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছে, ধর্ষিতাদের ভিতর শিশুদের সংখ্যাই অধিক। বুঝতে অসুবিধা নেই যে দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এবং ভোগবাদিতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকদের কাছে শিশুরা এখন আর শিশু নেই, ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গোটা ব্যবস্থাটা যে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক তার বহু প্রমাণ ও নিদর্শনের মধ্যে এটিও একটি। পর্যালোচনায় এটাও ধরা পড়েছে যে ধর্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাদের পূর্বপরিচিত। অর্থাৎ কাছের এবং দূরের ভিতর কোনো ব্যবধান নেই। নির্বিচারে ভোগ করা সম্ভব এবং পরিচিতজনদেরই শিকারে পরিণত করা সহজতর, কারণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণে আক্রান্তরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এটাও দেখা গেছে যে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে তাদের বাসগৃহেই। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিপদের দৃষ্টান্ত তো বিশ্বে রেকর্ড করেছে, পর্যবেক্ষণও সে কথা বলেছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের অঙ্গীকার

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের অঙ্গীকার
ফাইল ছবি

ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর থেকে এই মহানগর জাতীয় উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

অথচ আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকগুলোতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্বের নিম্ন সারির বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় কম বাসযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, দুর্বল অবকাঠামো, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, সীমিত সবুজ এলাকা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি।

তবে এই সংকট অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় ঢাকার মতোই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকবান্ধব নীতির মাধ্যমে তারা আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিউল এবং চীনের বিভিন্ন বৃহৎ মহানগর দেখিয়েছে যে সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে ঘনবসতিপূর্ণ শহরও একটি টেকসই, কার্যকর ও মানবিক নগরে পরিণত হতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো—ঢাকা কি বিশৃঙ্খল ও চাপগ্রস্ত মহানগর হিসেবেই থাকবে, নাকি আধুনিক, স্মার্ট, সবুজ ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হবে? এর উত্তর শুধু নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক জীবনমানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাসযোগ্য নগর বলতে শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়ককে বোঝায় না। একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য শহরের বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত, বিশুদ্ধ পরিবেশ, পরিকল্পিত আবাসন, পর্যাপ্ত সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, উন্নত নাগরিক সেবা এবং মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। তাই ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা।

ঢাকার অন্যতম বড় সংকট অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সীমিত ভূমির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং আবাসন, বাণিজ্য, শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতায় নগরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, অথচ পর্যাপ্ত রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন শহরতলি নতুন অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। ফলে ঢাকা ক্রমেই একটি অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত মহানগরে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা যানজট। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকেন। এতে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাও ঢাকার যানজটকে অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যানজটের জন্য শুধু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি দায়ী নয়; অপরিকল্পিত সড়ক নেটওয়ার্ক, দুর্বল গণপরিবহন, ফুটপাত দখল, পার্কিং সংকট এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতাও সমানভাবে দায়ী। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়ে নয়; বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমেই বড় শহরের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। মেট্রো রেল ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে বাস, রেল, নৌপথ ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

পরিবহনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতাও ঢাকার বড় সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বহু এলাকায় পানি জমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এ সমস্যাকে আরো তীব্র করেছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও সবুজ এলাকার সংকোচন নগরের পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি আধুনিক মহানগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব জীবন নিশ্চিত করারও স্থান। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে নগর উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। ফলে উচ্চমূল্যের আবাসন সংকটের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থানের সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকায় রাজধানীর ওপর চাপ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের সফল নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা : ঢাকার জন্য শিক্ষা

বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় জনসংখ্যার চাপ, যানজট, পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যায় ভুগেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নগর শাসন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে তারা আধুনিক, দক্ষ ও বাসযোগ্য মহানগরে রূপান্তরিত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা এসব অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে।

চীন, বিশেষ করে বেইজিং, সাংহাই, শেনজেন ও গুয়াংজুর মতো শহরগুলো পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক অবকাঠামো, সমন্বিত গণপরিবহন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফল নগর উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শেনজেনের রূপান্তর দেখিয়েছে, সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে একটি শহরকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। ঢাকার ক্ষেত্রেও নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে বিদেশি অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও সুশাসন, টোকিওর সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, একটি সফল ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত গণপরিবহন, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবনমানকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শন।

ঢাকার ভবিষ্যৎও এসব নীতির আলোকে গড়ে উঠতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণ নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নিজস্ব, কার্যকর ও টেকসই নগর উন্নয়ন মডেল তৈরি করতে হবে।

করণীয় : বাসযোগ্য ঢাকার জন্য সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা

ঢাকার বর্তমান নগর সংকট কোনো একক প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা, যেখানে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, আবাসন, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও নাগরিক সেবাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।

প্রথমেই রাজধানীর জন্য একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমি ব্যবহার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী নগর শাসন ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।

যানজট নিরসনে গণপরিবহনকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। মেট্রো রেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT), বাস, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পাশাপাশি একক টিকিটিং ব্যবস্থা, নিরাপদ স্টেশন, উন্নত যাত্রীসেবা এবং কার্যকর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত হয়।

রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়াকে শুধু আবাসিক এলাকা নয়, বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ রাজধানীর বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

ভবিষ্যতের ঢাকা হবে প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট মহানগর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তবে স্মার্ট সিটির লক্ষ্য প্রযুক্তির প্রদর্শন নয়; বরং মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করা।

পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আধুনিক ড্রেনেজব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নগর বন, পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করা সম্ভব। নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, পর্যাপ্ত পার্ক, শিশুদের খেলার মাঠ এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি সফল নগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি এমন একটি বাসযোগ্য পরিবেশ, যেখানে সব শ্রেণির মানুষ সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।

তবে এই রূপান্তরের জন্য সুশাসন, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি অভিজ্ঞতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, তবে তা অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নয়। চীনের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, টোকিওর দক্ষ গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর, টেকসই ও মানবিক নগর উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহারে বলা যায়, ঢাকা আজ নানা সংকটে জর্জরিত হলেও এর সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বের অনেক মহানগর একসময় একই ধরনের সমস্যায় ভুগেছে, কিন্তু দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা আধুনিক, বাসযোগ্য ও টেকসই নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও আশাব্যঞ্জক। বাসযোগ্য ঢাকা মানে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা বড় অবকাঠামো নয়; বরং এমন একটি মানবিক মহানগর, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে এবং সবুজ ও উন্মুক্ত পরিবেশে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে। ভবিষ্যতের ঢাকা হতে হবে স্মার্ট, সবুজ, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক—যেখানে প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন শক্তিশালী নগর শাসন, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা, গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। ঢাকার রূপান্তর শুধু রাজধানীর উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এখনই সময় সংকটের ঢাকা থেকে সম্ভাবনার ঢাকায় এগিয়ে যাওয়ার—যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য এবং নগরায়ণ হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও মানবিক। একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশের অপরিহার্য ভিত্তি।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট