• ই-পেপার

পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে তুলনামূলক উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপর ভর করে মধ্যম আয়ের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অগ্রযাত্রায় রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি—উভয়েরই ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের প্রেক্ষাপটে। মুদ্রানীতি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ, সুদের হার এবং তারল্য নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সব সময়ই একটি জটিল চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রধান লক্ষ্য উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ৮ শতাংশের ওপরে এবং কিছু সময় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়ন অর্থনীতিকে আরো নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, তারল্য সংকোচন এবং ঋণ প্রবাহ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা সামগ্রিকভাবে একটি ‘মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক অবস্থান’ নির্দেশ করে।

এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নীতি সুদের হারকে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া, যা গত এক দশকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ স্তরগুলোর একটি। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রেপো ও রিভার্স রেপো ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ডলার প্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টাকার ওপর চাপ কিছুটা কমানো গেলেও অর্থনীতিতে তারল্য সংকোচন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে একটি ‘বেসরকারি খাতকে স্থানচ্যুত করার প্রভাব (crowding out effect)’ সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে সরকারি ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই নীতির সামগ্রিক চরিত্রকে ‘মূল্যস্ফীতি-প্রথম অগ্রাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, এমনকি তা স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও। উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নীতি স্বাভাবিক হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়। বিশেষ করে যখন অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ ঘাটতি বিদ্যমান, তখন অতিরিক্ত সংকোচন প্রবৃদ্ধির গতি আরো ধীর করে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক ধীরে ও তথ্যনির্ভরভাবে সুদের হার সমন্বয় করছে, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে মন্দা ও কর্মসংস্থান সংকোচনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এই দুই চরম অবস্থানের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা থাকলেও উৎপাদন খাতের ওপর চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

এই নীতির সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহে। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে এই প্রভাব আরও তীব্র, কারণ এই খাতগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অর্থনীতির গতিশীলতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন এবং ঋণের উচ্চ ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখছেন।

এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আচরণ পরিবর্তিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। তারা ঝুঁকি এড়াতে সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক প্রবাহকে সীমিত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মূলধন গঠন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মোট বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩১-৩৩ শতাংশের মধ্যে স্থবির থাকায় এটি একটি উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উৎপাদন খাতেও এই নীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্প যেমন তৈরি পোশাক, চামড়া এবং হালকা প্রকৌশল খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের উচ্চ খরচ লাভজনকতা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে এবং বিদ্যমান উৎপাদন সম্প্রসারণও ধীর হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর পড়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকটও এতে ভূমিকা রেখেছে, তবে মুদ্রানীতির কঠোর অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তবে এই নীতির ইতিবাচক দিকও উপেক্ষা করা যায় না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে মানুষের বাস্তব আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে সহায়তা করতে পারে।

বর্তমান নীতির যথার্থতা মূলত এর লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করে এবং সেই দিক থেকে এটি আংশিকভাবে সফল বলা যায়। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো নীতির প্রভাব বাস্তব অর্থনীতিতে পুরোপুরি কার্যকরভাবে পৌঁছাতে না পারা। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এই নীতির প্রভাব অর্থনীতির বাস্তব খাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ঋণ সংকোচন ঘটলেও উৎপাদন কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মুদ্রানীতিকে মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা স্বাভাবিক হলেও এটি একমাত্র বা সর্বোত্তম সমাধান ছিল না। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে একই সঙ্গে উৎপাদন ঘাটতি, বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বিদ্যমান, সেখানে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত বিকল্প গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ ছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারত ‘লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ নীতি’, যেখানে সামগ্রিক ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করার পরিবর্তে কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধা আরো বিস্তৃত করা যেত। এতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ কিছুটা বজায় থাকলেও উৎপাদনশীল খাতের কার্যক্রম ও বিনিয়োগ প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে থেমে যেত না, ফলে অর্থনীতির বাস্তব খাত তুলনামূলকভাবে সচল থাকতে পারত।

এ ছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও নীতির কার্যকারিতা সীমিত করেছে। শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সরবরাহ-পক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধান হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ যেহেতু খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচনির্ভর, তাই একই সময়ে এই খাতগুলোতে সমন্বিত সরকারি হস্তক্ষেপ থাকলে নীতির ফল আরো কার্যকর হতে পারত।

অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বাজারে বিকৃতি তৈরি করেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে এবং পরোক্ষভাবে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধীরে ধীরে আরো নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলে এই ধরনের অকার্যকারিতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরো স্থিতিশীল থাকত।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতার ভিত্তিতে মুদ্রানীতি নির্ধারণ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তুলনামূলকভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কাঠামো থাকলেও সুদের হার পরিবর্তন ধীরে এবং পরিমিতভাবে করা হয়, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় থাকে। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল থাকায় তাদের মুদ্রানীতি তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি সহায়ক।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ২০১৯-২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী সুদের হার দ্রুত বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে তারা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়, যেখানে একসময় দ্বিগুণ অঙ্কেরও অনেক বেশি মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। তবে এর বিনিময়ে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপের মুখে পড়ে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের কারণে বারবার সুদের হার বৃদ্ধি করতে হয়েছে, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক সময় ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবিরতা-স্ফীতিজনিত ফাঁদ’-এর মতো অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি এবং অন্যদিকে নিম্ন প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে বিদ্যমান।

বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের তুলনায় একটি মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। এখানে মুদ্রাস্ফীতি ভারতের তুলনায় বেশি হলেও শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো অতিরিক্ত সংকটপূর্ণ নয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা হলো নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সমস্যা, যা মুদ্রানীতির সুফলকে পুরো অর্থনীতিতে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে বাধা সৃষ্টি করে।

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কেবলমাত্র কঠোরতা বা শিথিলতা নয়, বরং নীতির গুণগত ভারসাম্যই একটি দেশের অর্থনৈতিক সফলতার মূল নির্ধারক। সামগ্রিকভাবে বর্তমান মুদ্রানীতি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি আংশিকভাবে সফল হলেও বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমন একটি অর্থনীতিতে যেখানে সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিদ্যমান, সেখানে শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারে না।

ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং শিল্পনীতি পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ও সুশাসন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার আনা অপরিহার্য। কেবল সুদের হার বৃদ্ধি বা তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতে একটি দ্বৈত-পথ মুদ্রানীতি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে, যেখানে একদিকে কঠোর নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে, অন্যদিকে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের মতো উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রানীতি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকাঠামোই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না
সংগৃহীত ছবি

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ প্রায়ই দাবি করেন, জাতীয় নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শরিকদের হারানো হয়েছে। এটি কেবল বহুল ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং দলটির মৌলিক একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অনীহারই প্রতিফলন। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ভোটার এখনো জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব জামায়াতের হাতে তুলে দিতে আগ্রহী নয় কেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে আইনি প্রতিকার চাওয়ারও অধিকার রয়েছে। এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া এবং আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পথ অনুসরণ না করে বারবার নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বহুবার রাজনৈতিক সংঘাত, অবিশ্বাস ও অস্থিরতার চক্রের মধ্যদিয়ে পাড়ি দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে কাজ করবে। সেসব বর্ণনা বা বক্তব্য নয়, যা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের স্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি করে।  

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। তাদের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে এবং বিষয়টি এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। একই সময়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং বিদেশি সরকার এই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, গণতন্ত্রে নির্বাচনে পরাজয়ের সঠিক জবাব হলো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত পথে প্রতিকার চাওয়া। এমন বক্তব্য বা ইঙ্গিত দেওয়া নয়, যা আবারও অস্থিরতার নতুন চক্র সৃষ্টি করতে পারে।

ইতিহাস আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় 

বাংলাদেশের অন্য যেকোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের তুলনায় জামায়াতে ইসলামী এখনো এমন একটি ঐতিহাসিক দায় বহন করে, যা থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। একই সঙ্গে তাদের বহু নেতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই সেনাবাহিনীর পরিচালিত গণহত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ এবং পরিকল্পিত নিপীড়ন জাতির ইতিহাসে এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে। আলবদর ও আলশামসের মতো সহযোগী বাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের কর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সেই বাহিনীগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার কয়েকটির সঙ্গে যুক্ত বলে বহুলভাবে স্বীকৃত। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড অন্যতম।

এসব কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তোলা অভিযোগ নয়। এগুলো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ এবং স্বাধীনতার পর থেকে ভোটারদের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ও এই উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের দায় অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের ভিত্তিতেই স্থির করতে হবে। তবে এটাও সত্য যে, কট্টরপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা যখনই চরমে পৌঁছেছে, তখন রাজনৈতিক সহিংসতা বহু ক্ষেত্রেই তার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। 

এই ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে কেন কেবল ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বা ধুয়ো তুললে তা জামায়াতের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে খুব বেশি সাড়া জাগাতে পারে না। প্রতিটি নির্বাচনি ব্যর্থতাকে অদৃশ্য কোনো শক্তির ষড়যন্ত্রের ফল বলে তুলে ধরলে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। বরং, সেই আস্থা অর্জন করতে হয় বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহি এবং ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার সৎ সাহসের মাধ্যমে।

জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই বাংলাদেশের শাসনভার পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তবে তাদের উপলব্ধি করা উচিত যে সাংবিধানিক গণতন্ত্রে আন্দোলন, চাপ সৃষ্টি বা নিজেকে নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপনের বয়ানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করা যায় না। একটি সরকারের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে-নিজেদের জন্য অস্বস্তিকর প্রতিটি রাজনৈতিক ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা থেকে নয়। জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আরেকটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা বাস্তবসম্মত নয়; বরং বাস্তবসম্মত হলো নৈতিক জবাবদিহি। 

জামায়াতে ইসলামীর উচিত মুক্তিযুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকারোক্তি দেওয়া। সেই সময়ে লাখো বাংলাদেশির যে দুর্ভোগ ও কষ্ট হয়েছে তা স্বীকার করে দলের অতীত ভূমিকার জন্য আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করা এবং যাদের আস্থা তারা এখন অর্জন করতে চায় সেই জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এতে ইতিহাস বদলে যাবে না । তবে এটি প্রমাণ করবে বাংলাদেশ যে নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, জামায়াত তা উপলব্ধি করে। 

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা উচিত যে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাদের কৌশলের অংশ হবে না। অস্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে অনেক বড় মূল্য দিতে হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাত নয়, বরং নীতি, কর্মসূচি ও জনসেবার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে হবে। 

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এমন রাজনীতি পাওয়ার অধিকার রাখে যা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসকে ভুলে যায় না। কোনো জাতি ইতিহাস মুছে ফেলে নয়, বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে এগিয়ে যায়। জনগণের ভোট ও সমর্থন চাওয়ার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না, কিংবা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তা তৈরি করাও যায় না। বৈধতা অর্জন করতে হয় জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং ভোটারদের আস্থা ও সমর্থনের মাধ্যমে।

জামায়াতে ইসলামী যত দিন না তাদের অতীতের মুখোমুখি হচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতার সব ধরনের রূপকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করছে এবং কথায় ও কাজে প্রমাণ করছে যে তারা একসময় যে প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা করেছিল, একই সাথে আজ সেই প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে-তত দিন জাতীয় নেতৃত্বের দাবিতে তাদের আহ্বান মূল্যায়িত হবে তাদের বক্তব্যের জোরে নয়, বরং ইতিহাসের ভারকে সামনে রেখেই।

ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

হিংস্রতা, মানুষের পশু প্রবৃত্তি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘরের ভিতরে তিন মাস বয়সের শিশুর বিপদের খবরও বড় খবরের অংশ বটে। তবে তাই বলে তা কিন্তু ছোট খবর নয়। যেমন এই খবরটি, যার শিরোনাম ‘বাচ্চারে থামা, নইলে মাইরা ফালামু।’ ভিতরের খবর, আওয়াজটি শুধু হুমকি ছিল না, ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে। ঢাকার মিরপুরের বর্ধনবাড়ি এলাকায় মায়ের পাশে শুয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করছিল। তাতে যুবক স্বামীটির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে তিনি শিশুটির মাকে ধমক দিয়ে শিশুর কান্না থামাতে বলেন। শিশুসন্তানের কান্না থামাতে মা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, সফল হননি। ওই ব্যক্তি তখন শিশুটিকে সত্যি সত্যি গলা টিপে মেরে ফেলেন। যুবকটি ইতিঃপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে জামিনে ছাড়া পান এবং তিন মাসের সন্তানসহ মেয়েটিকে বিয়ে করেন। পরবর্তী ঘটনা সংবাদ হয়েছে গণমাধ্যমে।

ইতালিপ্রবাসী বড় ভাই খুন করেছেন আপন ছোট ভাইকে এবং খুনের ছবি ভিডিওতে ধারণ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সদস্যদের কাছে। কারণ অন্য কিছু নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। বড় ভাই হুমায়ূন কবির ইতালিতে যান ১১ বছর আগে। ছোট ভাইকেও তিনি-ই সেখানে নিয়ে যান, ৩ বছর হবে। বড় ভাই হুমায়ূনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে ছোট ভাই নয়ন আপত্তি করেন। বড় ভাইকে নয়ন যে টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত চান। ছোট ভাইয়ের বড় রকমের এই স্পর্ধা বড় ভাইয়ের পক্ষে হজম করা কঠিন হওয়াতেই ছোট ভাইকে তিনি খুন করেন। মুন্সিগঞ্জ নিবাসী তাদের পিতা দেলোয়ার ফকির স্বভাবতই পুত্র-হত্যার বিচার চেয়েছেন। কিন্তু কার কাছে? উল্লেখ্য ওই পিতার একমাত্র কন্যার স্বামীও থাকেন ইতালিতে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। তবে পালাননি, নিজেই খবর দিয়েছেন পুলিশকে। বয়স তার ৪৭। না, স্ত্রীর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের দুই ছেলেরই। যাদের একজনের বয়স ৫, অন্যজনের ১২। জন্মাবধি তারা অসুস্থ ছিল; আক্রান্ত ছিল অটিজমে। ঘটনা সিডনি শহরের। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশি ভদ্রলোক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ারই আরেক শহর, পার্থে-ঘটা একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা। গত জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি তাদের দুই অটেস্টিক পুত্র (বয়স ১৪ ও ১৬) হত্যা করেন। অসুস্থ সন্তানের দায়ভার সারা জীবন বহন করাতে নিশ্চয়ই তাদেরও আপত্তি ছিল। অনুপ্রেরণাদানকারী এবং অনুপ্রাণিত দুই ঘটনার ভিতর অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি সন্তান-হত্যার পর আর জীবিত থাকেনি। আত্মহত্যা করে পুত্র-হত্যাজনিত গ্লানির অবসান ঘটিয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশির ঘটনাটি যে কিছুটা উন্নত কিংবা মানবেতর; সেটা না-মেনে উপায় নেই।

পাশাপাশি খবর এই রকমের যে কাপাসিয়ার ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে (অর্থাৎ মোট পাঁচজনকে) নেশাজাতীয় দ্রব্যের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে নিজ হাতে জবাই করেন। তার অভিযোগ স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন; এবং প্রেমিকের মাধ্যমে ফোরকানের কষ্টার্জিত টাকা বেহাত হয়ে যেত। এ নিয়ে তিনি নাকি স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেন। তবে ফোরকান নিজেও যে মাদকাসক্ত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নওগাঁর খবর। সেখানে দুই সন্তানসহ এক দম্পতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডের কারণ জমিজমার ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের পিতা, দুই বোন ও এক বোনের ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ওদিকে গণপিটুনিও চলছে। মানিকগঞ্জে শিশুহত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে দুজন। সেই সঙ্গে একজন গুরুতর আহত। ঘটনার বিবরণ এই রকমের : বনপারিল গ্রামের মুকুল মিয়ার ৯ বছর বয়সি কন্যা আতিকা গিয়েছিল প্রতিবেশী এক পরিবারের বিয়েবাড়িতে। বিকালবেলা সে বাড়িতে ফিরছিল। তার কানে ছিল স্বর্ণের দুল, গলায় স্বর্ণের চেইন। ওই দুই বস্তুর লোভেই হবে, তাকে অপহরণ করা হয়। আতিকা নিখোঁজ হয়েছে, এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; মাইকিংও করা হয়। খোঁজাখুঁজিতে বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী এক শিশু জানায় যে নাঈম (১৫) নামের এক কিশোরের সঙ্গে আতিকাকে সে দেখেছে কথা বলতে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নাঈম তার অপরাধ স্বীকার করে এবং তার দেখানো ভুট্টাখেতেই মৃত অবস্থায় আতিকাকে পাওয়া যায়। পুলিশ অভিযুক্ত পুত্র, তার পিতা ও পিতার এক ভাইকে আটক করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষিপ্ত জনতা অভিযুক্ত নাঈমদের বাড়ি ঘেরাও করে। গণপ্রহারে নাঈমের পিতা অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮) নিহত হন। অভিযুক্তের এক ভাইও গুরুতর আহত। নাঈম হেফাজতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন পড়েছিল।

গত ২৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর ছিল এই রকম : ১. চুয়াডাঙ্গায় এক যুবকের (২১) দ্বারা সত্তর-উত্তীর্ণ বৃদ্ধা ধর্ষিত। মহিলা নিজেই মামলা করেছেন। বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি মেয়ের বাড়িতে। ফেরার সময় ভ্যানগাড়ি থেকে নামেন শহরের এক হাসপাতালের সামনে। রাত তখন ১২টা হবে। তার সঙ্গে তরকারি ও মাংসে ভরা একটি ব্যাগ ছিল। পরিচিত এক যুবক এগিয়ে আসেন ব্যাগটি বহন করে মহিলাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন এই প্রস্তাব নিয়ে। মহিলা সম্মত হন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মহিলার অভিযোগ একা পেয়ে যুবকটি তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত যুবকটিকে যথারীতি আটক করেছে পুলিশ। ২. যশোরের কেশবপুরে প্রতিবেশীর বাড়িতে টিভি দেখতে গিয়েছিল এক শিশু। সেখানেই সে ধর্ষিত হয়েছে। ৩. নাটোরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে দুজনকে। তারা পরস্পর পিতা এবং পুত্র। মেয়েটির বাড়ির পাশের দোকানে কাজ করত পিতা ও পুত্র দুজনেই। রাতে নিজেদের বাড়িতে মেয়েটি একাই ছিল। সেই সুযোগে পিতা মেয়েটির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে দোকানে কাজে এসে তার পুত্রও মেয়েটির একাকিত্বের সুযোগ নেয়। এবং আগের রাতে বাবা যা করেছে সকালে ছেলেও সে কাজই সম্পন্ন করেন। [পিতার পথ ধরে আগুয়ান হতে পুত্রের আনুগত্যে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।] ৪. গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। স্থানীয় লোকজন ইমামকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশে সোপর্দ করে। ৫. হবিগঞ্জে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ১০ বছরের এক শিশু বিকালবেলা দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গ্রামেরই এক বাসিন্দা তার এক সঙ্গীর সঙ্গে মিলে শিশুটিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির চিৎকার শুনে লোকজন ধাওয়া করলে বীরপুরুষেরা পালিয়ে যায়। অন্য পাষণ্ডদের মতো এই দুটিও নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের যে সর্বনাশটি ঘটে গেছে তার ক্ষতিপূরণ কী কোনোভাবেই সম্ভব?

গত ৭ জুনের দুটি খবর। ময়মনসিংহের ভালুকায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ গ্রেপ্তার। শিশুটি দোকানে যাচ্ছিল শ্যাম্পু কিনতে। পথিমধ্যে ফালু মিয়া তাকে ফুসলে অন্যত্র নিয়ে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয় খবরটি গাইবান্ধার। সেখানে এক কিশোরীকে তার বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার যুবক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। রাত ১২টার দিকে ওই কিশোরী নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। চারটি যুবক পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলের ধারে নিয়ে যায়। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর চিৎকারে লোকজন তাড়া করলে ধর্ষকদের তিনজন ধরা পড়ে, একজন পালিয়ে যায়।  মানিকগঞ্জের খবর, সেখানে ষাট-পেরোনো এক বৃদ্ধ ভিখারিনীক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মহিলা থানায় গিয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যুবক দুটি গ্রেপ্তার হয়েছে। পরিপূরক খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সেটির মর্মবাণী এই যে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার অভিযুক্তদের শতকরা ৯৮ জনের কোনো শাস্তি হয় না। সংলগ্ন অন্য একটি তথ্য, পানিতে ডুবে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২টি শিশুর মৃত্যু ঘটে।

শিশু ধর্ষণের সংখ্যা যে বাড়ছে সে ব্যাপারটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। একটি দৈনিক পত্রিকা সাম্প্রতিক ৬৮০টি ধর্ষণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছে, ধর্ষিতাদের ভিতর শিশুদের সংখ্যাই অধিক। বুঝতে অসুবিধা নেই যে দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এবং ভোগবাদিতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকদের কাছে শিশুরা এখন আর শিশু নেই, ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গোটা ব্যবস্থাটা যে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক তার বহু প্রমাণ ও নিদর্শনের মধ্যে এটিও একটি। পর্যালোচনায় এটাও ধরা পড়েছে যে ধর্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাদের পূর্বপরিচিত। অর্থাৎ কাছের এবং দূরের ভিতর কোনো ব্যবধান নেই। নির্বিচারে ভোগ করা সম্ভব এবং পরিচিতজনদেরই শিকারে পরিণত করা সহজতর, কারণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণে আক্রান্তরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এটাও দেখা গেছে যে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে তাদের বাসগৃহেই। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিপদের দৃষ্টান্ত তো বিশ্বে রেকর্ড করেছে, পর্যবেক্ষণও সে কথা বলেছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের অঙ্গীকার

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের অঙ্গীকার
ফাইল ছবি

ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর থেকে এই মহানগর জাতীয় উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

অথচ আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকগুলোতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্বের নিম্ন সারির বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় কম বাসযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, দুর্বল অবকাঠামো, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, সীমিত সবুজ এলাকা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি।

তবে এই সংকট অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় ঢাকার মতোই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকবান্ধব নীতির মাধ্যমে তারা আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিউল এবং চীনের বিভিন্ন বৃহৎ মহানগর দেখিয়েছে যে সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে ঘনবসতিপূর্ণ শহরও একটি টেকসই, কার্যকর ও মানবিক নগরে পরিণত হতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো—ঢাকা কি বিশৃঙ্খল ও চাপগ্রস্ত মহানগর হিসেবেই থাকবে, নাকি আধুনিক, স্মার্ট, সবুজ ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হবে? এর উত্তর শুধু নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক জীবনমানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাসযোগ্য নগর বলতে শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়ককে বোঝায় না। একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য শহরের বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত, বিশুদ্ধ পরিবেশ, পরিকল্পিত আবাসন, পর্যাপ্ত সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, উন্নত নাগরিক সেবা এবং মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। তাই ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা।

ঢাকার অন্যতম বড় সংকট অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সীমিত ভূমির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং আবাসন, বাণিজ্য, শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতায় নগরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, অথচ পর্যাপ্ত রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন শহরতলি নতুন অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। ফলে ঢাকা ক্রমেই একটি অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত মহানগরে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা যানজট। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকেন। এতে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাও ঢাকার যানজটকে অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যানজটের জন্য শুধু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি দায়ী নয়; অপরিকল্পিত সড়ক নেটওয়ার্ক, দুর্বল গণপরিবহন, ফুটপাত দখল, পার্কিং সংকট এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতাও সমানভাবে দায়ী। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়ে নয়; বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমেই বড় শহরের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। মেট্রো রেল ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে বাস, রেল, নৌপথ ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

পরিবহনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতাও ঢাকার বড় সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বহু এলাকায় পানি জমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এ সমস্যাকে আরো তীব্র করেছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও সবুজ এলাকার সংকোচন নগরের পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি আধুনিক মহানগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব জীবন নিশ্চিত করারও স্থান। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে নগর উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। ফলে উচ্চমূল্যের আবাসন সংকটের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থানের সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকায় রাজধানীর ওপর চাপ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের সফল নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা : ঢাকার জন্য শিক্ষা

বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় জনসংখ্যার চাপ, যানজট, পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যায় ভুগেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নগর শাসন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে তারা আধুনিক, দক্ষ ও বাসযোগ্য মহানগরে রূপান্তরিত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা এসব অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে।

চীন, বিশেষ করে বেইজিং, সাংহাই, শেনজেন ও গুয়াংজুর মতো শহরগুলো পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক অবকাঠামো, সমন্বিত গণপরিবহন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফল নগর উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শেনজেনের রূপান্তর দেখিয়েছে, সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে একটি শহরকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। ঢাকার ক্ষেত্রেও নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে বিদেশি অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও সুশাসন, টোকিওর সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, একটি সফল ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত গণপরিবহন, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবনমানকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শন।

ঢাকার ভবিষ্যৎও এসব নীতির আলোকে গড়ে উঠতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণ নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নিজস্ব, কার্যকর ও টেকসই নগর উন্নয়ন মডেল তৈরি করতে হবে।

করণীয় : বাসযোগ্য ঢাকার জন্য সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা

ঢাকার বর্তমান নগর সংকট কোনো একক প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা, যেখানে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, আবাসন, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও নাগরিক সেবাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।

প্রথমেই রাজধানীর জন্য একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমি ব্যবহার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী নগর শাসন ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।

যানজট নিরসনে গণপরিবহনকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। মেট্রো রেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT), বাস, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পাশাপাশি একক টিকিটিং ব্যবস্থা, নিরাপদ স্টেশন, উন্নত যাত্রীসেবা এবং কার্যকর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত হয়।

রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়াকে শুধু আবাসিক এলাকা নয়, বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ রাজধানীর বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

ভবিষ্যতের ঢাকা হবে প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট মহানগর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তবে স্মার্ট সিটির লক্ষ্য প্রযুক্তির প্রদর্শন নয়; বরং মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করা।

পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আধুনিক ড্রেনেজব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নগর বন, পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করা সম্ভব। নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, পর্যাপ্ত পার্ক, শিশুদের খেলার মাঠ এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি সফল নগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি এমন একটি বাসযোগ্য পরিবেশ, যেখানে সব শ্রেণির মানুষ সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।

তবে এই রূপান্তরের জন্য সুশাসন, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি অভিজ্ঞতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, তবে তা অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নয়। চীনের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, টোকিওর দক্ষ গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর, টেকসই ও মানবিক নগর উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহারে বলা যায়, ঢাকা আজ নানা সংকটে জর্জরিত হলেও এর সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বের অনেক মহানগর একসময় একই ধরনের সমস্যায় ভুগেছে, কিন্তু দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা আধুনিক, বাসযোগ্য ও টেকসই নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও আশাব্যঞ্জক। বাসযোগ্য ঢাকা মানে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা বড় অবকাঠামো নয়; বরং এমন একটি মানবিক মহানগর, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে এবং সবুজ ও উন্মুক্ত পরিবেশে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে। ভবিষ্যতের ঢাকা হতে হবে স্মার্ট, সবুজ, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক—যেখানে প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন শক্তিশালী নগর শাসন, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা, গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। ঢাকার রূপান্তর শুধু রাজধানীর উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এখনই সময় সংকটের ঢাকা থেকে সম্ভাবনার ঢাকায় এগিয়ে যাওয়ার—যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য এবং নগরায়ণ হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও মানবিক। একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশের অপরিহার্য ভিত্তি।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট