• ই-পেপার

ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না

ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

হিংস্রতা, মানুষের পশু প্রবৃত্তি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘরের ভিতরে তিন মাস বয়সের শিশুর বিপদের খবরও বড় খবরের অংশ বটে। তবে তাই বলে তা কিন্তু ছোট খবর নয়। যেমন এই খবরটি, যার শিরোনাম ‘বাচ্চারে থামা, নইলে মাইরা ফালামু।’ ভিতরের খবর, আওয়াজটি শুধু হুমকি ছিল না, ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে। ঢাকার মিরপুরের বর্ধনবাড়ি এলাকায় মায়ের পাশে শুয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করছিল। তাতে যুবক স্বামীটির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে তিনি শিশুটির মাকে ধমক দিয়ে শিশুর কান্না থামাতে বলেন। শিশুসন্তানের কান্না থামাতে মা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, সফল হননি। ওই ব্যক্তি তখন শিশুটিকে সত্যি সত্যি গলা টিপে মেরে ফেলেন। যুবকটি ইতিঃপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে জামিনে ছাড়া পান এবং তিন মাসের সন্তানসহ মেয়েটিকে বিয়ে করেন। পরবর্তী ঘটনা সংবাদ হয়েছে গণমাধ্যমে।

ইতালিপ্রবাসী বড় ভাই খুন করেছেন আপন ছোট ভাইকে এবং খুনের ছবি ভিডিওতে ধারণ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সদস্যদের কাছে। কারণ অন্য কিছু নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। বড় ভাই হুমায়ূন কবির ইতালিতে যান ১১ বছর আগে। ছোট ভাইকেও তিনি-ই সেখানে নিয়ে যান, ৩ বছর হবে। বড় ভাই হুমায়ূনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে ছোট ভাই নয়ন আপত্তি করেন। বড় ভাইকে নয়ন যে টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত চান। ছোট ভাইয়ের বড় রকমের এই স্পর্ধা বড় ভাইয়ের পক্ষে হজম করা কঠিন হওয়াতেই ছোট ভাইকে তিনি খুন করেন। মুন্সিগঞ্জ নিবাসী তাদের পিতা দেলোয়ার ফকির স্বভাবতই পুত্র-হত্যার বিচার চেয়েছেন। কিন্তু কার কাছে? উল্লেখ্য ওই পিতার একমাত্র কন্যার স্বামীও থাকেন ইতালিতে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। তবে পালাননি, নিজেই খবর দিয়েছেন পুলিশকে। বয়স তার ৪৭। না, স্ত্রীর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের দুই ছেলেরই। যাদের একজনের বয়স ৫, অন্যজনের ১২। জন্মাবধি তারা অসুস্থ ছিল; আক্রান্ত ছিল অটিজমে। ঘটনা সিডনি শহরের। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশি ভদ্রলোক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ারই আরেক শহর, পার্থে-ঘটা একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা। গত জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি তাদের দুই অটেস্টিক পুত্র (বয়স ১৪ ও ১৬) হত্যা করেন। অসুস্থ সন্তানের দায়ভার সারা জীবন বহন করাতে নিশ্চয়ই তাদেরও আপত্তি ছিল। অনুপ্রেরণাদানকারী এবং অনুপ্রাণিত দুই ঘটনার ভিতর অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি সন্তান-হত্যার পর আর জীবিত থাকেনি। আত্মহত্যা করে পুত্র-হত্যাজনিত গ্লানির অবসান ঘটিয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশির ঘটনাটি যে কিছুটা উন্নত কিংবা মানবেতর; সেটা না-মেনে উপায় নেই।

পাশাপাশি খবর এই রকমের যে কাপাসিয়ার ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে (অর্থাৎ মোট পাঁচজনকে) নেশাজাতীয় দ্রব্যের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে নিজ হাতে জবাই করেন। তার অভিযোগ স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন; এবং প্রেমিকের মাধ্যমে ফোরকানের কষ্টার্জিত টাকা বেহাত হয়ে যেত। এ নিয়ে তিনি নাকি স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেন। তবে ফোরকান নিজেও যে মাদকাসক্ত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নওগাঁর খবর। সেখানে দুই সন্তানসহ এক দম্পতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডের কারণ জমিজমার ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের পিতা, দুই বোন ও এক বোনের ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ওদিকে গণপিটুনিও চলছে। মানিকগঞ্জে শিশুহত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে দুজন। সেই সঙ্গে একজন গুরুতর আহত। ঘটনার বিবরণ এই রকমের : বনপারিল গ্রামের মুকুল মিয়ার ৯ বছর বয়সি কন্যা আতিকা গিয়েছিল প্রতিবেশী এক পরিবারের বিয়েবাড়িতে। বিকালবেলা সে বাড়িতে ফিরছিল। তার কানে ছিল স্বর্ণের দুল, গলায় স্বর্ণের চেইন। ওই দুই বস্তুর লোভেই হবে, তাকে অপহরণ করা হয়। আতিকা নিখোঁজ হয়েছে, এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; মাইকিংও করা হয়। খোঁজাখুঁজিতে বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী এক শিশু জানায় যে নাঈম (১৫) নামের এক কিশোরের সঙ্গে আতিকাকে সে দেখেছে কথা বলতে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নাঈম তার অপরাধ স্বীকার করে এবং তার দেখানো ভুট্টাখেতেই মৃত অবস্থায় আতিকাকে পাওয়া যায়। পুলিশ অভিযুক্ত পুত্র, তার পিতা ও পিতার এক ভাইকে আটক করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষিপ্ত জনতা অভিযুক্ত নাঈমদের বাড়ি ঘেরাও করে। গণপ্রহারে নাঈমের পিতা অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮) নিহত হন। অভিযুক্তের এক ভাইও গুরুতর আহত। নাঈম হেফাজতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন পড়েছিল।

গত ২৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর ছিল এই রকম : ১. চুয়াডাঙ্গায় এক যুবকের (২১) দ্বারা সত্তর-উত্তীর্ণ বৃদ্ধা ধর্ষিত। মহিলা নিজেই মামলা করেছেন। বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি মেয়ের বাড়িতে। ফেরার সময় ভ্যানগাড়ি থেকে নামেন শহরের এক হাসপাতালের সামনে। রাত তখন ১২টা হবে। তার সঙ্গে তরকারি ও মাংসে ভরা একটি ব্যাগ ছিল। পরিচিত এক যুবক এগিয়ে আসেন ব্যাগটি বহন করে মহিলাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন এই প্রস্তাব নিয়ে। মহিলা সম্মত হন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মহিলার অভিযোগ একা পেয়ে যুবকটি তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত যুবকটিকে যথারীতি আটক করেছে পুলিশ। ২. যশোরের কেশবপুরে প্রতিবেশীর বাড়িতে টিভি দেখতে গিয়েছিল এক শিশু। সেখানেই সে ধর্ষিত হয়েছে। ৩. নাটোরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে দুজনকে। তারা পরস্পর পিতা এবং পুত্র। মেয়েটির বাড়ির পাশের দোকানে কাজ করত পিতা ও পুত্র দুজনেই। রাতে নিজেদের বাড়িতে মেয়েটি একাই ছিল। সেই সুযোগে পিতা মেয়েটির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে দোকানে কাজে এসে তার পুত্রও মেয়েটির একাকিত্বের সুযোগ নেয়। এবং আগের রাতে বাবা যা করেছে সকালে ছেলেও সে কাজই সম্পন্ন করেন। [পিতার পথ ধরে আগুয়ান হতে পুত্রের আনুগত্যে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।] ৪. গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। স্থানীয় লোকজন ইমামকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশে সোপর্দ করে। ৫. হবিগঞ্জে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ১০ বছরের এক শিশু বিকালবেলা দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গ্রামেরই এক বাসিন্দা তার এক সঙ্গীর সঙ্গে মিলে শিশুটিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির চিৎকার শুনে লোকজন ধাওয়া করলে বীরপুরুষেরা পালিয়ে যায়। অন্য পাষণ্ডদের মতো এই দুটিও নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের যে সর্বনাশটি ঘটে গেছে তার ক্ষতিপূরণ কী কোনোভাবেই সম্ভব?

গত ৭ জুনের দুটি খবর। ময়মনসিংহের ভালুকায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ গ্রেপ্তার। শিশুটি দোকানে যাচ্ছিল শ্যাম্পু কিনতে। পথিমধ্যে ফালু মিয়া তাকে ফুসলে অন্যত্র নিয়ে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয় খবরটি গাইবান্ধার। সেখানে এক কিশোরীকে তার বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার যুবক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। রাত ১২টার দিকে ওই কিশোরী নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। চারটি যুবক পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলের ধারে নিয়ে যায়। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর চিৎকারে লোকজন তাড়া করলে ধর্ষকদের তিনজন ধরা পড়ে, একজন পালিয়ে যায়।  মানিকগঞ্জের খবর, সেখানে ষাট-পেরোনো এক বৃদ্ধ ভিখারিনীক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মহিলা থানায় গিয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যুবক দুটি গ্রেপ্তার হয়েছে। পরিপূরক খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সেটির মর্মবাণী এই যে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার অভিযুক্তদের শতকরা ৯৮ জনের কোনো শাস্তি হয় না। সংলগ্ন অন্য একটি তথ্য, পানিতে ডুবে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২টি শিশুর মৃত্যু ঘটে।

শিশু ধর্ষণের সংখ্যা যে বাড়ছে সে ব্যাপারটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। একটি দৈনিক পত্রিকা সাম্প্রতিক ৬৮০টি ধর্ষণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছে, ধর্ষিতাদের ভিতর শিশুদের সংখ্যাই অধিক। বুঝতে অসুবিধা নেই যে দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এবং ভোগবাদিতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকদের কাছে শিশুরা এখন আর শিশু নেই, ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গোটা ব্যবস্থাটা যে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক তার বহু প্রমাণ ও নিদর্শনের মধ্যে এটিও একটি। পর্যালোচনায় এটাও ধরা পড়েছে যে ধর্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাদের পূর্বপরিচিত। অর্থাৎ কাছের এবং দূরের ভিতর কোনো ব্যবধান নেই। নির্বিচারে ভোগ করা সম্ভব এবং পরিচিতজনদেরই শিকারে পরিণত করা সহজতর, কারণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণে আক্রান্তরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এটাও দেখা গেছে যে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে তাদের বাসগৃহেই। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিপদের দৃষ্টান্ত তো বিশ্বে রেকর্ড করেছে, পর্যবেক্ষণও সে কথা বলেছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের অঙ্গীকার

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকারের অঙ্গীকার
ফাইল ছবি

ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর থেকে এই মহানগর জাতীয় উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

অথচ আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকগুলোতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্বের নিম্ন সারির বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় কম বাসযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, দুর্বল অবকাঠামো, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, সীমিত সবুজ এলাকা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি।

তবে এই সংকট অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় ঢাকার মতোই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকবান্ধব নীতির মাধ্যমে তারা আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিউল এবং চীনের বিভিন্ন বৃহৎ মহানগর দেখিয়েছে যে সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে ঘনবসতিপূর্ণ শহরও একটি টেকসই, কার্যকর ও মানবিক নগরে পরিণত হতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো—ঢাকা কি বিশৃঙ্খল ও চাপগ্রস্ত মহানগর হিসেবেই থাকবে, নাকি আধুনিক, স্মার্ট, সবুজ ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হবে? এর উত্তর শুধু নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক জীবনমানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাসযোগ্য নগর বলতে শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়ককে বোঝায় না। একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য শহরের বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত, বিশুদ্ধ পরিবেশ, পরিকল্পিত আবাসন, পর্যাপ্ত সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, উন্নত নাগরিক সেবা এবং মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। তাই ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা।

ঢাকার অন্যতম বড় সংকট অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সীমিত ভূমির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং আবাসন, বাণিজ্য, শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতায় নগরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, অথচ পর্যাপ্ত রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন শহরতলি নতুন অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। ফলে ঢাকা ক্রমেই একটি অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত মহানগরে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা যানজট। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকেন। এতে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাও ঢাকার যানজটকে অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যানজটের জন্য শুধু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি দায়ী নয়; অপরিকল্পিত সড়ক নেটওয়ার্ক, দুর্বল গণপরিবহন, ফুটপাত দখল, পার্কিং সংকট এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতাও সমানভাবে দায়ী। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়ে নয়; বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমেই বড় শহরের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। মেট্রো রেল ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে বাস, রেল, নৌপথ ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

পরিবহনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতাও ঢাকার বড় সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বহু এলাকায় পানি জমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এ সমস্যাকে আরো তীব্র করেছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও সবুজ এলাকার সংকোচন নগরের পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি আধুনিক মহানগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব জীবন নিশ্চিত করারও স্থান। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে নগর উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। ফলে উচ্চমূল্যের আবাসন সংকটের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থানের সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকায় রাজধানীর ওপর চাপ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের সফল নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা : ঢাকার জন্য শিক্ষা

বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় জনসংখ্যার চাপ, যানজট, পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যায় ভুগেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নগর শাসন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে তারা আধুনিক, দক্ষ ও বাসযোগ্য মহানগরে রূপান্তরিত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা এসব অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে।

চীন, বিশেষ করে বেইজিং, সাংহাই, শেনজেন ও গুয়াংজুর মতো শহরগুলো পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক অবকাঠামো, সমন্বিত গণপরিবহন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফল নগর উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শেনজেনের রূপান্তর দেখিয়েছে, সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে একটি শহরকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। ঢাকার ক্ষেত্রেও নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে বিদেশি অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও সুশাসন, টোকিওর সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, একটি সফল ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত গণপরিবহন, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবনমানকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শন।

ঢাকার ভবিষ্যৎও এসব নীতির আলোকে গড়ে উঠতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণ নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নিজস্ব, কার্যকর ও টেকসই নগর উন্নয়ন মডেল তৈরি করতে হবে।

করণীয় : বাসযোগ্য ঢাকার জন্য সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা

ঢাকার বর্তমান নগর সংকট কোনো একক প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা, যেখানে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, আবাসন, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও নাগরিক সেবাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।

প্রথমেই রাজধানীর জন্য একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমি ব্যবহার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী নগর শাসন ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।

যানজট নিরসনে গণপরিবহনকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। মেট্রো রেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (BRT), বাস, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পাশাপাশি একক টিকিটিং ব্যবস্থা, নিরাপদ স্টেশন, উন্নত যাত্রীসেবা এবং কার্যকর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত হয়।

রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়াকে শুধু আবাসিক এলাকা নয়, বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ রাজধানীর বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

ভবিষ্যতের ঢাকা হবে প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট মহানগর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তবে স্মার্ট সিটির লক্ষ্য প্রযুক্তির প্রদর্শন নয়; বরং মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করা।

পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আধুনিক ড্রেনেজব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নগর বন, পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করা সম্ভব। নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, পর্যাপ্ত পার্ক, শিশুদের খেলার মাঠ এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি সফল নগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি এমন একটি বাসযোগ্য পরিবেশ, যেখানে সব শ্রেণির মানুষ সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।

তবে এই রূপান্তরের জন্য সুশাসন, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি অভিজ্ঞতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, তবে তা অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নয়। চীনের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, টোকিওর দক্ষ গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর, টেকসই ও মানবিক নগর উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহারে বলা যায়, ঢাকা আজ নানা সংকটে জর্জরিত হলেও এর সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বের অনেক মহানগর একসময় একই ধরনের সমস্যায় ভুগেছে, কিন্তু দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা আধুনিক, বাসযোগ্য ও টেকসই নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও আশাব্যঞ্জক। বাসযোগ্য ঢাকা মানে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা বড় অবকাঠামো নয়; বরং এমন একটি মানবিক মহানগর, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে এবং সবুজ ও উন্মুক্ত পরিবেশে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে। ভবিষ্যতের ঢাকা হতে হবে স্মার্ট, সবুজ, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক—যেখানে প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন শক্তিশালী নগর শাসন, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা, গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। ঢাকার রূপান্তর শুধু রাজধানীর উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এখনই সময় সংকটের ঢাকা থেকে সম্ভাবনার ঢাকায় এগিয়ে যাওয়ার—যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য এবং নগরায়ণ হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও মানবিক। একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশের অপরিহার্য ভিত্তি।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে আসবাব : পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

আহসান হাবিব বরুন
পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে আসবাব : পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
সংগৃহীত ছবি

একসময় যে পলিথিনকে আমরা কেবল পরিবেশ ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে দেখতাম, আজ সেই পরিত্যক্ত পলিথিনই আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রূপ নিচ্ছে টেকসই আসবাব, নির্মাণসামগ্রী এবং নানা মূল্যবান শিল্পপণ্যে। এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গল্প নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নদীমাতৃক বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ শুধু সময়োপযোগী নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অপরিহার্য উন্নয়ন কৌশল।

সম্প্রতি কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠিত একটি আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা দেখিয়ে দিয়েছে যে, যেসব একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন এতদিন সমুদ্র, নদী, খাল-বিল ও নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য অভিশাপ হয়ে ছিল, সেগুলোকেই পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে টেকসই আসবাব, প্লাস্টিক লাম্বার, শিট এবং অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব। এটি কেবল একটি শিল্প উদ্যোগ নয়; বরং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এক সফল উদাহরণ, যা বাংলাদেশের সার্কুলার অর্থনীতি গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় নদী, কৃষিজমি, জলাভূমি এবং শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে গিয়ে জমা হয়। বিশেষ করে পর্যটননগরী কক্সবাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

এই বাস্তবতায় কক্সবাজারের রামুতে গড়ে ওঠা আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখানে সংগ্রহ করা পলিথিন ও নিম্নমূল্যের প্লাস্টিক বর্জ্য ধোয়া, বাছাই, কুচি করা, শুকানো এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে পেলেটে রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে সেই পেলেট থেকে তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক লাম্বার, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, সোফা, শিট এবং বিভিন্ন ধরনের টেকসই আসবাব। কাঠের বিকল্প হিসেবে এসব পণ্য দীর্ঘস্থায়ী, পানি ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং তুলনামূলকভাবে কম রক্ষণাবেক্ষণসাপেক্ষ।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—এটি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একই সূত্রে বেঁধেছে। একদিকে সমুদ্র ও প্রকৃতি প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান। বর্জ্য সংগ্রহকারী, বাছাইকারী, কারখানার শ্রমিক, কারিগর এবং উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের সুযোগ। বিশেষ করে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ এই শিল্পকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক করে তুলছে।

বিশ্বব্যাপী এখন ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির ধারণা দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ধারণার মূল দর্শন হলো—একটি পণ্যের ব্যবহার শেষ হলেও সেটিকে পুনরায় উৎপাদনচক্রে ফিরিয়ে এনে নতুন সম্পদে রূপান্তর করা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ ইতোমধ্যেই এই মডেল অনুসরণ করে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশও যদি পরিকল্পিতভাবে এই শিল্পকে সম্প্রসারণ করতে পারে, তবে এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সবুজ শিল্পখাতে পরিণত হতে পারে।

বর্তমানে দেশের প্লাস্টিক শিল্প রপ্তানিমুখী সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি। কিন্তু পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটলে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং নাগরিক সচেতনতা—এই চারটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যবহারের পর পলিথিন যদি সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা যায়, তাহলে সেটি আর পরিবেশের শত্রু নয়; বরং শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ পৌর এলাকায় এখনও উৎস পর্যায়ে বর্জ্য আলাদা করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। একই ডাস্টবিনে খাদ্যবর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ ও চিকিৎসাবর্জ্য ফেলার ফলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকও নষ্ট হয়ে যায়। তাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল ভোক্তা আচরণ নিয়ে পাঠক্রম ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। কারণ পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশব থেকেই।

এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি উৎপাদিত প্লাস্টিকের একটি অংশ পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সরকার উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, কর-সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে, তবে দেশে শত শত আধুনিক রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে ওঠা সম্ভব।

কক্সবাজারের এই উদ্যোগ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকল্প নেই। পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি লাম্বার ও নির্মাণসামগ্রী উপকূলীয় অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা গেলে কাঠের ব্যবহার কমবে, বন সংরক্ষিত হবে এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে।

সরকার ইতিমধ্যে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। মানুষকে বোঝাতে হবে—প্লাস্টিক বর্জ্য কেবল আবর্জনা নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি একটি অর্থনৈতিক সম্পদ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে স্কুলের বেঞ্চ, পার্কের আসবাব, সেতুর উপকরণ, হাঁটার পথ এবং আবাসন নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই ধারায় এগিয়ে যেতে পারলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আজকের বিশ্বে উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলে গেছে। শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়; প্রকৃতি রক্ষা, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড। কক্সবাজারের এই উদ্যোগ সেই নতুন উন্নয়ন দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন।

পরিশেষে বলা যায়, পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে টেকসই আসবাব তৈরির এই উদ্যোগ কেবল একটি শিল্পপ্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। সরকার, বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে যদি এ ধরনের উদ্যোগকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে একদিন বাংলাদেশের নদী, সমুদ্র, বন ও নগরগুলো প্লাস্টিক দূষণের অভিশাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত হবে। তখন বর্জ্য আর বোঝা হবে না; বরং তা হবে নতুন সম্পদ, নতুন কর্মসংস্থান এবং সবুজ অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি। তাই কক্সবাজারের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ শুধু একটি জেলার সাফল্যের গল্প নয়; বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণা ও  উন্নয়ন দর্শন। সুতরাং সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে আবর্জনাও জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected] 
 

প্রবীণ ভরসা করে সবলের, সেবা পায় দুর্বলের

হাসান আলী
প্রবীণ ভরসা করে সবলের, সেবা পায় দুর্বলের
হাসান আলী

মানুষের জীবন বড় বিচিত্র। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সে নানা রকম সম্পর্ক গড়ে তোলে, অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসে, সাফল্য-ব্যর্থতা, সম্মান-অপমান, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে পথ চলতে থাকে। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেকেই একটি গভীর সত্য আবিষ্কার করেন—যাদেরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তারা সবসময় পাশে থাকেন না; আর যাদেরকে তেমন গুরুত্ব দেননি, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি সেবা ও সহযোগিতা করেন।

মানুষ স্বভাবতই শক্তির প্রতি আকৃষ্ট। ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে পরিচয়, ধনী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, খ্যাতিমান ব্যক্তির সান্নিধ্য—এসবকে অনেকেই সামাজিক মর্যাদার অংশ বলে মনে করেন। আমরা এমন মানুষের সঙ্গে ছবি তুলতে ভালোবাসি, তাদের সঙ্গে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি, তাদের কাছাকাছি থাকতে পারলে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। অন্যদিকে সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করা মানুষদের আমরা প্রায়ই অবহেলার চোখে দেখি। গৃহকর্মী, আয়া, বুয়া, দারোয়ান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, দোকান কর্মচারী, কেয়ারগিভার কিংবা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা সমমর্যাদার সম্পর্ক হয়ে ওঠে। অথচ জীবন একসময় মানুষকে অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

প্রবীণ বয়সে এসে মানুষের প্রয়োজন বদলে যায়। তখন আর বড় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একজন মানুষের। প্রয়োজন হয় এমন কাউকে, যে একটু সময় দেবে, প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেবে, কথা শুনবে, ওষুধ এনে দেবে কিংবা অসুস্থ শরীরের পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকবে। সেই মানুষটি অনেক সময় কোনো বড় কর্মকর্তা নন, কোনো ধনী আত্মীয় নন, কোনো খ্যাতিমান ব্যক্তি নন। তিনি হতে পারেন একজন গৃহকর্মী, একজন সেবাকর্মী, একজন কেয়ারটেকার কিংবা একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।

মানুষ জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করে সম্পদ অর্জনের জন্য। দামি গয়না কেনে, মূল্যবান পোশাক সংগ্রহ করে, ব্র্যান্ডের জুতা, ঘড়ি, চশমা, সুগন্ধি কিংবা নানা বিলাসদ্রব্য কিনে রাখে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসবের ব্যবহার কমতে থাকে। নিরাপত্তার কারণে গয়না পরা হয় না, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পোশাকের জাঁকজমক হারিয়ে যায়। একসময় যে খাবারের জন্য আকুলতা ছিল, চিকিৎসকের পরামর্শে তা বর্জন করতে হয়। মুখরোচক খাবারের পরিবর্তে থালায় স্থান করে নেয় করলা, শাকসবজি, লাউ, কুমড়া কিংবা কম ক্যালরির খাদ্য।
জীবন যেন ধীরে ধীরে মানুষকে শেখাতে থাকে—আসল প্রয়োজন অন্য কোথাও।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন প্রবীণ মানুষের কথা ভাবুন। নামকরা চিকিৎসক এসে রোগী দেখে চলে যান। তার জ্ঞান ও দক্ষতা অবশ্যই অমূল্য। কিন্তু সারাদিন রোগীর পাশে থাকেন কে? ওষুধ খাওয়ান কে? খাবার এনে দেন কে? বিছানা পরিষ্কার করেন কে? হুইলচেয়ারে বসিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নিয়ে যান কে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কাজ করেন একজন আয়া, ওয়ার্ড বয়, নার্স, সেবাকর্মী কিংবা কেয়ারগিভার। তারা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হন না, কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের জীবনে তাদের অবদান অপরিসীম।

বাসা-বাড়ির জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রবীণ মানুষের একাকী জীবনকে সহজ করে দেন গৃহকর্মী, কেয়ারটেকার, দারোয়ান কিংবা নানান পেশার সাধারণ মানুষ। ইলেকট্রিক মিস্ত্রি এসে বিদ্যুতের সমস্যা ঠিক করে দেন, প্লাম্বার পানির লাইন সচল করেন, দোকান কর্মচারী প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী পরিবেশ বাসযোগ্য রাখেন। তাদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই প্রবীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এগিয়ে চলে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যটি দেখা যায় জীবনের শেষ প্রহরে। মৃত্যুর পর মানুষের পরিচয়, পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানের আর কোনো মূল্য থাকে না। তখন প্রয়োজন হয় কিছু মানবিক হাতের। লাশ বহনের জন্য মানুষ লাগে, অ্যাম্বুলেন্স চালানোর জন্য মানুষ লাগে, গোসল করানোর জন্য মানুষ লাগে, কবর খোঁড়ার জন্য মানুষ লাগে। শেষ বিদায়ের প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষের শ্রম, ঘাম ও দায়িত্ববোধ জড়িয়ে থাকে। এমনকি মৃত্যুর পরও কবরের যত্ন কিংবা স্মৃতির রক্ষণাবেক্ষণের কাজও প্রায়শই তারাই করেন।

জীবনের এই বাস্তবতা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। মানুষকে তার পেশা, পোশাক, শিক্ষা কিংবা আর্থিক অবস্থান দিয়ে বিচার না করে তার মানবিক মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায়। সমাজে যাদের আমরা সাধারণ মানুষ বলি, তাদের অবদান আসলে অসাধারণ। তারা সভা-সেমিনারের আলোচনার বিষয় হন না, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন না, কিন্তু নীরবে মানুষের জীবনকে বয়ে নিয়ে যান।

প্রবীণ বয়সে এসে অনেকেই উপলব্ধি করেন, ক্ষমতা দূর থেকে মুগ্ধ করতে পারে, সম্পদ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, খ্যাতি কিছু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ায় মানুষই। আর সেই মানুষটি অনেক সময় সমাজের সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে কম আলোচিত একজন মানুষ।

এ কারণেই বলা যায়, জীবনের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষ ভরসা করে সবলের ওপর, কিন্তু সেবা পায় দুর্বলের কাছ থেকে।