ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী সব সময়ই উল্টো স্রোতে চলা সংগঠন। নীতি-আদর্শ, ইনসাফ, আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসনের কথা মুখে বললেও রাষ্ট্রক্ষমতাই মূলত দলটির লক্ষ্য। সে কারণেই বারবার দলটির বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। দলটির নেতা-কর্মীদের বাহ্যিক আচার-আচরণে আদব-কায়দার প্রকাশ থাকলেও অনুকূল পরিবেশ পেলেই তাঁরা চোখ উল্টে ফেলেন। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর ও অসহিষ্ণু আচরণও করেন। পেশাগত জীবনে অনেকবারই ব্যক্তিগতভাবে এর শিকার হয়েছি। ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত আমার একটি লেখা ‘ড. ইউনূসের নতুন স্বপ্ন, নতুন দল, জামায়াতের রাজনীতি’। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের একজন নেতা। তিনি ফোন করে আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। সে সময় সংগঠনটির নেতারা এমন এক মেজাজে ছিলেন যে তাঁরা মনে করতেন নির্বাচন হলেই নিশ্চিত ক্ষমতায়। হুমকির মেজাজও সে রকমই ছিল। কিন্তু ছাব্বিশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশবাসীর ভোটে সবকিছু পাল্টে গেলে বড্ড আশাহত হয় দলটি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র পাঁচ মাস পূরণ হতে যাচ্ছে। সব সেক্টরে বিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সমস্যার পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি এগিয়ে চলছেন। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসা অসন্তুষ্ট দলটির এখনকার টার্গেট হলো সংবিধান সংস্কারের নামে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল ঘরে তোলা। আর আশানুরূপ ফল পেলেই শুরু হবে সরকারবিরোধী নতুন খেলা। ক্ষমতার এমনই এক দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে কাজ করছে তারা। অন্যদিকে বিএনপির মধ্যে দিনদিন হাইব্রিড নেতার জন্ম হচ্ছে। তাঁদের কারণে দলের অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী, সমর্থক, পেশাজীবী আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ, গণতন্ত্র ও জনগণের রায়ের প্রশ্নটি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার আকাক্সক্ষা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা যদি অস্থিরতা সৃষ্টি, নির্বাচিত বা বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর প্রমাণের চেষ্টা, কিংবা ক্রমাগত সংঘাতমুখী রাজনীতির মাধ্যমে বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক নয়। জামায়াত রাজনীতির একটি বহুলবিতর্কিত দল। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির সময় দলটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির মহান মুক্তিযুদ্ধে দলটির অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। স্বাধীন বাংলাদেশে দলটি কখনো বিএনপির সঙ্গে, কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে ক্ষমতার সঙ্গেই থেকেছে। সর্বশেষ তাদের সঙ্গী হয়েছে ড. ইউনূসের আশীর্বাদপুষ্ট দল এনসিপি। একক শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্য না থাকায় দলটি এনপিসির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। কিন্তু এর পরেও কোনোভাবেই শোকর করতে পারছে না। গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে তারা নতুন করে মাঠ গরমের চেষ্টা করছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে এবং ৪ জুলাই রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। সেদিন প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদান স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে শুধু আমার দলেরই নয়, অন্য আরও রাজনৈতিক দল এবং একই সঙ্গে যেসব অরাজনৈতিক ব্যক্তি, যারা ৫ আগস্ট (ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলন) সফল করেছিলেন, তাদের সবার কাছে বলতে চাই, আসুন আমাদের প্রতি, বাংলাদেশের লাখো-কোটি মানুষের প্রতি স্বৈরাচার যেমন অবিচার করেছিল তার বিচারের নামে কারও প্রতি যেন অবিচার না হয়, সে বিষয়টিতেও সচেতন থাকতে হবে।’ নিজের ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশ করে তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘এই অনুষ্ঠান চলাকালে বারবার ভাবছিলাম এ মুহূর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার ও অন্যায় হয়েছে, আপনি কি চান আমি এসবের প্রতিশোধ নিই? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এ মুহূর্তে তোমার কাজ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি, আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন।’ মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের কাছ থেকে দেশবাসী এমন উদারতাই প্রত্যাশা করে। কারণ সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
জুলাই সনদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন স্পষ্ট বক্তব্যের তিন দিনের মাথায় জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট মঙ্গলবার রাজধানীতে একটি মানববন্ধন করে। সেখান থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদের ন্যাম ভবনের সামনে ১১-দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির এখন প্রধান সংকট গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া। এটি বাস্তবায়ন না হলে দেশের রাজনীতি সংঘাতের দিকে যেতে পারে।’ ইতঃপূর্বে প্রধানমন্ত্রী যখন সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার, জুলাইয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা ও ফ্যাসিস্টের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর পরও রাজনীতিতে সংঘাতের ইঙ্গিত সুখকর বিষয় নয়।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় জামায়াত রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখে ক্ষমতা লাভের স্বার্থে নিজেদের অবস্থান বারবার পরিবর্তন করেছে। কিন্তু অতীতের বিতর্ক থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচিও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা তীব্র। এ প্রেক্ষাপটে জামায়াতও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে দলটির বক্তব্যে এমন একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যেখানে সরকারকে চাপে রাখা এবং দ্রুত ক্ষমতার পরিবর্তনের দাবি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দেশে নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পথে হাঁটছে দলটি।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তারা এখন এমন রাজনীতি দেখতে চায়, যেখানে ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জনকল্যাণ বেশি গুরুত্ব পাবে। গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত আছে জনগণের রায়ে। সে রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েই সব দলকে নিজেদের পথ নির্ধারণ করতে হবে। বিগত নির্বাচনে একই সঙ্গে দুটি ভোট হয়েছে। একটি গণভোট, অন্যটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। তারা যাতে জনগণের পক্ষে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেজন্যই এ ম্যান্ডেট। এখন বিএনপি জনগণের স্বার্থে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের স্বার্থে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করে, কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিয়ে বিএনপি যদি কাজ করতে পারে তাহলেই রাজনীতির সংঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা অর্জনের আকাক্সক্ষা নতুন নয়। প্রতিটি দলই জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা যখন রাজনৈতিক ধৈর্য, গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি অনীহায় রূপ নেয়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের বক্তব্য ও তৎপরতা দেখে এমন প্রশ্ন উঠছে যে দলটি কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে ক্ষমতার স্বপ্নেই বেশি বিভোর হয়ে পড়েছে?
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা আজও বিতর্কের কেন্দ্রে। ভবিষ্যতেও হয়তো থাকবে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আত্মসমালোচনার পরিবর্তে দলটি বরাবরই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাস পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। জামায়াতের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতায় যাওয়ার আকাক্সক্ষা নয়; বরং তারা কতটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে সেটাই। ক্ষমতার দিবাস্বপ্ন দেখার চেয়ে জনগণের আস্থা অর্জনের পথ অনেক কঠিন, কিন্তু গণতন্ত্রে সেটিই একমাত্র টেকসই পথ। সরকারি দল বিএনপির উচিত হবে জামায়াত যে ব্লুপ্রিন্টে এগোচ্ছে তা মোকাবিলা করা। প্রধানমন্ত্রী বারবার দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেক নেতা-কর্মীই সে আহ্বান অনুধাবন করতে পারছেন না। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে দলের তৃণমূলে অন্তঃকোন্দল দিনদিন তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইদানীং দলের মধ্যে দ্রুতবর্ধনশীল অনেক হাইব্রিড নেতার জন্ম হচ্ছে। তাঁদের কারণে আস্তে আস্তে ত্যাগী নেতাদের অন্তর্দাহ বাড়ছে। সুতরাং সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে হলে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের অটুট ও ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন




