নিরাপদ, স্থিতিশীল, সার্বভৌম দেশ গড়তে দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, প্রশিক্ষিত আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর বিকল্প নেই—বার্তাটি প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই দিয়ে আসছেন। কেবল মুখে নয়, তার সেই চেষ্টা ও অভিপ্রায়ের ঝলক দেখা গেল এবারের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনে। প্রথাগতভাবে প্রধানমন্ত্রীরা শীতকালীন মহড়ায় যান। পরিবর্তিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথা ভেঙে চলে গেলেন গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় মানিকগঞ্জের সিংগাইরে। সেখানে তার আকস্মিক ও চমকিত উপস্থিতি ছড়াল ভিন্ন এক মুগ্ধতা। তৈরি হলো ইতিহাস। দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রীর সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকায় সশরীরে উপস্থিতির রেকর্ড। কোনো প্রধানমন্ত্রীর এভাবে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সদস্যদের মাঝে উপস্থিতি এবং তাদের সঙ্গে সাধারণ খাবার ও চা গ্রহণ সেনাবাহিনীর মনোবল চাঙ্গাই করেনি, তা সচেতন-চিন্তাশীলদের দিয়েছে বিশেষ বার্তা।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর, জায়গাটি ঢাকা থেকে খানিকটা দূরেই। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের অধীন ৮ বীর-এর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকা। সেখানে আকস্মিক তার উপস্থিতি। তাও বিস্তীর্ণ অংশ হেঁটে গিয়ে। মহড়ার মাঝেই ‘ফার্ম বেস’-এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা। দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ইউনিটের কমান্ডিং অফিসারের (সিও) কাছে গিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও কৌশলগত প্রস্তুতি দেখা। দেখলেন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা সদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, রণকৌশল, সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণের বিভিন্ন দিক। নেমে পড়লেন সেনা বাংকারেও। গাছের পাতার আড়ালে ছদ্মবেশে অবস্থানরত সেনা সদস্যদের কাছেও চলে গেলেন। তাদের খোঁজখবর নেন, দায়িত্ব পালনে উৎসাহও দেন। তাদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি খেলেনও। দূরদর্শী ও জনবান্ধব নেতৃত্বের এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নেতা শুধু উপাধি নয়, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং সাহসিকতার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কোনো কিছুকে পরিবর্তন করতে হলে আগে নিজেকে পরিবর্তনের টাটকা উদাহরণ। দেশের ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ধরনের মহড়া শুধু সামরিক সক্ষমতা বাড়ায় না, দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাহিনীর প্রস্তুতি আরো সুদৃঢ় করে। প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে পেশাদার প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা। সেনা সদস্যদের সঙ্গে রণকৌশল বিষয়ে মতবিনিময়ের সময় তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক কিছু বক্তব্যও রাখেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার আবশ্যকতা প্রধানমন্ত্রী গত কিছুদিন ধরে প্রায়ই বলছেন। এর একটা মাজেজা বা ফের অবশ্যই রয়েছে। আর গ্রীস্মকালীন মহড়ায় এভাবে আকস্মিক চলে যাওয়াও নিশ্চয়ই এমনি এমনি নয়।
মাঠ পর্যায়ে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন এবং সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো উভয়ের পারস্পরিক আস্থা ও মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে বাধ্য। দেশের নিরাপত্তা, সেনাবাহিনীর পেশাদারি এবং বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির কিছু বিষয় সেখানে অবশ্যই রয়েছে। একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় পরিচয় দেশ ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন তাঁর নেতৃত্বে এরই মধ্যে স্পষ্ট। ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণার ছাপ বিদ্যমান। তার বাংলাদেশের আপামর জনগণ, সামরিক বাহিনী এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় খেয়াল করছেন অনেকেই। তার রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডে তা সাধারণ মানুষও উপলব্ধি করছে। সামরিক পরিবারে জন্ম, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং সাবেক সেনাপ্রধানের সন্তান হওয়ায় তারেক রহমানের মধ্যে সামরিক বাহিনীর প্রতি স্বাভাবিকভাবেই একটি আলাদা আগ্রহ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। যেকোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে পেশাদার, আস্থাপূর্ণ ও সমন্বিত সম্পর্ক থাকলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে সহজ হয়—এ বোধও রয়েছে।
তার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউনিট ও জনবল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে যেখানে সেনাসংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের কম, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৬-৭৭) তা প্রায় ৯০ হাজারে উন্নীত করা হয়। সৈনিক ও অফিসারদের পেশাদারি বাড়াতে তিনি দেশি-বিদেশি উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশিক্ষণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। আধুনিক যুদ্ধের কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি পদাতিক, গোলন্দাজ (আর্টিলারি), সিগন্যাল ও ইঞ্জিনিয়ার কোরের মতো নতুন নতুন ইউনিট, ব্যাটালিয়ন এবং ব্রিগেড তৈরি করে বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সামরিক অভ্যুত্থান রোধ করে, বাহিনীর মধ্যে কঠোর কমান্ড ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে নেন নানামুখী পদক্ষেপ।তাঁর শাসনামলে নবগঠিত রাষ্ট্র এবং ভূকৌশলগত নিরাপত্তার প্রয়োজনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ব্রিগেড, পদাতিক ডিভিশন (যেমন ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও ৬৬ পদাতিক ডিভিশন) এবং বেশ কয়েকটি ইউনিট প্রতিষ্ঠা হয় জিয়াউর রহমানের হাতেই। সেনা সদস্যদের মনোবল বাড়াতে তিনি দ্রুত পদোন্নতি এবং ব্যাপক হারে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করেন। সেনাবাহিনীর জন্য যুগোপযোগী অস্ত্র, গোলাবারুদ, আধুনিক পরিবহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। জিয়াউর রহমান সেই সময়ে আধুনিকায়নের যে ভিত্তি বা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা তখন তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। সেখানে মাত্রা যোগ হতে পারে তারেক রহমানের মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের সাহস এবং একটি দেশের গৌরবের প্রতীক উল্লেখ করেছেন গত কয়েকটি বক্তৃতায়। জানিয়েছেন, তার বিশ্বাস-সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ এবং পেশাদারি বজায় রাখলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর কখনোই হুমকির মুখে পড়বে না। নিরাপত্তা কৌশল যাতে তাকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। এর মাঝেই তার ছুটে চলা। অন্যদিকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশেল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার ধারাবাহিকতায় দেশ ও জনতার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ক্রমেই আগোয়ান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যথাসময়ে যথা কাজটিই তারা করছে। যার উদাহরণ চব্বিশের গণ-আন্দোলনের বিজয়ে সারথি হওয়া। এ সেনাবাহিনীর রয়েছে সম্মুখ সমরের অভিজ্ঞতা, সাফল্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের অদম্যতা। সমর-সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্রে তারা এখনো আধুনিকতার শীর্ষ পর্যায়কে স্পর্শ করতে পারেনি, তবে তাদের ‘ইটস দ্য ম্যান বিহাইন্ড গান হুইচ ম্যাটারস’ বড় প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্মই যুদ্ধ ও জয় দিয়ে। জয়ী হতে হতেই এতদূর এসেছে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন




