• ই-পেপার

জার্মানিতে উসমানী স্থাপত্যের শেহিতলিক জামে মসজিদ

হাদিসের বাণী

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের যেভাবে তাঁর দিকে আহ্বান করেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের যেভাবে তাঁর দিকে আহ্বান করেন
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি আবু জর জুনদুব ইবনে জুনাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) তাঁর রব থেকে বর্ণনা করেন। মহান রব বলেছেন, হে আমার বান্দারা, আমি জুলুমকে আমার নিজের জন্য হারাম করে দিয়েছি, তাই আমি জুলুমকে তোমাদের জন্যও হারাম করে দিলাম। সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম কোরো না। হে আমার বান্দারা, যাকে আমি হিদায়াত দিয়েছি, তারা ব্যতীত তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট। সুতরাং তোমরা আমার কাছে সঠিক পথ কামনা করো। আমি তোমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করব। হে আমার বান্দারা, আমি যাদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করি, তারা ব্যতীত তোমরা সকলেই ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে আহার চাও, আমি তোমাদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করে দেবো।

হে আমার বান্দারা, আমি যাকে বস্ত্র দান করেছি, সে ব্যতীত তোমরা সকলেই বস্ত্রহীন, সুতরাং তোমরা আমার কাছে বস্ত্র চাও। আমি তোমাদের বস্ত্র দান করব। হে আমার বান্দারা, তোমরা দিন-রাত গুনাহ করে থাকো, আর আমি সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে থাকি। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবো। হে আমার বান্দারা, তোমরা কখনো আমার অপকার-উপকার কোনো কিছুই করতে পারবে না। হে আমার বান্দারা, যদি তোমাদের আগে-পরের মানুষ ও জিনজাতির সকলের অন্তর নেককার ব্যক্তির অন্তরের মতো হয়ে যায়, তবুও এতে আমার রাজত্বের কোনো কিছু বৃদ্ধি করতে পারবে না। হে আমার বান্দারা, যদি তোমাদের আগে-পরের মানুষ ও জিনজাতির সকলের অন্তর বদকার ব্যক্তির অন্তরের মতো হয়ে যায়, তবুও এতে আমার রাজত্বের কোনো হ্রাস করতে পারবে না।

হে আমার বান্দারা, হে আমার বান্দারা, যদি তোমাদের আগে-পরের মানুষ ও জিনজাতির সবাই কোনো বিশাল ময়দানে একত্রিত হয়ে আমার কাছে কোনো কিছু চাও, আর আমি যদি তা দান করি, তাহলে তা আমার বিশাল ভান্ডার থেকে ততটুকুই কমতি হবে, যতটুকু হ্রাস পেয়ে থাকে কোনো সমুদ্রে সুঁই ডুবিয়ে পানি উঠালে। হে আমার বান্দারা, আমি তোমাদের আমলসমূহ গণনা করে রাখছি, আমি তোমাদের তার পূর্ণ সাওয়াব দান করব। সুতরাং যে কল্যাণ লাভ করে, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি অকল্যাণ লাভ করে, সে যেন নিজেকে তিরস্কার করে। এই হাদিসের অন্য একজন বর্ণনাকারী আবু ইদরিস (রহ.) যখন এই হাদিস বর্ণনা করতেন, তখন হাঁটু গেড়ে বসে যেতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬৫৭২, মুসনাদে আহমাদ, ২১৪২০)

ইউরোপে প্রথমবারের মতো যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হচ্ছে স্বতন্ত্র ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অনুষদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইউরোপে প্রথমবারের মতো যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হচ্ছে স্বতন্ত্র ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অনুষদ
জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়।

জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বতন্ত্র ইসলামিক ধর্মতত্ত্ব অনুষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৭ সালে তা উদ্বোধন করা হবে। ইতিমধ্যে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়নস’-এ ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইসলামিক থিওলজির পাশাপাশি ধর্মতত্ত্ব বিভাগকে একই স্থানে আনা হবে। ২০২১ সাল থেকে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার শহরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচ ভেলে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

নবগঠিত অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা ডিন মোহানাদ খোরশিদে বলেন, ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ের অংশ হতে পেরে আমি সৌভাগ্যবান। মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ১৫ বছরের কাজের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, এই অর্জন তাকে গভীর কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ইসলামের একটি উদার, আলোকিত ও মুক্তমনা ব্যাখ্যার পক্ষে কাজ করতে চাই। তার মতে, এই অনুষদের প্রভাব শুধু ইউরোপেই নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বেও পড়বে।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক থিওলজির প্রধান ছিলেন খোরশিদে। নতুন অনুষদ হওয়ায় এখন ইসলামিক থিওলজি নিজস্বভাবে পিএইচডি ও উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে এবং গবেষণা তহবিল সংগ্রহও সহজ হবে। আশা করা হচ্ছে, এই নতুন মর্যাদার ফলে তৃতীয় পক্ষের গবেষণা তহবিল সংগ্রহ করাও সহজতর হবে।

২০১২ সালে মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করা কেন্দ্রটিতে বর্তমানে আটজন অধ্যাপক ও ৫০ জনের বেশি কর্মী রয়েছেন। আগামী কয়েক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন খোরশিদে।

জার্মানির বিভিন্ন সরকারি স্কুলে ইসলাম ধর্ম শিক্ষা চালু হওয়ায় যোগ্য শিক্ষকের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়ায় প্রায় ৩ হাজার ইসলাম ধর্মের শিক্ষক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৩৩০ জন।

২০২৭ সাল থেকে ইসলাম ও সমাজকর্ম নামে একটি স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান খোরশিদে। তিনি জানান এতে যুবসেবা, হাসপাতালের ধর্মীয় পরামর্শ, প্রবীণদের সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

অনুষদের নীতিমালায় ইসলাম ও গণতন্ত্রের সামঞ্জস্য, কোরআনের সমকালীন ও গবেষণাভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং আন্তধর্মীয় সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চরমপন্থা, ইহুদি-বিদ্বেষ এবং ইসলামবাদের বিরোধিতার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

খোরশিদে বলেছেন, নতুন অনুষদের খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে যে পরিমাণ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছেন। আফ্রিকা ও এশিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলের গণমাধ্যমগুলোও এই ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তিনি বিশেষভাবে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার কথা উল্লেখ করেন।

খোরশিদে বলেন, মানুষ একটি মুক্তমনা ইসলামের আকাঙ্ক্ষা করে। তিনি বিশ্বাস করেন, দীর্ঘমেয়াদে জার্মানির সীমানা ছাড়িয়ে ইসলামের ভবিষ্যৎ বিকাশ সংক্রান্ত বৃহত্তর রূপ দিতে মুনস্টার সাহায্য করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবার্ট রবার্স বলেন, একই ছাদের নিচে খ্রিস্টান ও ইসলামিক থিওলজিকে একত্রিত করার উদ্যোগের শক্তিশালী প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।

জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেত্তে শাভান এই পদক্ষেপকে একটি মাইলফলক খ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি ইউরোপজুড়ে একাডেমিক ধর্মতত্ত্বের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
 

সন্তানের জেদ কমাতে মাতা-পিতার করণীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সন্তানের জেদ কমাতে মাতা-পিতার করণীয়
সংগৃহীত ছবি

সংসারে সন্তান যেমন আনন্দের উৎস, তেমনি কখনো কখনো তার দুষ্টামি বা অতিরিক্ত জেদ বাবা-মায়ের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবার সামনে কান্নাকাটি করা, মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া, কিংবা জেদ করে না খেয়ে থাকা—এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাবা-মা-ই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাগ বা শাসন করে শিশুর জেদ কমানো যায় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং আধ্যাত্মিক আমলের সঠিক সমন্বয়।

শিশুর জেদ সামলানোর উপায়
শিশু যখন জেদ শুরু করে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন,

১. নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না দেখানো : শিশু যখন চিৎকার বা কান্না করবে, তখন আপনিও পাল্টা চিৎকার করবেন না। আপনার শান্ত থাকাটা তাকে শান্ত হতে সাহায্য করবে।

২. মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া : জেদের মূল কারণ থেকে শিশুর মনকে দ্রুত অন্য কোনো পছন্দের খেলনা বা মজার গল্পের দিকে ডাইভার্ট করুন।

৩. দাবি পূরণে তাড়াহুড়ো না করা : জেদ করলেই তার ইচ্ছা পূরণ করে ফেলবেন না। এতে শিশু ভাববে যে, কান্না বা জেদ করলেই সব পাওয়া যায়। তাকে শান্ত হতে দিন, তারপর বুঝিয়ে বলুন।

অবাধ্যতা দূরীকরণে হাদিসের নির্দেশনা
মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের পাশাপাশি একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মহান আল্লাহর কাছে দোয়া ও কোরআনিক আমল। হাদিসে এ-সংক্রান্ত একটি বিশেষ আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ আল-মুজামুল আউসাত লিত-তাবারানির ৬৪ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘যে ব্যক্তির সন্তান বা গৃহপালিত প্রাণী তাকে কষ্ট দেয় (কথা শোনে না বা অবাধ্যতা করে), সে যেন তার কানে সুরা আলে ইমরানের ৮৩ নম্বর আয়াতটি পাঠ করে।’ (আল-মুজামুল আউসাত লিত-তাবারানি, হাদিস : ৬৪) 

তাই সন্তানের অতিরিক্ত জেদ দূর করতে, তাকে শান্ত ও অনুগত করতে ইসলামবিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ৮৩ নম্বর আয়াতটির আমল করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আয়াতটি হলো-

أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ

উচ্চারণ : ‘আফাগাইরা দ্বীনিল্লাহি ইয়াবগুনা ওয়ালাহু আসলামা মান ফিস-সামাওয়াতি ওয়াল ‍আরদি তাউআন ওয়া কারহান; ওয়া ইলাইহি ইউরজাউন।’

অর্থ : ‘তারা কি আল্লাহর দেওয়া জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য জীবন ব্যবস্থা তালাশ করছে? অথচ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে—স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তাঁরই অনুগত হয়েছে। এবং সবাই তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত :  ৮৩)


যেভাবে আমলটি করবেন

প্রতিদিন যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানের কপালের উপরিভাগের চুলে (সামনের মাথার চুলে) ডান হাত রাখুন।
পরম বিশ্বাসের সঙ্গে ওপরের আয়াতটি ৭ বার পাঠ করুন।
পাঠ শেষে সন্তানের মুখমণ্ডল (চেহারা) এবং দুই কানে হালকা করে ফুঁ দিন। এই আমলটি অন্তত ২১ দিন নিয়মিত (লাগাতার) করতে হবে। মাঝখানে কোনো দিন বাদ দেওয়া যাবে না।

সন্তান আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। তার স্বভাব গঠনে বাবা-মায়ের আচরণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তাই পরিবারে সবসময় শান্ত ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখুন। সন্তানের জেদের মুহূর্তে নিজে শান্ত থেকে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অবলম্বন করুন এবং পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করুন। বাবা-মায়ের আন্তরিক দোয়া সাধারণত বিফলে যায় না।

ধন-সম্পদ কেন প্রকৃত সুখের নিশ্চয়তা নয়?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ধন-সম্পদ কেন প্রকৃত সুখের নিশ্চয়তা নয়?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অর্থের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়, জীবনযাত্রা সহজ হয় এবং সমাজে নানা কল্যাণমূলক কাজ করা সম্ভব হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন যুগে যুগে মানুষকে ভাবিয়েছে—অঢেল সম্পদ কি সত্যিই মানুষের হৃদয়ে শান্তি ও প্রকৃত সুখ এনে দিতে পারে? বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বহু ধনকুবের ব্যক্তি অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও মানসিক অশান্তি, উদ্বেগ, হতাশা ও একাকীত্বে ভুগেছেন। অন্যদিকে, সীমিত সম্পদের অধিকারী অসংখ্য মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার কারণে প্রশান্ত জীবন কাটিয়েছেন।

তাই সম্পদ সুখের উৎস নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর স্মরণ, সন্তুষ্টি এবং পরকালের সফলতার মধ্যে। তাই সম্পদকে লক্ষ্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই মুমিনের কর্তব্য। 

১. সম্পদ মানুষের অন্তরের প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না
অর্থ দিয়ে বাড়ি, গাড়ি, বিলাসিতা কেনা যায়; কিন্তু হৃদয়ের প্রশান্তি কেনা যায় না। মানুষের অন্তরের শান্তি একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)।
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, প্রকৃত মানসিক শান্তি সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর জিকির ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত।

২. সম্পদ দুনিয়াবি পরীক্ষার একটি মাধ্যম
অনেকে মনে করেন সম্পদ মানেই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। অথচ কোরআন জানিয়ে দেয়, সম্পদ ও সন্তান উভয়ই মানুষের জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তো কেবল পরীক্ষা; আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৫)
অর্থাৎ সম্পদ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তীও করতে পারে, আবার গাফেলও করে দিতে পারে।

৩. সম্পদের মোহ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
যখন সম্পদই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন মানুষ ইবাদত, নৈতিকতা ও পরকালের কথা ভুলে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে।’ (সুরা : তাকাসুর, আয়াত : ১)
এ কারণেই সম্পদ কখনো কখনো সুখের পরিবর্তে অস্থিরতা, প্রতিযোগিতা ও হিংসার জন্ম দেয়।

৪. সম্পদ মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না
মানুষ যত ধনীই হোক, মৃত্যু তার অনিবার্য পরিণতি। মৃত্যুর সময় ধন-সম্পদ কোনো উপকারে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার সম্পদ আমার কোনো কাজে এল না। আমার ক্ষমতাও বিলুপ্ত হয়ে গেল।’ (সুরা : হাক্কাহ, আয়াত : ২৮–২৯)
এ আয়াত কিয়ামতের দিন ধন-সম্পদের অসহায়ত্বের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

৫. সম্পদের লোভ মানুষের অশান্তি বাড়ায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আদম সন্তানের জন্য স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে আরেকটি উপত্যকা কামনা করবে। আর তার মুখ মাটি ছাড়া অন্য কিছু পূর্ণ করবে না। তবে যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৩৯)
এ হাদিস প্রমাণ করে, সম্পদের লোভের কোনো শেষ নেই। লোভ যত বাড়ে, সুখ তত কমে।

৬. প্রকৃত ধনী সেই, যার অন্তর তৃপ্ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধন-সম্পদের আধিক্যই প্রকৃত ধন নয়; বরং প্রকৃত ধনী হলো অন্তরের প্রাচুর্যের অধিকারী ব্যক্তি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৫১)
অন্তরের তৃপ্তিই প্রকৃত সুখের ভিত্তি। যার অন্তরে সন্তুষ্টি আছে, সে অল্প সম্পদেও সুখী।

৭. সম্পদ মানুষকে অহংকারে নিমজ্জিত করতে পারে
কোরআনে কারূনের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সম্পদের অহংকার মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। কারূন তার বিপুল ধন-সম্পদের কারণে অহংকারী হয়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে তার ধন-সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৬–৮২)
এ ঘটনা প্রমাণ করে, সম্পদ যদি বিনয় ও কৃতজ্ঞতা না বাড়ায়, তবে তা মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।

৮. আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সুখের উৎস
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)
এখানে ‘পবিত্র জীবন’ বলতে অন্তরের প্রশান্তি, সন্তুষ্টি, বরকতপূর্ণ জীবন এবং পরকালের সফলতা বোঝানো হয়েছে।

সম্পদকে প্রকৃত সুখের মাধ্যম বানানোর উপায় 

১. হালাল উপায়ে উপার্জন করা।
২. জাকাত ও সদকা আদায় করা।
৩. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের হক আদায় করা।
৪. অপচয় ও অহংকার থেকে বিরত থাকা।
৫. সম্পদের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
৬. দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতের সফলতাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।

শেষকথা, ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এর ব্যবহারই মানুষের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। প্রকৃত সুখ কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রাসাদ কিংবা বিলাসবহুল জীবনে নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর স্মরণ, তাকওয়া, সন্তুষ্টি, কৃতজ্ঞতা এবং সৎকর্মময় জীবনের মধ্যেই নিহিত। তাই একজন মুমিনের উচিত সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য না বানিয়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি আমানত হিসেবে ব্যবহার করা। কারণ দুনিয়ার সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মানুষকে চিরস্থায়ী সুখ ও সফলতার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। ইনশাআল্লাহ।