• ই-পেপার

ধন-সম্পদ কেন প্রকৃত সুখের নিশ্চয়তা নয়?

সন্তানের জেদ কমাতে মাতা-পিতার করণীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সন্তানের জেদ কমাতে মাতা-পিতার করণীয়
সংগৃহীত ছবি

সংসারে সন্তান যেমন আনন্দের উৎস, তেমনি কখনো কখনো তার দুষ্টামি বা অতিরিক্ত জেদ বাবা-মায়ের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবার সামনে কান্নাকাটি করা, মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া, কিংবা জেদ করে না খেয়ে থাকা—এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাবা-মা-ই ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাগ বা শাসন করে শিশুর জেদ কমানো যায় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং আধ্যাত্মিক আমলের সঠিক সমন্বয়।

শিশুর জেদ সামলানোর উপায়
শিশু যখন জেদ শুরু করে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকেন,

১. নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না দেখানো : শিশু যখন চিৎকার বা কান্না করবে, তখন আপনিও পাল্টা চিৎকার করবেন না। আপনার শান্ত থাকাটা তাকে শান্ত হতে সাহায্য করবে।

২. মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া : জেদের মূল কারণ থেকে শিশুর মনকে দ্রুত অন্য কোনো পছন্দের খেলনা বা মজার গল্পের দিকে ডাইভার্ট করুন।

৩. দাবি পূরণে তাড়াহুড়ো না করা : জেদ করলেই তার ইচ্ছা পূরণ করে ফেলবেন না। এতে শিশু ভাববে যে, কান্না বা জেদ করলেই সব পাওয়া যায়। তাকে শান্ত হতে দিন, তারপর বুঝিয়ে বলুন।

অবাধ্যতা দূরীকরণে হাদিসের নির্দেশনা
মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের পাশাপাশি একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মহান আল্লাহর কাছে দোয়া ও কোরআনিক আমল। হাদিসে এ-সংক্রান্ত একটি বিশেষ আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ আল-মুজামুল আউসাত লিত-তাবারানির ৬৪ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘যে ব্যক্তির সন্তান বা গৃহপালিত প্রাণী তাকে কষ্ট দেয় (কথা শোনে না বা অবাধ্যতা করে), সে যেন তার কানে সুরা আলে ইমরানের ৮৩ নম্বর আয়াতটি পাঠ করে।’ (আল-মুজামুল আউসাত লিত-তাবারানি, হাদিস : ৬৪) 

তাই সন্তানের অতিরিক্ত জেদ দূর করতে, তাকে শান্ত ও অনুগত করতে ইসলামবিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ৮৩ নম্বর আয়াতটির আমল করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আয়াতটি হলো-

أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ

উচ্চারণ : ‘আফাগাইরা দ্বীনিল্লাহি ইয়াবগুনা ওয়ালাহু আসলামা মান ফিস-সামাওয়াতি ওয়াল ‍আরদি তাউআন ওয়া কারহান; ওয়া ইলাইহি ইউরজাউন।’

অর্থ : ‘তারা কি আল্লাহর দেওয়া জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তে অন্য জীবন ব্যবস্থা তালাশ করছে? অথচ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে—স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তাঁরই অনুগত হয়েছে। এবং সবাই তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত :  ৮৩)


যেভাবে আমলটি করবেন

প্রতিদিন যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানের কপালের উপরিভাগের চুলে (সামনের মাথার চুলে) ডান হাত রাখুন।
পরম বিশ্বাসের সঙ্গে ওপরের আয়াতটি ৭ বার পাঠ করুন।
পাঠ শেষে সন্তানের মুখমণ্ডল (চেহারা) এবং দুই কানে হালকা করে ফুঁ দিন। এই আমলটি অন্তত ২১ দিন নিয়মিত (লাগাতার) করতে হবে। মাঝখানে কোনো দিন বাদ দেওয়া যাবে না।

সন্তান আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। তার স্বভাব গঠনে বাবা-মায়ের আচরণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তাই পরিবারে সবসময় শান্ত ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখুন। সন্তানের জেদের মুহূর্তে নিজে শান্ত থেকে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অবলম্বন করুন এবং পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করুন। বাবা-মায়ের আন্তরিক দোয়া সাধারণত বিফলে যায় না।

আখেরাতে সফল হওয়ার পাঁচ উপায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আখেরাতে সফল হওয়ার পাঁচ উপায়
সংগৃহীত ছবি

জীবনকে সুন্দর, সফল ও বরকতময় করতে মানুষ নানা উপায় খুঁজে বেড়ায়। অথচ ইসলাম আমাদের এমন কিছু মৌলিক নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছে, যা মেনে চললে দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় জগতেই কল্যাণ লাভ করা সম্ভব। আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে চলতে পারলে মানুষের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক জীবন এবং পরকাল—সবই আলোকিত হয়ে ওঠে। 

১. লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের জীবনকে সুন্দর করা
মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গোপনে নিজেকে সংশোধন করা উচিত। যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে ভয় করে, পাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং গোপনে নেক আমল করে, আল্লাহ তার প্রকাশ্য জীবনকে সম্মানিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা বা দেহের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪)

২. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা
যখন একজন বান্দা তার রবের সঙ্গে সম্পর্ককে মজবুত করে—নামাজ, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও তাকওয়ার মাধ্যমে—তখন আল্লাহ মানুষের হৃদয়ে তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন এবং মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কও সহজ করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা : তালাক,  আয়াত ২–৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর বিধান সংরক্ষণ কর; আল্লাহ তোমাকে সংরক্ষণ করবেন।’ (তিরমিজি : হাদিস : ২৫১৬)

৩. আখেরাতের প্রস্তুতি নেয়া 
যে ব্যক্তি আখেরাতকে তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তার দুনিয়ার প্রয়োজনগুলোও সহজ করে দেন। কারণ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আর আখেরাতই চিরস্থায়ী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আখেরাতই উত্তম এবং অধিক স্থায়ী।’ (সুরা : আলা, আয়াত : ১৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার প্রধান চিন্তা আখেরাত, আল্লাহ তার অন্তরে প্রাচুর্য দান করেন, তার কাজগুলো গুছিয়ে দেন এবং দুনিয়া তার কাছে অনুগত হয়ে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬৫)

৪. আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনকে প্রাধান্য দেয়া
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যদি দুনিয়ার কিছু স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়, তবে সেটিই প্রকৃত লাভ। কারণ দুনিয়ার ক্ষতি পূরণ হতে পারে, কিন্তু আখেরাতের ক্ষতি কখনো পূরণ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে; আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা চিরস্থায়ী।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৬)

৫. আখেরাতকে মূল লক্ষ্য বানানো 
দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের জন্য ইমান, সততা ও নেক আমল বিসর্জন দেওয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে সাময়িক সুখের চেয়ে চিরস্থায়ী মুক্তিকে বেছে নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন তো অতি সামান্য ভোগসামগ্রী।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৩৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাতস্বরূপ।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৫৬)

জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়; বরং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তরিক ইবাদত, বিশুদ্ধ চরিত্র এবং আখেরাতমুখী জীবনবোধে। যে ব্যক্তি গোপনে নিজেকে সংশোধন করে, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের চেয়ে আখেরাতের চিরস্থায়ী সফলতাকে প্রাধান্য দেয়, সে-ই প্রকৃত সফল মানুষ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই পাঁচটি উপায় আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মৃত্যুপরবর্তী পুনর্জীবন নিয়ে বিজ্ঞান যা বলে

প্রফেসর ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
মৃত্যুপরবর্তী পুনর্জীবন নিয়ে বিজ্ঞান যা বলে
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, নবুয়ত ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের মতোই মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কোরআনে পুনরুত্থানকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মানবজীবনের জবাবদিহির অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কিছু দিক কোরআন ও সুন্নাহ বর্ণিত সৃষ্টির সূক্ষ্মতা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিকে আরো গভীর করে।

পুনরুত্থান : মানুষের পুনরুত্থান (বাআস বা হাশর) হলো মৃত্যুর পর পরকালে হিসাব-নিকাশের জন্য আবার জীবিত হওয়া। এটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ এবং পরকালের প্রথম ধাপ। এরপর হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান।

আসলে পরকালের বিশ্বাসই মানবজীবনের গতি পাল্টে দেয়। যেকোনো গর্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিরত রাখে। এ বিশ্বাসের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানরা অন্য জাতির মোকাবিলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হয়। পুনরুত্থান বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় এবং বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচে-গলে যাবে? বলো (হে রাসুল), তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৭৮-৭৯)

যেভাবে পুনরুত্থান : কিয়ামতের প্রথম ফুৎকারের পর পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর দ্বিতীয় ফুৎকারের আগে আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে এক বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের ক্ষুদ্র হাড় (টেইলবোন) সেই পানি শোষণ করবে এবং বৃষ্টির পানিতে যেভাবে শাক-সবজি বা ঘাস গজিয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবে প্রত্যেক মানুষের পূর্ণাঙ্গ শরীর এই হাড়টিকে কেন্দ্র করে আবার মাটির নিচ থেকে নিখুঁতভাবে তৈরি হয়ে উঠবে। ইসরাফিল (আ.) যখন দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখন মহাবিশ্বের পূর্বের সব মৃত জীব ও মানুষ একযোগে জীবিত হয়ে উঠবে। মানুষ তাদের কবর বা যেখানেই তাদের অবশিষ্টাংশ থাকুক না কেন, সেখান থেকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দুইবার ফুৎকারের মাঝে ৪০ হবে।’ সাহাবিরা বললেন, হে আবু হুরায়রা! ৪০ দিন? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ মাস? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ বছর? তিনি বললেন, অস্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমারও জানা নেই)। অতঃপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, এতে তারা উদগত হবে যেমন সবজি উদগত হয়। অতঃপর তিনি বললেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের গোটা শরীর পচে যাবে। আর সে হাড়টি হলো মেরুদণ্ডের (সর্বনিম্ন ভাগের এবং নিতম্বের ওপরের) হাড়। কিয়ামতের দিন এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৭১৪৬)

প্রথম সৃষ্টির মতোই পুনরুত্থান : উল্লিখিত আল্লাহর বাণী—‘তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন’ আর রাসুল (সা.)-এর বানী ‘এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে’—আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসবের সত্যতা দেখা যায়। মায়ের গর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রাথমিক ধাপে (গর্ভধারণের প্রায় ১৪-১৫তম দিনে) ভ্রূণে একটি রেখা বা বিন্দুর আবির্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Primitive Streak। এর থেকেই মানবদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ুতন্ত্র, মাংসপেশি ও হাড় তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিশুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণের পর এই আদি রেখাটি সংকুচিত হয়ে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান নেয়, যাকে Coccyx বা টেইলবোন বলা হয়। হাদিসে এই বিশেষ হাড়টিকে ‘আজবুয-জানাব’ বলা হয়েছে। 

গবেষকরা এই আদিরেখা বা টেইলবোনের কোষ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করেছেন। এটি চরম অবস্থায়ও টিকে থাকে। তারা এই কোষগুলোকে তীব্র এসিডে ফুটিয়েছেন, শক্তিশালী তেজস্ক্রিয়া দিয়েছেন এবং অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়েছেন। দেখা গেছে, প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞের পরও এই কোষগুলোর মূল গঠন বা ডিএনএ পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। মাটির নিচে হাজার বছর থাকলেও ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক বিক্রিয়া এই অংশটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। আধুনিক জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering) ও স্টেম সেল থেরাপির যুগে বিজ্ঞানীরা জানেন যে কোনো প্রাণীর একটিমাত্র জীবন্ত কোষ বা ডিএনএ-এর সঠিক তথ্য-উপাত্ত (Blue-print) থাকলে তা থেকে হুবহু সেই প্রাণীকে আবার ক্লোন বা তৈরি করা সম্ভব। এই টেইলবোনটি হলো মানুষের দেহের সেই সুরক্ষিত ‘ডিএনএ চিপ’ বা ব্লু-প্রিন্ট, যা মাটির নিচে সুরক্ষিত থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদেশে বিশেষ বৃষ্টির পানি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষুদ্র হাড়ের কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ পুনর্গঠিত হবে।

কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না : ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ হলো মানুষের হাতের আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু রেখার অনন্য বিন্যাস। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কোনো দুই ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণরূপে এক নয়। এমনকি অভিন্ন যমজ সন্তানেরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভিন্ন হয়। ভ্রূণের গর্ভাবস্থার প্রায় ১০—১৬ সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর গঠন শুরু হয় এবং ১৭—২৪ সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী রূপ লাভ করে। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আঙুলের ছাপের মৌলিক নকশা অপরিবর্তিত থাকে; শুধু দেহের বৃদ্ধি অনুযায়ী এর আকার বড় হয়। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অপরাধ তদন্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন আনলক এবং ব্যাংকিং নিরাপত্তায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (Automated Fingerprint Identification System@AFIS) এবং উন্নত বায়োমেট্রিক অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম। পুনরুত্থানের সময় মহান আল্লাহ হাত-পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ যা জোড়, নখ, সূক্ষ্ম উপশিরা এবং পাতলা হাড় (চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম রেখা) ইত্যাদির মতো সূক্ষ্ম জিনিসগুলোকেও ঠিক ঠিকভাবে জুড়ে দেবেন। বড় বড় অংশকে জোড়া দেওয়া তাঁর জন্য মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না; বরং যার যার শরীর তার অংশগুলোই মিলে প্রথম সৃষ্টির মতো পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনোই তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই। আমি ওর আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম।’ (সুরা : ক্বিয়ামাহ, আয়াত : ৩-৪)

পরিশেষে বলা যায়, পুনরুত্থান এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যার ওপর ইসলামের আখিরাত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ, যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাদের কর্মের ন্যায়সংগত বিচার করবেন। আধুনিক বিজ্ঞান মানবদেহের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ, জিনগত তথ্যের সংরক্ষণ, ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনের সূক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির অসাধারণ নিদর্শন তুলে ধরেছে। এসব বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পুনরুত্থানের বিষয়টি উপলব্ধির সহায়ক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

যে ছয় শ্রেণির মানুষ শয়তানের বন্ধু

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে ছয় শ্রেণির মানুষ শয়তানের বন্ধু
সংগৃহীত ছবি

শয়তান মানবজাতির চিরশত্রু। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাকে প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৬)

শয়তানের এ শত্রুতা আজকের নয়; মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই তার বিদ্বেষের সূচনা। আল্লাহ তাআলা যখন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অহংকারে সেই আদেশ অমান্য করল। (সুরা : সাদ, আয়াত : ৭১-৭৪)

এরপর ইবলিস প্রতিজ্ঞা করল, ‘আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতীত।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৮২-৮৩)

এ থেকে স্পষ্ট হয়, শয়তান আল্লাহর বান্দাদের বিভ্রান্ত করার জন্য সর্বদা তৎপর। এর মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কারণে হয়তো শতভাগ তার চক্রান্ত সফল হবে না। কিন্তু বহু মানুষ তাদের কর্ম ও চরিত্রের কারণে শয়তান তাদের বন্ধু, সহচর কিংবা ভাইয়ে পরিণত হবে। নিম্নে এ রকম কিছু মানুষের কথা তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ ব্যক্তিরা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি রহমানের জিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি; অতঃপর সে হয় তার সহচর।’ (সুরা : জুখরুফ : আয়াত : ৩৬)

আল্লাহর স্মরণই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা। জিকির শুধু জিহ্বার তাসবিহ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে সঙ্গী করাই প্রকৃত জিকির। মানুষ যখন এই স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, আল্লাহর বিধান মানে না, তখন শয়তান তার হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তার সহচর হয়ে যায়।

২. যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে না : যারা ঈমান গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা ঈমান আনে না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, ‘যারা কুফরি করে, তাদের বন্ধু হলো তাগুত (শয়তান বা বাতিল শক্তি)। তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৫৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে না—যাদের সহচর শয়তান, সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

৩. লোক-দেখানো দাতা : যারা লোক-দেখানোর জন্য সম্পদ খরচ করে শয়তান তাদের সঙ্গী হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে... (তারা শয়তানের সঙ্গী)। আর শয়তান যার সহচর (সঙ্গী) হয়, সে কতই না নিকৃষ্ট সহচর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

৪. অপব্যয়কারীরা : ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সম্পদ আল্লাহর আমানত। তাই বাজে খরচ ও অপচয়কে কোরআন শয়তানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬-২৭)

এখানে শুধু বন্ধু নয়, অপব্যয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে, যা বিষয়টির গুরুতরতা আরো স্পষ্ট করে।

৫. মুনাফিক : মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফরি ও মুসলমানদের ক্ষতি করার চিন্তা যারা লালন করে, তারা মূলত শয়তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা যখন আড়ালে তাদের প্রধান শয়তানদের (কুচক্রী নেতাদের) সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৪)

৬. পাপে অন্ধ ব্যক্তি : যারা পাপের কারণে অন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাদের জন্য শয়তানকে স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমরা তাদের জন্য কিছু সহচর (শয়তান) নির্ধারিত করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের অতীত ও ভবিষ্যেক তাদের সামনে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল...।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।