আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, নবুয়ত ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের মতোই মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কোরআনে পুনরুত্থানকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মানবজীবনের জবাবদিহির অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কিছু দিক কোরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত সৃষ্টির সূক্ষ্মতা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিকে আরো গভীর করে।
পুনরুত্থান : মানুষের পুনরুত্থান (বাআস বা হাশর) হলো মৃত্যুর পর পরকালে হিসাব-নিকাশের জন্য আবার জীবিত হওয়া। এটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ এবং পরকালের প্রথম ধাপ। এরপর হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান।
আসলে পরকালের বিশ্বাসই মানবজীবনের গতি পাল্টে দেয়। যেকোনো গর্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিরত রাখে। এ বিশ্বাসের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানরা অন্য জাতির মোকাবেলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হয়। পুনরুত্থান বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় এবং বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচেগলে যাবে? বলো (হে রাসুল), তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৭৮-৭৯)
যেভাবে পুনরুত্থান : কিয়ামতের প্রথম ফুৎকারের পর পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর দ্বিতীয় ফুৎকারের আগে আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে এক বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের ক্ষুদ্র হাড় (টেইলবোন) সেই পানি শোষণ করবে এবং বৃষ্টির পানিতে যেভাবে শাক-সবজি বা ঘাস গজিয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবে প্রত্যেক মানুষের পূর্ণাঙ্গ শরীর এই হাড়টিকে কেন্দ্র করে আবার মাটির নিচ থেকে নিখুঁতভাবে তৈরি হয়ে উঠবে। ইসরাফিল (আ.) যখন দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখন মহাবিশ্বের পূর্বের সব মৃত জীব ও মানুষ একযোগে জীবিত হয়ে উঠবে। মানুষ তাদের কবর বা যেখানেই তাদের অবশিষ্টাংশ থাকুক না কেন, সেখান থেকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসবে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দুইবার ফুৎকারের মাঝে ৪০ হবে।’ সাহাবিরা বললেন, হে আবু হুরায়রা! ৪০ দিন? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ মাস? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ বছর? তিনি বললেন, অস্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমারও জানা নেই)। অতঃপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, এতে তারা উদগত হবে যেমন সবজি উদগত হয়। অতঃপর তিনি বললেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের গোটা শরীর পচে যাবে। আর সে হাড়টি হলো মেরুদণ্ডের (সর্বনিম্ন ভাগের এবং নিতম্বের ওপরের) হাড়। কিয়ামতের দিন এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৭১৪৬)
প্রথম সৃষ্টির মতোই পুনরুত্থান : উল্লিখিত আল্লাহর বাণী ‘তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন’ আর রাসুল (সা.)-এর বানী ‘এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে’—আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসবের সত্যতা দেখা যায়। মায়ের গর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রাথমিক ধাপে (গর্ভধারণের প্রায় ১৪-১৫তম দিনে) ভ্রূণে একটি রেখা বা বিন্দুর আবির্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Primitive Streak। এর থেকেই মানবদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ুতন্ত্র, মাংসপেশি ও হাড় তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিশুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণের পর এই আদি রেখাটি সংকুচিত হয়ে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান নেয়, যাকে Coccyx বা টেইলবোন বলা হয়। হাদিসে এই বিশেষ হাড়টিকে ‘আজবুয-জানাব’ বলা হয়েছে।
গবেষকরা এই আদি রেখা বা টেইলবোনের কোষ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করেছেন। এটি চরম অবস্থায়ও টিকে থাকে। তারা এই কোষগুলোকে তীব্র এসিডে ফুটিয়েছেন, শক্তিশালী তেজস্ক্রিয়া দিয়েছেন এবং অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়েছেন। দেখা গেছে, প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞের পরও এই কোষগুলোর মূল গঠন বা ডিএনএ পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। মাটির নিচে হাজার বছর থাকলেও ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক বিক্রিয়া এই অংশটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। আধুনিক জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering) ও স্টেম সেল থেরাপির যুগে বিজ্ঞানীরা জানেন যে কোনো প্রাণীর একটিমাত্র জীবন্ত কোষ বা ডিএনএ-এর সঠিক তথ্য-উপাত্ত (Blue-print) থাকলে তা থেকে হুবহু সেই প্রাণীকে আবার ক্লোন বা তৈরি করা সম্ভব। এই টেইলবোনটি হলো মানুষের দেহের সেই সুরক্ষিত ‘ডিএনএ চিপ’ বা ব্লু-প্রিন্ট, যা মাটির নিচে সুরক্ষিত থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদেশে বিশেষ বৃষ্টির পানি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষুদ্র হাড়ের কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ পুনর্গঠিত হবে।
কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না : ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ হলো মানুষের হাতের আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু রেখার অনন্য বিন্যাস। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কোনো দুই ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণরূপে এক নয়। এমনকি অভিন্ন যমজ সন্তানেরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভিন্ন হয়। ভ্রূণের গর্ভাবস্থার প্রায় ১০—১৬ সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর গঠন শুরু হয় এবং ১৭—২৪ সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী রূপ লাভ করে। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আঙুলের ছাপের মৌলিক নকশা অপরিবর্তিত থাকে; শুধু দেহের বৃদ্ধি অনুযায়ী এর আকার বড় হয়। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অপরাধ তদন্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন আনলক এবং ব্যাংকিং নিরাপত্তায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (Automated Fingerprint Identification System@AFIS) এবং উন্নত বায়োমেট্রিক অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম। পুনরুত্থানের সময় মহান আল্লাহ হাত-পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ যা জোড়, নখ, সূক্ষ্ম উপশিরা এবং পাতলা হাড় (চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম রেখা) ইত্যাদির মতো সূক্ষ্ম জিনিসগুলোকেও ঠিক ঠিকভাবে জুড়ে দেবেন। বড় বড় অংশকে জোড়া দেওয়া তাঁর জন্য মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না; বরং যার যার শরীর তার অংশগুলোই মিলে প্রথম সৃষ্টির মতো পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনোই তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই। আমি ওর আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম।’ (সুরা : ক্বিয়ামাহ, আয়াত : ৩-৪)
পরিশেষে বলা যায়, পুনরুত্থান এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যার ওপর ইসলামের আখিরাত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ, যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাদের কর্মের ন্যায়সংগত বিচার করবেন। আধুনিক বিজ্ঞান মানবদেহের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ, জিনগত তথ্যের সংরক্ষণ, ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনের সূক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির অসাধারণ নিদর্শন তুলে ধরেছে। এসব বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পুনরুত্থানের বিষয়টি উপলব্ধির সহায়ক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়




