জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে দেশের অর্থনীতিকে বের করে আনতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জরুরি নীতি-সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)।
সংগঠনটির মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দ্রুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আয়োজিত এক নীতি সংলাপে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও সমপ্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা সুরক্ষার বিষয়। টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করতে হবে।’
সংলাপে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং টেকসই জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে ৭ দফা নীতি-প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৈষম্যমূলক এসআরও বাতিল, ২৫ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, গৃহস্থালি ও কৃষি-সৌরবিদ্যুতে প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমিতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, ‘সবুজ জেলা’ কর্মসূচি চালু, বছরে ১০ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা।
সংলাপে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের সরকারি লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু বড় বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ পরিবার, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে সৌর সরঞ্জামের ওপর কর-ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে এনবিআরের জারি করা একটি এসআরওর মাধ্যমে সেই সুবিধা কেবল দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে গৃহস্থালি ছাদ সৌরবিদ্যুৎ, সৌরসেচ, সৌরভিত্তিক পানি সরবরাহ এবং কৃষিভিত্তিক সৌর উদ্যোগগুলো কার্যত কর-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাই বৈষম্যমূলক এসআরও বাতিল করে সবার জন্য সমান কর-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে বিডব্লিউজিইডি বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ২৫ হাজার কোটি টাকার (প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেয়। এ তহবিল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পূর্বতহবিল (প্রি-ফাইন্যান্সিং) দেওয়া হবে এবং তারা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ করবে।
বিডব্লিউজিইডির সদস্যসচিব হাসান মেহেদী বলেন, প্রতি ১ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে পারে। তাই ৩ কিলোওয়াট পর্যন্ত গৃহস্থালি ও কৃষি-সৌরবিদ্যুতে প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি সরকারের জন্য ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের কার্যকর বিনিয়োগ।
নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ প্রণোদনারও প্রস্তাব দেন তিনি।





