• ই-পেপার

আখেরাতে সফল হওয়ার পাঁচ উপায়

ধন-সম্পদ কেন প্রকৃত সুখের নিশ্চয়তা নয়?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ধন-সম্পদ কেন প্রকৃত সুখের নিশ্চয়তা নয়?
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অর্থের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়, জীবনযাত্রা সহজ হয় এবং সমাজে নানা কল্যাণমূলক কাজ করা সম্ভব হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন যুগে যুগে মানুষকে ভাবিয়েছে—অঢেল সম্পদ কি সত্যিই মানুষের হৃদয়ে শান্তি ও প্রকৃত সুখ এনে দিতে পারে? বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বহু ধনকুবের ব্যক্তি অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও মানসিক অশান্তি, উদ্বেগ, হতাশা ও একাকীত্বে ভুগেছেন। অন্যদিকে, সীমিত সম্পদের অধিকারী অসংখ্য মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার কারণে প্রশান্ত জীবন কাটিয়েছেন।

তাই সম্পদ সুখের উৎস নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর স্মরণ, সন্তুষ্টি এবং পরকালের সফলতার মধ্যে। তাই সম্পদকে লক্ষ্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই মুমিনের কর্তব্য। 

১. সম্পদ মানুষের অন্তরের প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না
অর্থ দিয়ে বাড়ি, গাড়ি, বিলাসিতা কেনা যায়; কিন্তু হৃদয়ের প্রশান্তি কেনা যায় না। মানুষের অন্তরের শান্তি একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)।
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, প্রকৃত মানসিক শান্তি সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর জিকির ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত।

২. সম্পদ দুনিয়াবি পরীক্ষার একটি মাধ্যম
অনেকে মনে করেন সম্পদ মানেই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। অথচ কোরআন জানিয়ে দেয়, সম্পদ ও সন্তান উভয়ই মানুষের জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তো কেবল পরীক্ষা; আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৫)
অর্থাৎ সম্পদ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তীও করতে পারে, আবার গাফেলও করে দিতে পারে।

৩. সম্পদের মোহ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
যখন সম্পদই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন মানুষ ইবাদত, নৈতিকতা ও পরকালের কথা ভুলে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে।’ (সুরা : তাকাসুর, আয়াত : ১)
এ কারণেই সম্পদ কখনো কখনো সুখের পরিবর্তে অস্থিরতা, প্রতিযোগিতা ও হিংসার জন্ম দেয়।

৪. সম্পদ মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না
মানুষ যত ধনীই হোক, মৃত্যু তার অনিবার্য পরিণতি। মৃত্যুর সময় ধন-সম্পদ কোনো উপকারে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার সম্পদ আমার কোনো কাজে এল না। আমার ক্ষমতাও বিলুপ্ত হয়ে গেল।’ (সুরা : হাক্কাহ, আয়াত : ২৮–২৯)
এ আয়াত কিয়ামতের দিন ধন-সম্পদের অসহায়ত্বের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

৫. সম্পদের লোভ মানুষের অশান্তি বাড়ায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আদম সন্তানের জন্য স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে আরেকটি উপত্যকা কামনা করবে। আর তার মুখ মাটি ছাড়া অন্য কিছু পূর্ণ করবে না। তবে যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৩৯)
এ হাদিস প্রমাণ করে, সম্পদের লোভের কোনো শেষ নেই। লোভ যত বাড়ে, সুখ তত কমে।

৬. প্রকৃত ধনী সেই, যার অন্তর তৃপ্ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধন-সম্পদের আধিক্যই প্রকৃত ধন নয়; বরং প্রকৃত ধনী হলো অন্তরের প্রাচুর্যের অধিকারী ব্যক্তি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৫১)
অন্তরের তৃপ্তিই প্রকৃত সুখের ভিত্তি। যার অন্তরে সন্তুষ্টি আছে, সে অল্প সম্পদেও সুখী।

৭. সম্পদ মানুষকে অহংকারে নিমজ্জিত করতে পারে
কোরআনে কারূনের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সম্পদের অহংকার মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। কারূন তার বিপুল ধন-সম্পদের কারণে অহংকারী হয়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে তার ধন-সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৬–৮২)
এ ঘটনা প্রমাণ করে, সম্পদ যদি বিনয় ও কৃতজ্ঞতা না বাড়ায়, তবে তা মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।

৮. আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সুখের উৎস
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)
এখানে ‘পবিত্র জীবন’ বলতে অন্তরের প্রশান্তি, সন্তুষ্টি, বরকতপূর্ণ জীবন এবং পরকালের সফলতা বোঝানো হয়েছে।

সম্পদকে প্রকৃত সুখের মাধ্যম বানানোর উপায় 

১. হালাল উপায়ে উপার্জন করা।
২. জাকাত ও সদকা আদায় করা।
৩. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের হক আদায় করা।
৪. অপচয় ও অহংকার থেকে বিরত থাকা।
৫. সম্পদের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
৬. দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতের সফলতাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।

শেষকথা, ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এর ব্যবহারই মানুষের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। প্রকৃত সুখ কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রাসাদ কিংবা বিলাসবহুল জীবনে নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর স্মরণ, তাকওয়া, সন্তুষ্টি, কৃতজ্ঞতা এবং সৎকর্মময় জীবনের মধ্যেই নিহিত। তাই একজন মুমিনের উচিত সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য না বানিয়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি আমানত হিসেবে ব্যবহার করা। কারণ দুনিয়ার সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মানুষকে চিরস্থায়ী সুখ ও সফলতার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। ইনশাআল্লাহ।  

মৃত্যুপরবর্তী পুনর্জীবন নিয়ে বিজ্ঞান যা বলে

প্রফেসর ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
মৃত্যুপরবর্তী পুনর্জীবন নিয়ে বিজ্ঞান যা বলে
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, নবুয়ত ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের মতোই মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার বিশ্বাস প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কোরআনে পুনরুত্থানকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মানবজীবনের জবাবদিহির অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কিছু দিক কোরআন ও সুন্নাহ বর্ণিত সৃষ্টির সূক্ষ্মতা এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিকে আরো গভীর করে।

পুনরুত্থান : মানুষের পুনরুত্থান (বাআস বা হাশর) হলো মৃত্যুর পর পরকালে হিসাব-নিকাশের জন্য আবার জীবিত হওয়া। এটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ এবং পরকালের প্রথম ধাপ। এরপর হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান।

আসলে পরকালের বিশ্বাসই মানবজীবনের গতি পাল্টে দেয়। যেকোনো গর্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিরত রাখে। এ বিশ্বাসের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানরা অন্য জাতির মোকাবিলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হয়। পুনরুত্থান বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় এবং বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচে-গলে যাবে? বলো (হে রাসুল), তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৭৮-৭৯)

যেভাবে পুনরুত্থান : কিয়ামতের প্রথম ফুৎকারের পর পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর দ্বিতীয় ফুৎকারের আগে আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে এক বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের ক্ষুদ্র হাড় (টেইলবোন) সেই পানি শোষণ করবে এবং বৃষ্টির পানিতে যেভাবে শাক-সবজি বা ঘাস গজিয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবে প্রত্যেক মানুষের পূর্ণাঙ্গ শরীর এই হাড়টিকে কেন্দ্র করে আবার মাটির নিচ থেকে নিখুঁতভাবে তৈরি হয়ে উঠবে। ইসরাফিল (আ.) যখন দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখন মহাবিশ্বের পূর্বের সব মৃত জীব ও মানুষ একযোগে জীবিত হয়ে উঠবে। মানুষ তাদের কবর বা যেখানেই তাদের অবশিষ্টাংশ থাকুক না কেন, সেখান থেকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দুইবার ফুৎকারের মাঝে ৪০ হবে।’ সাহাবিরা বললেন, হে আবু হুরায়রা! ৪০ দিন? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ মাস? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি ৪০ বছর? তিনি বললেন, অস্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমারও জানা নেই)। অতঃপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, এতে তারা উদগত হবে যেমন সবজি উদগত হয়। অতঃপর তিনি বললেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের গোটা শরীর পচে যাবে। আর সে হাড়টি হলো মেরুদণ্ডের (সর্বনিম্ন ভাগের এবং নিতম্বের ওপরের) হাড়। কিয়ামতের দিন এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৭১৪৬)

প্রথম সৃষ্টির মতোই পুনরুত্থান : উল্লিখিত আল্লাহর বাণী—‘তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন’ আর রাসুল (সা.)-এর বানী ‘এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে’—আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এসবের সত্যতা দেখা যায়। মায়ের গর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রাথমিক ধাপে (গর্ভধারণের প্রায় ১৪-১৫তম দিনে) ভ্রূণে একটি রেখা বা বিন্দুর আবির্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Primitive Streak। এর থেকেই মানবদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ুতন্ত্র, মাংসপেশি ও হাড় তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিশুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণের পর এই আদি রেখাটি সংকুচিত হয়ে মেরুদণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান নেয়, যাকে Coccyx বা টেইলবোন বলা হয়। হাদিসে এই বিশেষ হাড়টিকে ‘আজবুয-জানাব’ বলা হয়েছে। 

গবেষকরা এই আদিরেখা বা টেইলবোনের কোষ নিয়ে অনেক পরীক্ষা করেছেন। এটি চরম অবস্থায়ও টিকে থাকে। তারা এই কোষগুলোকে তীব্র এসিডে ফুটিয়েছেন, শক্তিশালী তেজস্ক্রিয়া দিয়েছেন এবং অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়েছেন। দেখা গেছে, প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞের পরও এই কোষগুলোর মূল গঠন বা ডিএনএ পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। মাটির নিচে হাজার বছর থাকলেও ব্যাকটেরিয়া বা রাসায়নিক বিক্রিয়া এই অংশটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। আধুনিক জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering) ও স্টেম সেল থেরাপির যুগে বিজ্ঞানীরা জানেন যে কোনো প্রাণীর একটিমাত্র জীবন্ত কোষ বা ডিএনএ-এর সঠিক তথ্য-উপাত্ত (Blue-print) থাকলে তা থেকে হুবহু সেই প্রাণীকে আবার ক্লোন বা তৈরি করা সম্ভব। এই টেইলবোনটি হলো মানুষের দেহের সেই সুরক্ষিত ‘ডিএনএ চিপ’ বা ব্লু-প্রিন্ট, যা মাটির নিচে সুরক্ষিত থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদেশে বিশেষ বৃষ্টির পানি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষুদ্র হাড়ের কোষগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ পুনর্গঠিত হবে।

কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না : ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ হলো মানুষের হাতের আঙুলের অগ্রভাগে অবস্থিত সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু রেখার অনন্য বিন্যাস। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কোনো দুই ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণরূপে এক নয়। এমনকি অভিন্ন যমজ সন্তানেরও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভিন্ন হয়। ভ্রূণের গর্ভাবস্থার প্রায় ১০—১৬ সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর গঠন শুরু হয় এবং ১৭—২৪ সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী রূপ লাভ করে। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আঙুলের ছাপের মৌলিক নকশা অপরিবর্তিত থাকে; শুধু দেহের বৃদ্ধি অনুযায়ী এর আকার বড় হয়। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। অপরাধ তদন্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন আনলক এবং ব্যাংকিং নিরাপত্তায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (Automated Fingerprint Identification System@AFIS) এবং উন্নত বায়োমেট্রিক অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ আঙুলের ছাপের সঙ্গে তুলনা করে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম। পুনরুত্থানের সময় মহান আল্লাহ হাত-পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ যা জোড়, নখ, সূক্ষ্ম উপশিরা এবং পাতলা হাড় (চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম রেখা) ইত্যাদির মতো সূক্ষ্ম জিনিসগুলোকেও ঠিক ঠিকভাবে জুড়ে দেবেন। বড় বড় অংশকে জোড়া দেওয়া তাঁর জন্য মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। কারো শরীরের অংশ কারো সঙ্গে মিলবে না; বরং যার যার শরীর তার অংশগুলোই মিলে প্রথম সৃষ্টির মতো পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনোই তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই। আমি ওর আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম।’ (সুরা : ক্বিয়ামাহ, আয়াত : ৩-৪)

পরিশেষে বলা যায়, পুনরুত্থান এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যার ওপর ইসলামের আখিরাত বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ, যিনি প্রথমবার মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তাদের কর্মের ন্যায়সংগত বিচার করবেন। আধুনিক বিজ্ঞান মানবদেহের সৃষ্টি, ভ্রূণের বিকাশ, জিনগত তথ্যের সংরক্ষণ, ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনের সূক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির অসাধারণ নিদর্শন তুলে ধরেছে। এসব বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ পুনরুত্থানের বিষয়টি উপলব্ধির সহায়ক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

যে ছয় শ্রেণির মানুষ শয়তানের বন্ধু

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে ছয় শ্রেণির মানুষ শয়তানের বন্ধু
সংগৃহীত ছবি

শয়তান মানবজাতির চিরশত্রু। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং তাকে প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৬)

শয়তানের এ শত্রুতা আজকের নয়; মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই তার বিদ্বেষের সূচনা। আল্লাহ তাআলা যখন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অহংকারে সেই আদেশ অমান্য করল। (সুরা : সাদ, আয়াত : ৭১-৭৪)

এরপর ইবলিস প্রতিজ্ঞা করল, ‘আপনার ইজ্জতের শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতীত।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৮২-৮৩)

এ থেকে স্পষ্ট হয়, শয়তান আল্লাহর বান্দাদের বিভ্রান্ত করার জন্য সর্বদা তৎপর। এর মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কারণে হয়তো শতভাগ তার চক্রান্ত সফল হবে না। কিন্তু বহু মানুষ তাদের কর্ম ও চরিত্রের কারণে শয়তান তাদের বন্ধু, সহচর কিংবা ভাইয়ে পরিণত হবে। নিম্নে এ রকম কিছু মানুষের কথা তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ ব্যক্তিরা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি রহমানের জিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি; অতঃপর সে হয় তার সহচর।’ (সুরা : জুখরুফ : আয়াত : ৩৬)

আল্লাহর স্মরণই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা। জিকির শুধু জিহ্বার তাসবিহ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিধানকে সঙ্গী করাই প্রকৃত জিকির। মানুষ যখন এই স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়, আল্লাহর বিধান মানে না, তখন শয়তান তার হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে এবং তার সহচর হয়ে যায়।

২. যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে না : যারা ঈমান গ্রহণ করে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি শয়তানদের তাদের বন্ধু বানিয়েছি, যারা ঈমান আনে না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, ‘যারা কুফরি করে, তাদের বন্ধু হলো তাগুত (শয়তান বা বাতিল শক্তি)। তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৫৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে না—যাদের সহচর শয়তান, সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

৩. লোক-দেখানো দাতা : যারা লোক-দেখানোর জন্য সম্পদ খরচ করে শয়তান তাদের সঙ্গী হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে... (তারা শয়তানের সঙ্গী)। আর শয়তান যার সহচর (সঙ্গী) হয়, সে কতই না নিকৃষ্ট সহচর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৮)

৪. অপব্যয়কারীরা : ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সম্পদ আল্লাহর আমানত। তাই বাজে খরচ ও অপচয়কে কোরআন শয়তানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৬-২৭)

এখানে শুধু বন্ধু নয়, অপব্যয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে, যা বিষয়টির গুরুতরতা আরো স্পষ্ট করে।

৫. মুনাফিক : মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফরি ও মুসলমানদের ক্ষতি করার চিন্তা যারা লালন করে, তারা মূলত শয়তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা যখন আড়ালে তাদের প্রধান শয়তানদের (কুচক্রী নেতাদের) সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৪)

৬. পাপে অন্ধ ব্যক্তি : যারা পাপের কারণে অন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাদের জন্য শয়তানকে স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমরা তাদের জন্য কিছু সহচর (শয়তান) নির্ধারিত করে দিয়েছিলাম, যারা তাদের অতীত ও ভবিষ্যেক তাদের সামনে সুশোভিত করে দেখিয়েছিল...।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৯ ‍জুলাই, ২০২৬

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ৯ ‍জুলাই, ২০২৬
সংগৃহীত ছবি

আজ বৃহস্পতিবার বার, ৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩, ২৩ মহররম, ১৪৪৮।
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—
জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৭ মিনিটে।
আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।
মাগরিব ৬টা ৫৩ মিনিটে।
এশার সময় শুরু ৮টা ১৯ মিনিটে।
আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৫৪ মিনিটে 
আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৫০ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৮ মিনিটে।
সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।