মানুষের জীবনে সম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অর্থের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়, জীবনযাত্রা সহজ হয় এবং সমাজে নানা কল্যাণমূলক কাজ করা সম্ভব হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন যুগে যুগে মানুষকে ভাবিয়েছে—অঢেল সম্পদ কি সত্যিই মানুষের হৃদয়ে শান্তি ও প্রকৃত সুখ এনে দিতে পারে? বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বহু ধনকুবের ব্যক্তি অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও মানসিক অশান্তি, উদ্বেগ, হতাশা ও একাকীত্বে ভুগেছেন। অন্যদিকে, সীমিত সম্পদের অধিকারী অসংখ্য মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার কারণে প্রশান্ত জীবন কাটিয়েছেন।
তাই সম্পদ সুখের উৎস নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে ঈমান, তাকওয়া, আল্লাহর স্মরণ, সন্তুষ্টি এবং পরকালের সফলতার মধ্যে। তাই সম্পদকে লক্ষ্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই মুমিনের কর্তব্য।
১. সম্পদ মানুষের অন্তরের প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না
অর্থ দিয়ে বাড়ি, গাড়ি, বিলাসিতা কেনা যায়; কিন্তু হৃদয়ের প্রশান্তি কেনা যায় না। মানুষের অন্তরের শান্তি একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)।
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, প্রকৃত মানসিক শান্তি সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর জিকির ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত।
২. সম্পদ দুনিয়াবি পরীক্ষার একটি মাধ্যম
অনেকে মনে করেন সম্পদ মানেই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। অথচ কোরআন জানিয়ে দেয়, সম্পদ ও সন্তান উভয়ই মানুষের জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তো কেবল পরীক্ষা; আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৫)
অর্থাৎ সম্পদ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তীও করতে পারে, আবার গাফেলও করে দিতে পারে।
৩. সম্পদের মোহ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
যখন সম্পদই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন মানুষ ইবাদত, নৈতিকতা ও পরকালের কথা ভুলে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে।’ (সুরা : তাকাসুর, আয়াত : ১)
এ কারণেই সম্পদ কখনো কখনো সুখের পরিবর্তে অস্থিরতা, প্রতিযোগিতা ও হিংসার জন্ম দেয়।
৪. সম্পদ মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না
মানুষ যত ধনীই হোক, মৃত্যু তার অনিবার্য পরিণতি। মৃত্যুর সময় ধন-সম্পদ কোনো উপকারে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার সম্পদ আমার কোনো কাজে এল না। আমার ক্ষমতাও বিলুপ্ত হয়ে গেল।’ (সুরা : হাক্কাহ, আয়াত : ২৮–২৯)
এ আয়াত কিয়ামতের দিন ধন-সম্পদের অসহায়ত্বের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
৫. সম্পদের লোভ মানুষের অশান্তি বাড়ায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আদম সন্তানের জন্য স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে আরেকটি উপত্যকা কামনা করবে। আর তার মুখ মাটি ছাড়া অন্য কিছু পূর্ণ করবে না। তবে যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৩৯)
এ হাদিস প্রমাণ করে, সম্পদের লোভের কোনো শেষ নেই। লোভ যত বাড়ে, সুখ তত কমে।
৬. প্রকৃত ধনী সেই, যার অন্তর তৃপ্ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধন-সম্পদের আধিক্যই প্রকৃত ধন নয়; বরং প্রকৃত ধনী হলো অন্তরের প্রাচুর্যের অধিকারী ব্যক্তি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৫১)
অন্তরের তৃপ্তিই প্রকৃত সুখের ভিত্তি। যার অন্তরে সন্তুষ্টি আছে, সে অল্প সম্পদেও সুখী।
৭. সম্পদ মানুষকে অহংকারে নিমজ্জিত করতে পারে
কোরআনে কারূনের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সম্পদের অহংকার মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। কারূন তার বিপুল ধন-সম্পদের কারণে অহংকারী হয়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে তার ধন-সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৬–৮২)
এ ঘটনা প্রমাণ করে, সম্পদ যদি বিনয় ও কৃতজ্ঞতা না বাড়ায়, তবে তা মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
৮. আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সুখের উৎস
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)
এখানে ‘পবিত্র জীবন’ বলতে অন্তরের প্রশান্তি, সন্তুষ্টি, বরকতপূর্ণ জীবন এবং পরকালের সফলতা বোঝানো হয়েছে।
সম্পদকে প্রকৃত সুখের মাধ্যম বানানোর উপায়
১. হালাল উপায়ে উপার্জন করা।
২. জাকাত ও সদকা আদায় করা।
৩. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের হক আদায় করা।
৪. অপচয় ও অহংকার থেকে বিরত থাকা।
৫. সম্পদের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
৬. দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতের সফলতাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।
শেষকথা, ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এর ব্যবহারই মানুষের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। প্রকৃত সুখ কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রাসাদ কিংবা বিলাসবহুল জীবনে নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর স্মরণ, তাকওয়া, সন্তুষ্টি, কৃতজ্ঞতা এবং সৎকর্মময় জীবনের মধ্যেই নিহিত। তাই একজন মুমিনের উচিত সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য না বানিয়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি আমানত হিসেবে ব্যবহার করা। কারণ দুনিয়ার সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মানুষকে চিরস্থায়ী সুখ ও সফলতার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। ইনশাআল্লাহ।




