মানুষের জীবন বড় বিচিত্র। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সে নানা রকম সম্পর্ক গড়ে তোলে, অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসে, সাফল্য-ব্যর্থতা, সম্মান-অপমান, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে পথ চলতে থাকে। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেকেই একটি গভীর সত্য আবিষ্কার করেন—যাদেরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তারা সবসময় পাশে থাকেন না; আর যাদেরকে তেমন গুরুত্ব দেননি, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি সেবা ও সহযোগিতা করেন।
মানুষ স্বভাবতই শক্তির প্রতি আকৃষ্ট। ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে পরিচয়, ধনী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, খ্যাতিমান ব্যক্তির সান্নিধ্য—এসবকে অনেকেই সামাজিক মর্যাদার অংশ বলে মনে করেন। আমরা এমন মানুষের সঙ্গে ছবি তুলতে ভালোবাসি, তাদের সঙ্গে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি, তাদের কাছাকাছি থাকতে পারলে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। অন্যদিকে সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করা মানুষদের আমরা প্রায়ই অবহেলার চোখে দেখি। গৃহকর্মী, আয়া, বুয়া, দারোয়ান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, দোকান কর্মচারী, কেয়ারগিভার কিংবা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা সমমর্যাদার সম্পর্ক হয়ে ওঠে। অথচ জীবন একসময় মানুষকে অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
প্রবীণ বয়সে এসে মানুষের প্রয়োজন বদলে যায়। তখন আর বড় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একজন মানুষের। প্রয়োজন হয় এমন কাউকে, যে একটু সময় দেবে, প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেবে, কথা শুনবে, ওষুধ এনে দেবে কিংবা অসুস্থ শরীরের পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকবে। সেই মানুষটি অনেক সময় কোনো বড় কর্মকর্তা নন, কোনো ধনী আত্মীয় নন, কোনো খ্যাতিমান ব্যক্তি নন। তিনি হতে পারেন একজন গৃহকর্মী, একজন সেবাকর্মী, একজন কেয়ারটেকার কিংবা একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।
মানুষ জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করে সম্পদ অর্জনের জন্য। দামি গয়না কেনে, মূল্যবান পোশাক সংগ্রহ করে, ব্র্যান্ডের জুতা, ঘড়ি, চশমা, সুগন্ধি কিংবা নানা বিলাসদ্রব্য কিনে রাখে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসবের ব্যবহার কমতে থাকে। নিরাপত্তার কারণে গয়না পরা হয় না, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পোশাকের জাঁকজমক হারিয়ে যায়। একসময় যে খাবারের জন্য আকুলতা ছিল, চিকিৎসকের পরামর্শে তা বর্জন করতে হয়। মুখরোচক খাবারের পরিবর্তে থালায় স্থান করে নেয় করলা, শাকসবজি, লাউ, কুমড়া কিংবা কম ক্যালরির খাদ্য।
জীবন যেন ধীরে ধীরে মানুষকে শেখাতে থাকে—আসল প্রয়োজন অন্য কোথাও।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন প্রবীণ মানুষের কথা ভাবুন। নামকরা চিকিৎসক এসে রোগী দেখে চলে যান। তার জ্ঞান ও দক্ষতা অবশ্যই অমূল্য। কিন্তু সারাদিন রোগীর পাশে থাকেন কে? ওষুধ খাওয়ান কে? খাবার এনে দেন কে? বিছানা পরিষ্কার করেন কে? হুইলচেয়ারে বসিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নিয়ে যান কে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কাজ করেন একজন আয়া, ওয়ার্ড বয়, নার্স, সেবাকর্মী কিংবা কেয়ারগিভার। তারা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হন না, কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের জীবনে তাদের অবদান অপরিসীম।
বাসা-বাড়ির জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রবীণ মানুষের একাকী জীবনকে সহজ করে দেন গৃহকর্মী, কেয়ারটেকার, দারোয়ান কিংবা নানান পেশার সাধারণ মানুষ। ইলেকট্রিক মিস্ত্রি এসে বিদ্যুতের সমস্যা ঠিক করে দেন, প্লাম্বার পানির লাইন সচল করেন, দোকান কর্মচারী প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী পরিবেশ বাসযোগ্য রাখেন। তাদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই প্রবীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এগিয়ে চলে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যটি দেখা যায় জীবনের শেষ প্রহরে। মৃত্যুর পর মানুষের পরিচয়, পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানের আর কোনো মূল্য থাকে না। তখন প্রয়োজন হয় কিছু মানবিক হাতের। লাশ বহনের জন্য মানুষ লাগে, অ্যাম্বুলেন্স চালানোর জন্য মানুষ লাগে, গোসল করানোর জন্য মানুষ লাগে, কবর খোঁড়ার জন্য মানুষ লাগে। শেষ বিদায়ের প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষের শ্রম, ঘাম ও দায়িত্ববোধ জড়িয়ে থাকে। এমনকি মৃত্যুর পরও কবরের যত্ন কিংবা স্মৃতির রক্ষণাবেক্ষণের কাজও প্রায়শই তারাই করেন।
জীবনের এই বাস্তবতা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। মানুষকে তার পেশা, পোশাক, শিক্ষা কিংবা আর্থিক অবস্থান দিয়ে বিচার না করে তার মানবিক মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায়। সমাজে যাদের আমরা সাধারণ মানুষ বলি, তাদের অবদান আসলে অসাধারণ। তারা সভা-সেমিনারের আলোচনার বিষয় হন না, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন না, কিন্তু নীরবে মানুষের জীবনকে বয়ে নিয়ে যান।
প্রবীণ বয়সে এসে অনেকেই উপলব্ধি করেন, ক্ষমতা দূর থেকে মুগ্ধ করতে পারে, সম্পদ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, খ্যাতি কিছু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ায় মানুষই। আর সেই মানুষটি অনেক সময় সমাজের সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে কম আলোচিত একজন মানুষ।
এ কারণেই বলা যায়, জীবনের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষ ভরসা করে সবলের ওপর, কিন্তু সেবা পায় দুর্বলের কাছ থেকে।




