• ই-পেপার

পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে আসবাব : পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

প্রবীণ ভরসা করে সবলের, সেবা পায় দুর্বলের

হাসান আলী
প্রবীণ ভরসা করে সবলের, সেবা পায় দুর্বলের
হাসান আলী

মানুষের জীবন বড় বিচিত্র। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সে নানা রকম সম্পর্ক গড়ে তোলে, অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসে, সাফল্য-ব্যর্থতা, সম্মান-অপমান, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে পথ চলতে থাকে। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেকেই একটি গভীর সত্য আবিষ্কার করেন—যাদেরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তারা সবসময় পাশে থাকেন না; আর যাদেরকে তেমন গুরুত্ব দেননি, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি সেবা ও সহযোগিতা করেন।

মানুষ স্বভাবতই শক্তির প্রতি আকৃষ্ট। ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে পরিচয়, ধনী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, খ্যাতিমান ব্যক্তির সান্নিধ্য—এসবকে অনেকেই সামাজিক মর্যাদার অংশ বলে মনে করেন। আমরা এমন মানুষের সঙ্গে ছবি তুলতে ভালোবাসি, তাদের সঙ্গে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি, তাদের কাছাকাছি থাকতে পারলে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। অন্যদিকে সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করা মানুষদের আমরা প্রায়ই অবহেলার চোখে দেখি। গৃহকর্মী, আয়া, বুয়া, দারোয়ান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, দোকান কর্মচারী, কেয়ারগিভার কিংবা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা সমমর্যাদার সম্পর্ক হয়ে ওঠে। অথচ জীবন একসময় মানুষকে অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

প্রবীণ বয়সে এসে মানুষের প্রয়োজন বদলে যায়। তখন আর বড় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একজন মানুষের। প্রয়োজন হয় এমন কাউকে, যে একটু সময় দেবে, প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেবে, কথা শুনবে, ওষুধ এনে দেবে কিংবা অসুস্থ শরীরের পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকবে। সেই মানুষটি অনেক সময় কোনো বড় কর্মকর্তা নন, কোনো ধনী আত্মীয় নন, কোনো খ্যাতিমান ব্যক্তি নন। তিনি হতে পারেন একজন গৃহকর্মী, একজন সেবাকর্মী, একজন কেয়ারটেকার কিংবা একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।

মানুষ জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করে সম্পদ অর্জনের জন্য। দামি গয়না কেনে, মূল্যবান পোশাক সংগ্রহ করে, ব্র্যান্ডের জুতা, ঘড়ি, চশমা, সুগন্ধি কিংবা নানা বিলাসদ্রব্য কিনে রাখে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসবের ব্যবহার কমতে থাকে। নিরাপত্তার কারণে গয়না পরা হয় না, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পোশাকের জাঁকজমক হারিয়ে যায়। একসময় যে খাবারের জন্য আকুলতা ছিল, চিকিৎসকের পরামর্শে তা বর্জন করতে হয়। মুখরোচক খাবারের পরিবর্তে থালায় স্থান করে নেয় করলা, শাকসবজি, লাউ, কুমড়া কিংবা কম ক্যালরির খাদ্য।
জীবন যেন ধীরে ধীরে মানুষকে শেখাতে থাকে—আসল প্রয়োজন অন্য কোথাও।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন প্রবীণ মানুষের কথা ভাবুন। নামকরা চিকিৎসক এসে রোগী দেখে চলে যান। তার জ্ঞান ও দক্ষতা অবশ্যই অমূল্য। কিন্তু সারাদিন রোগীর পাশে থাকেন কে? ওষুধ খাওয়ান কে? খাবার এনে দেন কে? বিছানা পরিষ্কার করেন কে? হুইলচেয়ারে বসিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নিয়ে যান কে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কাজ করেন একজন আয়া, ওয়ার্ড বয়, নার্স, সেবাকর্মী কিংবা কেয়ারগিভার। তারা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হন না, কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের জীবনে তাদের অবদান অপরিসীম।

বাসা-বাড়ির জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রবীণ মানুষের একাকী জীবনকে সহজ করে দেন গৃহকর্মী, কেয়ারটেকার, দারোয়ান কিংবা নানান পেশার সাধারণ মানুষ। ইলেকট্রিক মিস্ত্রি এসে বিদ্যুতের সমস্যা ঠিক করে দেন, প্লাম্বার পানির লাইন সচল করেন, দোকান কর্মচারী প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী পরিবেশ বাসযোগ্য রাখেন। তাদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই প্রবীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এগিয়ে চলে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যটি দেখা যায় জীবনের শেষ প্রহরে। মৃত্যুর পর মানুষের পরিচয়, পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানের আর কোনো মূল্য থাকে না। তখন প্রয়োজন হয় কিছু মানবিক হাতের। লাশ বহনের জন্য মানুষ লাগে, অ্যাম্বুলেন্স চালানোর জন্য মানুষ লাগে, গোসল করানোর জন্য মানুষ লাগে, কবর খোঁড়ার জন্য মানুষ লাগে। শেষ বিদায়ের প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষের শ্রম, ঘাম ও দায়িত্ববোধ জড়িয়ে থাকে। এমনকি মৃত্যুর পরও কবরের যত্ন কিংবা স্মৃতির রক্ষণাবেক্ষণের কাজও প্রায়শই তারাই করেন।

জীবনের এই বাস্তবতা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। মানুষকে তার পেশা, পোশাক, শিক্ষা কিংবা আর্থিক অবস্থান দিয়ে বিচার না করে তার মানবিক মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায়। সমাজে যাদের আমরা সাধারণ মানুষ বলি, তাদের অবদান আসলে অসাধারণ। তারা সভা-সেমিনারের আলোচনার বিষয় হন না, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন না, কিন্তু নীরবে মানুষের জীবনকে বয়ে নিয়ে যান।

প্রবীণ বয়সে এসে অনেকেই উপলব্ধি করেন, ক্ষমতা দূর থেকে মুগ্ধ করতে পারে, সম্পদ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, খ্যাতি কিছু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে; কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ায় মানুষই। আর সেই মানুষটি অনেক সময় সমাজের সবচেয়ে সাধারণ, সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে কম আলোচিত একজন মানুষ।

এ কারণেই বলা যায়, জীবনের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষ ভরসা করে সবলের ওপর, কিন্তু সেবা পায় দুর্বলের কাছ থেকে।

ক্ষমতার দিবাস্বপ্নে বিভোর জামায়াত

মন্‌জুরুল ইসলাম
ক্ষমতার দিবাস্বপ্নে বিভোর জামায়াত

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী সব সময়ই উল্টো স্রোতে চলা সংগঠন। নীতি-আদর্শ, ইনসাফ, আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসনের কথা মুখে বললেও রাষ্ট্রক্ষমতাই মূলত দলটির লক্ষ্য। সে কারণেই বারবার দলটির বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ উঠেছে। দলটির নেতা-কর্মীদের বাহ্যিক আচার-আচরণে আদব-কায়দার প্রকাশ থাকলেও অনুকূল পরিবেশ পেলেই তাঁরা চোখ উল্টে ফেলেন। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর ও অসহিষ্ণু আচরণও করেন। পেশাগত জীবনে অনেকবারই ব্যক্তিগতভাবে এর শিকার হয়েছি। ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত আমার একটি লেখা ‘ড. ইউনূসের নতুন স্বপ্ন, নতুন দল, জামায়াতের রাজনীতি’। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের একজন নেতা। তিনি ফোন করে আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। সে সময় সংগঠনটির নেতারা এমন এক মেজাজে ছিলেন যে তাঁরা মনে করতেন নির্বাচন হলেই নিশ্চিত ক্ষমতায়। হুমকির মেজাজও সে রকমই ছিল। কিন্তু ছাব্বিশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশবাসীর ভোটে সবকিছু পাল্টে গেলে বড্ড আশাহত হয় দলটি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র পাঁচ মাস পূরণ হতে যাচ্ছে। সব সেক্টরে বিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সমস্যার পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি এগিয়ে চলছেন। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসা অসন্তুষ্ট দলটির এখনকার টার্গেট হলো সংবিধান সংস্কারের নামে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল ঘরে তোলা। আর আশানুরূপ ফল পেলেই শুরু হবে সরকারবিরোধী নতুন খেলা। ক্ষমতার এমনই এক দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে কাজ করছে তারা। অন্যদিকে বিএনপির মধ্যে দিনদিন হাইব্রিড নেতার জন্ম হচ্ছে। তাঁদের কারণে দলের অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী, সমর্থক, পেশাজীবী আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ, গণতন্ত্র ও জনগণের রায়ের প্রশ্নটি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার আকাক্সক্ষা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা যদি অস্থিরতা সৃষ্টি, নির্বাচিত বা বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর প্রমাণের চেষ্টা, কিংবা ক্রমাগত সংঘাতমুখী রাজনীতির মাধ্যমে বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক নয়। জামায়াত রাজনীতির একটি বহুলবিতর্কিত দল। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির সময় দলটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির মহান মুক্তিযুদ্ধে দলটির অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। স্বাধীন বাংলাদেশে দলটি কখনো বিএনপির সঙ্গে, কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে ক্ষমতার সঙ্গেই থেকেছে। সর্বশেষ তাদের সঙ্গী হয়েছে ড. ইউনূসের আশীর্বাদপুষ্ট দল এনসিপি। একক শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্য না থাকায় দলটি এনপিসির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। কিন্তু এর পরেও কোনোভাবেই শোকর করতে পারছে না। গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে তারা নতুন করে মাঠ গরমের চেষ্টা করছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে এবং ৪ জুলাই রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। সেদিন প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদান স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে শুধু আমার দলেরই নয়, অন্য আরও রাজনৈতিক দল এবং একই সঙ্গে যেসব অরাজনৈতিক ব্যক্তি, যারা ৫ আগস্ট (ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলন) সফল করেছিলেন, তাদের সবার কাছে বলতে চাই, আসুন আমাদের প্রতি, বাংলাদেশের লাখো-কোটি মানুষের প্রতি স্বৈরাচার যেমন অবিচার করেছিল তার বিচারের নামে কারও প্রতি যেন অবিচার না হয়, সে বিষয়টিতেও সচেতন থাকতে হবে।’ নিজের ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশ করে তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘এই অনুষ্ঠান চলাকালে বারবার ভাবছিলাম এ মুহূর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার ও অন্যায় হয়েছে, আপনি কি চান আমি এসবের প্রতিশোধ নিই? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এ মুহূর্তে তোমার কাজ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি, আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন।’ মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের কাছ থেকে দেশবাসী এমন উদারতাই প্রত্যাশা করে। কারণ সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

জুলাই সনদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন স্পষ্ট বক্তব্যের তিন দিনের মাথায় জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট  মঙ্গলবার রাজধানীতে একটি মানববন্ধন করে। সেখান থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদের ন্যাম ভবনের সামনে ১১-দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির এখন প্রধান সংকট গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া। এটি বাস্তবায়ন না হলে দেশের রাজনীতি সংঘাতের দিকে যেতে পারে।’ ইতঃপূর্বে প্রধানমন্ত্রী যখন সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার, জুলাইয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা ও ফ্যাসিস্টের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর পরও রাজনীতিতে সংঘাতের ইঙ্গিত সুখকর বিষয় নয়।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় জামায়াত রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখে ক্ষমতা লাভের স্বার্থে নিজেদের অবস্থান বারবার পরিবর্তন করেছে। কিন্তু অতীতের বিতর্ক থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচিও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা তীব্র। এ প্রেক্ষাপটে জামায়াতও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে দলটির বক্তব্যে এমন একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যেখানে সরকারকে চাপে রাখা এবং দ্রুত ক্ষমতার পরিবর্তনের দাবি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দেশে নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পথে হাঁটছে দলটি।

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তারা এখন এমন রাজনীতি দেখতে চায়, যেখানে ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জনকল্যাণ বেশি গুরুত্ব পাবে। গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত আছে জনগণের রায়ে। সে রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েই সব দলকে নিজেদের পথ নির্ধারণ করতে হবে। বিগত নির্বাচনে একই সঙ্গে দুটি ভোট হয়েছে। একটি গণভোট, অন্যটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। তারা যাতে জনগণের পক্ষে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেজন্যই এ ম্যান্ডেট। এখন বিএনপি জনগণের স্বার্থে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের স্বার্থে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করে, কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিয়ে বিএনপি যদি কাজ করতে পারে তাহলেই রাজনীতির সংঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা অর্জনের আকাক্সক্ষা নতুন নয়। প্রতিটি দলই জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা যখন রাজনৈতিক ধৈর্য, গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি অনীহায় রূপ নেয়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের বক্তব্য ও তৎপরতা দেখে এমন প্রশ্ন উঠছে যে দলটি কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে ক্ষমতার স্বপ্নেই বেশি বিভোর হয়ে পড়েছে?

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা আজও বিতর্কের কেন্দ্রে। ভবিষ্যতেও হয়তো থাকবে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আত্মসমালোচনার পরিবর্তে দলটি বরাবরই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইতিহাস পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। জামায়াতের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতায় যাওয়ার আকাক্সক্ষা নয়; বরং তারা কতটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে সেটাই। ক্ষমতার দিবাস্বপ্ন দেখার চেয়ে জনগণের আস্থা অর্জনের পথ অনেক কঠিন, কিন্তু গণতন্ত্রে সেটিই একমাত্র টেকসই পথ। সরকারি দল বিএনপির উচিত হবে জামায়াত যে ব্লুপ্রিন্টে এগোচ্ছে তা মোকাবিলা করা। প্রধানমন্ত্রী বারবার দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেক নেতা-কর্মীই সে আহ্বান অনুধাবন করতে পারছেন না। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে দলের তৃণমূলে অন্তঃকোন্দল দিনদিন তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।  ইদানীং দলের মধ্যে দ্রুতবর্ধনশীল অনেক হাইব্রিড নেতার জন্ম হচ্ছে। তাঁদের কারণে আস্তে আস্তে ত্যাগী নেতাদের অন্তর্দাহ বাড়ছে। সুতরাং সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে হলে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের অটুট ও ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected] 

গ্রীষ্মকালীন সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নতুন দৃষ্টান্ত

মোস্তফা কামাল
গ্রীষ্মকালীন সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নতুন দৃষ্টান্ত
সংগৃহীত ছবি

নিরাপদ, স্থিতিশীল, সার্বভৌম দেশ গড়তে দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, প্রশিক্ষিত আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর বিকল্প নেই—বার্তাটি প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই দিয়ে আসছেন। কেবল মুখে নয়, তার সেই চেষ্টা ও অভিপ্রায়ের ঝলক দেখা গেল এবারের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনে। প্রথাগতভাবে প্রধানমন্ত্রীরা শীতকালীন মহড়ায় যান। পরিবর্তিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথা ভেঙে চলে গেলেন গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় মানিকগঞ্জের সিংগাইরে। সেখানে তার আকস্মিক ও চমকিত উপস্থিতি ছড়াল ভিন্ন এক মুগ্ধতা। তৈরি হলো ইতিহাস। দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রীর সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকায় সশরীরে উপস্থিতির রেকর্ড। কোনো প্রধানমন্ত্রীর এভাবে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সদস্যদের মাঝে উপস্থিতি এবং তাদের সঙ্গে সাধারণ খাবার ও চা গ্রহণ সেনাবাহিনীর মনোবল চাঙ্গাই করেনি, তা সচেতন-চিন্তাশীলদের দিয়েছে বিশেষ বার্তা।  

মানিকগঞ্জের সিংগাইর, জায়গাটি ঢাকা থেকে খানিকটা দূরেই। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের অধীন ৮ বীর-এর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকা। সেখানে আকস্মিক তার উপস্থিতি। তাও বিস্তীর্ণ অংশ হেঁটে গিয়ে। মহড়ার মাঝেই ‘ফার্ম বেস’-এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা। দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ইউনিটের কমান্ডিং অফিসারের (সিও) কাছে গিয়ে  প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও কৌশলগত প্রস্তুতি দেখা। দেখলেন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা সদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, রণকৌশল, সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণের বিভিন্ন দিক। নেমে পড়লেন সেনা বাংকারেও। গাছের পাতার আড়ালে ছদ্মবেশে অবস্থানরত সেনা সদস্যদের কাছেও চলে গেলেন। তাদের খোঁজখবর নেন, দায়িত্ব পালনে উৎসাহও দেন। তাদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি খেলেনও। দূরদর্শী ও জনবান্ধব নেতৃত্বের এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। 

নেতা শুধু উপাধি নয়, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং সাহসিকতার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কোনো কিছুকে পরিবর্তন করতে হলে আগে নিজেকে পরিবর্তনের টাটকা উদাহরণ। দেশের ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ধরনের মহড়া শুধু সামরিক সক্ষমতা বাড়ায় না, দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাহিনীর প্রস্তুতি আরো সুদৃঢ় করে। প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে পেশাদার প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা। সেনা সদস্যদের সঙ্গে রণকৌশল বিষয়ে মতবিনিময়ের সময় তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক কিছু বক্তব্যও রাখেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার আবশ্যকতা প্রধানমন্ত্রী গত কিছুদিন ধরে প্রায়ই বলছেন। এর একটা মাজেজা বা ফের অবশ্যই রয়েছে। আর গ্রীস্মকালীন মহড়ায় এভাবে আকস্মিক চলে যাওয়াও নিশ্চয়ই এমনি এমনি নয়।  

মাঠ পর্যায়ে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন এবং সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো উভয়ের পারস্পরিক আস্থা ও মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে বাধ্য। দেশের নিরাপত্তা, সেনাবাহিনীর পেশাদারি এবং বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির কিছু বিষয় সেখানে অবশ্যই রয়েছে। একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় পরিচয় দেশ ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন তাঁর নেতৃত্বে এরই মধ্যে স্পষ্ট। ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণার ছাপ বিদ্যমান। তার বাংলাদেশের আপামর জনগণ, সামরিক বাহিনী এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় খেয়াল করছেন অনেকেই। তার রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডে তা সাধারণ মানুষও উপলব্ধি করছে। সামরিক পরিবারে জন্ম, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং সাবেক সেনাপ্রধানের সন্তান হওয়ায় তারেক রহমানের মধ্যে সামরিক বাহিনীর প্রতি স্বাভাবিকভাবেই একটি আলাদা আগ্রহ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। যেকোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে পেশাদার, আস্থাপূর্ণ ও সমন্বিত সম্পর্ক থাকলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে সহজ হয়—এ বোধও রয়েছে। 

তার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউনিট ও জনবল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে যেখানে সেনাসংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের কম, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৬-৭৭) তা প্রায় ৯০ হাজারে উন্নীত করা হয়। সৈনিক ও অফিসারদের পেশাদারি বাড়াতে তিনি দেশি-বিদেশি উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। একাডেমি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশিক্ষণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। আধুনিক যুদ্ধের কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি পদাতিক, গোলন্দাজ (আর্টিলারি), সিগন্যাল ও ইঞ্জিনিয়ার কোরের মতো নতুন নতুন ইউনিট, ব্যাটালিয়ন এবং ব্রিগেড তৈরি করে বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সামরিক অভ্যুত্থান রোধ করে, বাহিনীর মধ্যে কঠোর কমান্ড ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে নেন নানামুখী পদক্ষেপ।তাঁর শাসনামলে নবগঠিত রাষ্ট্র এবং ভূকৌশলগত নিরাপত্তার প্রয়োজনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ব্রিগেড, পদাতিক ডিভিশন (যেমন ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও ৬৬ পদাতিক ডিভিশন) এবং বেশ কয়েকটি ইউনিট প্রতিষ্ঠা হয় জিয়াউর রহমানের হাতেই। সেনা সদস্যদের মনোবল বাড়াতে তিনি দ্রুত পদোন্নতি এবং ব্যাপক হারে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করেন। সেনাবাহিনীর জন্য যুগোপযোগী অস্ত্র, গোলাবারুদ, আধুনিক পরিবহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। জিয়াউর রহমান সেই সময়ে আধুনিকায়নের যে ভিত্তি বা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা তখন তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। সেখানে মাত্রা যোগ হতে পারে তারেক রহমানের মাধ্যমে। 

প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের সাহস এবং একটি দেশের গৌরবের প্রতীক উল্লেখ করেছেন গত কয়েকটি বক্তৃতায়। জানিয়েছেন, তার বিশ্বাস-সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ এবং পেশাদারি বজায় রাখলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর কখনোই হুমকির মুখে পড়বে না। নিরাপত্তা কৌশল যাতে তাকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। এর মাঝেই তার ছুটে চলা। অন্যদিকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশেল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার ধারাবাহিকতায় দেশ ও জনতার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ক্রমেই আগোয়ান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যথাসময়ে যথা কাজটিই তারা করছে। যার উদাহরণ চব্বিশের গণ-আন্দোলনের বিজয়ে সারথি হওয়া। এ সেনাবাহিনীর রয়েছে সম্মুখ সমরের অভিজ্ঞতা, সাফল্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের অদম্যতা। সমর-সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্রে তারা এখনো আধুনিকতার শীর্ষ পর্যায়কে স্পর্শ করতে পারেনি, তবে তাদের ‘ইটস দ্য ম্যান বিহাইন্ড গান হুইচ ম্যাটারস’ বড় প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্মই যুদ্ধ ও জয় দিয়ে। জয়ী হতে হতেই এতদূর এসেছে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

অভিমত

জামায়াতের বাছাই করা নীতি ও বিপজ্জনক রাজনীতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের বাছাই করা নীতি ও বিপজ্জনক রাজনীতি

সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার শাহরিয়ার ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তার কথিত মন্তব্য “ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলো ‘দখলকৃত দেশ’ এবং সেখানকার খ্রিস্টানদের স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেওয়া উচিত” শুধু উসকানিমূলকই নয়, এটি রাজনৈতিকভাবেও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহ ও জাতিগত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে এসব রাজ্য ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। এগুলোকে ‘দখলকৃত স্বাধীন দেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করা একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক দাবি, যা বাংলাদেশের স্বার্থ ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। একই ভাবে, নির্বিচারে নিপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ করতে হলে সাধারণ বক্তব্য দিয়ে নয়, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করার প্রয়োজন হয়।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো। এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে যা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ায় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।

জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের মন্তব্য আরো তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক শাসনকে সমর্থন করেছিল ও বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। পরবর্তীতে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়। ওই বিচার নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করা জামায়াতের ইতিহাসের একটি অস্বীকারযোগ্য অধ্যায়।

এখানে আরেকটি বৈপরীত্য রয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতার বিরোধিতা করে আসছে এবং সবসময়ই নিজের ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেই নীতির সঙ্গে প্রতিবেশী একটি দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে উৎসাহিত করার আহ্বান কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বেছে বেছে নীতি গ্রহণ করা চলে না।

সরকার গঠনের স্বপ্ন লালনকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উপলব্ধি করা উচিত যে জনগণের সামনে উচ্চারিত প্রতিটি বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিণতি রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উৎসাহিত করে এমন বক্তব্য বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনের দিকে নিয়ে যায় না; বরং তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে দেয় না । তা অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়।

বিরোধী রাজনীতি কখনোই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রপরিচালনার সন্নিকটে উসকানিমূলক হতে পারে না। বাংলাদেশের দরকার এমন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব, যারা কূটনীতি, তথ্যভিত্তিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আঞ্চলিক বাস্তবতার মোকাবেলা করবেন। আর এটি কোনো বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে হয় না, যা দেশের সীমানার বাইরে বিভেদ ও অস্থিরতাকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

জামায়াত যদি নিজেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে তাকে নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিচক্ষণতা এবং জনপরিসরে দায়িত্বশীল আচরণের প্রমাণ দিতে হবে। যে দলটি এক সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের জন্য অন্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিকে উৎসাহিত করার মতো অবস্থান গ্রহণের আগে বিশেষ সতর্কতা ও সংযম প্রদর্শন করা খুবই প্রয়োজন।