ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর থেকে এই মহানগর জাতীয় উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
অথচ আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকগুলোতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্বের নিম্ন সারির বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় কম বাসযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, দুর্বল অবকাঠামো, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, সীমিত সবুজ এলাকা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি।
তবে এই সংকট অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় ঢাকার মতোই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকবান্ধব নীতির মাধ্যমে তারা আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিউল এবং চীনের বিভিন্ন বৃহৎ মহানগর দেখিয়েছে যে সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে ঘনবসতিপূর্ণ শহরও একটি টেকসই, কার্যকর ও মানবিক নগরে পরিণত হতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো—ঢাকা কি বিশৃঙ্খল ও চাপগ্রস্ত মহানগর হিসেবেই থাকবে, নাকি আধুনিক, স্মার্ট, সবুজ ও বাসযোগ্য নগরে রূপান্তরিত হবে? এর উত্তর শুধু নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক জীবনমানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাসযোগ্য নগর বলতে শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়ককে বোঝায় না। একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য শহরের বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত, বিশুদ্ধ পরিবেশ, পরিকল্পিত আবাসন, পর্যাপ্ত সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, উন্নত নাগরিক সেবা এবং মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। তাই ঢাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা।
ঢাকার অন্যতম বড় সংকট অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সীমিত ভূমির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং আবাসন, বাণিজ্য, শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতায় নগরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, অথচ পর্যাপ্ত রাস্তা, পার্ক, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন শহরতলি নতুন অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। ফলে ঢাকা ক্রমেই একটি অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত মহানগরে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা যানজট। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকেন। এতে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাও ঢাকার যানজটকে অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
যানজটের জন্য শুধু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি দায়ী নয়; অপরিকল্পিত সড়ক নেটওয়ার্ক, দুর্বল গণপরিবহন, ফুটপাত দখল, পার্কিং সংকট এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতাও সমানভাবে দায়ী। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়ে নয়; বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমেই বড় শহরের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। মেট্রো রেল ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে বাস, রেল, নৌপথ ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
পরিবহনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতাও ঢাকার বড় সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বহু এলাকায় পানি জমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এ সমস্যাকে আরো তীব্র করেছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও সবুজ এলাকার সংকোচন নগরের পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি আধুনিক মহানগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব জীবন নিশ্চিত করারও স্থান। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে নগর উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। ফলে উচ্চমূল্যের আবাসন সংকটের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থানের সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকায় রাজধানীর ওপর চাপ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্বের সফল নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা : ঢাকার জন্য শিক্ষা
বিশ্বের অনেক বড় শহর একসময় জনসংখ্যার চাপ, যানজট, পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যায় ভুগেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নগর শাসন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে তারা আধুনিক, দক্ষ ও বাসযোগ্য মহানগরে রূপান্তরিত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা এসব অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে।
চীন, বিশেষ করে বেইজিং, সাংহাই, শেনজেন ও গুয়াংজুর মতো শহরগুলো পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক অবকাঠামো, সমন্বিত গণপরিবহন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফল নগর উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শেনজেনের রূপান্তর দেখিয়েছে, সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে একটি শহরকে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। ঢাকার ক্ষেত্রেও নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে বিদেশি অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও সুশাসন, টোকিওর সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, একটি সফল ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত গণপরিবহন, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবনমানকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শন।
ঢাকার ভবিষ্যৎও এসব নীতির আলোকে গড়ে উঠতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণ নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নিজস্ব, কার্যকর ও টেকসই নগর উন্নয়ন মডেল তৈরি করতে হবে।
করণীয় : বাসযোগ্য ঢাকার জন্য সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা
ঢাকার বর্তমান নগর সংকট কোনো একক প্রকল্পের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা, যেখানে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, আবাসন, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও নাগরিক সেবাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
প্রথমেই রাজধানীর জন্য একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমি ব্যবহার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজউক, সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী নগর শাসন ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।
যানজট নিরসনে গণপরিবহনকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। মেট্রো রেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (BRT), বাস, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পাশাপাশি একক টিকিটিং ব্যবস্থা, নিরাপদ স্টেশন, উন্নত যাত্রীসেবা এবং কার্যকর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত হয়।
রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য। পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়াকে শুধু আবাসিক এলাকা নয়, বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি দপ্তর ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ রাজধানীর বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
ভবিষ্যতের ঢাকা হবে প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট মহানগর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তবে স্মার্ট সিটির লক্ষ্য প্রযুক্তির প্রদর্শন নয়; বরং মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করা।
পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আধুনিক ড্রেনেজব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নগর বন, পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করা সম্ভব। নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, পর্যাপ্ত পার্ক, শিশুদের খেলার মাঠ এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি সফল নগর শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়; এটি এমন একটি বাসযোগ্য পরিবেশ, যেখানে সব শ্রেণির মানুষ সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।
তবে এই রূপান্তরের জন্য সুশাসন, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি অভিজ্ঞতা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, তবে তা অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নয়। চীনের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন, সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, টোকিওর দক্ষ গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং সিউলের স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর, টেকসই ও মানবিক নগর উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহারে বলা যায়, ঢাকা আজ নানা সংকটে জর্জরিত হলেও এর সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বের অনেক মহানগর একসময় একই ধরনের সমস্যায় ভুগেছে, কিন্তু দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা আধুনিক, বাসযোগ্য ও টেকসই নগরে রূপান্তরিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও আশাব্যঞ্জক। বাসযোগ্য ঢাকা মানে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা বড় অবকাঠামো নয়; বরং এমন একটি মানবিক মহানগর, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে এবং সবুজ ও উন্মুক্ত পরিবেশে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে। ভবিষ্যতের ঢাকা হতে হবে স্মার্ট, সবুজ, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক—যেখানে প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন শক্তিশালী নগর শাসন, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা, গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বিকেন্দ্রীকরণ এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। ঢাকার রূপান্তর শুধু রাজধানীর উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এখনই সময় সংকটের ঢাকা থেকে সম্ভাবনার ঢাকায় এগিয়ে যাওয়ার—যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য এবং নগরায়ণ হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও মানবিক। একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশের অপরিহার্য ভিত্তি।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট




