এক ফোঁটা মদ্যপান না করেও কেউ যদি হঠাৎ মাতালের মতো আচরণ করতে শুরু করে, বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি বাস্তব। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি বিরল রোগ রয়েছে, যার নাম ‘অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম বা গাট ফারমেন্টেশন সিনড্রোম’। এতে শরীর নিজেই রুটি, ভাত, পাস্তা বা অন্যান্য শর্করাযুক্ত খাবারকে অ্যালকোহলে (ইথানল) রূপান্তরিত করে। ফলে শুরু হয় মাতালের মতো আচরণ।
অটো-ব্রুয়ারি মূলত কী?
বিরল এই রোগে অন্ত্রে থাকা কিছু বিশেষ ধরনের ইস্ট ও অণুজীব খাবারের শর্করা ভেঙে ইথানল তৈরি করে। ফলে মদ না পান করলেও আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে তার মধ্যে মাতালের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা প্রতি লিটারে প্রায় ৪ গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা গুরুতর নেশাগ্রস্ত বা মাতাল অবস্থার সমতুল্য।
কতটা বিরল এই রোগ?
অটো-ব্রুয়ারি অত্যন্ত বিরল একটি রোগ। এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খুবই অল্পসংখ্যক রোগীর ঘটনা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নথিভুক্ত হয়েছে। এটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়েরই হতে পারে।
এই রোগের প্রথম প্রকাশিত চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদন ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে আফ্রিকার ৫ বছর বয়সী এক শিশুর মধ্যে এ রোগ শনাক্ত করা হয়। এ ছাড়া এটি এতটাই বিরল যে বিশ্বের অনেক দেশেই এখন পর্যন্ত এ রোগের কোনো নিশ্চিত ঘটনা পাওয়া যায়নি।
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মদ্যপানের মতো নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
* ভারসাম্য হারানো, অর্থাৎ মাতালের মতো আচরণ
* মাথা ঘোরা
* জড়িয়ে কথা বলা
* আচরণে পরিবর্তন
* গাড়ি চালানো বা কাজ করা কঠিন হয়ে পড়া
* দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রমে জটিলতা
* রক্তে অ্যালকোহল ধরা পড়া
এ ছাড়া চিকিৎসকদের মতে, এই রোগে আক্রান্তদের অনেকেই শুরুতে বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়েন। অনেক সময় তারা পরিবার, কর্মস্থল বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও ভুল-বোঝাবুঝির শিকার হন। কারণ তারা সত্যিই মদ পান করেননি—এ কথা অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তখন তিনি বরাবরই দাবি করে আসছিলেন, তিনি কোনো ধরনের মদ পান করেননি। পরিবার, বন্ধু এমনকি চিকিৎসকেরাও প্রথমে তার কথা বিশ্বাস করেননি।
কিন্তু কয়েক বছর পর জানা যায়, ঘটনাটির পেছনে ছিল এক বিরল চিকিৎসাজনিত সমস্যা। ২০১৫ সালে চিকিৎসকরা তার শরীরে অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম বা গাট ফারমেন্টেশন সিনড্রোম শনাক্ত করেন। এই বিরল রোগে শরীরের অন্ত্রে কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার গাঁজনের মাধ্যমে অ্যালকোহলে রূপান্তরিত হয়।
কিভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
অটো-ব্রুয়ারি নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষা করে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে—
* রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা
* এন্ডোস্কপি
* নির্দিষ্ট পরিমাণ (প্রায় ২০০ গ্রাম) গ্লুকোজ খাওয়ানোর পর ধারাবাহিকভাবে রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা পরিমাপ করা
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি অত্যন্ত বিরল হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি শনাক্ত হয় না। ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং ক্রোনস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
চিকিৎসা কী?
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং অতিরিক্ত ইস্ট ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। এর জন্য সাধারণত চিকিৎসায় যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়—
* খবু কম চিনি বা শর্করাযুক্ত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা
* অন্ত্রের ইস্ট ও ক্ষতিকর জীবাণুর ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া
* যদি দীর্ঘদিনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে এ সমস্যা শুরু হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেই ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৯৭০-এর দশক থেকেই অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোমের বিভিন্ন ঘটনা নথিভুক্ত হলেও এখনো এ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশিকা নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
অটো-ব্রুয়ারি সিনড্রোম একটি অত্যন্ত বিরল কিন্তু বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত রোগ। এতে শরীর নিজেই শর্করাকে অ্যালকোহলে পরিণত করে, ফলে ব্যক্তি মদ না খেয়েও মাতালের মতো লক্ষণ দেখাতে পারেন। সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা সম্ভব এবং খাদ্যাভ্যাস ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।





