বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে তুলনামূলক উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপর ভর করে মধ্যম আয়ের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অগ্রযাত্রায় রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি—উভয়েরই ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের প্রেক্ষাপটে। মুদ্রানীতি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ, সুদের হার এবং তারল্য নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সব সময়ই একটি জটিল চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে বাংলাদেশ একটি সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রধান লক্ষ্য উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ৮ শতাংশের ওপরে এবং কিছু সময় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়ন অর্থনীতিকে আরো নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, তারল্য সংকোচন এবং ঋণ প্রবাহ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা সামগ্রিকভাবে একটি ‘মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক অবস্থান’ নির্দেশ করে।
এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নীতি সুদের হারকে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া, যা গত এক দশকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ স্তরগুলোর একটি। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রেপো ও রিভার্স রেপো ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ডলার প্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টাকার ওপর চাপ কিছুটা কমানো গেলেও অর্থনীতিতে তারল্য সংকোচন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে একটি ‘বেসরকারি খাতকে স্থানচ্যুত করার প্রভাব (crowding out effect)’ সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে সরকারি ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই নীতির সামগ্রিক চরিত্রকে ‘মূল্যস্ফীতি-প্রথম অগ্রাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, এমনকি তা স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও। উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নীতি স্বাভাবিক হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়। বিশেষ করে যখন অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ ঘাটতি বিদ্যমান, তখন অতিরিক্ত সংকোচন প্রবৃদ্ধির গতি আরো ধীর করে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক ধীরে ও তথ্যনির্ভরভাবে সুদের হার সমন্বয় করছে, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে মন্দা ও কর্মসংস্থান সংকোচনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এই দুই চরম অবস্থানের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা থাকলেও উৎপাদন খাতের ওপর চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
এই নীতির সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহে। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে এই প্রভাব আরও তীব্র, কারণ এই খাতগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অর্থনীতির গতিশীলতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন এবং ঋণের উচ্চ ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখছেন।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আচরণ পরিবর্তিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। তারা ঝুঁকি এড়াতে সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক প্রবাহকে সীমিত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মূলধন গঠন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মোট বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩১-৩৩ শতাংশের মধ্যে স্থবির থাকায় এটি একটি উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উৎপাদন খাতেও এই নীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্প যেমন তৈরি পোশাক, চামড়া এবং হালকা প্রকৌশল খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের উচ্চ খরচ লাভজনকতা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে এবং বিদ্যমান উৎপাদন সম্প্রসারণও ধীর হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর পড়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকটও এতে ভূমিকা রেখেছে, তবে মুদ্রানীতির কঠোর অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তবে এই নীতির ইতিবাচক দিকও উপেক্ষা করা যায় না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে মানুষের বাস্তব আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে সহায়তা করতে পারে।
বর্তমান নীতির যথার্থতা মূলত এর লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করে এবং সেই দিক থেকে এটি আংশিকভাবে সফল বলা যায়। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো নীতির প্রভাব বাস্তব অর্থনীতিতে পুরোপুরি কার্যকরভাবে পৌঁছাতে না পারা। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এই নীতির প্রভাব অর্থনীতির বাস্তব খাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ঋণ সংকোচন ঘটলেও উৎপাদন কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটছে না।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মুদ্রানীতিকে মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা স্বাভাবিক হলেও এটি একমাত্র বা সর্বোত্তম সমাধান ছিল না। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে একই সঙ্গে উৎপাদন ঘাটতি, বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বিদ্যমান, সেখানে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত বিকল্প গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ ছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারত ‘লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ নীতি’, যেখানে সামগ্রিক ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করার পরিবর্তে কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধা আরো বিস্তৃত করা যেত। এতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ কিছুটা বজায় থাকলেও উৎপাদনশীল খাতের কার্যক্রম ও বিনিয়োগ প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে থেমে যেত না, ফলে অর্থনীতির বাস্তব খাত তুলনামূলকভাবে সচল থাকতে পারত।
এ ছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও নীতির কার্যকারিতা সীমিত করেছে। শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সরবরাহ-পক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধান হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ যেহেতু খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচনির্ভর, তাই একই সময়ে এই খাতগুলোতে সমন্বিত সরকারি হস্তক্ষেপ থাকলে নীতির ফল আরো কার্যকর হতে পারত।
অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বাজারে বিকৃতি তৈরি করেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে এবং পরোক্ষভাবে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধীরে ধীরে আরো নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলে এই ধরনের অকার্যকারিতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরো স্থিতিশীল থাকত।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতার ভিত্তিতে মুদ্রানীতি নির্ধারণ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তুলনামূলকভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কাঠামো থাকলেও সুদের হার পরিবর্তন ধীরে এবং পরিমিতভাবে করা হয়, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় থাকে। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল থাকায় তাদের মুদ্রানীতি তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি সহায়ক।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ২০১৯-২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী সুদের হার দ্রুত বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে তারা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়, যেখানে একসময় দ্বিগুণ অঙ্কেরও অনেক বেশি মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। তবে এর বিনিময়ে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপের মুখে পড়ে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের কারণে বারবার সুদের হার বৃদ্ধি করতে হয়েছে, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক সময় ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবিরতা-স্ফীতিজনিত ফাঁদ’-এর মতো অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি এবং অন্যদিকে নিম্ন প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে বিদ্যমান।
বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের তুলনায় একটি মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। এখানে মুদ্রাস্ফীতি ভারতের তুলনায় বেশি হলেও শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো অতিরিক্ত সংকটপূর্ণ নয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা হলো নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সমস্যা, যা মুদ্রানীতির সুফলকে পুরো অর্থনীতিতে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে বাধা সৃষ্টি করে।
এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কেবলমাত্র কঠোরতা বা শিথিলতা নয়, বরং নীতির গুণগত ভারসাম্যই একটি দেশের অর্থনৈতিক সফলতার মূল নির্ধারক। সামগ্রিকভাবে বর্তমান মুদ্রানীতি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি আংশিকভাবে সফল হলেও বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমন একটি অর্থনীতিতে যেখানে সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিদ্যমান, সেখানে শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারে না।
ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং শিল্পনীতি পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ও সুশাসন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার আনা অপরিহার্য। কেবল সুদের হার বৃদ্ধি বা তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতে একটি দ্বৈত-পথ মুদ্রানীতি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে, যেখানে একদিকে কঠোর নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে, অন্যদিকে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের মতো উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রানীতি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকাঠামোই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট




