• ই-পেপার

চব্বিশের তাপে তেইশের ‘১-দফা’ ভুলে যাওয়ার অনুতাপ

বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
বাংলাদেশের সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতি : বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত রূপান্তর
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে তুলনামূলক উচ্চ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপর ভর করে মধ্যম আয়ের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অগ্রযাত্রায় রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি—উভয়েরই ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের প্রেক্ষাপটে। মুদ্রানীতি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ, সুদের হার এবং তারল্য নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সব সময়ই একটি জটিল চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি সংকোচনমূলক বা কঠোর মুদ্রানীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রধান লক্ষ্য উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ৮ শতাংশের ওপরে এবং কিছু সময় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়ন অর্থনীতিকে আরো নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, তারল্য সংকোচন এবং ঋণ প্রবাহ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা সামগ্রিকভাবে একটি ‘মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক অবস্থান’ নির্দেশ করে।

এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নীতি সুদের হারকে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া, যা গত এক দশকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সর্বোচ্চ স্তরগুলোর একটি। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রেপো ও রিভার্স রেপো ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও ডলার প্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টাকার ওপর চাপ কিছুটা কমানো গেলেও অর্থনীতিতে তারল্য সংকোচন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে একটি ‘বেসরকারি খাতকে স্থানচ্যুত করার প্রভাব (crowding out effect)’ সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে সরকারি ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এই নীতির সামগ্রিক চরিত্রকে ‘মূল্যস্ফীতি-প্রথম অগ্রাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, এমনকি তা স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও। উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নীতি স্বাভাবিক হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়। বিশেষ করে যখন অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ ঘাটতি বিদ্যমান, তখন অতিরিক্ত সংকোচন প্রবৃদ্ধির গতি আরো ধীর করে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলনা করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক ধীরে ও তথ্যনির্ভরভাবে সুদের হার সমন্বয় করছে, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমাতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে মন্দা ও কর্মসংস্থান সংকোচনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এই দুই চরম অবস্থানের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা থাকলেও উৎপাদন খাতের ওপর চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

এই নীতির সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহে। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে এই প্রভাব আরও তীব্র, কারণ এই খাতগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অর্থনীতির গতিশীলতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন এবং ঋণের উচ্চ ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখছেন।

এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আচরণ পরিবর্তিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। তারা ঝুঁকি এড়াতে সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক প্রবাহকে সীমিত করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মূলধন গঠন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মোট বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩১-৩৩ শতাংশের মধ্যে স্থবির থাকায় এটি একটি উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উৎপাদন খাতেও এই নীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্প যেমন তৈরি পোশাক, চামড়া এবং হালকা প্রকৌশল খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের উচ্চ খরচ লাভজনকতা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে এবং বিদ্যমান উৎপাদন সম্প্রসারণও ধীর হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর পড়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকটও এতে ভূমিকা রেখেছে, তবে মুদ্রানীতির কঠোর অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তবে এই নীতির ইতিবাচক দিকও উপেক্ষা করা যায় না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলে মানুষের বাস্তব আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে সহায়তা করতে পারে।

বর্তমান নীতির যথার্থতা মূলত এর লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করে এবং সেই দিক থেকে এটি আংশিকভাবে সফল বলা যায়। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো নীতির প্রভাব বাস্তব অর্থনীতিতে পুরোপুরি কার্যকরভাবে পৌঁছাতে না পারা। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এই নীতির প্রভাব অর্থনীতির বাস্তব খাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ঋণ সংকোচন ঘটলেও উৎপাদন কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মুদ্রানীতিকে মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা স্বাভাবিক হলেও এটি একমাত্র বা সর্বোত্তম সমাধান ছিল না। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে একই সঙ্গে উৎপাদন ঘাটতি, বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বিদ্যমান, সেখানে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত বিকল্প গ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ ছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারত ‘লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ নীতি’, যেখানে সামগ্রিক ঋণ প্রবাহ সংকুচিত করার পরিবর্তে কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধা আরো বিস্তৃত করা যেত। এতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ কিছুটা বজায় থাকলেও উৎপাদনশীল খাতের কার্যক্রম ও বিনিয়োগ প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে থেমে যেত না, ফলে অর্থনীতির বাস্তব খাত তুলনামূলকভাবে সচল থাকতে পারত।

এ ছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও নীতির কার্যকারিতা সীমিত করেছে। শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সরবরাহ-পক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধান হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ যেহেতু খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচনির্ভর, তাই একই সময়ে এই খাতগুলোতে সমন্বিত সরকারি হস্তক্ষেপ থাকলে নীতির ফল আরো কার্যকর হতে পারত।

অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বাজারে বিকৃতি তৈরি করেছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে এবং পরোক্ষভাবে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ধীরে ধীরে আরো নমনীয় ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলে এই ধরনের অকার্যকারিতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরো স্থিতিশীল থাকত।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতার ভিত্তিতে মুদ্রানীতি নির্ধারণ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তুলনামূলকভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সেখানে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কাঠামো থাকলেও সুদের হার পরিবর্তন ধীরে এবং পরিমিতভাবে করা হয়, যার ফলে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় থাকে। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল থাকায় তাদের মুদ্রানীতি তুলনামূলকভাবে প্রবৃদ্ধি সহায়ক।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ২০১৯-২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী সুদের হার দ্রুত বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে তারা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়, যেখানে একসময় দ্বিগুণ অঙ্কেরও অনেক বেশি মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। তবে এর বিনিময়ে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপের মুখে পড়ে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের কারণে বারবার সুদের হার বৃদ্ধি করতে হয়েছে, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক সময় ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্থবিরতা-স্ফীতিজনিত ফাঁদ’-এর মতো অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যেখানে একদিকে মূল্যস্ফীতি এবং অন্যদিকে নিম্ন প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে বিদ্যমান।

বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের তুলনায় একটি মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। এখানে মুদ্রাস্ফীতি ভারতের তুলনায় বেশি হলেও শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো অতিরিক্ত সংকটপূর্ণ নয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা হলো নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সমস্যা, যা মুদ্রানীতির সুফলকে পুরো অর্থনীতিতে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে বাধা সৃষ্টি করে।

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কেবলমাত্র কঠোরতা বা শিথিলতা নয়, বরং নীতির গুণগত ভারসাম্যই একটি দেশের অর্থনৈতিক সফলতার মূল নির্ধারক। সামগ্রিকভাবে বর্তমান মুদ্রানীতি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি আংশিকভাবে সফল হলেও বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমন একটি অর্থনীতিতে যেখানে সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিদ্যমান, সেখানে শুধুমাত্র সুদের হার বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারে না।

ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং শিল্পনীতি পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা ও সুশাসন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বচ্ছতা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার আনা অপরিহার্য। কেবল সুদের হার বৃদ্ধি বা তারল্য সংকোচনের মাধ্যমে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতে একটি দ্বৈত-পথ মুদ্রানীতি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে, যেখানে একদিকে কঠোর নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে, অন্যদিকে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের মতো উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রানীতি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত, ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকাঠামোই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?

বিশেষ প্রতিনিধি
পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ মডেল বাংলাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক?
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির বৈঠকে পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে—এমন খবর স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর নগর পুলিশিং ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে বাংলাদেশও এ উদ্যোগ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এক দেশের জননীতি-সংক্রান্ত উদ্যোগ সম্পর্কে অন্য দেশের আগ্রহী হওয়ায় অস্বাভাবিক কিছু নেই। কোনো নীতি নিজ দেশে প্রয়োগের আগে নীতিনির্ধারকরা নিয়মিতভাবেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেন এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য বিচার করেন। কিন্তু বিষয়টি যখন রাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরের নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ শুধু তার সাফল্য জানা নয়; তার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা থেকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা নেওয়া।

বাংলাদেশ যখন একটি ডিজিটাল সক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘সেফ সিটি’ ধারণাটি ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সমন্বিত কমান্ড সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (এএনপিআর) এবং হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরার সমন্বয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের এক নতুন যুগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়—আরো উন্নত প্রযুক্তি, আরো দ্রুত সাড়া এবং আরো নিরাপদ শহর।

বিশেষ করে লাহোরের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পকে সামনে রেখে পাকিস্তানকে প্রায়ই এ ধরনের মডেলের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, এ ব্যবস্থা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু সুফল এনে দিয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরো সমন্বিত হয়েছে, যানবাহন ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটেছে এবং বহু অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব অর্জন অবশ্যই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

তবে কোনো জননীতিকে কখনোই শুধু তার কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। সেটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা কতটা সুদৃঢ় করে—সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য। আর ঠিক এখানেই পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান শিক্ষা বহন করে, যদিও সেটি অনুকরণের উপযোগী মডেল নাও হতে পারে।

‘সেফ সিটি’ প্রকল্প নিয়ে প্রথম ভুল ধারণা হলো— প্রযুক্তি এমন সমস্যার সমাধান করতে পারে, যার মূল কারণ আসলে প্রাতিষ্ঠানিক। নজরদারি অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের পরও পাকিস্তান এখনো সংঘবদ্ধ অপরাধ, নগর সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখোমুখি। নজরদারি প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত পরিচালনা এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রদানের সক্ষমতা বাড়িয়েছে; কিন্তু পুলিশিং, প্রসিকিউশন এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সমাধান করতে পারেনি। প্রযুক্তি কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু তা কখনোই পেশাদার তদন্ত, স্বাধীন প্রসিকিউশন কিংবা সময়মতো বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। বাংলাদেশও একই ধরনের বহু কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশিক্ষিত তদন্তকারীর ঘাটতি, সীমিত ফরেনসিক সক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থায় মামলার জট—এসব সমস্যার সমাধান শুধু আরো বেশি ক্যামেরা বসিয়ে সম্ভব নয়। বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া ব্যয়বহুল নজরদারি ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন এক উন্নত প্রযুক্তিগত সমাধানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যা পুরনো ও অপরিবর্তিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

দ্বিতীয় উদ্বেগটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ পরিসরের নজরদারি নাগরিক ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্রই বদলে দেয়। আধুনিক ‘সেফ সিটি’ ব্যবস্থা শুধু অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করে না—এটি সাধারণ মানুষের চলাচল, ব্যবহৃত যানবাহন, ভ্রমণের ধরন এবং অনেক ক্ষেত্রে মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের জৈবিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। জননিরাপত্তার বৈধ প্রয়োজনে এ ধরনের সক্ষমতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে তার সঙ্গে সমান শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, নজরদারি প্রযুক্তির সক্ষমতা যখন তা নিয়ন্ত্রণকারী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে দ্রুত বিস্তৃত হয়, তখন কী ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পাকিস্তানের ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, দেশটিতে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য সুরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। নজরদারি কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। নজরদারিতে সংগৃহীত তথ্য কত দিন সংরক্ষিত থাকবে এবং কে বা কিভাবে তা ব্যবহার করতে পারবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর স্বাধীন তদারকিও অনুপস্থিত। এসব উদ্বেগ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তব অপব্যবহারে রূপ নিয়েছে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—নজরদারির ক্ষমতা সম্প্রসারণের আগে কার্যকর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এ শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

দেশটি এখনো ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে নজরদারি কার্যক্রমের স্বাধীন তদারকিও সীমিত। ফলে পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আগেই যদি ব্যাপক নজরদারিব্যবস্থা চালু করা হয়, তবে ভবিষ্যতের কোনো সরকার পর্যাপ্ত জবাবদিহি ছাড়াই সেই ক্ষমতা ব্যবহার করার সুযোগ পেতে পারে।

ইতিহাস এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো সরকারই সাধারণত অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলে না। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এই অসাধারণ ক্ষমতাগুলোকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের আওতায় রাখা। জনসাধারণের প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে তা শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্যও সমানভাবে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক থাকে।

স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক সুরক্ষা না থাকলে নজরদারি ব্যবস্থা রাজনৈতিক অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সাংবাদিক, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন কিংবা শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। এ ধরনের অপব্যবহারের সম্ভাবনাই গণতান্ত্রিক সমাজগুলোকে নজরদারির ক্ষমতার সঙ্গে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করার ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিতে বাধ্য করেছে।

এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, ‘সেফ সিটি’ প্রযুক্তি ব্যবহারে পাকিস্তান কোনো ব্যতিক্রম নয়। সিঙ্গাপুর, লন্ডন, দুবাইসহ বিশ্বের বহু শহরেই অনুরূপ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পার্থক্য প্রযুক্তিতে নয়; পার্থক্য এর শাসনব্যবস্থায়। যেসব দেশ নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে, তারা সাধারণত তা করেছে শক্তিশালী ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অনুপ্রবেশমূলক নজরদারির ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, তথ্য সংরক্ষণের নির্দিষ্ট আইনি সীমা এবং নিয়মিত জনসম্মুখে স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে।
বাংলাদেশেরও উচিত, প্রযুক্তিগত মডেলের পাশাপাশি এসব শাসনব্যবস্থা থেকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা নেওয়া।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—অগ্রাধিকার কী হবে?

‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু ক্যামেরা কেনাই নয়; কমান্ড সেন্টার, সফটওয়্যার লাইসেন্স, সাইবার নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিশেষায়িত জনবল এবং নিয়মিত প্রযুক্তি হালনাগাদের জন্যও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব ব্যয় এককালীন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত। ফলে পুলিশের প্রশিক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষাগার, কমিউনিটি পুলিশিং, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে এ প্রকল্পের অর্থায়নের প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সীমিত সরকারি সম্পদসম্পন্ন একটি উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকদের তাই নিজেদের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা উচিত—জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরো এক হাজার নজরদারি ক্যামেরা কি বেশি কার্যকর হবে, নাকি আরো এক শ দক্ষ তদন্তকারী, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রসিকিউটর? এর উত্তর মোটেও সহজ নয়।

এর কোনোটির অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। বরং বুদ্ধিমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত জরুরি সাড়া কেন্দ্র, ডিজিটাল অপরাধ মানচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় লক্ষ্যভিত্তিক সিসিটিভি কভারেজ এবং আধুনিক আলামত ব্যবস্থাপনা—এসবই দায়িত্বশীলভাবে বাস্তবায়িত হলে জননিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে। প্রকৃত পার্থক্যটি উদ্দেশ্য ও শাসনব্যবস্থায়। প্রযুক্তি হবে জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের সহায়ক; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প নয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা যদি বাংলাদেশকে ‘সেফ সিটি’ কর্মসূচি বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তবে নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত মনে হওয়ার কারণে পুরো একটি মডেল আমদানি করার প্রলোভন এড়িয়ে চলা। যেকোনো প্রস্তাব প্রথমে সংসদীয় পর্যালোচনা, স্বাধীন গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন, জনপরামর্শ এবং কঠোর ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে শুধু কোন প্রযুক্তি গ্রহণ করবে তা-ই নির্ধারণ করলেই চলবে না; বরং সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কোন কোন আইনি সুরক্ষা অবিচ্ছেদ্যভাবে নিশ্চিত করতে হবে, সেটিও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

সর্বশেষে, একটি নিরাপদ শহরের প্রকৃত মানদণ্ড রাস্তার মোড়ে কতগুলো ক্যামেরা বসানো হয়েছে কিংবা তার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার কতটা আধুনিক—তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা নিজেদের নিরাপদ অনুভব করেন কি না, অথচ সারাক্ষণ নজরদারির মধ্যে থাকার অনুভূতি ছাড়াই; প্রযুক্তি জনগণের আস্থা ক্ষয় না করে বরং তা আরো সুদৃঢ় করে কি না; এবং রাষ্ট্র যত সক্ষম হয়, ততই কি আরো জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, নজরদারি প্রযুক্তি পুলিশিং এবং নগর ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। একই সঙ্গে সেটি এটিও প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি একা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে পারে না।

সুতরাং কার্যক্রম পরিচালনার সাফল্যকে নীতিগত সাফল্য বলে ধরে নেওয়ার ভুল বাংলাদেশের করা উচিত নয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার প্রকৃত শিক্ষা কেবল কিভাবে একটি ‘সেফ সিটি’ গড়ে তুলতে হয়, তা নয়; বরং এমন একটি শহর গড়ে তুলতে যে শক্তিশালী আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি অপরিহার্য—যে ভিত্তি জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম—সেটিই আরো বড় শিক্ষা।

বাংলাদেশ অবশ্যই আরো নিরাপদ শহর পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তাই নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপদ শহর নির্মাণের আগে শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন হয়।

ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ষড়যন্ত্রের দাবি দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না
সংগৃহীত ছবি

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ প্রায়ই দাবি করেন, জাতীয় নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শরিকদের হারানো হয়েছে। এটি কেবল বহুল ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং দলটির মৌলিক একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অনীহারই প্রতিফলন। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ভোটার এখনো জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব জামায়াতের হাতে তুলে দিতে আগ্রহী নয় কেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে আইনি প্রতিকার চাওয়ারও অধিকার রয়েছে। এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া এবং আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পথ অনুসরণ না করে বারবার নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বহুবার রাজনৈতিক সংঘাত, অবিশ্বাস ও অস্থিরতার চক্রের মধ্যদিয়ে পাড়ি দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে কাজ করবে। সেসব বর্ণনা বা বক্তব্য নয়, যা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের স্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি করে।  

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। তাদের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে এবং বিষয়টি এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। একই সময়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা এবং বিদেশি সরকার এই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, গণতন্ত্রে নির্বাচনে পরাজয়ের সঠিক জবাব হলো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত পথে প্রতিকার চাওয়া। এমন বক্তব্য বা ইঙ্গিত দেওয়া নয়, যা আবারও অস্থিরতার নতুন চক্র সৃষ্টি করতে পারে।

ইতিহাস আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় 

বাংলাদেশের অন্য যেকোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের তুলনায় জামায়াতে ইসলামী এখনো এমন একটি ঐতিহাসিক দায় বহন করে, যা থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। একই সঙ্গে তাদের বহু নেতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই সেনাবাহিনীর পরিচালিত গণহত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ এবং পরিকল্পিত নিপীড়ন জাতির ইতিহাসে এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে। আলবদর ও আলশামসের মতো সহযোগী বাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের কর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সেই বাহিনীগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার কয়েকটির সঙ্গে যুক্ত বলে বহুলভাবে স্বীকৃত। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড অন্যতম।

এসব কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তোলা অভিযোগ নয়। এগুলো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ এবং স্বাধীনতার পর থেকে ভোটারদের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ও এই উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের দায় অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের ভিত্তিতেই স্থির করতে হবে। তবে এটাও সত্য যে, কট্টরপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা যখনই চরমে পৌঁছেছে, তখন রাজনৈতিক সহিংসতা বহু ক্ষেত্রেই তার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। 

এই ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে কেন কেবল ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বা ধুয়ো তুললে তা জামায়াতের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে খুব বেশি সাড়া জাগাতে পারে না। প্রতিটি নির্বাচনি ব্যর্থতাকে অদৃশ্য কোনো শক্তির ষড়যন্ত্রের ফল বলে তুলে ধরলে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। বরং, সেই আস্থা অর্জন করতে হয় বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহি এবং ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার সৎ সাহসের মাধ্যমে।

জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই বাংলাদেশের শাসনভার পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তবে তাদের উপলব্ধি করা উচিত যে সাংবিধানিক গণতন্ত্রে আন্দোলন, চাপ সৃষ্টি বা নিজেকে নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপনের বয়ানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করা যায় না। একটি সরকারের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে-নিজেদের জন্য অস্বস্তিকর প্রতিটি রাজনৈতিক ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা থেকে নয়। জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আরেকটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা বাস্তবসম্মত নয়; বরং বাস্তবসম্মত হলো নৈতিক জবাবদিহি। 

জামায়াতে ইসলামীর উচিত মুক্তিযুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকারোক্তি দেওয়া। সেই সময়ে লাখো বাংলাদেশির যে দুর্ভোগ ও কষ্ট হয়েছে তা স্বীকার করে দলের অতীত ভূমিকার জন্য আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করা এবং যাদের আস্থা তারা এখন অর্জন করতে চায় সেই জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এতে ইতিহাস বদলে যাবে না । তবে এটি প্রমাণ করবে বাংলাদেশ যে নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, জামায়াত তা উপলব্ধি করে। 

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা উচিত যে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাদের কৌশলের অংশ হবে না। অস্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে অনেক বড় মূল্য দিতে হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাত নয়, বরং নীতি, কর্মসূচি ও জনসেবার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে হবে। 

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এমন রাজনীতি পাওয়ার অধিকার রাখে যা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসকে ভুলে যায় না। কোনো জাতি ইতিহাস মুছে ফেলে নয়, বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে এগিয়ে যায়। জনগণের ভোট ও সমর্থন চাওয়ার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না, কিংবা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তা তৈরি করাও যায় না। বৈধতা অর্জন করতে হয় জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক আচরণ এবং ভোটারদের আস্থা ও সমর্থনের মাধ্যমে।

জামায়াতে ইসলামী যত দিন না তাদের অতীতের মুখোমুখি হচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতার সব ধরনের রূপকে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করছে এবং কথায় ও কাজে প্রমাণ করছে যে তারা একসময় যে প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা করেছিল, একই সাথে আজ সেই প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে-তত দিন জাতীয় নেতৃত্বের দাবিতে তাদের আহ্বান মূল্যায়িত হবে তাদের বক্তব্যের জোরে নয়, বরং ইতিহাসের ভারকে সামনে রেখেই।

ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

হিংস্রতা, মানুষের পশু প্রবৃত্তি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘরের ভিতরে তিন মাস বয়সের শিশুর বিপদের খবরও বড় খবরের অংশ বটে। তবে তাই বলে তা কিন্তু ছোট খবর নয়। যেমন এই খবরটি, যার শিরোনাম ‘বাচ্চারে থামা, নইলে মাইরা ফালামু।’ ভিতরের খবর, আওয়াজটি শুধু হুমকি ছিল না, ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে। ঢাকার মিরপুরের বর্ধনবাড়ি এলাকায় মায়ের পাশে শুয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করছিল। তাতে যুবক স্বামীটির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে তিনি শিশুটির মাকে ধমক দিয়ে শিশুর কান্না থামাতে বলেন। শিশুসন্তানের কান্না থামাতে মা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, সফল হননি। ওই ব্যক্তি তখন শিশুটিকে সত্যি সত্যি গলা টিপে মেরে ফেলেন। যুবকটি ইতিঃপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে জামিনে ছাড়া পান এবং তিন মাসের সন্তানসহ মেয়েটিকে বিয়ে করেন। পরবর্তী ঘটনা সংবাদ হয়েছে গণমাধ্যমে।

ইতালিপ্রবাসী বড় ভাই খুন করেছেন আপন ছোট ভাইকে এবং খুনের ছবি ভিডিওতে ধারণ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সদস্যদের কাছে। কারণ অন্য কিছু নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। বড় ভাই হুমায়ূন কবির ইতালিতে যান ১১ বছর আগে। ছোট ভাইকেও তিনি-ই সেখানে নিয়ে যান, ৩ বছর হবে। বড় ভাই হুমায়ূনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে ছোট ভাই নয়ন আপত্তি করেন। বড় ভাইকে নয়ন যে টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত চান। ছোট ভাইয়ের বড় রকমের এই স্পর্ধা বড় ভাইয়ের পক্ষে হজম করা কঠিন হওয়াতেই ছোট ভাইকে তিনি খুন করেন। মুন্সিগঞ্জ নিবাসী তাদের পিতা দেলোয়ার ফকির স্বভাবতই পুত্র-হত্যার বিচার চেয়েছেন। কিন্তু কার কাছে? উল্লেখ্য ওই পিতার একমাত্র কন্যার স্বামীও থাকেন ইতালিতে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। তবে পালাননি, নিজেই খবর দিয়েছেন পুলিশকে। বয়স তার ৪৭। না, স্ত্রীর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের দুই ছেলেরই। যাদের একজনের বয়স ৫, অন্যজনের ১২। জন্মাবধি তারা অসুস্থ ছিল; আক্রান্ত ছিল অটিজমে। ঘটনা সিডনি শহরের। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশি ভদ্রলোক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ারই আরেক শহর, পার্থে-ঘটা একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা। গত জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি তাদের দুই অটেস্টিক পুত্র (বয়স ১৪ ও ১৬) হত্যা করেন। অসুস্থ সন্তানের দায়ভার সারা জীবন বহন করাতে নিশ্চয়ই তাদেরও আপত্তি ছিল। অনুপ্রেরণাদানকারী এবং অনুপ্রাণিত দুই ঘটনার ভিতর অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি সন্তান-হত্যার পর আর জীবিত থাকেনি। আত্মহত্যা করে পুত্র-হত্যাজনিত গ্লানির অবসান ঘটিয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশির ঘটনাটি যে কিছুটা উন্নত কিংবা মানবেতর; সেটা না-মেনে উপায় নেই।

পাশাপাশি খবর এই রকমের যে কাপাসিয়ার ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে (অর্থাৎ মোট পাঁচজনকে) নেশাজাতীয় দ্রব্যের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে নিজ হাতে জবাই করেন। তার অভিযোগ স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন; এবং প্রেমিকের মাধ্যমে ফোরকানের কষ্টার্জিত টাকা বেহাত হয়ে যেত। এ নিয়ে তিনি নাকি স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেন। তবে ফোরকান নিজেও যে মাদকাসক্ত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নওগাঁর খবর। সেখানে দুই সন্তানসহ এক দম্পতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডের কারণ জমিজমার ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের পিতা, দুই বোন ও এক বোনের ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ওদিকে গণপিটুনিও চলছে। মানিকগঞ্জে শিশুহত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে দুজন। সেই সঙ্গে একজন গুরুতর আহত। ঘটনার বিবরণ এই রকমের : বনপারিল গ্রামের মুকুল মিয়ার ৯ বছর বয়সি কন্যা আতিকা গিয়েছিল প্রতিবেশী এক পরিবারের বিয়েবাড়িতে। বিকালবেলা সে বাড়িতে ফিরছিল। তার কানে ছিল স্বর্ণের দুল, গলায় স্বর্ণের চেইন। ওই দুই বস্তুর লোভেই হবে, তাকে অপহরণ করা হয়। আতিকা নিখোঁজ হয়েছে, এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; মাইকিংও করা হয়। খোঁজাখুঁজিতে বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী এক শিশু জানায় যে নাঈম (১৫) নামের এক কিশোরের সঙ্গে আতিকাকে সে দেখেছে কথা বলতে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নাঈম তার অপরাধ স্বীকার করে এবং তার দেখানো ভুট্টাখেতেই মৃত অবস্থায় আতিকাকে পাওয়া যায়। পুলিশ অভিযুক্ত পুত্র, তার পিতা ও পিতার এক ভাইকে আটক করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষিপ্ত জনতা অভিযুক্ত নাঈমদের বাড়ি ঘেরাও করে। গণপ্রহারে নাঈমের পিতা অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮) নিহত হন। অভিযুক্তের এক ভাইও গুরুতর আহত। নাঈম হেফাজতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন পড়েছিল।

গত ২৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর ছিল এই রকম : ১. চুয়াডাঙ্গায় এক যুবকের (২১) দ্বারা সত্তর-উত্তীর্ণ বৃদ্ধা ধর্ষিত। মহিলা নিজেই মামলা করেছেন। বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি মেয়ের বাড়িতে। ফেরার সময় ভ্যানগাড়ি থেকে নামেন শহরের এক হাসপাতালের সামনে। রাত তখন ১২টা হবে। তার সঙ্গে তরকারি ও মাংসে ভরা একটি ব্যাগ ছিল। পরিচিত এক যুবক এগিয়ে আসেন ব্যাগটি বহন করে মহিলাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন এই প্রস্তাব নিয়ে। মহিলা সম্মত হন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মহিলার অভিযোগ একা পেয়ে যুবকটি তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত যুবকটিকে যথারীতি আটক করেছে পুলিশ। ২. যশোরের কেশবপুরে প্রতিবেশীর বাড়িতে টিভি দেখতে গিয়েছিল এক শিশু। সেখানেই সে ধর্ষিত হয়েছে। ৩. নাটোরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে দুজনকে। তারা পরস্পর পিতা এবং পুত্র। মেয়েটির বাড়ির পাশের দোকানে কাজ করত পিতা ও পুত্র দুজনেই। রাতে নিজেদের বাড়িতে মেয়েটি একাই ছিল। সেই সুযোগে পিতা মেয়েটির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে দোকানে কাজে এসে তার পুত্রও মেয়েটির একাকিত্বের সুযোগ নেয়। এবং আগের রাতে বাবা যা করেছে সকালে ছেলেও সে কাজই সম্পন্ন করেন। [পিতার পথ ধরে আগুয়ান হতে পুত্রের আনুগত্যে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।] ৪. গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। স্থানীয় লোকজন ইমামকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশে সোপর্দ করে। ৫. হবিগঞ্জে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ১০ বছরের এক শিশু বিকালবেলা দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গ্রামেরই এক বাসিন্দা তার এক সঙ্গীর সঙ্গে মিলে শিশুটিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির চিৎকার শুনে লোকজন ধাওয়া করলে বীরপুরুষেরা পালিয়ে যায়। অন্য পাষণ্ডদের মতো এই দুটিও নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের যে সর্বনাশটি ঘটে গেছে তার ক্ষতিপূরণ কী কোনোভাবেই সম্ভব?

গত ৭ জুনের দুটি খবর। ময়মনসিংহের ভালুকায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ গ্রেপ্তার। শিশুটি দোকানে যাচ্ছিল শ্যাম্পু কিনতে। পথিমধ্যে ফালু মিয়া তাকে ফুসলে অন্যত্র নিয়ে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয় খবরটি গাইবান্ধার। সেখানে এক কিশোরীকে তার বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার যুবক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। রাত ১২টার দিকে ওই কিশোরী নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। চারটি যুবক পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলের ধারে নিয়ে যায়। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর চিৎকারে লোকজন তাড়া করলে ধর্ষকদের তিনজন ধরা পড়ে, একজন পালিয়ে যায়।  মানিকগঞ্জের খবর, সেখানে ষাট-পেরোনো এক বৃদ্ধ ভিখারিনীক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মহিলা থানায় গিয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যুবক দুটি গ্রেপ্তার হয়েছে। পরিপূরক খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সেটির মর্মবাণী এই যে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার অভিযুক্তদের শতকরা ৯৮ জনের কোনো শাস্তি হয় না। সংলগ্ন অন্য একটি তথ্য, পানিতে ডুবে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২টি শিশুর মৃত্যু ঘটে।

শিশু ধর্ষণের সংখ্যা যে বাড়ছে সে ব্যাপারটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। একটি দৈনিক পত্রিকা সাম্প্রতিক ৬৮০টি ধর্ষণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছে, ধর্ষিতাদের ভিতর শিশুদের সংখ্যাই অধিক। বুঝতে অসুবিধা নেই যে দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এবং ভোগবাদিতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকদের কাছে শিশুরা এখন আর শিশু নেই, ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গোটা ব্যবস্থাটা যে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক তার বহু প্রমাণ ও নিদর্শনের মধ্যে এটিও একটি। পর্যালোচনায় এটাও ধরা পড়েছে যে ধর্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাদের পূর্বপরিচিত। অর্থাৎ কাছের এবং দূরের ভিতর কোনো ব্যবধান নেই। নির্বিচারে ভোগ করা সম্ভব এবং পরিচিতজনদেরই শিকারে পরিণত করা সহজতর, কারণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণে আক্রান্তরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এটাও দেখা গেছে যে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে তাদের বাসগৃহেই। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিপদের দৃষ্টান্ত তো বিশ্বে রেকর্ড করেছে, পর্যবেক্ষণও সে কথা বলেছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়