কালচারাল শক বা ‘সাংস্কৃতিক অভিঘাত’ শব্দ দুটির সাথে আমার পরিচিতি বহুদিনের। চার দশক আগে মার্কিন সরকারের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার বৃত্তি বাগিয়ে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের জন্য উড়াল দিয়েছিলাম হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের অভিমুখে। সেটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম বিদেশ যাত্রা। নবীন বরন উৎসবে ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার কর্তৃপক্ষ আমাকেসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন মার্কিন সংস্কৃতির আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তারা জানিয়েছিলেন মার্কিনদের জীবনধারার বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের কাছে অপরিচিত এবং অস্বস্তিকর লাগতে পারে, সৃষ্টি করতে পারা আমাদের ওপর অনাবশ্যক মানসিক চাপ। তবে তারা আশ্বস্ত করেছিলেন, আমরা দ্রুত মার্কিন সংস্কৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবো। তাদের এ উপদেশের প্রতিফলন তৎক্ষণাৎ পেয়ে গিয়েছিলাম। জনা পঁচিশেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ছিল এক রাজসিক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। ভোজ শেষে দেখি অর্ধেকের বেশি দামি দামি খাবার; যেগুলোর বেশির ভাগ জীবনে প্রথম দেখলাম, অথচ তা ধরাই হয়নি। কিছুক্ষণ পরে আমার সামনে দিয়ে পরিছন্নকর্মীরা এসে সে অছোঁয়া খাবারগুলো ‘গারবেজ ব্যাগে’ ভরে ‘বিনে’ ফেলার জন্য নিয়ে গেলো। সে সময় আমার দেশের অর্ধভুক্ত মানুষের কথা ভেবে মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম।
দিন গড়িয়ে যেতে লাগলো আর বিস্ময় নিয়ে দেখতে পেলাম আমরা যা জানি আর ভাবি, সব কিছুরই বিপরীতধর্মী চিন্তা মার্কিনদের মগজে স্থিতু হয়ে আছে। তারা তারিখ লিখতে গিয়ে দিনের আগে মাসটা লিখে দেয়, গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরে বাম সিটে বসে, ফুটবলকে বলে সকার, ফুটপাথকে বলে সাইড ওয়াক, সিনেমাকে বলে মুভি, রেস্তোরাঁর বিলকে বলে চেক ইত্যাদি আরও কত শত নাম! সেই প্রথম (১৯৮৫ সালে) দেখলাম ক্যাশের পরিবর্তে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, টাকা উত্তোলনের জন্য এটিএম মেশিন, টাইপিং সহজ করে দেওয়ার জন্য ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রিন্টার। দ্রুত ধাবমান গাড়ি, বিশাল বিশাল উড়াল সড়ক, নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা, সুশাসন, শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য আর সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠেছিল। এর সাথে ছিল স্কিন কালারের সমস্যা। চারিদিকে ভিন্ন বর্ণের লোকজন দেখে নিজেকে একাকী এবং অসহায় লাগত। তবে সাদা চামড়ার মার্কিন সহকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা মার্কিন মুলুকে আমার জীবন ধারা দিনে দিনে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।

সংস্কৃতি হোল একটা জাতির জীবনযাপন, মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও বিশ্বাসের সমষ্টি। বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য, নদী-মাটি-কৃষি ও উপনিবেশ-উত্তর ইতিহাসের ফসল। অন্যদিকে মার্কিন সংস্কৃতির ইতিহাস মাত্র আড়াইশো বছরের পুরোনো, যেখানে বহু জাতের অভিবাসী এসে নানা ধাঁচের সংস্কৃতির মিলন ঘটিয়ে আমেরিকা মহাদেশে নতুন ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পূর্ব পট ভিন্ন হবার কারণে বাঙালি ও মার্কিন সংস্কৃতির দর্শন ভিন্ন। বাঙালি সমাজ এখনো সমষ্টিকেন্দ্রিক; যৌথ পরিবার ভেঙে নিউক্লিয়ার হলেও মা-বাবা, দাদা-দাদি, আত্মীয় স্বজনের সাথে নিবিড় বন্ধন এ সমাজে এখনও প্রত্যাশিত। বড়দের মতামতকে সম্মান করা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে সবার অংশগ্রহণ স্বাভাবিক নিয়ম। বিয়েতে পরিবারের সম্মতি, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান করা আর দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া প্রথাগত ব্যাপার। কিন্তু মার্কিনদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সন্তানদের বয়স ১৮ পার হলে পিতা-মাতা তাদের স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ দেয়। তাদের কাছে পরিবার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যক্তির পছন্দ, ক্যারিয়ার ও স্বাধীনতা অগ্রাধিকার পায়। বাবা মা এবং বড়দের সাথে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয় আর বিয়েতে ব্যক্তিগত পছন্দ হয়ে থাকে শেষ কথা। পরিবারের বাকিরা পালন করে সাক্ষী গোপালের ভূমিকা।
বাঙালিদের আতিথেয়তা সমাজ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেউ বাড়ি এলে না খাইয়ে ছাড়া হয়না, কারণ বাঙালির কাছে অতিথি হচ্ছে নারায়ণ। সময় জ্ঞানে, নিয়ম অনুসরণে এবং প্রতিশ্রুতি পালনে বাঙালির চারিত্রিক দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। সমাজে আবেগ প্রকাশ করা,গল্প আড্ডায় মেতে থাকা, পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করা বাঙালির গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; আর ইশারা ইঙ্গিতে মনোভাব প্রকাশ করা সামাজিক ভাবে বাঙালিদের কাছে গ্রহণযোগ্য। বাঙালিরা সরাসরি না বলাকে অভদ্রতা মনে করে আর সামাজিক কর্মকাণ্ডে ‘লোকে কি বলবে’ এ চিন্তা তাদের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মার্কিনদের কাছে সময়ানুবর্তিতা, স্পষ্ট কথা ও ব্যক্তিগত পরিসর বা পার্সোনাল স্পেস খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইনিয়ে বিনিয়ে কথা না বলে টু দ্য পয়েন্ট কথা বলাটা পছন্দ করে এবং মনে করে সরাসরি ‘না’ বলাটা সৎ ও পেশাদার আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তাদের কাছে সমাজের চেয়ে আইন ও ব্যক্তিগত অধিকার বড়। আতিথেয়তা নিয়ে তাদের মধ্যে বাড়াবাড়ি নেই এবং আতিথেয়তার জন্য তারা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে সময় নির্ধারণ করে।
বাঙালিদের বছর ঘোরে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, দুর্গা পূজা, নবান্ন ঘিরে। উৎসব মানেই একসাথে খাওয়া, নতুন জামা, গান বাজনা ও সামাজিক মিলন। পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানি ছাড়াও বাঙালি জীবনে ভাত, মাছ, ডাল অবিচ্ছেদ্য অংশ। রান্নায় তেল-মশলা আর অতিথি আপ্যায়নে বাঙালির ভালবাসা প্রকাশ পায়। আমেরিকান উৎসব ফোরথ অফ জুলাই, হ্যালোইন, থাঙ্কস গিভিং, ক্রিসমাস। টার্কি, বারবিকিউ, পাম্পকিন পাই, ফাস্ট ফুড মার্কিনদের কাছে আচার অনুষ্ঠানের জন্য প্রিয় খাবার। তাদের মধ্যে আছে পট লাক কালচার, যেখানে খাবার আয়োজনে সবাই কিছু না কিছু অবদান রাখে। ব্যক্তিগত ডায়েটে ভেগান, কিটো স্বাভাবিকভাবে মানা হয়। বাঙালি পরিবারে শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদার সিঁড়ি ভাবা হয়। বাঙালির কাছে এখনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরি নিরাপদ পছন্দ। মুখস্থ বিদ্যা,পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনা ও শিক্ষকের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা চালু আছে। চাকরিতে সিনিয়রটি ও ক্ষমতা বাঙালিদের কাছে মূল্যবান। মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রশ্ন করা, ক্রিটিকাল থিঙ্কিং ও ‘নিজের পথ বেছে নেওয়া’ শেখায়। ‘গ্যাপ ইয়ার’, মেজর বদলানো, উদ্যোক্তা হওয়া তাদের কাছে সন্মানজনক। কাজের ক্ষেত্রে জীবনযাপন ও চাকরির ভারসাম্য বজায় রাখা, চাকরি বদল এবং সরাসরি ফিড ব্যাক তাদের সংস্কৃতির অংশ; মার্কিনদের ভাষায় ব্যর্থতা হোল শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা।

বাঙালির জীবনে ধর্ম ও লোকাচার মিশে আছে, সব ধর্মের লোক নিজ নিজ পার্বণ পালন করলেও সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্র-নজরুল-বাউল-লালন সবাইকে ছুঁয়ে যায়। তবে ধর্ম ব্যক্তিগত হলেও, তা বাঙালির সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পক্ষান্তরে মার্কিনরা সাংবিধানিকভাবে সেকুলার, তাদের চার্চ-ষ্টেট আলাদা। খ্রিষ্ট ধর্ম সংখ্যা গরিষ্ঠ হলেও, ধর্মীয় ভাবে তারা গোঁড়া নয়, কিন্তু চিন্তা ভাবনায় তারা আধ্যাত্মিক। যদিও আমেরিকান রাজনীতিতে ধর্মীয় লবিগুলোর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, মার্কিনরা সাধারণত কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করে না। বাঙালিরা হোল আবেগপ্রধান, কবিতা, গান, আড্ডা ছাড়া বাঙালির জীবন অসম্পূর্ণ; সিনেমা নাটকে মেলো ড্রামা তাদের পছন্দনীয়। বাঙালির যুক্তি-তর্কে, আবেগ, উপমা, গল্প ঢুকে পরে। অপর দিকে মার্কিনরা কথা ও যুক্তি দিয়ে জীবন যাচাই করে, তারা সরাসরি কথা বলে এবং ব্যক্তিগত গল্প বলতে ভালবাসে। তাদের মধ্যে পলিটিক্যাল কারেক্টনেস ও ফ্রি স্পিস নিয়ে টানা পোড়ান থাকলেও মত প্রকাশের অধিকার সাংবিধানিক।
বাঙালি সংস্কৃতি শিকড়, আবেগ, সমষ্টি ও ঐতিহ্যের গল্প বলে। আমেরিকান সংস্কৃতি চিন্তা শক্তি, যুক্তি, ব্যক্তি ও উদ্ভাবনের কথা বলে। একটা মাটির মত জীবনযাপনকে ধারণ করে, অন্যটা মানুষকে হাওয়ার মত উড়তে শেখায়। এখানে শ্রেষ্ঠ-নিকৃষ্ট বিচার্য নয়, বরং দুই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পারস্পরিকভাবে শেখার অঢেল সুযোগ আছে। বাঙালিরা মার্কিনদের কাছ থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের চিন্তা-ভাবনা নিতে পারে, আর মার্কিনরা বাঙালির পারিবারিক বন্ধন ও আন্তরিকতা থেকে শিখতে পারে। তরুণ বাঙালি এখন নেটফ্লিক্স দেখে, স্টার্টআপ খোলে, নানা ধরনের কফির স্বাদ নেয়, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে, ইন্টারনেট সারফ করে অজানাকে জানার চেষ্টা করে। আবার আমেরিকান শহরগুলোতে পহেলা বৈশাখ, বাঙালি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ভোজ, যোগ ব্যায়াম, বাংলা ছবি ইত্যাদি ধীরে ধীরে মার্কিনদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বর্তমানকালে অভিবাসী বাঙালিরা ‘দেশি’ ও ‘আমেরিকান’ পরিচয় মিলিয়ে তৃতীয় একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। কর্মক্ষেত্রে আমেরিকানদের দায়িত্ববোধ, কর্ম পর্যালোচনা ও সরাসরি ফিডব্যাকের ধারণা শিখছে বাঙালি, আর আমেরিকানরা শিখছে বাঙালির পারিবারিক মূল্যবোধ ও আতিথেয়তা। দিন শেষে নদীর মত চলতে চলতে সংস্কৃতির দুই ধারা মিলে মিশে অন্তহীন নতুন মোহনা সৃষ্টি করে চলেছে।
লেখক: বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র




