• ই-পেপার

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর

প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ছাড়া কি শুধু সংযোগই যথেষ্ট?

বাঙালি আর মার্কিনদের সংস্কৃতির দুই ধারার মেলবন্ধন ঘটে যেভাবে

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
বাঙালি আর মার্কিনদের সংস্কৃতির দুই ধারার মেলবন্ধন ঘটে যেভাবে

কালচারাল শক বা ‘সাংস্কৃতিক অভিঘাত’ শব্দ দুটির সাথে আমার পরিচিতি বহুদিনের। চার দশক আগে মার্কিন সরকারের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার বৃত্তি বাগিয়ে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের জন্য উড়াল দিয়েছিলাম হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের অভিমুখে। সেটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম বিদেশ যাত্রা। নবীন বরন উৎসবে ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার কর্তৃপক্ষ আমাকেসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন মার্কিন সংস্কৃতির আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তারা জানিয়েছিলেন মার্কিনদের জীবনধারার বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের কাছে অপরিচিত এবং অস্বস্তিকর লাগতে পারে, সৃষ্টি করতে পারা আমাদের ওপর অনাবশ্যক মানসিক চাপ। তবে তারা আশ্বস্ত করেছিলেন, আমরা দ্রুত মার্কিন সংস্কৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবো। তাদের এ উপদেশের প্রতিফলন তৎক্ষণাৎ পেয়ে গিয়েছিলাম। জনা পঁচিশেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ছিল এক রাজসিক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। ভোজ শেষে দেখি অর্ধেকের বেশি দামি দামি খাবার; যেগুলোর বেশির ভাগ জীবনে প্রথম দেখলাম, অথচ তা ধরাই হয়নি। কিছুক্ষণ পরে আমার সামনে দিয়ে পরিছন্নকর্মীরা এসে সে অছোঁয়া খাবারগুলো ‘গারবেজ ব্যাগে’ ভরে ‘বিনে’ ফেলার জন্য নিয়ে গেলো। সে সময় আমার দেশের অর্ধভুক্ত মানুষের কথা ভেবে মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম।

দিন গড়িয়ে যেতে লাগলো আর বিস্ময় নিয়ে দেখতে পেলাম আমরা যা জানি আর ভাবি, সব কিছুরই বিপরীতধর্মী চিন্তা মার্কিনদের মগজে স্থিতু হয়ে আছে। তারা তারিখ লিখতে গিয়ে দিনের আগে মাসটা লিখে দেয়, গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরে বাম সিটে বসে, ফুটবলকে বলে সকার, ফুটপাথকে বলে সাইড ওয়াক, সিনেমাকে বলে মুভি, রেস্তোরাঁর বিলকে বলে চেক ইত্যাদি আরও কত শত নাম! সেই প্রথম (১৯৮৫ সালে) দেখলাম ক্যাশের পরিবর্তে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, টাকা উত্তোলনের জন্য এটিএম মেশিন, টাইপিং সহজ করে দেওয়ার জন্য ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রিন্টার। দ্রুত ধাবমান গাড়ি, বিশাল বিশাল উড়াল সড়ক, নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা, সুশাসন, শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য আর সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠেছিল। এর সাথে ছিল স্কিন কালারের সমস্যা। চারিদিকে ভিন্ন বর্ণের লোকজন দেখে নিজেকে একাকী এবং অসহায় লাগত। তবে সাদা চামড়ার মার্কিন সহকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা মার্কিন মুলুকে আমার জীবন ধারা দিনে দিনে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।

1

সংস্কৃতি হোল একটা জাতির জীবনযাপন, মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও বিশ্বাসের সমষ্টি। বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য, নদী-মাটি-কৃষি ও উপনিবেশ-উত্তর ইতিহাসের ফসল। অন্যদিকে মার্কিন সংস্কৃতির ইতিহাস মাত্র আড়াইশো বছরের পুরোনো, যেখানে বহু জাতের অভিবাসী এসে নানা ধাঁচের সংস্কৃতির মিলন ঘটিয়ে আমেরিকা মহাদেশে নতুন ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পূর্ব পট ভিন্ন হবার কারণে বাঙালি ও মার্কিন সংস্কৃতির দর্শন ভিন্ন। বাঙালি সমাজ এখনো সমষ্টিকেন্দ্রিক; যৌথ পরিবার ভেঙে নিউক্লিয়ার হলেও মা-বাবা, দাদা-দাদি, আত্মীয় স্বজনের সাথে নিবিড় বন্ধন এ সমাজে এখনও প্রত্যাশিত। বড়দের মতামতকে সম্মান করা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে সবার অংশগ্রহণ স্বাভাবিক নিয়ম। বিয়েতে পরিবারের সম্মতি, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান করা আর দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া প্রথাগত ব্যাপার। কিন্তু মার্কিনদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সন্তানদের বয়স ১৮ পার হলে পিতা-মাতা তাদের স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ দেয়। তাদের কাছে পরিবার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যক্তির পছন্দ, ক্যারিয়ার ও স্বাধীনতা অগ্রাধিকার পায়। বাবা মা এবং বড়দের সাথে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয় আর বিয়েতে ব্যক্তিগত পছন্দ হয়ে থাকে শেষ কথা। পরিবারের বাকিরা পালন করে সাক্ষী গোপালের ভূমিকা। 

বাঙালিদের আতিথেয়তা সমাজ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেউ বাড়ি এলে না খাইয়ে ছাড়া হয়না, কারণ বাঙালির কাছে অতিথি হচ্ছে নারায়ণ। সময় জ্ঞানে, নিয়ম অনুসরণে এবং প্রতিশ্রুতি পালনে বাঙালির চারিত্রিক দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। সমাজে আবেগ প্রকাশ করা,গল্প আড্ডায় মেতে থাকা, পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করা বাঙালির গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; আর ইশারা ইঙ্গিতে মনোভাব প্রকাশ করা সামাজিক ভাবে বাঙালিদের কাছে গ্রহণযোগ্য। বাঙালিরা সরাসরি না বলাকে অভদ্রতা মনে করে আর সামাজিক কর্মকাণ্ডে ‘লোকে কি বলবে’ এ চিন্তা তাদের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মার্কিনদের কাছে সময়ানুবর্তিতা, স্পষ্ট কথা ও ব্যক্তিগত পরিসর বা পার্সোনাল স্পেস খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইনিয়ে বিনিয়ে কথা না বলে টু দ্য পয়েন্ট কথা বলাটা পছন্দ করে এবং মনে করে সরাসরি ‘না’ বলাটা সৎ ও পেশাদার আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তাদের কাছে সমাজের চেয়ে আইন ও ব্যক্তিগত অধিকার বড়। আতিথেয়তা নিয়ে তাদের মধ্যে বাড়াবাড়ি নেই এবং আতিথেয়তার জন্য তারা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে সময় নির্ধারণ করে।

বাঙালিদের বছর ঘোরে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, দুর্গা পূজা, নবান্ন ঘিরে। উৎসব মানেই একসাথে খাওয়া, নতুন জামা, গান বাজনা ও সামাজিক মিলন। পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানি ছাড়াও বাঙালি জীবনে ভাত, মাছ, ডাল অবিচ্ছেদ্য অংশ। রান্নায় তেল-মশলা আর অতিথি আপ্যায়নে বাঙালির ভালবাসা প্রকাশ পায়। আমেরিকান উৎসব ফোরথ অফ জুলাই, হ্যালোইন, থাঙ্কস গিভিং, ক্রিসমাস। টার্কি, বারবিকিউ, পাম্পকিন পাই, ফাস্ট ফুড মার্কিনদের কাছে আচার অনুষ্ঠানের জন্য প্রিয় খাবার। তাদের মধ্যে আছে পট লাক কালচার, যেখানে খাবার আয়োজনে সবাই কিছু না কিছু অবদান রাখে। ব্যক্তিগত ডায়েটে ভেগান, কিটো স্বাভাবিকভাবে মানা হয়। বাঙালি পরিবারে শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদার সিঁড়ি ভাবা হয়। বাঙালির কাছে এখনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরি নিরাপদ পছন্দ। মুখস্থ বিদ্যা,পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনা ও শিক্ষকের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা চালু আছে। চাকরিতে সিনিয়রটি ও ক্ষমতা বাঙালিদের কাছে মূল্যবান। মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রশ্ন করা, ক্রিটিকাল থিঙ্কিং ও ‘নিজের পথ বেছে নেওয়া’ শেখায়। ‘গ্যাপ ইয়ার’, মেজর বদলানো, উদ্যোক্তা হওয়া তাদের কাছে সন্মানজনক। কাজের ক্ষেত্রে জীবনযাপন ও চাকরির ভারসাম্য বজায় রাখা, চাকরি বদল এবং সরাসরি ফিড ব্যাক তাদের সংস্কৃতির অংশ; মার্কিনদের ভাষায় ব্যর্থতা হোল শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা।

2

বাঙালির জীবনে ধর্ম ও লোকাচার মিশে আছে, সব ধর্মের লোক নিজ নিজ পার্বণ পালন করলেও সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্র-নজরুল-বাউল-লালন সবাইকে ছুঁয়ে যায়। তবে ধর্ম ব্যক্তিগত হলেও, তা বাঙালির সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পক্ষান্তরে মার্কিনরা সাংবিধানিকভাবে সেকুলার, তাদের চার্চ-ষ্টেট আলাদা। খ্রিষ্ট ধর্ম সংখ্যা গরিষ্ঠ হলেও, ধর্মীয় ভাবে তারা গোঁড়া নয়, কিন্তু চিন্তা ভাবনায় তারা আধ্যাত্মিক। যদিও আমেরিকান রাজনীতিতে ধর্মীয় লবিগুলোর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, মার্কিনরা সাধারণত কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করে না। বাঙালিরা হোল আবেগপ্রধান, কবিতা, গান, আড্ডা ছাড়া বাঙালির জীবন অসম্পূর্ণ; সিনেমা নাটকে মেলো ড্রামা তাদের পছন্দনীয়। বাঙালির যুক্তি-তর্কে, আবেগ, উপমা, গল্প ঢুকে পরে। অপর দিকে মার্কিনরা কথা ও যুক্তি দিয়ে জীবন যাচাই করে, তারা সরাসরি কথা বলে এবং ব্যক্তিগত গল্প বলতে ভালবাসে। তাদের মধ্যে পলিটিক্যাল কারেক্টনেস ও ফ্রি স্পিস নিয়ে টানা পোড়ান থাকলেও মত প্রকাশের অধিকার সাংবিধানিক।

বাঙালি সংস্কৃতি শিকড়, আবেগ, সমষ্টি ও ঐতিহ্যের গল্প বলে। আমেরিকান সংস্কৃতি চিন্তা শক্তি, যুক্তি, ব্যক্তি ও উদ্ভাবনের কথা বলে। একটা মাটির মত জীবনযাপনকে ধারণ করে, অন্যটা মানুষকে হাওয়ার মত উড়তে শেখায়। এখানে শ্রেষ্ঠ-নিকৃষ্ট বিচার্য নয়, বরং দুই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পারস্পরিকভাবে শেখার অঢেল সুযোগ আছে। বাঙালিরা মার্কিনদের কাছ থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের চিন্তা-ভাবনা নিতে পারে, আর মার্কিনরা বাঙালির পারিবারিক বন্ধন ও আন্তরিকতা থেকে শিখতে পারে। তরুণ বাঙালি এখন নেটফ্লিক্স দেখে, স্টার্টআপ খোলে, নানা ধরনের কফির স্বাদ নেয়, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে, ইন্টারনেট সারফ করে অজানাকে জানার চেষ্টা করে। আবার আমেরিকান শহরগুলোতে পহেলা বৈশাখ, বাঙালি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ভোজ, যোগ ব্যায়াম, বাংলা ছবি ইত্যাদি ধীরে ধীরে মার্কিনদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বর্তমানকালে অভিবাসী বাঙালিরা ‘দেশি’ ও ‘আমেরিকান’ পরিচয় মিলিয়ে তৃতীয় একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। কর্মক্ষেত্রে আমেরিকানদের দায়িত্ববোধ, কর্ম পর্যালোচনা ও সরাসরি ফিডব্যাকের ধারণা শিখছে বাঙালি, আর আমেরিকানরা শিখছে বাঙালির পারিবারিক মূল্যবোধ ও আতিথেয়তা। দিন শেষে নদীর মত চলতে চলতে সংস্কৃতির দুই ধারা মিলে মিশে অন্তহীন নতুন মোহনা সৃষ্টি করে চলেছে।   
লেখক: বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায়

রাশেদুল হাসান
মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায়
[ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, জন্ম ১ ডিসেম্বর ১৯৩১ - মৃত্যু ১২ জুলাই ২০২৬]

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম পুরোধা ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের আইন অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ছিলেন।

জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স ছিলেন একজন জোতদার (ধনী কৃষক)। তার শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ অনার্স এবং এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

১৯৬০ সালের ২৭ মে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আইন পেশা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট থেকে শুরু পরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। আইন অঙ্গনে তার পাণ্ডিত্য শুধু সাধারণ ওকালতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্প ও বাণিজ্য আইন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন। তার নেতৃত্বে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গতি পেয়েছিল।

পড়ুন: ব্যতিক্রমী স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একজন সচেতন পেশাজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ওই সময় হাইকোর্টের আইনজীবীদের ক্ষুদ্র ও সাহসী দলটির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। আইনজীবীদের এ গ্রুপটি তখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠন এবং আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

রাজনীতিতে জমির উদ্দিন সরকারের হাতেখড়ি হয় ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দল গঠনের উদ্যোগ নেন, তখন জমির উদ্দিন সরকার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের (জাগদল) গঠনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব পান। পরে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।

জমির উদ্দিন সরকার পাঁচবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার এবং পরে ঢাকা-৯ ও পঞ্চগড়-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন এবং জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ প্রণয়ণের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার তত্ত্বাবধানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে স্বল্পকালীন বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলের খসড়া প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। 

অষ্টম জাতীয় সংসদে (২০০১-২০০৯) জমির উদ্দিন সরকার জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় তিনি পদাধিকার বলে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। সংসদীয় রীতিনীতি রক্ষায় তার নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা দল-মত নির্বিশেষে প্রশংসিত হয়েছে। সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনে তিনি অত্যন্ত সংযম, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

তার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি উপকূলীয় দেশগুলোর অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন।

পড়ুন: ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখক। ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘স্ট্রংগার ইউনাইটেড ন্যাশনস ফর পিসফুল ওয়েলফেয়ার ওয়াল্ড’, ‘পাল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’, ‘গ্লিমপেসেস অব ইন্টারন্যাশনাল ল’, ‘অষ্টম সংসদে স্পিকার’, ‘দি ল অব দি সি’, ‘ল অব দি ইন্টান্যাশনাল রিভারস এ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্রস’, ‘লন্ডনে বন্ধু-বান্ধব’, ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’ ও ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’ উল্লেখযোগ্য বই।

রাজনীতির নানা সংকটময় সময়ে জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন ভারসাম্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তিনি সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দলীয় অবস্থান থেকে বক্তব্য দিলেও তার অনেক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্ব পেয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে তিনি সাদাসিধে জীবনযাপন, ভদ্রতা ও শালীন আচরণের জন্য পরিচিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তার সৌজন্যপূর্ণ আচরণ এবং যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তাকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। দেশের আইনজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন।

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন জমির উদ্দিন সরকার। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

ফেসবুক, ইউটিউব কেন অফিস করে না বাংলাদেশে?

অদিতি করিম
ফেসবুক, ইউটিউব কেন অফিস করে না বাংলাদেশে?

বাংলাদেশে এখন মতপ্রকাশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়া কেবল স্বাভাবিক জনমতকে প্রভাবিত করছে না, এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বহু মাত্রিক সমস্যা। এখন সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের চরিত্রহননের অন্যতম হাতিয়ার। অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান বাহন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অবাধে চলছে ব্ল্যাকমেল, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার এবং মিথ্যাচার। জনমত পাল্টে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার বটবাহিনী। গুজব, অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে করা হচ্ছে বিভ্রান্ত। শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন রীতিমতো আতঙ্কের নাম। দেশে দেশে তাই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে এসব উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতা ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন অপব্যবহার, সাইবার অপরাধ এবং মিথ্যাচার ঠেকাতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ভারতেও সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো সেই দেশের আইনের আওতায় চলে। ফলে অধিকাংশ দেশই সাইবার অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যেন অসহায়। একদিকে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নেই তেমন কার্যকর আইন, অন্যদিকে ফেসবুক, টুইটার কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। ফলে সাইবার অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। এদের মধ্যে চলতি বছরের জুনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন। ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। ফেসবুক বা ইউটিউব বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে। বাংলাদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতি বছর ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করে মেটা এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে ইউটিউবের আয়ও ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কাজেই বাংলাদেশ ফেসবুক বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক বিশাল বাজার। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এত বড় বাজার আছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য। বাংলাদেশ থেকে এত বিপুল পরিমাণ আয় করলেও বাংলাদেশ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর। এদের নেই কোনো জবাবদিহিতা। এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো আপত্তিকর, অশালীন, দেশের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট পোস্ট করা হলে বাংলাদেশ কেবল ফেসবুককে অনুরোধ করতে পারে, আপত্তিকর কন্টেন্টটি সরিয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের মর্জি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়, এ কনটেন্ট সরাবে কি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরাসরি আপত্তিকর লিংক সরানো, কনটেন্ট ব্লক করার মতো সক্ষমতা নেই দেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির। সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষ বরাবর অনুরোধ পাঠিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা তাদের গাইডলাইন ও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে যায়, এমন সব লিংক বা কনটেন্ট অপসারণ করে বাংলাদেশের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুরোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কাছে যায় তার তিন ভাগের এক ভাগেরও কম অনুরোধে তারা সাড়া দেয়। তাছাড়া এসব কনটেন্ট অপসারণে এত বেশি সময় নেয় যে এটা সরানোর আগেই যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যায়। বাংলাদেশ যেন ফেসবুক, ইউটিউবের কাছে জিম্মি। এসব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম যেন একালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধান আইনে আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে অফিস না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশের আইনের আওতায় আসবে না। যত কঠিন আইন করা হোক না কেন তা শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারের একটি বড় অংশ হচ্ছে বিদেশ থেকে। আইন যতই কঠোর হোক, বিদেশ বসে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে এ আইন কিছুই করতে পারবে না।

তাই সাইবার অপরাধ এবং হিংসাত্মক অপপ্রচার বন্ধের একমাত্র উপায় হলো মেটা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অফিস করতে বাধ্য করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার প্রতিরোধ করেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে কখনো বা সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের দেশে অফিস খুলতে বাধ্য করেছে। মেক্সিকোর কথাই ধরা যাক, মাদক নেটওয়ার্কের জন্য সেদেশে ফেসবুক হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। সরকার বিষয়টি জানার পর ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু ফেসবুক মেক্সিকো সরকারের কথায় কান দেয়নি। অতঃপর ওই দেশের সরকার সাময়িকভাবে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা সেখানে অফিস করতে বাধ্য হয়। জার্মানি ফেসবুক কে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের দেশে অফিস না করলে এবং আইন না মানলে তারা এ প্ল্যাটফর্মকে কার্যক্রম করতে দেবে না। এভাবেই ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনেছে। শুধু তাই নয়. এসব আইনে বিপুল পরিমাণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে, এসব প্ল্যাটফর্মে কোনো কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও হিংসাত্মক পোস্ট হলে তার দায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর বর্তায়। প্রতি বছর মেটা কে মিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হয় এখন। ফলে কোনো অপতথ্য পোস্ট যেন না হয় সেদিকে নজর রাখে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নিজেই। এটাই হলো অপতথ্য প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে আজ যা ঘটছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এত ভয়াবহ না হলেও এর কাছাকাছি অবস্থা ছিল। সেখান থেকে আইন করে, ফেসবুক ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় এনে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভারতে কার্যালয় করতে বাধ্য করেছে। তাদের ভারতীয় আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য প্রকাশ করলে সরাসরি প্রথম এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বলা হয়। এর ফলে কাউকে হয়রানি করা, ব্ল্যাকমেল করা পোস্টগুলো দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামিয়ে ফেলে। ভারতে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রধানত আইনগত নীতিমালা এবং কঠোর সরকারি নির্দেশিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভুয়া খবর প্রতিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০ (ওঞ অপঃ), তথ্যপ্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস এবং ডিজিটাল মিডিয়া এথিক্স কোড) রুলস, ২০২১ (ওঞ জঁষবং, ২০২১) এর মাধ্যমে ভারত মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত রেখেই অপতথ্য, গুজব এবং হিংসাত্মক পোস্ট প্রতিরোধে অনেকটাই সফল হয়েছে। বিভিন্ন দেশ মেটা এবং গুগলের অফিসের শাখা তাদের দেশে করতে বাধ্য করেছে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২০ টাকা ধরে) জরিমানা করেছে আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশন (ডিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও গুগলকে ২১ কোটি ইউরো জরিমানা করেছে ফ্রান্স সরকার। অস্ট্রেলিয়া গত বছর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, চরিত্র হনন এবং হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সব আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। মেটা বা গুগলের কোনো শাখা অফিস নেই বাংলাদেশে অথচ বাংলাদেশের ছয় কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। মেটার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ফেসবুক ব্যবহারের বিশ্বে দশম। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম ব্যবহারকারী দেশ সিংগাপুর, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েলে মেটা অফিস খুলেছে।

কাজেই বাংলাদেশকেও সেই পথে যেতে হবে। সমস্যা সমাধানের উৎসে যেতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে বাধ্য করতে হবে। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাস আমাদের সব অর্জন ধ্বংস করে দেবে।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

ইমেইল : [email protected]

সরকারের সুবিধাজনক অবস্থার অসুবিধা

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
সরকারের সুবিধাজনক অবস্থার অসুবিধা

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। রাজপথ ও জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের মতো একটি অঘটনপটীয়সী বড় দলের বিরোধিতার মুখোমুখি তাদের হতে হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যসংখ্যা ৭৭ হওয়া সত্ত্বেও পারফরম্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল বিরোধী দলকে কাবু করতে বিএনপিকে তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। কিন্তু এ ধরনের একটি সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার যদি অতি-আত্মপ্রসাদের মধ্যে থাকে, তাহলে এখন আওয়ামী লীগকে যে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে, বিএনপিকেও সেই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হতে পারে, এই উপলব্ধি মাথায় রেখে কাজ করলে বিএনপির পক্ষে সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনা করা তেমন জটিল হবে বলে মনে হয় না। সুবিধাজনক এবং অনুকূল অবস্থার কিছু অসুবিধা ও প্রতিকূল অবস্থা থাকে। বিএনপি সরকারে এসেছে, এখনো ছয় মাস পূর্ণ হয়নি। কিন্তু ‘সকাল দেখে বোঝা যায়, সারা দিন কেমন কাটবে’, বলে যে কথাটি প্রচলিত আছে, তা ভাবনায় রেখে কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আদৌ ভালো নয়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর কোনো রাজনৈতিক দল যদি ততোধিক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ক্ষমতার বাইরে থাকতে বাধ্য হয়ে অথবা শীতনিদ্রায় কাটিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হয়, তাহলে সেই দলের সরকারকে যে সংকটগুলোর মুখে পড়তে হয়, বিএনপি সরকারকে ইতোমধ্যে অনুরূপ সংকটে পড়তে হয়েছে।

বিএনপি ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। সময়ের বিচারে প্রায় এক প্রজন্মের ব্যবধান। এ সময়ের মধ্যে বদলে গেছে মানুষের মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচার-আচরণ। দ্রুততর গতিতে পরিবর্তিত সামাজিক, রাজনৈতিক মূল্যবোধ এবং নতুন নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও কৌশল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিন্ন এক রূপ দিয়েছে। দীর্ঘকাল জনগণের ওপর চেপে থাকা ফ্যাসিবাদী মনোভাব পোষণকারী একটি দলের পতনে জনগণের মাঝে যে নবতর প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণে ব্যর্থ হলে সমাজে অসন্তোষ বেড়ে রাজনীতিকে টালমাটাল করে তুলতে যে খুব বেশি সময় লাগে না, ২০২৪-এ ক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে সমূলে উৎপাটিত হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারই এর বড় প্রমাণ। ২০০৮ সালে ওই সময়ের কেয়ারটেকার সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর যৌথ রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনি অন্যায় ও জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর আন্দোলন শুরু করা তো সম্ভবই হয়নি, এমনকি দল দুটি তাদের রুটিন রাজনৈতিক কর্মসূচি পর্যন্ত পালন করতে পারেনি।

বিএনপি সরকারের নিজেদের দলীয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমানতার কারণে আওয়ামী লীগ অদূরভবিষ্যতে রাজনৈতিক ময়দানে অবতীর্ণ হলে সরকারে থাকাকালে তারা যে নিপীড়নমূলক কৌশল প্রয়োগ করে বিএনপি ও জামায়াতকে যেভাবে রাজনৈতিক মাঠ থেকে অপসারণ করেছিল, বিএনপি সরকারের পক্ষে আওয়ামী লীগের ওপর তা প্রয়োগ করা সম্ভব হবে কি না, সে ব্যাপারে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সন্দিহান। তদুপরি বিএনপি-জামায়াতের মানসিক দূরত্ব দিনদিন যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে বিপদের সময়ে বিএনপি জামায়াতকে কাছে পাবে, এমন আশা করা যায় না। অনুরূপ পরিস্থিতিতে সংসদে বিএনপির ২১২ সদস্যের বিপুল শক্তির পক্ষে ফলপ্রসূ কিছু করা সম্ভব হবে না। ২০২৪ সালে তো সংসদে আওয়ামী লীগের ২২৪ সদস্যের  অপ্রতিরোধ্য শক্তি ছিল। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ইতিহাসে অমিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী, সবচেয়ে দাম্ভিক ও বেপরোয়া শাসক শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারকে মাত্র ২০ দিনের আন্দোলনে বিদায় নিতে হয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বিষয়গুলো মাথায় রাখলে ভালো করবেন।     

চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পর্বতসম উঁচু ছিল না। অভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে আগত ড. ইউনূসের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বরং প্রত্যাশা বেশি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং আশা পূরণের দায়িত্ব বর্তেছে বিএনপি সরকারের ওপর। খুবই সাধারণ এসব প্রত্যাশা বা জন-আকাক্সক্ষা- হত্যা-ধর্ষণ-চাঁদাবাজি-অবৈধ দখল কার্যকরভাবে বন্ধ করা, খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, মূল্যবৃদ্ধি না করে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ জরুরি সেবাগুলোর মান বৃদ্ধি করা। কিন্তু সরকার এসবের কোনোটাই নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। ধর্ষণ-হত্যা-চাঁদাবাজি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই লক্ষ্য করা গেছে যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নতুন এক গোষ্ঠীর হাতে এসেছে। যেহেতু তারা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধ জগতে ঠাঁই পায়নি, অতএব তারা শূন্যস্থান পূরণ করেছে অধিক উৎসাহে। অপরাধীদের চেহারার পরিবর্তন হয়েছে মাত্র, অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। নতুন অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়ালে ছিল না। বিএনপি অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। কিন্তু সরকারে আসার পরও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুপস্থিতি অথবা ‘নিজেদের লোকদের’ বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণে ‘লজ্জাবোধ’ জনমনে চরম হতাশার দৃষ্টি হয়েছে। তারা পথেঘাটে, এমনকি নিজ বাড়িতে নিরাপদবোধ করতে পারছে না।

দীর্ঘকাল পর ক্ষমতায় আসীন বিএনপির মাঝে সরকার পরিচালনার অনভিজ্ঞতাজনিত জড়তা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু  বিএনপি যদি তার দলীয় নীতি ও আদর্শের ভিত্তির ওপর অটল থাকতে চায় তাহলে অপরাধী নিজ দলের হলেও তাদের দায়মুক্তভাবে অপরাধ সংঘটনের লাইসেন্স দিতে পারে না। শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের পতনের অনেক কারণের মধ্যে একটি ছিল দলীয় নেতা-কর্মীদের দায়মুক্ত অপরাধ পরিচালনার সুযোগ দেওয়া। শেখ হাসিনা আত্মতুষ্ট ছিলেন যে তাঁর অনুসারীরা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে সারা দেশে শত শত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। কিন্তু এসবের আড়ালে আওয়ামী নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি ও দখলবাণিজ্য ছিল অপরাধের দায়মুক্ত কাণ্ডকারবার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন গড়ে না তোলার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন, যা প্রশংসিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অপরাধের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছেন। বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না, অপরাধ বেড়েই চলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে ৩১৭টি, বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক পরপর, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৬৪টি ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হন, যার মধ্যে ১১ জন গুলিবিদ্ধ। এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত হন, যার মধ্যে ৩৭ জন গুলিবিদ্ধ। মার্চে ১১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৯১২ জন আহত হন, যার মধ্যে ১৫ জন গুলিবিদ্ধ। বাংলাদেশের অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি, দুর্বল পুলিশিব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীরা পর্দার আড়াল থেকে প্রকাশ্যে ফিরে আসাই সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দলীয় কোন্দল এখন রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। দিনদুপুরে একের পর এক হত্যা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিএনপি সরকার সম্ভবত এখনো নিরুদ্বিগ্ন যে আওয়ামী লীগপ্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ও তাঁর দলের নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ মানবতাবিরোধী মামলাগুলো দায়ের করেছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ও ঘোষণা করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৪৫৩টি হত্যা মামলাসহ মোট ৬৬৩টি মামলাও দায়ের হয়েছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে। দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে এবং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে জাতীয় পর্যায়ের কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এক অর্থে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক পথের প্রধান কাঁটা অপসারণ করে দেওয়ায় তারা গা-ঝাড়া দিয়ে বলছে, ‘আমরা তো কিছু করিনি’ এবং তারা অসত্য কিছু বলছে না।

গণ অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে, দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। তারা আর বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। শিগগিরই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে।’ সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং আইসিটি অ্যাক্টের আওতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করার আইনি সুযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন যে, খুব শিগগির তাদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হবে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপিকে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা-মুক্ত করার কাজ যেখানে শেষ করেছে, বিএনপি সরকার সেখান থেকে আওয়ামী লীগকে অকার্যকর রাজনৈতিক দলে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে রয়টার্সের সঙ্গে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে আগামী ডিসেম্বরে তাঁর নেতা-কর্মীদের নিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক উপদেষ্টা বলেছেন, শেখ হাসিনা এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারা দেশে ফিরবেন কী ফিরবেন না, বা তাঁরা কী করবেন সেটি তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তিনি তাঁদের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে বিএনপি সরকারের অবস্থানের কথাও জানান।

আওয়ামী লীগপ্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নিজ দেশে ফিরে আসবেন, এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে। অনেকগুলো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। অতএব আইনের শাসন নিশ্চিত করার স্বার্থে বিএনপি সরকার শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের অন্যান্য সাজাপ্রাপ্ত বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আওতায় থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক।  দৃশ্যত সরকার নিজেকে নিরুদ্বিগ্ন ভাবলেও তার এগিয়ে যাওয়ার পথ তেমন নির্ঝঞ্ঝাট হবে না। বিএনপি ও বিএনপি সরকারের ওপর যে জনআস্থা ছিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে জনগণের সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে রাজনৈতিক ফ্রন্টে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার সংগ্রামে জনগণই সরকারের পাশে থাকবে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক