বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ এক ব-দ্বীপ রাষ্ট্র। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা নিচু সমতলভূমি। ঘন বর্ষা, উজানের ঢল আর ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চাপ এই ভূখণ্ডের নিয়তির অংশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এখানে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো নগরে সামান্য কিংবা মাঝারি বৃষ্টিতেই যখন রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়, তখন সেটিকে নিছক প্রকৃতির খেয়াল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
১২ জুলাই মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার এবং ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর অসংখ্য সড়ক ডুবে যাওয়ার ঘটনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানদণ্ডে ‘অতিভারী বর্ষণ’ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা হলো- এর চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিতেও ঢাকা ডোবে। কারণ শহরের পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিজেই ভেঙে পড়েছে।
ঢাকার সংকটের মূলে আছে হারিয়ে যাওয়া খাল ও জলাধার। একসময় নগরীর চারপাশে অসংখ্য খালবিল জলাধার বৃষ্টির পানি ধারণ করত অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নিয়ন্ত্রণহীন নগর সম্প্রসারণের চাপে সেসবের বড় অংশ ভরাট বা দখল হয়ে গেছে। নগর-পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বারবার সতর্ক করেছেন, টেকসই সমাধানের জন্য দরকার সব সংস্থার সমন্বিত ও বৃহৎ পরিকল্পনা। খণ্ড খণ্ড উদ্যোগে সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সমাধান আসে না।
তার মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কারণ পরিকল্পনা প্রণয়ন আর বাস্তবায়নের মধ্যে বিরাট ফারাক থেকে গেছে। এ বছর বর্ষার আগেই দুই সিটি করপোরেশন শহরের ১৪১টি স্থানকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই উত্তর সিটির এলাকায়। অথচ খাল উদ্ধারের নামে নেওয়া প্রকল্পেও অনিয়মের ছায়া দেখা যায়। মান্ডা-শ্যামপুর-কালুনগর খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পে অনেক অপ্রাসঙ্গিক অবকাঠামো যুক্ত হওয়ায় মূল লক্ষ্যই ঝাপসা হয়ে পড়ে। দখলদারদের সঙ্গে আপস হলে ভবিষ্যতে সব খালই ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরও খাল-জলাশয় দখলের দায়ে কাউকে শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এই পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও দখলদারি সংস্কৃতি অক্ষত থেকে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের চিত্র আরো বিস্ময়কর। সাত-আট বছর ধরে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা; ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ডুবে যাওয়ায় নাগরিকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- টাকা গেল কোথায়?
সিডিএর মূল মেগাপ্রকল্পটি ২০১৭ সালে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকায় অনুমোদিত হলেও ২০২৩ সালে তার আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায়। আর মেয়াদ বেড়েছে একাধিকবার। একসময় সিডিএ ও সিটি করপোরেশন নিজেরাই স্বীকার করেছিল, দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতা চললেও এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কোনো টেকসই গবেষণা হয়নি। বর্তমানে নতুন করে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে খাল খনন ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা বা সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির কাঠামো এখনো দৃশ্যমান নয়।
এক বৃষ্টি একই ব্যর্থতা, জবাবদিহি কারসিলেটের সংকট কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। তবে একই মূল রোগে আক্রান্ত। সুরমা-কুশিয়ারার মতো প্রধান নদীগুলোর নাব্য হারানোয় উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির পানি ধারণ করার ক্ষমতা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট বিভাগের প্রকৌশলীরা। যাঁরা নদীখননে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন, যা এখনো বিবেচনাধীন বলে জানা যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট শাখার নেতা আবদুল করিম কিম দীর্ঘদিন ধরে জরুরি ভিত্তিতে সুরমা খননের দাবি জানিয়ে আসছেন। নইলে প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ হলো, নগরের জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণের স্বাভাবিক ক্ষমতাই কমে গেছে। ফলে সাধারণ বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা আর ঢল নামলেই তা বন্যায় রূপ নেয়।
এখানেই কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি সামনে আসে। স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনা করেছে একাধিক সরকার। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জুলাই গণ অভ্যুত্থানপরবর্তী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এখন ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রতিটি সরকারের আমলেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে আধুনিক নগরায়ণ ও নাগরিক সুবিধার কথা এসেছে। প্রতিটি আমলেই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের জলাবদ্ধতা কোনো একটি সরকারের সমস্যা নয়, এটি দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। যেখানে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বারবার প্রকল্পের সুফল নষ্ট করে দিয়েছে। তাই এ প্রশ্ন ন্যায্য : যারা বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে বা ক্ষমতার অংশীদার হয়ে নাগরিক জীবনের এই মৌলিক ও পূর্বানুমানযোগ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হন, রাজনৈতিক জবাবদিহির সেই দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে? ব্যর্থতার পরও পদত্যাগ, নেতৃত্ব পরিবর্তন বা স্বচ্ছ মূল্যায়নের সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে কেন এত দুর্বল?
জনগণের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খালে-ড্রেনে বর্জ্য ফেলা, জলাশয় ভরাটে নীরব সহযোগিতা, নিয়ম না মানার প্রবণতা- এসব নাগরিক আচরণও সংকট গভীর করে। কিন্তু এই অসচেতনতা দেখিয়ে রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের আইন প্রয়োগ, পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত দায়িত্ব এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে নাগরিকরা কেন প্রায়ই দলীয় আবেগ, স্লোগান বা ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বাস্তব কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, সেই আত্মজিজ্ঞাসাও জরুরি। এটি জনগণকে হেয় করার জন্য নয়, বরং সচেতন নাগরিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা থেকেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিঃসন্দেহে বাড়ছে, কিন্তু সব ব্যর্থতার দায় জলবায়ুর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া অসততা হবে। প্রাকৃতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এক জিনিস, মানবসৃষ্ট নগর-অব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সমাধানের পথ অজানা নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পানিব্যবস্থাপনা, খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, প্রকল্প ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা, একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা এবং প্রকৃত রাজনৈতিক জবাবদিহি। একটি রাষ্ট্রে একই জনদুর্ভোগ যদি দশকের পর দশক ফিরে আসে, তাহলে সেটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকে না। তা শাসনব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির সংকটে পরিণত হয়। জনগণ নিজেই যদি ব্যর্থতার হিসাব না চায়, তবে পরিবর্তনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে কীভাবে?
লেখক : প্যারিসপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক










