জুলাই জাতীয় সনদ ও উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৭ সদস্যের এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। তবে বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি সদস্যপদ শূন্য রাখা হয়েছে।
এদিকে জনরায়কে উপেক্ষা করে এই বিশেষ কমিটি গঠনের অভিযোগ এনে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। এ সময় নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়া নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের কড়া জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (১৩ জুলাই) ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি।
কমিটির সদস্যরা হলেন সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ (কক্সবাজার-১), সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম (বরগুনা-২), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (ঝিনাইদহ-১), জয়নাল আবেদিন (বরিশাল-৩), মোহাম্মদ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), হাবিবুর রহমান (ভোলা-১), মোহাম্মদ নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), ফারজানা শারমিন (নাটোর-১), সাকিলা ফারজানা (মহিলা আসন-১), মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩) ও মোহাম্মদ অলিউল্লাহ (বরগুনা-১)।
প্রস্তাবিত কমিটি উত্থাপনের পর সংসদে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি প্রথম অধিবেশনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উত্থাপন করেছিলেন এবং সেই দিনই বিরোধী দল অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক দফায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করলেও বিরোধী দল কমিটির জন্য কোনো সদস্যের নাম দেয়নি। কারণ বিরোধী দল নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তারা জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ, যেমনটি বর্তমান সরকারি দলও নির্বাচনের আগে ওয়াদাবদ্ধ ছিল।
ডা. শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে সব দলই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছিল এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হবে। এরই প্রেক্ষিতে তারা দুটি শপথ নিয়েছেন— একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিরোধী দল মনে করে তাদের দুটি শপথই বহাল ও কার্যকর আছে। সুতরাং, সেই সংস্কার পরিষদকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যদি এই সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, তবে তারা এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছেন।
তিনি আরো বলেন, তারা আগের অবস্থানেই অনড় আছেন। গণতন্ত্রের মূল দাবিই হচ্ছে জনগণের মতামতকে মেনে নেওয়া, যা এই ক্ষেত্রে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের রায়। এই বিপুল জনমতকে অবলীলায় শেষ করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে এবং বিদ্রোহী হয়ে উঠবে।
জনগণের এই মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা উচিত হবে না উল্লেখ করে ড. শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন, জনগণের রায়কে সম্মান না জানানোর প্রতিবাদে তারা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং সংসদ থেকে ওয়াকআউট করবেন। এই বক্তব্য শেষ করেই তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে এর কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা যে পয়েন্টে ওয়াকআউট করছেন তা তাদের বিবেচনায় সঠিক হতে পারে, তবে গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। এই লেজিসলেচারে যদি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা না হয়, তবে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও দেশকে ওই বিতর্কিত সংশোধনীর ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে। সুতরাং, সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন ও সংবিধান সংশোধন ছাড়া জাতিকে নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
বিরোধীদলীয় নেতার দুটি শপথের দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুটি শপথ নিলে প্রথম শপথটিই তো অবৈধ হয়ে যায়। কারণ বর্তমান সংবিধান অনুসারেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সেই সংবিধান অনুযায়ীই সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সরকারি ও বিরোধী উভয় দল আলোচনা করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানে কোথায় আছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেওয়া যাবে? তিনি একে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে আইনি উপদেষ্টার নথিতে পাস করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল, যা প্রথম দিন থেকেই অবৈধ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ এবং তৃতীয় তফসিল লঙ্ঘন করে ব্লু পেপারে সংসদ সদস্যদের জন্য আরেকটি শপথের যে ফর্ম ছাপানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ বা বাতিল এবং এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের যে আদেশ, যেটিকে ‘জুলাই আদেশ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ নাম দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রথম দিন থেকেই এখতিয়ারবহির্ভূত ও সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা ছিল, যা রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদের কোথাও এমন কিছু ছিল না যেখানে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, জুলাই জাতীয় সনদে যে সমঝোতা হয়েছে তার চার ভাগের সাড়ে তিন ভাগ তারা মানেন, কিন্তু বাকি আধা খানি অংশ সংবিধানের ওপর অবৈধ হাত বাড়িয়েছে। বিরোধী দলকে সংসদে এসে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় রাস্তায় গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কমিটি করলে সংবিধান সংশোধন না করে তারা বসে থাকতে পারবেন না। আর সংবিধান সংশোধন না করলে জাতিকে শেখ হাসিনার দেওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই চলতে হবে, যা কেউ চায় না।
অবিলম্বে এই সংবিধান সংশোধনী কমিটি কাজ শুরু করবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জুডিশিয়ারি, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংসদ ও সংসদের বাইরে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। এরপর সব স্টেকহোল্ডারদের সুপারিশের ভিত্তিতে এই সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বিরোধীদলীয় সদস্যরা আবেগসর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনী বিল আনার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।





