মুসলিম সমাজে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যারা আল্লাহর দ্বিনের বিধানকে দুনিয়ার বিষয় থেকে আলাদা করতে চায়। তারা দাবি করে—ধর্মের জন্য আইন প্রণয়ন করবেন আল্লাহ, আর দুনিয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করবে মানুষ। এটি সুস্পষ্ট ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা। কারণ তারা আইন প্রণয়নের অধিকার একাধিক সত্তার হাতে তুলে দিয়েছে, অথচ আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র অধিকার শুধু আল্লাহরই। ইসলামের মূল কথা দুটি—১. একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। ২. দ্বিন ও দুনিয়ার সব ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধানকে মান্য করা। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এ সত্য জানে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন, তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করো। এটাই সরল ও সঠিক দ্বিন; কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তা জানে না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪০)
যেমন আল্লাহ তাঁর ইবাদতে কাউকে শরিক করা পছন্দ করেন না, তেমনি তিনি তাঁর বিধানের পরিবর্তে অন্য কারো বিধান মান্য করাও পছন্দ করেন না। কোরআনে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) তাঁর বিধান ও কর্তৃত্বে কাউকে শরিক করেন না।’ (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ২৬)
আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন—দ্বিন বা দুনিয়ার যেকোনো মতবিরোধের সমাধান তাঁর কিতাব ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর কাছে ফিরিয়ে নিতে। তিনি বলেন, ‘যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হও, তবে তা আল্লাহ ও রাসুলের কাছে প্রত্যাবর্তন করো—যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখো। এটাই উত্তম এবং পরিণামের দিক থেকে সর্বোত্তম।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)
ইসলামী শরিয়তের অপব্যাখ্যা ও আধুনিক বিভ্রান্তি
মুসলিম সমাজে এমন বহু চিন্তাধারার উদ্ভব হয়েছে, যারা শরিয়তের দলিলগুলো শরিয়তের বিশেষজ্ঞ আলেমদের ব্যাখ্যা ছাড়াই বোঝার আহ্বান জানায়। তারা কোরআন ও সুন্নাহকে সালাফে সালেহিন, তাফসিরবিদ, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের বোঝার পদ্ধতি অনুসরণ করে না; বরং তারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণে কোরআন ও সুন্নাহর অর্থ বিকৃত করে। তারা যাকে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ বলে, তার নামে চিন্তার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তারা প্রত্যেক মানুষকে—যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক, সব বিষয়ে মতামত দেওয়ার উৎসাহ দেয়। এমনকি তারা বিশ্বাসের স্বাধীনতার নামে কোরআন-সুন্নাহ অস্বীকার করা কিংবা শরিয়তের বিধান প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতার কথাও বলে।
এসব লোক ইসলামী শরিয়তের দলিল নিয়ে খেলছে। তাদের অনেক বক্তব্য বিচ্ছিন্ন, অস্বাভাবিক ও বিভ্রান্তিকর। তারা সাহাবা ও তাবেঈনদের পথের বিরোধিতা করছে, অথচ আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা কোরআনের দ্ব্যর্থবোধক আয়াত নিয়ে মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর শরিয়ত বিকৃত করার চেষ্টা করে। এমনকি তাদের কেউ কেউ স্বাধীনতার নামে নাস্তিকতা, শরিয়তবিরোধিতা এবং ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর্যায়েও পৌঁছে গেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যাকে আলো দেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।’ (সুরা : আন-নুর, আয়াত : ৪০)
‘তোমরাই তোমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানো’ হাদিসের সঠিক অর্থ কিছু লোক দ্বিনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করার পক্ষে দলিল হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস পেশ করে—‘তোমরাই তোমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৬৩)
কিন্তু এরা হাদিসটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট গোপন করে। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু লোককে খেজুরগাছে পরাগায়ণ (পুরুষ গাছের রেণু স্ত্রী গাছে দেওয়া) করতে দেখলেন। তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, এটি না করলেও চলবে।’ লোকেরা ভেবেছিল এটি নবী (সা.)-এর নির্দেশ, তাই তারা পরাগায়ণ বন্ধ করে দিল। ফলে সে বছর ফলন কমে গেল। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি বললেন, ‘যদি এতে তাদের উপকার হয়, তবে তারা তা করুক। আমি তো শুধু একটি ধারণা প্রকাশ করেছিলাম। তাই আমার অনুমানের জন্য আমাকে দোষারোপ কোরো না। কিন্তু আমি যখন তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিষয় বলি, তখন অবশ্যই তা গ্রহণ করবে। কারণ আমি কখনো আল্লাহর নামে মিথ্যা বলি না।’ (সহিহ মুসলিম)
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের পরাগায়ণ করতে নিষেধ করেননি; বরং তারা ভুলবশত মনে করেছিল যে তিনি নিষেধ করেছেন।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৮/১২)
অতএব, শরিয়ত মানুষের দ্বিন ও দুনিয়া—উভয়ের কল্যাণ সাধনের জন্য এসেছে। দুনিয়াবি বিষয়ে অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে উন্নতি করতে ইসলাম উৎসাহিত করেছে। যেমন—নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ করা, উপযোগী কৃষিপদ্ধতি গ্রহণ করা, নতুন শিল্প ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, মানুষের উপকারে আসে এমন আবিষ্কার করা, খাদ্য প্রস্তুতের নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা, উপকারী সব বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন সাধন করা। এসব ক্ষেত্রে শরিয়ত বাধা দেয় না; বরং উপকার হলে উৎসাহিত করে।
দুনিয়াবি লেনদেন ও ইবাদতের মূলনীতি
ইসলামে মূলনীতি হলো দুনিয়াবি লেনদেন (মুয়ামালাত) মূলত বৈধ, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তা হারাম ঘোষণা করেন। ইবাদত সম্পূর্ণরূপে শরিয়তনির্ভর; শরিয়তের অনুমতি ছাড়া নতুন কোনো ইবাদত প্রবর্তন করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বিনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এখানে ‘আমাদের এই বিষয়’ বলতে দ্বিন বোঝানো হয়েছে, দুনিয়ার উপকারী বিষয় নয়। সুতরাং দুনিয়াবি এমন সব কাজ যা শরিয়তের নীতিবিরোধী নয়, সেগুলো গ্রহণে কোনো বাধা নেই। কিন্তু যে ব্যক্তি দুনিয়ার নামে শরিয়তের বিরোধিতা বৈধ মনে করে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করে, সে তো স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়েছে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)
আলেমদের ব্যাখ্যা
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ) বলেছে, ‘তোমরাই তোমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানো’ হাদিসটি সহিহ। এর অর্থ হলো কৃষি, শিল্প, সেলাই, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এ ধরনের দুনিয়াবি বিষয়ে মানুষ অভিজ্ঞ। তবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান মেনে চলতে হবে।’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ : ১(১৮/২৭)
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, ‘নবীরা মানুষের জন্য রেখে গেছেন শরিয়তের জ্ঞান; শিল্প, প্রযুক্তি বা কারিগরি বিদ্যা নয়।’ দুনিয়াবি যেসব বিষয়ে শরিয়তের বিধান আছে। কোরআনের দীর্ঘতম আয়াতই হলো ঋণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত। (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)
এটি প্রমাণ করে, ইসলাম দুনিয়ার বিষয়ও সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে। দুনিয়াবি যেসব বিষয় শরিয়ত হারাম করেছে, তার মধ্যে আছে—সুদ, জুয়া, ব্যভিচার, বেপর্দা ও অশালীনতা, ব্যবসায় প্রতারণা, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতাকারীদের প্রতি অবৈধ আনুগত্য। এসব ক্ষেত্রে ‘আমরাই আমাদের দুনিয়ার বিষয় বেশি জানি’ এই অজুহাতে শরিয়ত অমান্য করা বৈধ নয়। আবার দুনিয়ার যেসব বিষয়ে শরিয়ত বিধান দিয়েছে, যেমন বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, ক্রয়-বিক্রয়, ইজারা, খাদ্য, বিচারব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রেও শরিয়তের পরিবর্তে মানুষের বানানো বিধান গ্রহণ করা বৈধ নয়।
যেসব দুনিয়াবি বিষয়ে মানুষ স্বাধীনভাবে উন্নয়ন করতে পারে
অন্যদিকে যেসব বিষয় শরিয়তের বিরোধী নয়, যেমন—শিল্প-কারখানা, কৃষি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও তথ্য-প্রযুক্তি, বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিবহন ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বিমান ও নৌপরিবহন এবং এ ধরনের অন্যান্য দুনিয়াবি উন্নয়নমূলক কাজ—এসব ক্ষেত্রে মানুষকে চিন্তা-গবেষণা, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
পরিশেষে ইসলাম কখনো দ্বিন ও দুনিয়াকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে না; বরং ইসলাম মানুষের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে অনুসরণ করার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প ও মানবকল্যাণমূলক সব দুনিয়াবি বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উন্নয়নকে উৎসাহিত করে।