রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশের মাঠে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) শুরু হয়েছে জাতীয় পরিবেশ মেলা। সপ্তাহব্যাপী মেলার উদ্বোধন শেষে সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণেই বৃক্ষরোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর তিনি মেলায় অংশ নেওয়া পরিবেশবাদী সংগঠনের স্টল ও নানা রকম ফুল-ফল আর ওষুধি গাছ দিয়ে সাজানো নার্সারিগুলো ঘুরে দেখেন। স্টলে স্টলে ঘোরার সময় প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি উদ্যোগের খোঁজখবর নেন এবং তরুণদের পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণের মঞ্চের কাছে পরিবেশবাদী সংগঠন ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্টিস ফাউন্ডেশন (সিএজেএফ)-এর স্টলও পরিদর্শন করেন। এ সময় তাকে সংগঠনটির জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, প্লাস্টিক দূষণ রোধ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, শিশু-কিশোরদের পরিবেশ শিক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করা হয়।
স্টলে প্রদর্শিত বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম, জলবায়ু সহনশীল আদর্শ গ্রাম নির্মাণের পরিকল্পনা, সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠনটির বহুমুখী উদ্যোগের কথা মন দিয়ে শােনেন প্রধানমন্ত্রী। এসব কার্যক্রমে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
স্টল পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীকে শিশুদের আঁকা পরিবেশবিষয়ক একটি চিত্রকর্ম উপহার দেওয়া হয়। তিনি হাসিমুখে উপহারটি গ্রহণ করেন ও চিত্রকর্মের প্রশংসা করেন।
ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্টিস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মামুন বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের স্টল পরিদর্শন করে কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য করেছেন। পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে আমাদের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। দেশের সরকারপ্রধানের এই স্বীকৃতি ও অনুপ্রেরণা আমাদের দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা ভবিষ্যতেও জলবায়ু ন্যায়বিচার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং তরুণদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করে যাব।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই উৎসাহ সংগঠনের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং তরুণ কর্মীদের জন্য বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন আমাদের স্টলে এসে অনুপ্রেরণা দেন তখন পরিবেশ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আরো অনেক বেড়ে যায়। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।
কাজগের কলম দেখে মুগ্ধ প্রধানমন্ত্রী
মেলা প্রাঙ্গণে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘মিশন গ্রীন বাংলাদেশ’-এর স্টলে গিয়ে চমকে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তরুণদের তৈরি পরিবেশবান্ধব ‘কাগজের কলম’ (পেপার পেন রেভোলিউশন) দেখে তিনি খুশি হন।
সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি জানান, প্রধানমন্ত্রী এই কাগজের কলমটি এতটাই পছন্দ করেছেন যে, সরকারি অফিস-আদালতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কলমের পরিবর্তে এই পরিবেশবান্ধব কলম ব্যবহার করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার লক্ষ্যে সংগঠনের সিগনেচার উদ্যোগ ‘ভাংরি মামা’র অভিনব চিন্তাভাবনারও ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
‘বাহ! আপনি তো দারুণ সাজিয়েছেন’
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর স্টল দেখার আগে প্রধানমন্ত্রী ঢোকেন ফুলে-ফলে সুসজ্জিত বিভিন্ন নার্সারির স্টলে। একটি নার্সারির চমৎকার সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বাহ! আপনি তো দারুণ সাজিয়েছেন।’ তিনি কেবল প্রশংসাই করেননি, বরং নার্সারির ভেতরের খোঁজ নিতে তাদের জিজ্ঞেস করেন- গাছগুলো কি শুধুই মেলা উপলক্ষে এভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, নাকি বাস্তবেও এমন? জবাবে নার্সারির প্রতিনিধিরা জানান, সাভারের আশুলিয়াতে তাদের মূল নার্সারিটিও ঠিক একইভাবে সাজানো-গোছানো। এক থা শুনে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলেও তার এই সফর মেলার স্বেচ্ছাসেবক ও বৃক্ষপ্রেমীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। মেলায় অংশ নেওয়া তরুণদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক যখন নিজে এসে এভাবে উৎসাহ দেন, তখন পরিবেশ রক্ষার লড়াইটা আরো সহজ হয়ে যায়।
পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার এবং পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনজন ব্যক্তি ও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫’ প্রদান করা হয়েছে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ এর জাতীয় অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে এ পদক তুলে দেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন আলহাজ ফরহাদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. হাসমত আলী।
পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন মো. মনির হোসেন। পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে ক্লাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেড। পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস। এছাড়া পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে পদক পেয়েছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট।




