প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী যে কথাটি প্রায়ই বলেন সেটি হলো- ‘এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট।’ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটও তার ব্যতিক্রম নয়। গত এক দশকে বাজেটের আকার প্রায় ২.৬৮ গুণ বেড়েছে কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বৃদ্ধি কি রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিফলন?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটের অঙ্ক বড় হওয়া আর রাষ্ট্রের সেবা প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এক বিষয় নয়। এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করব কেন বাংলাদেশের বাজেট বাড়লেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ছে না এবং এই ব্যবধান দূর করতে কী প্রয়োজন।
বাজেট বাড়ছে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমছে : ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায়। প্রায় ২.৬৮ গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.১১ শতাংশ থেকে নেমে এসে এখন ৩.৯৭ থেকে ৪.৮০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাজেটের আকার বাড়লেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, বরং কমেছে। এটি প্রমাণ করে যে শুধু বাজেটের আকার বৃদ্ধি টেকসই উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং বাজেটের মান, কার্যকারিতা এবং বাস্তবায়নের গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু মানব উন্নয়নে প্রভাব সীমিত : এক দশকে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩৮২ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮২০ ডলারে। এটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক হলেও, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় এর প্রতিফলন যথেষ্ট নয়। ভোলার শিশু তাকরিমের ঘটনা প্রমাণ করে, স্বাস্থ্যসেবার মান এখনো উদ্বেগজনক নিম্ন স্তরে রয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি শুধু একটি গড় পরিসংখ্যান; এটি আয় বৈষম্য বা সেবার প্রাপ্যতার সঠিক চিত্র দেয় না। আয় বাড়লেও সরকারি সেবার মান ও বিস্তৃতি না বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনমান তেমন উন্নত হয় না।
রাষ্ট্রীয় ব্যয়-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম : আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১২.৩ শতাংশ। অথচ ভারতে এই হার ২৮.৩৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯.৪৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯.৩২ শতাংশ এবং ভুটানে ২৭.১৩ শতাংশ। একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সরকারি ব্যয়-জিডিপি অনুপাত। বাংলাদেশে এই হার এত কম হওয়ার অর্থ হলো- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় সরকারের হস্তক্ষেপের পরিসর তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত। ফলে রাষ্ট্র দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
রাজস্ব সংকট সমস্যার মূল কেন্দ্রবিন্দু : বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয় কম হওয়ার প্রধান কারণ আয় কম। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৯.৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেমে এসেছে ৬.৭-৭.১ শতাংশে। অন্যদিকে করদাতার সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। দেশে ১ কোটি ৪৫ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪৫ লাখ। ১০ কোটির বেশি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে করদাতা মাত্র ৩৫-৪০ লাখ। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়া একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা। এর অর্থ হলো অর্থনীতি বড় হলেও কর আদায়ের সক্ষমতা কমছে। করজাল সংকীর্ণ, কর ফাঁকি বেশি এবং এনবিআর দুর্বল। সিপিডির ড. ফাহমিদা খাতুনের ভাষায়, ‘কেবল প্রবৃদ্ধি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি সম্ভব নয়; প্রয়োজন কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থা।’
অর্থ আছে, ব্যয় করার সক্ষমতা নেই : বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হলো বরাদ্দকৃত অর্থ সময়মতো ব্যয় করতে না পারা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অব্যয়িত থেকে যায় প্রায় ৭২ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৪১.৪১ শতাংশ। এটি শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার এক চরম সীমাবদ্ধতার পরিচয়। অর্থ অব্যবহৃত থাকলে উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। পাশাপাশি, পদ্মা সেতু ও মাতারবাড়ি বন্দরের মতো বড় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো এবং বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবহারে ধীরগতি রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তুলে ধরে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ : স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ২.৩৬ শতাংশ, যেখানে ভারত ৩.৩৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৩.৬৮ শতাংশ, ভুটান ৪.৪২ শতাংশ এবং নেপাল ৬.১৬ শতাংশ ব্যয় করে। শিক্ষা খাতেও জিডিপির মাত্র ১.৫-২ শতাংশ ব্যয় করা হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ না থাকলে একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভোলার শিশু তাকরিমের মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফল। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, করজাল সম্প্রসারণ, এনবিআরের আধুনিকায়ন ও সংস্কার এবং কর ফাঁকি ও কর অব্যাহতি কমানো জরুরি। প্রকল্প গ্রহণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়ন, সময়মতো অর্থ ছাড় ও ব্যয় নিশ্চিতকরণ। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জিডিপির শতাংশ হিসেবে ব্যয় অন্তত ৫-৬ শতাংশে উন্নীত করা। বৈদেশিক ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার, ঋণের অর্থ গ্রহণের আগে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা যাচাই করা এবং অব্যবহৃত অর্থের সুদ পরিশোধের বোঝা কমানো।
গত এক দশকে বাংলাদেশের বাজেটের আকার প্রায় তিন গুণ হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা, উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নে অদক্ষতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং সরকারি সেবার মান বিবেচনায় রাষ্ট্রের সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি বাজেটের অঙ্ক নয়; বরং সেই অর্থ কোথা থেকে আসছে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় হচ্ছে এবং তার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘বাজেট কত বড়?’ নয়, বরং ‘রাষ্ট্র কতটা সক্ষম?’ এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুশাসনের পথ নির্ধারণ করবে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন




