‘হারিয়ে ফেলতে চাইনি বলেই আমাদের সম্পর্কের নাম দিয়েছি স্বামী-স্ত্রী। যদি তোমাকে হারানোর ইচ্ছে থাকত, যদি এই ভালোবাসা ক্ষণিকের মোহ হতো, তবে কখনোই এত পবিত্র এক বন্ধনের নামে তোমাকে নিজের বলে ঘোষণা করতাম না। কখনোই তোমাকে নিজের নামে লিখিত করতাম না।’
মৃত্যুর আগে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক পোস্টে কথাগুলো লিখেছিলেন রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনে কর্মরত তরুণ কনস্টেবল সাইদুল ইসলাম (২১)। তিনি ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
ওই পোস্টে সাইদুল লিখেন, ‘‘দিনের বেলা আমি যোদ্ধা... কিন্তু রাত? রাত আসলেই সব মুখোশ খুলে যায়। যে মানুষটা দিনের আলোয় পাহাড় ঠেলতো, সে রাতের অন্ধকারে একটা মেসেজের কাছে ভেঙে পড়ে। লোকে বলে 'সময় সব ঠিক করে দেয়', আমি হাসি কারণ আমি জানি কিছু ক্ষত সময়ে না, অভ্যাসে ভালো হয়; আর তোমাকে ভোলার অভ্যাসটা আমার হচ্ছে না। এটাই এখন আমার জীবন— দিনে যুদ্ধ, রাতে পরাজয়; বাইরে আগুন, ভেতরে ছাই। একটা শেষ হয়ে যাওয়া মন নিয়ে রোজ বেঁচে থাকার মিথ্যে অভিনয়...’
তার ফেসবুক আইডির একাধিক পোস্টে উঠে আসে হতাশার গল্প। ২৩ জুন এক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘হে জীবন তুমি সংক্ষিপ্ত হয়ে যাও, বেদনার রজনী সংক্ষিপ্ত হবার নয়...!!’ ৩০ জুন লিখেন, ‘আত্মারও একটা আত্মসম্মান আছে, সুতরাং বিদায়...।’
গত ১৪ জুলাই আরেক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘দরজাটা তুমি বন্ধ করলা, শাস্তিটা আমি পাইলাম, মানুষ বিয়েটাও এখন ট্রায়াল দিয়ে দেখে কি অদ্ভুত বাস্তবতা..!! শেষে এটাই মেনে নিলাম: যে থাকে না তাকে জোর করে স্টকে রাখি না। এটাই শেষ চিঠি তোমার নামে, আর কোনো অক্ষর খরচ হবে না। এরপর থেকে তুমি শুধু নীরবতা। চিরতরে বিদায়।’
মৃত্যুর আগে ফেসবুকে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি ভিডিও পোস্ট করেন সাইদুল, যা মূলত তার জীবনের শেষ আকুতি ও চিরকুট। ভিডিওটিতে দেখা যায়, তাদের মিলনের পর বিচ্ছেদের সেই মুহূর্ত, যেখানে তারা আইনজীবীর (অ্যাডভোকেট) সামনে বিষণ্ণ মনে বসে আছেন এবং বিচ্ছেদের দলিলে খাতায় স্বাক্ষর করছেন।
ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেন, ‘তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম একটু একটু করে, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুদিনেই চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে। আমি সবকিছু চুপচাপ দেখে গেলাম। সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কুলের দেখা না পেয়ে শেষমেশ নিয়তিকে মেনে নেয়, সদরে গ্রহণ করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই।
কত তুচ্ছ বাহানা দিয়ে মানুষ একটা গভীরতম সম্পর্কের ইতি টানে, আমি অবাক হই, মানুষ আসলেই কি মানুষকে ভালোবাসে..? জানো.? মাঝে মাঝে কেন জানি নিজেরে দেখলে নিজের অনেক মায়া লাগে, হাহাকার লাগে কি হয়ে গেলাম কি বানাইয়া গেলা, আচ্ছা বলতো আমার দোষটা কি ছিল.? কি করছিলাম আমি.? তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ.? নাকি সব কিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ?
তুমি না বলছিলা মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না? এখন কই তুমি? আমিতো তোমার অভাবেই শেষ হয়ে গেলাম, অনেকবারই তো আঘাত করছো সব ভুলে বার বার মাপ করে তোমাকে বুকে টেনে নিলাম এই মূল্য দিলা.? একেবারেই শেষ করে দিতে আসলা? আমি তো নিয়তি মেনে নিয়ে দূরেই ছিলাম তোমার থেকে কেন আবার আসছিলা কেন এত কাছে আসচিলা? কোন উত্তর খুঁজে পাইনা আমি। শুধু দ্বিতীয় বার না, তৃতীয় বার না, চতুর্থ বার না, আমি হাজার বার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু তুমি প্রতিবারই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছো মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয় না, যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকে না।
আমার কাছে এই সম্পর্ক কোনো সাময়িক অনুভূতি নয় এটি আজীবনের অঙ্গীকার, বিশ্বস্ততা আর একে অপরকে পাশে থাকার নীরব শপথ ছিল কিন্তু তুমি সব শেষ করে দিলা। আচ্ছা যদি যাওয়ারই ছিল আসছিলাই কেন.? বহুকাল বয়ে বেড়াতে হবে হৃদয় ভাঙা এই ব্যথা, হয়তো এই জন্মে আর সেরে উঠবে না মৃত্যু ছাড়া। তাই আমি সেই পথেই গেলাম। সারা জীবন মানুষকে বুঝাইলাম অথচ দিন শেষে এসে দেখি আমি নিজেই অবুঝ..!
যাও ভালো থাকো, যতটুকু দূরত্ব নিয়ে তুমি চলে গেলে তার থেকে দ্বিগুণ দূরত্ব নিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম, সুখে থাকো এটাই কামনা। তোমাকে বলেছিলাম না এটাই আমার শেষ শক্তি হয়তো তুমি, নয়তো আমি শেষ। নাও তারও প্রমাণ দিলাম সারা জীবন তো প্রমাণই দিয়ে আসলাম তারপরও। যাই হোক। তুমি তো জানোই চাইলে আমি অনেক কিছুই করতে পারতাম কিন্তু আমার প্রতিপক্ষ তো তুমি হয়ে গেলা কি আর করব, যাও প্রমাণ সব তোমার অনুকূলে কারণ আমার পক্ষের উকিল হচ্ছে এমন নীরবতা আমার নীরবে হারিয়ে যাওয়া, যেখানে তুমি জবানবন্দি দিলে আর তুমি দিলে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায়।’’
পোস্টের শেষে তিনি তার জন্মদাতা বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে লিখেন, ‘দুঃখিত আম্মু আব্বু আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেছে না আম্মু আর পারতেছে না আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাপ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে। আমার যেন আর কিছুই করার নেই। একদম ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেলাম।’
মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে পুলিশের তরুণ এই সদস্য আরেকটি পোস্টে লিখেছিলেন, ‘মন হৃদয়টা আর বাজে না, পুরোপুরি শেষ, একদম নিঃশব্দ একটা কবরখানা। ভেতরে আর কোনো শব্দ নেই, শুধু পুরনো দেয়ালে ঝুলে থাকা তোমার রেখে যাওয়া কিছু ফ্রেম যা খুলে ফেলার সাহস হয় না। তবু আমি অভিনয় করি প্রতিদিন, সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখে পানি মুছে ঠোঁটে হাসির রং লাগাই, বন্ধুদের আড্ডায় সবচেয়ে জোরে হাসি, স্ট্যাটাসে লিখি 'নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত', সবাইকে দেখাই আমি কত স্ট্রং।
কেউ বোঝে না এই স্ট্রংনেসটা আসলে একটা ইউনিফর্ম, যুদ্ধের ময়দানে পরে থাকা মিথ্যে বর্ম, ভেতরে রক্ত ঝরে, বাইরে মেডেল ঝোলে। ...অনেক চেয়েছি শক্ত হতে, নিজেকে বুঝিয়েছি 'যা গেছে তা গেছে', নতুন করে শুরু করেছি একশো বার, কিন্তু মন তো কাগজ না যে চাইলেই নতুন পাতা পাওয়া যায়। এটা মাংসের টুকরো যেখানে তোমার নামটা খোদাই হয়ে আছে, যতই ঘষি, দাগটা থেকে যায়। ...তাই আমি আবার সকালে উঠি, আবার স্ট্রং সাজি, আবার মানুষকে দেখাই আমার কিছু হয়নি, আর রাতে আবার হেরে যাই স্মৃতির কাছে, নিজের কাছে, নিজের মিথ্যের কাছে। ...যদি কোনোদিন সত্যি স্ট্রং হতে পারি, সেদিন তোমাকে চিঠি লিখবো না, শুধু নিজেকে বলবো 'যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত জিতেছি'। কিন্তু আজ? আজও আমি হেরে যাচ্ছি, দিনশেষে তোমার স্মৃতির কাছে।’’
নিহতের বাবা মোহাম্মদ সাদেক জানান, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখে বাংলাদেশ পুলিশে জয়েন করেছে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমার এই ছেলে... আমার এবং আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল খুব বড় কিছু। সব এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল!
তিনি আরো বলেন, ‘আমি কি করমু? আমি কি বলমু? আমি জানি না। কেউ কিছু জানে না, তার ফেসবুকে আমিও দেখতে পেয়েছি। যা হয়েছে সে জানে আর আল্লাহই জানে। তাছাড়া তার মোবাইল থেকে শুরু করে সবকিছু পুলিশ নিয়ে গেছে। আর আমরা বুঝি না, গ্রামের মানুষ। আমার মন মানসিকতাও ঠিক নেই।’
ডিএমপি কল্যাণ ট্রাস্টের এএসআই কামরুল পুরো প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে প্রথমে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সহকর্মীদের উপস্থিতিতে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ ডেমরা পুলিশ লাইন্সে নেওয়া হলে সেখানে সহকর্মী ও স্থানীয়দের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘দুই দফা জানাজা সম্পন্ন করার পর মরদেহটি চূড়ান্তভাবে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বজনরা চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তার নিথর দেহ গ্রামের বাড়ি ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামে নিয়ে যান এবং সেখানে আরেকটি জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় দাফন করা হয়।’
ডেমরা থানা সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে সাইদুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ যাবতীয় আলামত পুলিশ হেফাজতে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালানো হচ্ছে।
নিহত সাইদুলের পরিবার ও সহকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, ডেমরা পুলিশ লাইন্সের ২০ তলা ভবনের নবম তলার একটি কক্ষে থাকতেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দেন তিনি। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে শুক্রবার ভোরে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সাইদুলের ঠিক পাশের সিটে থাকা এক পুলিশ সদস্যের বরাতে এসআই নজরুল জানান, সাইদুল চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে পুলিশে যোগদান করেন। তিনি অত্যন্ত হাসিখুশি ও উদ্যমী স্বভাবের ছেলে ছিলেন। তার মনের ভেতর যে এমন গভীর বিষাদ ও আত্মহননের পরিকল্পনা চলছিল, তা কেউ টের পাননি।
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছিল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে গুরুত্বের সঙ্গে জানানো হয়েছে।









