জুলাই আন্দোলনে ফেনীর মহিপালে সাত হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এসব মামলায় ঢালাওভাবে আসামির নাম অন্তর্ভুক্তি, দুর্বল অভিযোগপত্র (চার্জশিট) ও মূল ঘটনায় জড়িত না থাকা ব্যক্তিদের জড়ানোসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) নানা আইনি অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মামলাগুলোর নথি পর্যবেক্ষণ করার পর ফেনীর স্থানীয় প্রশাসন ও আদালতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার নথিতে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর সম্প্রতি ফেনী জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন খাঁন ও বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞাকে ঢাকায় তলব করেন আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর।
গত বৃহস্পতিবার ফেনীর পিপি মেজবাহ উদ্দিন খাঁন সাংবাদিকদের জানান, আইনি ত্রুটি, ইচ্ছানুযায়ী আসামির তালিকা তৈরি এবং বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই তড়িঘড়ি চার্জশিট দাখিল করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন চিফ প্রসিকিউটর। সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে এবং আদালতের বিচারক, আইনজীবী, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহেই আইসিটির চিফ প্রসিকিউটরের ফেনী সফরে আসার কথা রয়েছে। এর পরই মামলাগুলোর বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে এক দফা দাবিতে ফেনীর মহিপালে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি ও হামলা চালায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন সাতজন। আহত হন সাড়ে চার শতাধিক মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করেন প্রায় অর্ধশত। ওই ঘটনায় সাতটি হত্যাসহ মোট ২২টি মামলা দায়ের করা হয়।
এরই মধ্যে পুলিশ ছয়টি হত্যা ও পাঁচটি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ ১১টি মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে। দুইটি হত্যা মামলার বিচার কাজও স্থানীয় আদালতে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে টমটমচালক সবুজ হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে ও আলোচিত শিহাব হত্যা মামলায় চার্জ গঠন শেষে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।
মামলাগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক এমপি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ আসামির সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার।
আসামিদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করা হলেও অনেকে ইতোমধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া মামলার মূল ও প্রভাবশালী আসামিদের প্রায় সবাই বর্তমানে পলাতক।
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে ঘটনার সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক হয়রানি, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিহিংসার কারণে অনেক সাধারণ মানুষকে এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার এই দুর্বলতার কারণে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা আইনজ্ঞদের।
হত্যাচেষ্টার এক মামলার বাদী ও ‘আমরাই জুলাই যোদ্ধা’ ফেনী জেলা কমিটির সদস্যসচিব নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ফেনীর মহিপালে ৪ আগস্টের গণহত্যায় যারা সরাসরি জড়িত, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলো রাজপথ ও আদালতে অনড় থাকবে।’
ফেনী জেলা জজ আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন খাঁন বলেন, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে হওয়া ১৫টি মামলার বিচার ফেনীর আদালতে চলমান থাকলেও সাতটি হত্যা মামলা দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) স্থানান্তর করা হবে। চিফ প্রসিকিউটরের ফেনী সফরের পর মামলাগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিতে পুনঃতদন্তের নির্দেশ আসতে পারে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত দল সম্প্রতি ফেনীতে তদন্ত পরিচালনা করে গেছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞা বলেন, ‘বিচার কোন আদালতে হচ্ছে- সেটি বড় বিষয় নয়, মূল লক্ষ্য হলো সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত দোষীদের অপরাধ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।’
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মু. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ সততার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করেই চার্জশিট দাখিল করেছে। তবে আদালতের যেকোনো নির্দেশনা বা পুনঃতদন্তের আদেশ বাস্তবায়নে পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।’





