শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে দুই জেলা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ। একসময় জেলা দুটির সীমানা শীতলক্ষ্যা নদী ছিল পাট ব্যবসার প্রধান নৌপথ। এ অঞ্চলে বিশেষ করে গাজীপুরের কালীগঞ্জে ব্যাপক চাষ হতো পাট। সেই দিন এখন আর না থাকলেও নতুন করে আবারও পাট চাষ করছেন কেউ কেউ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালীগঞ্জে পাটের সেই সুদিন আর নেই। সময়ের বাস্তবতায় পণ্যটির উৎপাদন আজ বিলুপ্তির পথে। তবু এ উপজেলায় সামান্য হলেও অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কয়েকটি কৃষক পরিবার। স্বল্পপরিসরে পাট চাষ করে তারা এখন পাট কাটা শুরু করেছেন। যারা পাট চাষ করেছেন তারা এখন পাট কাটার মৌসুম পালন করছেন।
গাজীপুর পাট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় চলতি মৌসুমে ৩২৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাটকাটা শুরু হয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে কয়েকটি পাটক্ষেত পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেতে এখন পাট কাটা হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, এটা পাট কাটার মৌসুম। আগে অনেক চাষ হতো। এখন অনেক কম চাষ হচ্ছে। তবু তারা যেটুকু জমিতে পাট চাষ করছেন- পাটের বীজে বোনা ও পাটের গাছ কাটার সময় ধুমধাম করেই করেন। পাট কাটা ও লাগানোর পরিমাণ কমে গেলেও তাদের আনন্দ কমনি বলে জানান তারা।
কৃষকরা জানান, শীতলক্ষ্যা নদীর গাজীপুর অংশে কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, শ্রীপুরসহ জেলার প্রায় সব উপজেলা ও নদীর অপর পাশে নারায়াণগঞ্জের রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁওয়ে ব্যাপক পাট চাষ হতো। এই দুই জেলা পাটচাষে বিখ্যাত ছিল বলেই বড় বড় জুটমিলগুলো গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছিল। সময়ের পরিক্রমায় পাট চাষ কমে গেলেও পৈত্রিক পেশা হিসেবে অনেকে পাট চাষ করছেন।
কালীগঞ্জের জামালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল বাসার বলেন, পাট চাষ হারিয়ে যাচ্ছে। কালীগঞ্জ তথা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে পাট চাষ ও ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। কালীগঞ্জে দুটি জুট মিল রয়েছে। এর মধ্যে একটি বন্ধ ও আরেকটি আংশিক চলে। আমরা চাই, সরকার পাট চাষের দিকে নজর দিক যেন হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসে।
কালীগঞ্জের পাটচাষী আব্দুল হাকিম (৯০) বলেন, পাট চাষ ও পাটের ব্যবসা আমার বাপ-চাচারা করতেন। তারা পাট চাষ করে পাট নিয়ে কালীগঞ্জ সদর ও নারায়াণগঞ্জে বিক্রি করতেন। ডিঙ্গি নৌকা করে বাবা-চাচাদের সঙ্গে আমিও যেতাম। এখন পাটের সেই সুদিন না থাকলেও আমি ছোট পরিসরে চাষ করে পৈত্রিক ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা করছি।
পাট কাটতে কাটতে দুপুর হয়ে যাওয়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কালীগঞ্জের নোয়াপাড়া গ্রামের কৃষিশ্রমিক রিয়াদ হাসান। এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা পাট কাটার কাজ করছি। এখন দুপুরের খাবারের সময়। তাই বিশ্রাম নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আগে অনেক পাট কাটার কাজ পেতাম। এখন পাট কম। তবু যা পাই তাই করি।’
গাজীপুর পাট অধিদপ্তরের মুখ্য পরিদর্শক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার কালীগঞ্জে ৩২৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। ৩৮ হেক্টর জমিতে সাদা পাট, ১৫৫ হেক্টর জমিতে তোষা পাট ও ১৩২ হেক্টর জমিতে কেনাফ জাতের পাট চাষ করা হয়েছে। আমরা চাই পাটের ব্যাপক চাষ হোক, যেন হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারি।’







