• ই-পেপার

রাতে গাছ কাটা বা পাতা ছেঁড়া নিয়ে ইসলাম কী বলে?

বর্ষাকালে যে ১০ আমল বেশি বেশি করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বর্ষাকালে যে ১০ আমল বেশি বেশি করবেন
সংগৃহীত ছবি

সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ষড়্ঋতুর এই দেশে নিয়ামতের ডালি নিয়ে বর্ষা আসে প্রকৃতি সজীব করতে। বর্ষাকাল যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সময়, তেমন একজন মুমিনের জন্য এটি ইবাদত, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, সমাজসেবা এবং আল্লাহর প্রতি পরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য সুযোগ।

মেঘ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টির পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা। আল্লাহর রাসুল (সা.) বৃষ্টিকে ইবাদত ও দোয়ার শ্রেষ্ঠ সময় বানিয়ে নিতেন। বর্ষায় আমাদের করণীয় কিছু আমল হলো:

১. কল্যাণের দোয়া করা : বৃষ্টি শুরু হলে উপকার পেতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন—‘আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ’ অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি মুষলধারায় যে বৃষ্টি দিচ্ছেন, তা যেন আমাদের জন্য উপকারী হয়। (সহিহ বুখারি)

২. বৃষ্টিতে কিছুটা ভেজা : বৃষ্টিকে আল্লাহর সদ্য আগত রহমত বিবেচনা করে এতে শরীর ভেজানো সুন্নত। আনাস (রা.) বলেন, একবার বৃষ্টি শুরু হলে নবীজি (সা.) তাঁর পোশাকের কিছু অংশ সরিয়ে নিলেন, যাতে শরীরে বৃষ্টির পানি লাগে। কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এটা (বৃষ্টি) এইমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।’ (সহিহ মুসলিম)

৩. দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগ নেওয়া : বৃষ্টি চলাকালীন দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুই সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. আজানের পরে করা দোয়া এবং দুই. বৃষ্টির সময় করা দোয়া।’ (আল-হাকেম)

৪. বজ্রপাতের সময় তাসবিহ ও দোয়া : বজ্রপাত আল্লাহর মহাশক্তির এক ছোট নিদর্শন। বজ্রের শব্দ শুনলে নবীজি (সা.) বলতেন— ‘আল্লাহুম্মা লা তাক্বতুলনা বিগদাবিকা ওয়া লা তুহলিকনা বিআজাবিকা, ওয়া আফিনা ক্ববলা জালিকা।’

৫. অতিবৃষ্টিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে আশ্রয় : যখন অতিবৃষ্টি বা ঝড় হতো, তখন নবীজি (সা.) দোয়া করতেন—‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা’ অর্থ : হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়—পাহাড়, মালভূমি ও বনভূমিতে বর্ষণ করুন। (সহিহ বুখারি)

৬. বৃষ্টি শেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ : বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলতে হয়—‘মুতিরনা বিফাদলিল্লাহি ওয়া রাহমাতিহি’ অর্থ : আমরা আল্লাহর দয়া ও করুণার বৃষ্টি লাভ করেছি। (সহিহ বুখারি)

৭. পরিবেশরক্ষায় বৃক্ষরোপণ : পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার অন্যতম উপাদান হলো উদ্ভিদ। বর্ষাকাল হলো বৃক্ষরোপণের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ সময়। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা বিশেষ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইসলাম গাছ লাগানোর প্রতি এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগমুহূর্তেও তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তাহলে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১২৯০২)

এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ লাগায় বা ফসল ফলায়, আর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা পশু আহার করে—তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য কিয়ামত পর্যন্ত ‘সদকা’ বা দান হিসেবে গণ্য হবে। (সহিহ বুখারি: ২৩২০)

নির্বিচারে গাছ কাটা থেকে বিরত থাকতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে, আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৪১)। তবে যদি কোনো গাছ মানুষের চলাচলে কষ্ট দেয় বা পরিবেশের ক্ষতি করে, তবে তা কেটে ফেলাও জান্নাত লাভের উসিলা হতে পারে। (সহিহ মুসলিম)

৮. বর্ষাকালে মানবসেবা করা : বর্ষা যেমন রহমত নিয়ে আসে, তেমনি কখনো কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হয়ে মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। এই সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বর্ষার দিনে রিকশাচালক, দিনমজুর বা পথের ফেরিওয়ালাদের আয় কমে যায়। তাদের কষ্ট লাঘব করতে একটি ছাতা বা রেইনকোট উপহার দেওয়া কিংবা দরিদ্র পরিবারে শুকনো খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

৯. সামাজিক সচেতনতা ও স্বেচ্ছাসেবা : নিজ এলাকার ড্রেন বা পানি চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখতে তরুণদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো ইমানের একটি শাখার অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা। এ ছাড়া নিজ এলাকার মসজিদে কয়েকটি অতিরিক্ত ছাতা বা রেইনকোট কিনে রাখা যেতে পারে, যেন হঠাৎ বৃষ্টি এলে মুসল্লিরা তা ব্যবহার করে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।

১০. পরিবারকে সময় দেওয়া : বর্ষার দিনগুলোতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাইরে যাতায়াত বা ঘোরাঘুরি সাধারণত কমে যায়। ফলে পরিবারকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত সময় পাওয়া যায়। এই সময়ে পরিবারের সব সদস্য মিলে একসঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত, সিরাত বা হাদিস পাঠের ছোটখাটো ঘরোয়া আসর করা যেতে পারে। এতে পরিবারের বন্ধন যেমন দৃঢ় হয়, তেমনি ঘরে আল্লাহর রহমত ও শান্তি নেমে আসে।

এ ছাড়া ঘরের কোমলমতি শিশুদের বৃষ্টির নিয়ামত, মেঘের গর্জন, বজ্রপাত এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মহান আল্লাহর অপরিসীম কুদরত ও মহিমা সম্পর্কে গল্পে গল্পে শেখানো যায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম বার্তা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম বার্তা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

প্রতিদিন টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন সতর্কবার্তা দেখতে পাই। কখনো বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে; কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা, কোথাও বজ্রপাত বা বন্যার সম্ভাবনা। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ আগাম প্রস্তুতি নেয়, কৃষক ফসল রক্ষা করে, জেলেরা সমুদ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকে এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পায়। কিন্তু মাঝে-মধ্যে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়— আবহাওয়া অধিদপ্তরের এ ধরনের বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস সম্পের্কে ইসলাম কী বলে?

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, আসমান ও জমিনে যারা আছে তারা আল্লাহ ছাড়া গায়েবের জ্ঞান রাখে না।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৬৫)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, মাতৃগর্ভে যা আছে তা তিনি জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৩৪)
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, স্বতন্ত্রভাবে, নিশ্চিতভাবে এবং সর্বাঙ্গীণভাবে ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই। কোনো মানুষ, ফেরেশতা, জিন কিংবা নবীও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া গায়েব জানেন না। 

লক্ষণীয় বিষয় হলো
আবহাওয়া অধিদপ্তর কখনোই বলে না যে, ‘নিশ্চিতভাবেই এমনটি ঘটবে।’ তারা আধুনিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, রাডার, বায়ুচাপ, তাপমাত্রা, বায়ুর গতিবেগ, আর্দ্রতা, সমুদ্রের অবস্থা এবং দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পূর্বাভাস প্রদান করে। অর্থাৎ এটি গায়েবের জ্ঞান নয়; বরং দৃশ্যমান তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

এটি অনেকটা একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো। রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখে তিনি বলেন, ‘এই রোগীর ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আছে’ বা ‘এই ওষুধে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ চিকিৎসক ভবিষ্যৎ জানেন না; বরং দৃশ্যমান লক্ষণ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফলাফল জানান। একইভাবে একজন কৃষক আকাশের মেঘ, বাতাসের দিক কিংবা ঋতুর পরিবর্তন দেখে বৃষ্টির সম্ভাবনা অনুমান করেন। এতে কেউ গায়েবের দাবিদার হয়ে যান না। বরং ইসলাম মানুষকে প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি বাতাসকে তাঁর রহমতের পূর্বে সুসংবাদবাহীরূপে পাঠিয়ে দেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৭)
এসব আয়াত মানুষকে প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করতে এবং তাঁর নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মূল উদ্দেশ্যও ভবিষ্যৎ জানার দাবি করা নয়; বরং মানুষের জীবন, সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা করা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত কিংবা তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা দিয়ে তারা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে, কৃষকদের ফসল রক্ষা করতে, জেলেদের সমুদ্রে না যেতে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে। এর ফলে বহু প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি কমে আসে। ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা একটি মহৎ কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)

অতএব, মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সতর্কবার্তা প্রদান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো গুনাহের কাজ নয়। বরং এটি জনকল্যাণমূলক একটি দায়িত্ব। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। যদি কেউ দাবি করে যে, সে নিজেই নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যৎ জানে, অথবা আল্লাহর মতো গায়েবের পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী—তবে তা ইসলামের আকিদার পরিপন্থী। একইভাবে জ্যোতিষ, গণক, ভাগ্যবিচার বা অলৌকিক উপায়ে ভবিষ্যৎ জানার দাবি ইসলাম কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল, তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩০)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, গণক বা জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী এবং বৈজ্ঞানিক আবহাওয়া পূর্বাভাস এক বিষয় নয়। প্রথমটি গায়েব জানার দাবি; দ্বিতীয়টি পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ।

একজন মুসলিমের করণীয় হলো—আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে একটি সম্ভাব্য সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া এবং একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা। কারণ সব পরিকল্পনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর হাতে। পূর্বাভাস সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না।

বিয়ে গোপন রাখা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
বিয়ে গোপন রাখা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

বিয়ে একজন নারী ও একজন পুরুষের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত অঙ্গীকার, একটি ইবাদত এবং সুস্থ ও শালীন সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। ইসলাম বিয়েকে সহজ, সম্মানজনক ও প্রকাশ্য করার শিক্ষা দিয়েছে। যাতে সমাজে বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সন্দেহ, অপবাদ ও অনৈতিকতার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আজকাল নানা কারণে অনেকেই বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে, কেউ পারিবারিক বা সামাজিক চাপে, আবার কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ, দ্বিতীয় বিয়ে বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিবাহকে আড়াল করেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বিয়ের বিষয় গোপন রাখা কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে?

ইসলাম বিয়েকে এমন একটি সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা হবে সমাজের কাছে স্বীকৃত, মর্যাদাপূর্ণ এবং সন্দেহমুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দিয়ে দাও এবং তোমাদের সৎকর্মপরায়ণ দাস-দাসীদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)

 তাই ইসলামে বিয়ে এমনভাবে সম্পন্ন হওয়া উচিত, যাতে তা বৈধ ও স্বীকৃত সম্পর্ক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত হয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে প্রকাশ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই বিয়ে প্রকাশ করো, মসজিদে সম্পন্ন করো এবং এর উপলক্ষে দফ বাজাও।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৯)

হাদিসের শিক্ষা হলো, মুসলিম সমাজে বিয়ে যেন গোপন না থাকে; বরং এমনভাবে প্রকাশিত হয়, যাতে সবাই জানতে পারে এটি একটি বৈধ ও শরিয়তসম্মত সম্পর্ক। কারণ গোপনীয়তা অনেক সময় সন্দেহ, অপবাদ ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। ইসলামী শরিয়তে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে—যেমন উভয় পক্ষের সম্মতি, কনের ওয়ালি (জুমহুর আলেমদের মতে), দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী এবং মোহর নির্ধারণ। এসব শর্ত পূরণ হলে বিয়ে বৈধ হয়। কিন্তু বৈধ হওয়া আর বিয়ে গোপন রাখা—এ দুটি বিষয় এক নয়।

যদি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে শরিয়তের সব শর্ত পূরণ করে বিয়ে সম্পন্ন হয়, তাহলে সেটি বৈধ হতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘদিন বিয়ের বিষয়টি সমাজ, আত্মীয়স্বজন কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে গোপন রাখা ইসলামের আদর্শ নয়। বিশেষ করে যদি এর মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়, কারও অধিকার নষ্ট হয় বা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে গুনাহের কাজ।

বর্তমান সময়ে অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ে সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। ইসলাম একাধিক বিয়ার অনুমতি দিয়েছে, তবে তার সঙ্গে ন্যায়বিচারের কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩)

অতএব, দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হলেও মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা কিংবা অন্যায়ভাবে বিষয়টি গোপন রাখা ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী। কারণ ইসলাম শুধুমাত্র বাহ্যিক বৈধতার শিক্ষা দেয় না; বরং সততা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতার ওপরও সমান গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)

তবে বিশেষ কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে—যেমন নিরাপত্তাজনিত কারণ, পারিবারিক জটিলতা বা সাময়িক কোনো বৈধ প্রয়োজনের কারণে—স্বল্প সময়ের জন্য বিয়ের বিষয়টি সীমিত পরিসরে রাখার অবকাশ থাকতে পারে। কিন্তু সেটি কখনোই স্থায়ী গোপনীয়তা বা প্রতারণার হাতিয়ার হতে পারে না। ইসলামের উদ্দেশ্য হলো, যথাসময়ে বিয়ে প্রকাশিত হবে এবং উভয় পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

ইসলাম এমন একটি সমাজ গড়তে চায়, যেখানে বৈধ সম্পর্ক সম্মান পায় এবং অবৈধ সম্পর্কের সব পথ রুদ্ধ হয়। তাই বিয়ে কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। শরিয়তের শর্ত পূরণ হলে বিয়ে বৈধ হলেও, অকারণে বা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বিয়ে গোপন রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে ঘোষণা ও প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষিত থাকে, সন্তানদের বংশপরিচয় সুস্পষ্ট হয়, সমাজে সন্দেহ ও অপবাদ দূর হয় এবং পারিবারিক জীবনে আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

অতএব, একজন সচেতন মুসলিমের উচিত বিয়েকে লুকিয়ে না রেখে যথাসম্ভব প্রকাশ করা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করা এবং এমন কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা, যা প্রতারণা, ফিতনা বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার কারণ হতে পারে। 

হাদিসের বাণী

শিক্ষার ভাষা নম্র ও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শিক্ষার ভাষা নম্র ও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস সুলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সালাত আদায় করছিলাম। তখন সালাতের মধ্যে কেউ একজন হাঁচি দিলে আমি (হাঁচির জবাবে) ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে ফেলি। তখন অন্যান্য মুসল্লিরা আমার দিকে তাকাতে লাগল। তখন আমি (মনে-মনে) বলতে লাগলাম, আমার মা আমাকে হারিয়ে ফেলুক, তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন? তখন তারা নিজ-নিজ হাত দিয়ে উরুতে আঘাত করতে লাগল। যখন বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে, আমি চুপ হয়ে গেলাম। 

তারপর মহানবী (সা.) সালাত শেষ করলেন। আমার মা-বাবা মহানবী (সা.)-এর জন্য উৎসর্গ হোক, আমি মহানবী (সা.)-এর মতো এত উত্তম শিক্ষক তার আগে-পরে কখনো দেখিনি। ওয়াল্লাহি, তিনি আমাকে গালমন্দ ও অপছন্দও করলেন না এবং আমাকে বকাঝকাও করলেন না; মারলেনও না। মহানবী (সা.)  বললেন, সালাত হচ্ছে এমন ইবাদত, যাতে কোনো মানুষের কথা বলা সংগত না। এখানে তাসবিহ, তাহলিল ও কোরআন তিলাওয়াত করা যায়। অথবা মহানবী (সা.) এমনই কোনো কথা বললেন। তারপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি তো জাহিলি যুগের কাছাকাছির লোক। আল্লাহ আমাকে ইসলামের ছায়াতলে এনেছেন। আমাদের অনেকে গণকের কাছে আসা-যাওয়া করে। (ভবিষ্যতের কথা জানার জন্য, আমিও কি যাব?) মহানবী (সা.) বললেন, না, তুমি তাদের কাছেও যেয়ো না। আমি বললাম, আমাদের অনেকে তো কোনো বস্তুকে শুভ ও অশুভ মনে করে থাকে। (ভালো-মন্দ লক্ষণ নির্ধারণ করে থাকে।) মহানবী (সা.) বললেন, এগুলো এমন অনুভূতি, যা মানুষের অন্তরে উদিত হয়। তাই এসব অনুভূতি যেন তাদের (কর্মসম্পাদনে) বাধা না দেয়। (সহিহ মুসলিম, ১১৯৯, মুসনাদে আহমাদ, ২৩৭৬২)

শিক্ষা ও বিধান
১. মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম শিক্ষক। তিনি ভুলকারীকে অপমান, গালমন্দ বা কঠোর শাস্তি না দিয়ে কোমলতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শিক্ষা দিতেন।

২. দাওয়াত ও শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে নম্রতা ও ধৈর্য অবলম্বন করা উচিত। বিশেষ করে নতুন মুসলিম বা অজ্ঞ ব্যক্তির ভুলকে সহানুভূতির সঙ্গে সংশোধন করা উচিত।

৩. গণক, জ্যোতিষী বা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে যাওয়া হারাম। ভবিষ্যৎ একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের কাছে যাওয়া বা তাদের কথা বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ।

৪. কুসংস্কার বা অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, দিন বা ঘটনার মাধ্যমে শুভ-অশুভ নির্ধারণ করা জাহিলিয়াতের রীতি।

৫. মনে অশুভ ধারণা আসা গুনাহ নয়। তবে সেই ধারণার কারণে কাজ থেকে বিরত থাকা বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত নয়।