প্রতিদিন টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন সতর্কবার্তা দেখতে পাই। কখনো বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে; কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা, কোথাও বজ্রপাত বা বন্যার সম্ভাবনা। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ আগাম প্রস্তুতি নেয়, কৃষক ফসল রক্ষা করে, জেলেরা সমুদ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকে এবং অসংখ্য মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পায়। কিন্তু মাঝে-মধ্যে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়— আবহাওয়া অধিদপ্তরের এ ধরনের বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস সম্পের্কে ইসলাম কী বলে?
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, আসমান ও জমিনে যারা আছে তারা আল্লাহ ছাড়া গায়েবের জ্ঞান রাখে না।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৬৫)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, মাতৃগর্ভে যা আছে তা তিনি জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৩৪)
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, স্বতন্ত্রভাবে, নিশ্চিতভাবে এবং সর্বাঙ্গীণভাবে ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই। কোনো মানুষ, ফেরেশতা, জিন কিংবা নবীও আল্লাহর অনুমতি ছাড়া গায়েব জানেন না।
লক্ষণীয় বিষয় হলো
আবহাওয়া অধিদপ্তর কখনোই বলে না যে, ‘নিশ্চিতভাবেই এমনটি ঘটবে।’ তারা আধুনিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, রাডার, বায়ুচাপ, তাপমাত্রা, বায়ুর গতিবেগ, আর্দ্রতা, সমুদ্রের অবস্থা এবং দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পূর্বাভাস প্রদান করে। অর্থাৎ এটি গায়েবের জ্ঞান নয়; বরং দৃশ্যমান তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।
এটি অনেকটা একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো। রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখে তিনি বলেন, ‘এই রোগীর ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আছে’ বা ‘এই ওষুধে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ চিকিৎসক ভবিষ্যৎ জানেন না; বরং দৃশ্যমান লক্ষণ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফলাফল জানান। একইভাবে একজন কৃষক আকাশের মেঘ, বাতাসের দিক কিংবা ঋতুর পরিবর্তন দেখে বৃষ্টির সম্ভাবনা অনুমান করেন। এতে কেউ গায়েবের দাবিদার হয়ে যান না। বরং ইসলাম মানুষকে প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি বাতাসকে তাঁর রহমতের পূর্বে সুসংবাদবাহীরূপে পাঠিয়ে দেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৭)
এসব আয়াত মানুষকে প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করতে এবং তাঁর নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মূল উদ্দেশ্যও ভবিষ্যৎ জানার দাবি করা নয়; বরং মানুষের জীবন, সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা করা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত কিংবা তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা দিয়ে তারা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে, কৃষকদের ফসল রক্ষা করতে, জেলেদের সমুদ্রে না যেতে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে। এর ফলে বহু প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি কমে আসে। ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা একটি মহৎ কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)
অতএব, মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সতর্কবার্তা প্রদান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো গুনাহের কাজ নয়। বরং এটি জনকল্যাণমূলক একটি দায়িত্ব। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। যদি কেউ দাবি করে যে, সে নিজেই নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যৎ জানে, অথবা আল্লাহর মতো গায়েবের পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী—তবে তা ইসলামের আকিদার পরিপন্থী। একইভাবে জ্যোতিষ, গণক, ভাগ্যবিচার বা অলৌকিক উপায়ে ভবিষ্যৎ জানার দাবি ইসলাম কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল, তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩০)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, গণক বা জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী এবং বৈজ্ঞানিক আবহাওয়া পূর্বাভাস এক বিষয় নয়। প্রথমটি গায়েব জানার দাবি; দ্বিতীয়টি পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ।
একজন মুসলিমের করণীয় হলো—আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে একটি সম্ভাব্য সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া এবং একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা। কারণ সব পরিকল্পনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর হাতে। পূর্বাভাস সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত কখনো ভুল হয় না।




