মানুষ যখন কঠিন বিপদে পড়ে, সব পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং কারো সাহায্যের আশা থাকে না, তখন তার অন্তরের সহজাত প্রবৃত্তি বা ফিতরাত জেগে ওঠে। সে তখন নিজের অজান্তেই আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। সে ভুলে যায় তার পূর্বের সব ভরসা, মিথ্যা উপাস্য কিংবা পার্থিব নির্ভরতাকে। তখন সে দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করে—আল্লাহ ছাড়া উদ্ধারকারী আর কেউ নেই।
এ কারণেই ফিতরাত আল্লাহর অস্তিত্বের সর্বোত্তম সাক্ষ্য, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ, সবচেয়ে উজ্জ্বল দলিল এবং এমন একটি যুক্তি, যার জন্য জটিল দর্শন বা বিতর্কের প্রয়োজন হয় না। এটি মানুষের হৃদয়ে স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে বিদ্যমান; সন্দেহ, কুপ্রবৃত্তি কিংবা অপপ্রচার দ্বারা একে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।
আল্লাহ তাআলা মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তির কথা কোরআনের বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যখন মানুষ কোনো কষ্টে পতিত হয়, তখন সে শোয়া, বসা কিংবা দাঁড়ানো—সব অবস্থায় আমাকে ডাকে। অতঃপর যখন আমি তার কষ্ট দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলে যায় যেন সে কখনো আমাকে ডাকেনি।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১২)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও অহংকার করে। কিন্তু যখন তাকে কোনো কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনায় লিপ্ত হয়।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৫১)
সমুদ্রযাত্রার উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি (আল্লাহ) তোমাদের স্থল ও সমুদ্রে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। এমনকি যখন তোমরা নৌকায় থাকো এবং অনুকূল বাতাসে আনন্দে ভেসে চলো, হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় ও চারদিক থেকে উত্তাল ঢেউ এসে তাদের ঘিরে ধরে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডেকে বলে—আপনি যদি আমাদের এ বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ২২)
এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এমন যে যখন সে বিপদ, দুঃখ, সংকট বা অসহায় অবস্থায় পড়ে, তখন তার হৃদয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহান স্রষ্টার দিকে ফিরে যায়। সে বুঝতে পারে—আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত উদ্ধারকারী আর কেউ নেই।
ফিতরাত ইসলামের ডাক দিয়ে যায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে ‘ফিতরাত’ বলতে ইসলামকেই বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন—‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়; যেমন একটি পশু সম্পূর্ণ সুস্থ বাচ্চা প্রসব করে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩৮৫)
এই হাদিস বর্ণনা করার পর আবু হুরায়রা (রা.) কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন—‘আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সাহাবায়ে কিরাম ‘ফিতরাত’ বলতে ইসলামের স্বাভাবিক ধর্মকেই বুঝতেন। ফিতরাত আল্লাহর সঙ্গে মানুষের আদিম অঙ্গীকারের সাক্ষ্য বহন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিলাম। যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো—আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৭২)
মানুষের সহজাত ফিতরাত স্রষ্টা সম্পর্কে একটি মৌলিক ও সামগ্রিক জ্ঞান দান করে। সে অনুভব করে যে তার একজন প্রতিপালক আছেন, যাঁর সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং তাঁর ইবাদত করা উচিত।
কিন্তু এই সহজাত প্রবৃত্তিকে সঠিকভাবে বিকশিত ও পরিশুদ্ধ করার জন্য আল্লাহর ওহি এবং নবী-রাসুলদের দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘শপথ মানুষের নফসের এবং যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন; অতঃপর তাকে তার পাপ ও তাকওয়ার জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সে সফল হয়েছে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে; আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা : আশ-শামস, আয়াত : ৭-১০)
অতএব, ফিতরাত মানুষের অন্তরে সত্যের বীজ রোপণ করে; আর ওহি সেই বীজকে লালন-পালন করে পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত করে।




