• ই-পেপার

মেস থেকে ববি শিক্ষার্থীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

বুয়েটের উপউপাচার্য হলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম

অনলাইন ডেস্ক
বুয়েটের উপউপাচার্য হলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলামকে বিশ্ববিদ্যালয়টির চতুর্থ উপউপাচার্য (প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

বুধবার (২২ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগের কথা জানানো হয়। তিনি বর্তমান উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হবেন।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম ১৯৯৭ সালে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। 

পরে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ২০১৩ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। বর্তমানে তিনি বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (রাইজ)-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি জাপানের সাইতামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে ২০০২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগ, ক্যান্টিনকর্মী আটক

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগ, ক্যান্টিনকর্মী আটক

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বিজয়’২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছেন ছাত্রীরা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হলজুড়ে আবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

বুধবার (২৩ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিজয়’২৪ হলের গণরুমসংলগ্ন ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এক ছাত্রীর ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে ওই ছাত্রী আতঙ্কিত হয়ে সহপাঠীদের জানান। খবর ছড়িয়ে পড়তেই হলের বিভিন্ন ব্লকের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন।

শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাকর্মীদের বিষয়টি জানালে তারা অভিযুক্ত ইমাম হাসানকে আটক করেন। এ সময় হলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে হল প্রশাসন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ নেয়।

বিজয়’২৪ হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওয়াশরুমে একটি মোবাইল ফোন দেখতে পেয়ে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। পরে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে হলের বিভিন্ন ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হন। পরে অভিযুক্তকে হলের ভেতরে আটকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়। ঘটনার পর থেকে হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এদিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেন, অভিযুক্তের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিক ভিডিও পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হলের ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণ করে সেগুলো বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে পাঠাতেন।

বিজয়’২৪ হলের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী বলেন, ‘সবসময় আমাদের নিরাপত্তার কথা বলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। অথচ নিজেদের হলেই যদি আমরা নিরাপদ না থাকি, তাহলে কোথায় নিরাপদ থাকব? এর আগেও ওই ব্যক্তির চলাফেরা সন্দেহজনক বলে হল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয়’২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, ‘এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তারেক বিন সালাম বলেন, ‘অভিযুক্তকে আটক রাখা হয়েছে। তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা এবং মামলা দায়েরের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

এদিকে বুধবার রাতের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে সম্প্রতি ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির বিভিন্ন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। নতুন এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা দ্রুত ও তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের আর কত গিনিপিগ বানানো হবে?

অনলাইন ডেস্ক
শিক্ষার্থীদের আর কত গিনিপিগ বানানো হবে?

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে আবারও লিখিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। সরকারের এ পদক্ষেপে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে অনেকেই এখন কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের (প্রাইভেট টিউটর) দ্বারস্থ হচ্ছেন। অভিভাবকদের উদ্বেগ দূর করতে গত মাসে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ছোট শিশুদের ভর্তি প্রক্রিয়াটি সহজ হবে এবং এতে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াকে উৎসাহিত করা হবে না।

তবে রাজধানীর বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, তারা এরই মধ্যেই প্রথম শ্রেণির ভর্তিচ্ছুদের জন্য বিশেষ কোর্স ও নির্দিষ্ট স্কুলভিত্তিক গাইডলাইন দেওয়া শুরু করেছে। অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে স্কুলজীবন শুরুর আগেই শিশুদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

আবার প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ দূর করতে ২০১১ সালে সরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে লটারিভিত্তিক ভর্তি প্রথা চালু করা হয়েছিল। চলতি বছর শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এ লটারি পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ছেলে এবং ১৭ লাখ ৯৯ হাজার মেয়ে। এ বিপুলসংখ্যক শিশুর পরীক্ষা সম্পন্ন করা সরকার এবং স্কুলগুলোর জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের অভিভাবকদের পছন্দের স্কুল হাতেগোনা। ফলে এ কটি স্কুলে ভয়াবহ ভর্তিযুদ্ধ হবে। যাতে বেশির ভাগ শিশু অকৃতকার্য হয়ে জীবনের শুরুতেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। এদের শিক্ষায় আগ্রহ কমে যাবে। জীবনের শুরুতেই শিশুদের এ রকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?

এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, লটারি পদ্ধতিতে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। লটারির নামে স্বজনপ্রীতির অনেক অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান হতে পারে না।

শিক্ষা নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত বদল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে শিক্ষা নিয়ে যত এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে তা আর কোনো ক্ষেত্রে হয়নি। এর ফলে আমাদের শিক্ষার মান তলানিতে, বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। লক্ষ্যহীন শিক্ষায় জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কমছে।

বারবার বদলে যাচ্ছে কারিকুলাম
একটা সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষা কারিকুলাম, শিক্ষানীতির আমূল পরিবর্তন হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাব্যবস্থার সবকিছু পাল্টে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৮ সাল থেকে স্কুলগুলোয় এ কারিকুলাম চালু করবে সরকার। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘ সময়ে টেকসই শিক্ষা কারিকুলাম না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে তরুণ-তরুণীরা। ২০১৩ সালে শিক্ষায় নতুন জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম এনেছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। এরপর ২০২৩ সালে ফের নতুন জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম বাস্তবায়ন শুরু করে দলটি। এই কারিকুলাম নিয়ে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয় শিক্ষা সেক্টরে।

সব সমালোচনা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ সরকার এ কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্তর্বর্তী সরকার এক যুগ পেছনে ফিরে গিয়ে ২০১২ সালের কারিকুলাম অনুযায়ী ২০২৫ সালে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বই বিতরণ করে। চলতি বছরও শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে এক যুগের বেশি সময়ের আগে প্রণয়ন করা কারিকুলামে। ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলামের বই পাবে ছাত্রছাত্রীরা। অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ-ছয় বছরেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তিনটি কারিকুলাম। এভাবে দেশের শিক্ষা নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কিছু দিন পরপর খোলনলচে বদলে ফেলার কারণে শিক্ষা খাতে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তনে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে, বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার কোনো তাগিদ নেই। বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন বলতে এখনো অবকাঠামোগত উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তার পছন্দের এলাকায় বড় বড় দালান সমৃদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। কিন্তু ভালো শিক্ষক এবং উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে না। ফলে, কিছুদিনের মধ্যেই এসব সুন্দর ভবন অবহেলায় পড়ে থাকে। বাংলাদেশের শতকরা ৪০ শতাংশ সরকারি স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। ভালো মানের শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা এখন সরকারি স্কুলের চেয়ে বেসরকারি স্কুলের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। গত তিন বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্যাডেট কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এবং বেসরকারি স্কুলগুলো সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। সে তুলনায় জিলা স্কুল ও সরকারি স্কুলের ফল নিম্নমুখী। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষায় এ বিপুল বিনিয়োগ কি আদৌ কাজে আসছে। আমাদের শিক্ষা খাতের বাজেট প্রায় পুরোটাই চলে যায় বেতন-ভাতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে। শিক্ষার মানোন্নয়নে গবেষণা, লাইব্রেরি, ল্যাব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য বাজেট বরাদ্দ খুবই কম। ফলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি হচ্ছে না।

প্রাথমিক শিক্ষার করুণ চিত্র
বাংলাদেশের শিক্ষার সবচেয়ে করুণ দশা প্রাথমিক শিক্ষায়। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থার একটি। দেশে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি ও ৫৩ হাজার ৩৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। আজ বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের সংকট, প্রশাসনিক জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত অশিক্ষামূলক দায়িত্ব শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় গুণগত প্রাথমিক শিক্ষার দিক দিয়ে আমরা এখনো পিছিয়ে। পঞ্চম শ্রেণি সমাপ্ত করার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়তে এবং পড়ে মানে বুঝতে পারছে না। প্রাথমিক শিক্ষার নিম্নমানের কারণে এখন অভিভাবকরা হয় ইংরেজি মাধ্যম স্কুল অথবা মাদরাসা শিক্ষার দিকে ঝুঁকছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরাও এখন তাদের সাধ্যের বাইরে গিয়ে সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। আবার গরিবরাও ক্রমশ সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষার চেয়ে মাদরাসা শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে শতকরা ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত কম হওয়ায় মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী নন। ফলে শুরুতেই শিক্ষার মান হোঁচট খাচ্ছে।

মাধ্যমিক শিক্ষাও ধুঁকছে
মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা আরো করুণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হলো মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি সরকারের অবহেলা। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি স্কুলের প্রাধান্য বিরাজ করে। এ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাকি ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করে।

উচ্চশিক্ষা তথা ব্যাচেলর ও মাস্টার ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার দিকে তাকালে আমরা দেখি, ব্যক্তি খাতে ১০৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত। যদি মাধ্যমিক (এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের) শিক্ষার দিকে তাকাই, তাহলে দেখি, মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত এবং বাকি ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করে। বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পারিতোষিকের একটি অংশ সরকারি তহবিল থেকে প্রদান করা হয়। এ বন্দোবস্তের নাম ‘মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও)’ বাংলায় বলা যেতে পারে মাসিক বেতন আদেশ। এমপিও ব্যবস্থার একটি প্রত্যক্ষ ফল হলো বৈষম্য। কারণ, সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তুলনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কম ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পান এবং অনেক সময় পানও না। সামগ্রিকভাবে এ বন্দোবস্তের ফলে মাধ্যমিক শিক্ষকদের মধ্যে একটি শ্রেণি বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানের একটি চিত্র উঠে এসেছিল বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের প্রতিবেদনে। এ ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণিতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণির দক্ষতার সমান। হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের আগের সংস্করণের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, দিনদিন বাংলাদেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মানে অবনমন ঘটছে। ইনডেক্সের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ওই সময়ে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে যে দক্ষতা অর্জন করত, তা ছিল আন্তর্জাতিক মানে ৬ বছর ৫ মাস বা সপ্তম শ্রেণির দক্ষতার সমান। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মানের আরো অবনমন ঘটেছে।

উচ্চ শিক্ষার বেহাল দশা
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার যখন এই করুণ অবস্থা তখন উচ্চশিক্ষার মান কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দেওয়া নয়, তাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক বোধের বিকাশ ঘটানো। সৃজনশীলতা, সহযোগিতা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই হওয়া ও আজীবন শিক্ষার ক্ষমতা কোনো কোর্সের সিলেবাসে আটকে রাখার মতো বিষয় নয়। এসব গড়ে ওঠে একটি গতিশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক পরিবেশের মাধ্যমে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো আমরা ভাবি তাত্ত্বিক চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে, যা শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেকটাই দূরে। একদিকে সমাজ চায় সৃজনশীল, নৈতিক ও অভিযোজনে সক্ষম নাগরিক; অন্যদিকে শিল্প ও শ্রমবাজার চায় এমন স্নাতক, যে প্রথম দিন থেকেই নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে। এই দুই প্রত্যাশার মাঝখানে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন দিশাহীন। বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হচ্ছে সার্টিফিকেট ব্যবসা। এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে ন্যূনতম পাঠদান ছাড়াই সার্টিফিকেট বিক্রি করা হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে অচল হয়ে পড়েন। এভাবেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক অতল অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে।

শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি
শিক্ষার এই বেহাল দশার প্রধান কারণ হলো, শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি। যখন যেদল ক্ষমতায় আসে তখন তারা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের আলোকে কারিকুলাম পরিবর্তন করে। তাদের পছন্দের লোকদের শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলে রাখার জন্য ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলেছে সব সময়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা পথ হারিয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণ না হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন অসম্ভব। আর শিক্ষার উন্নয়ন না হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাকে রাজনীতির বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির ৩১ দফায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শিক্ষায় দলীয়করণ বন্ধ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বলেছেন, দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজাতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। শিক্ষা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। শিক্ষার মান উন্নয়নে তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য। শিক্ষাকে দলীয় রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজাতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেই শিক্ষানীতি, কারিকুলাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

অধ্যাপক আল মামুন

জুলাই ছিল সর্বদলীয় গণ-আন্দোলন, কোনো একক দলের নয়

রাবি প্রতিনিধি
জুলাই ছিল সর্বদলীয় গণ-আন্দোলন, কোনো একক দলের নয়
অধ্যাপক আল-মামুন। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা সর্বদলীয় গণ-আন্দোলন।

বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের ১০৪ নম্বর কক্ষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিবার্ষিকী উপলক্ষে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, রাবি শাখা আয়োজিত ‘ফিরে দেখা জুলাই : স্মৃতিচারণা ও আলোচনাসভা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।

অধ্যাপক আল মামুন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর একক এজেন্ডা ছিল না, বরং এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের একটি সর্বদলীয় গণ-আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রচারণায় আন্দোলনটিকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের ব্যানারে রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা দেখা গেলেও, মূল নেতৃত্বের ভাষ্য এবং মাঠের চিত্র ভিন্ন কথা বলে।’

তিনি বলেন, ‘জুলাইকে অনেকেই ষড়যন্ত্র বলে। কিন্তু জুলাই কোনো মেটিকুলাস ডিজাইন কিংবা কোনো ষড়যন্ত্র নয়। এটি ছিল একটি অনিবার্য বাস্তবতা। ২০২৪ সালে না হলে ২০২৫ কিংবা ২০২৬ সালেও এমন অভ্যুত্থান ঘটত।’

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে আল-মামুন বলেন, ‘সরকার যেভাবে রাষ্ট্রকাঠামো ব্যবহার ও রাষ্ট্র পরিচালনা করছিল, তাতে একটা গণ-অভ্যুত্থান কিংবা সামরিক অভ্যুত্থান ছাড়া সরকার পরিবর্তনের আর কোনো পথ ছিল না।’

তিনি দাবি করেন, ‘জুলাই ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গণচেতনার প্রতিফলন, যেখানে দলীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধই ছিল মূল শক্তি।’

সভায় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা অন্যায়, বঞ্চনা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তাই একে ‘কালার রেভোলিউশন’ বা বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। লক্ষ-কোটি মানুষের অংশগ্রহণেই এই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।’

ফুয়াদ রাতুলের সভাপতিত্বে আলোচনাসভা সঞ্চালনা করেন শাখা সেক্রেটারি মো. সজীব। অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘ছাত্র-জনতার জবানীতে লড়াইয়ের দিনগুলি’ শীর্ষক স্মৃতিচারণ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।