রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচল যেন নিত্যদিনের চিত্র। একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এবং যাত্রী ধরতে একে অপরকে ওভারটেক করার প্রবণতায় প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে যানজট। এতে শুধু সড়কের গতি কমছে না, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, নির্দিষ্ট বাস স্টপেজে না থেমে বাসগুলো যাত্রী দেখলেই সড়কের যেকোনো অংশে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি বাস রাস্তার এক পাশে দাঁড়ালে অন্য বাসটি সেটিকে পাশ কাটিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে পেছনে থাকা যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। অনেক সময় বাসগুলো একাধিক লেন দখল করে দাঁড়ানোয় সড়কে তৈরি হচ্ছে যানজট। রাজধানীর সড়কে নামলেই চোখে পড়বে বিশৃঙ্খল অবস্থা। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় রাস্তায় বাসের রেষারেষি নিত্যচিত্র। ভাড়া নিয়ে বাসের হেলপারের সঙ্গে যাত্রীর বাগ্বিতণ্ডা লেগেই থাকে। দুই বাসের চাপায় হাত হারানো, যাত্রী তুলতে ফুটপাতে উঠে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া কিংবা ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়েছে কিন্তু শৃঙ্খলা ফেরেনি নগরের গণপরিবহনে। পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে কয়েকটি রুটে চালু হয়েছিল লাল সবুজ নগর পরিবহন বাস, গোলাপি রঙের বাস। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই টেকসই হয়নি। ২০১৬ সাল থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস নামানো নিয়ে কাজ শুরু হলেও ১০ বছরেও তা সফলতা পায়নি। ব্যর্থ হয়েছে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর সব চেষ্টা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘গণপরিবহনে আধুনিকায়ন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত উন্নয়নে নজর দিতে হবে। প্রথমে অগ্রাধিকার দিতে হবে পথচারীদের এরপর গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার অনুৎসাহিত করতে গণপরিবহনকে যুগোপযোগী করতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন ৪০টি নতুন গাড়ি নামছে রাস্তায়। রাস্তা না বাড়লেও গাড়ি বাড়ছে প্রতিদিন। এতে যানজট বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় গাড়ি ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার যেতে পারছে। রাস্তা না বাড়িয়ে ডবল ডেকার বাসে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যেতে পারে। সড়ক পরিবহনে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থাকে এক ছাতার নিচে কেউ কখনো আনতে পারে নি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় রুটভিত্তিক সমন্বয় না থাকায় এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে। একই রুটে অসংখ্য বাস কোম্পানি নিজেদের মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতায় নামে। ফলে বাস চলাচল অনেকটা ‘যাত্রী আগে ধরার প্রতিযোগিতা’ নির্ভর হয়ে পড়েছে। যাত্রী পাওয়ার আশায় চালকরা হঠাৎ গতি কমান, ব্রেক করেন, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ান কিংবা এক লেন থেকে অন্য লেনে চলে যান। এ ধরনের আচরণে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ও সড়কের শৃঙ্খলা দুটিই নষ্ট হয়।
বাসের এলোমেলো চলাচলের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে যাত্রী ওঠানামার সময়। নির্দিষ্ট স্টপেজে না থেমে যাত্রীদের সুবিধামতো বা চালক-হেলপারের ইচ্ছায় বাস থামানো হচ্ছে। ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ফলে পেছনে যানবাহনের সারি তৈরি হয়।
রাজধানীর অধিকাংশ সড়কে বাসগুলো নির্দিষ্ট লেন ধরে চলে না। যাত্রী ওঠানোর জন্য হঠাৎ বাম পাশে চলে যাওয়া, সামনে থাকা যানবাহন পাশ কাটাতে ডান দিকে সরে যাওয়া কিংবা মোড়ের কাছে একাধিক লেন দখল করে দাঁড়িয়ে পড়ার এসব ঘটনা প্রতিদিনের। ঢাকার সড়কে যানবাহনের ধরনও একেবারে একরকম নয়। বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন একই সড়কে চলাচল করে। এই মিশ্র যানবাহনের মধ্যে বাসের অনিয়ন্ত্রিত লেন পরিবর্তন সামগ্রিক যানপ্রবাহকে আরও জটিল করে তোলে। ঢাকার মতো নন-লেনভিত্তিক ও বৈচিত্র্যময় যানবাহন ব্যবস্থায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ও প্রেক্ষিতভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে গবেষণাতেও উঠে এসেছে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন








