• ই-পেপার

অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা প্রয়োজন

  • ড. খলিলুর রহমান

উচ্চশিক্ষায় ওবিইর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়াস এবং বাস্তবতা

মাছুম বিল্লাহ

উচ্চশিক্ষায় ওবিইর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়াস এবং বাস্তবতা

আউটকাম বেইসড এডুকেশন (ওবিই) এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে পাঠ্যবিষয়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা কী ধরনের যোগ্যতা অর্জন করবে এবং সেই দক্ষতার মূল্যায়ন কিভাবে হবেসেদিকে। এর মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি, প্রায়োগিক দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালে ওবিই কারিকুলাম চালুর সুপারিশ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদের অধীনে ৮৪টি বিভাগ এবং ১৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে কলা ও চারুকলা অনুষদের বেশির ভাগ বিভাগে ওবিই চালু করা হয়েছে বলে পত্রিকা মারফত খবর দেখলাম। তবে বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের কোনো বিভাগেই এখনো এই কারিকুলাম চালু হয়নি। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মাত্র দুটি বিভাগে ওবিই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষকসংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং বড় আকারের শ্রেণিকক্ষের কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

এখানে যেটি হওয়া উচিত ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও তাই যে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করা, তাদের পাঠ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিভাবে আনন্দময় করা যায়, উচ্চশিক্ষা কিভাবে মানবিক ও সামাজিক করা যায় সেদিকে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীরা শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার হয়ে বসে না থেকে বরং সমাজের চাহিদা অনুযায়ী নিজেরা কাজ করবেন এবং অন্যদেরও করাতে পারবেন। এসব বিষয়ের গবেষণার ফল সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য লেভেলের শিক্ষকদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও  প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে কিভাবে তাঁদের শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট বিষয়ে পাঠ দেওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে। এগুলো তাঁদের তৈরি করার কথা ছিল সব পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য। তাঁদের গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ তথ্য অন্যান্য শিক্ষকের মাঝে বিতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে উল্টো! অন্যের তৈরি করা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মাধ্যমে অর্জন করানো যায়, সেটি নিয়ে চলছে প্রশিক্ষণ।

এর বেশ কিছু কারণও আছে। যেমনবিশ্ববিদ্যালয়জীবনে দেখেছি, যাঁরা শিক্ষক (ব্যতিক্রম আছে), তাঁরা শুধু নিজের বিষয়ে নোট মুখস্থ করে, নির্দিষ্ট কিছু পাঠের ওপর জোর দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু সমাজ, রাজনীতি, মানবিকতা, সামাজিকতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, দেশের পরিস্থিতিএসব বিষয়ে তাঁরা ছিলেন বেখেয়ালি। তাঁরা পড়ে পড়ে  প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন এবং তাঁরাও প্রায় এ রকমই কিছু শিক্ষার্থী তৈরি করছেন। অন্যদিকে যাঁরা চারদিকের জ্ঞান রাখেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কাজ করেন, তাঁরা সিভিল সার্ভিসে যোগ দিচ্ছেন। যাঁরা শুধু একটি বিষয়ে ইনটেলেকচুয়ালি গভীরে না গিয়ে সব দিকে মোটামুটি স্মার্ট, তাঁরা হচ্ছেন আমলা ও রাজনীতিবিদ। এ ধরনের বিষয় আশির দশক পর্যন্ত একেবারে বেমানান ছিল না। কিন্তু তার পরের দশকগুলোতে এগুলোকেও ছাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়েছেন শুধু পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীও না, আবার আমলা হওয়ার আশায় যাঁরা শুধু নিজ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত না থেকে বাইরের অনেক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, তাঁরাও না। প্রধানত পার্টিতন্ত্রের জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ঢুকে পড়েছে একটি বড় অংশ, যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমাজের কেউ এখন প্রকৃত শিক্ষকই মনে করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, তথাকথিত জ্ঞানদানসবকিছুই একেবারে গৌণ হয়ে পড়েছে। 

সরকার টেকনিক্যাল সেন্টারের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা শুরু করল। মনে হচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এক ধরনের ট্রেনিং সেন্টার, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হলেই সমাজে যেসব পেশার চাহিদা আছে, তারা সেগুলো পূরণ করে ফেলবে এবং বেকার থাকবে না। উচ্চশিক্ষা নিয়ে এই উল্টো ধারণা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। আমাদের দরকার প্লাম্বার, আমাদের দরকার রেডিও-টিভি-ফ্রিজ মেরামত করার লোক, দরকার গাড়ির মেকানিক, আমাদের প্রয়োজন কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষি প্রকৌশলী, কিন্তু তাঁদের বড় অভাব। আপনার বাসায় বাথরুমে কিংবা কিচেনে সমস্যা হয়েছে, সঠিক লোক পাবেন না। লোক ডেকেছেন, সে আসছে চার-পাঁচ দিন পর। কারণ তাদের প্রচুর চাহিদা। অথচ একটি প্রতিষ্ঠানে একজন বা দুজন এমবিএ প্রার্থী চাওয়া হয়েছে, গিয়ে হাজির হবেন ৫০০ কিংবা ৬০০ জন। চাওয়া হয়েছে এসএসসি বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস পিয়ন, দেখবেন ২০০ দরখাস্ত পড়েছে মাস্টার্স আর গ্র্যাজুয়েট। এই বাস্তবতার আলোকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেটি কে নেবে? সবাই ভাবে, রাষ্ট্র নেবে। রাষ্ট্র নেয় না। দায়িত্বে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কিছু জনপ্রিয় কথা বলে থাকেন! তা না হলে পূর্ববর্তী সরকার উচ্চশিক্ষার যে মহাক্ষতি করে গেছে, তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ছোট ছোট জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেটিকে আরো বেগবান করার চেষ্টা চলছে। জনপ্রতিনিধিরা আসল সমস্যায় না গিয়ে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চান। এর মানে কী, তা আমাদের বুঝে আসে না।

আপাতদৃষ্টিতে বাজারমুখী দক্ষতার চমৎকার আলোচনা ও সাইনবোর্ড বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সঙ্গে এই ধারণা কতটা যায়! লোকপ্রশাসন বিভাগে যাঁরা পড়াশোনা করেন, তাঁরা দেশের লোকপ্রশাসন, পার্শ্ববর্তী এবং উন্নত বিশ্বের কিছু লোকপ্রশাসন সম্পর্কে ধারণা রাখেন। কিন্তু প্রকৃত প্রশাসন চালাতে হলে তাঁকে প্রশাসনে আসতে হবেতারপর পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে, বহু ধাক্কা খেয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লোকপ্রশাসনে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা সবাই কি প্রশাসক হবেন? তাঁদের জন্য এত পোস্ট কি খালি আছে? তাঁরা সবাই প্রশাসনে গেলে অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কী হবে? একইভাবে যাঁরা পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন, তাঁরা সবাই কি অ্যাটমিক এনার্জি বা এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করবেন? বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাই? বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা; যেমনপ্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন থেকে পাস করে বেশ কয়েক দশক ধরে অনেকেই নিজেদের বিভাগীয় চাকরি বা প্রসপেকটাস বাদ দিয়ে সাধারণ চাকরি, বিশেষ করে প্রশাসনে চলে আসছেন, এমনকি ব্যাংকে চাকরি করছেন, পুলিশ প্রশাসনে চাকরি করছেন। কারণ উচ্চশিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক চাকরি নেই। আর বিশেষায়িত বিষয় পড়ে যাঁদের বিশেষ সেবা করা দরকার ছিল, রাষ্ট্র তা-ও নিশ্চিত করতে পারেনি। অথচ আউটকাম বেইসড কারিকুলামের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই রোগের চিকিৎসা কতটা সারানো যাবে, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে যে বিভাগেই পড়ুক না কেন, সবাই প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএস গাইড পড়া শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাইব্রেরির বই ও জার্নাল থাকে আনটাচড, অথচ লাইব্রেরিতে বসার জায়গা নেই, লাইব্রেরিতে ঢোকার জন্য লম্বা লাইন। তারা সবাই জানে পাঠ্যবিষয় পড়ে কোনো লাভ নেই, পড়তে হবে সাধারণ জ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান আর ইংরেজি ও গণিত। তাহলে বিসিএসসহ যেকোনো চাকরির দরখাস্ত করা যাবে, চাকরির পরীক্ষায় ভালো করা যাবে। আর তাই সবাই সেদিকে ছুটছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে ওবিই প্রশিক্ষণ কতটা এবং কিভাবে সমন্বয় করবে, সেটি আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে।

সরকারি পলিটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল নলেজ নেই, বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। কারণ তারা প্র্যাকটিক্যাল কাজ শেখেনি, রাজনীতি করেছে। তবে ব্যতিক্রম আছে। যারা টেকনিক্যাল কাজ শিখছে নিতান্ত অসহায় অবস্থায়, রাস্তার পাশে, চিপার ভেতর কোনো কারখানায়; সমাজে তাদের চাহিদা রয়েছে। এগুলোকে কিভাবে উন্নত করা যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায় এখন কাজ করতে হবে সেগুলো নিয়ে। কারণ সমাজে তাদের প্রয়োজন। যেমনএকজন গাড়ির ড্রাইভারের বেতন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত, অথচ একজন এমবিএ পাস করা গ্র্যাজুয়েটের বেতন ১০ হাজার টাকা, একজন মাধ্যমিকের শিক্ষকের বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এটি বর্তমান সমাজের চাহিদা ও বাস্তবতা! সরকার এগুলো কিভাবে সমন্বয় করবে, সেটি নিয়ে দরকার বাস্তব পরিকল্পনা। কিন্তু আমরা শুনি আরো কোথায় কোথায় বিশ্ববিদ্যালয় হবে অর্থাৎ সমাজে আরো বেকার কিভাবে বানানো যায়, সেদিকে হাঁটা। আরো শুনি কারিকুলাম পরিবর্তন করতে হবে, তাহলে সবাই যেন চাকরি পেয়ে যাবে ইত্যাদি! আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম বেইসড কারিকুলাম থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাস করার পর চাকরি পায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট বাটখারায় পরিমাপযোগ্য পণ্য নয়, উচ্চশিক্ষা টেকনিক্যাল বিষয় নয়, উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট কিছু প্রশিক্ষণ, গ্রেড আর লেসন প্ল্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। উচ্চশিক্ষার ধারণা ব্যাপক, উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক জ্ঞান, বিশেষ জ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করে, যার প্রকাশ ঘটে নতুন কিছু আবিষ্কার, নতুন কিছু উদ্ভাবনের মাধ্যমে। চার বছরের অনার্স আর এক বা দুই বছরের মাস্টার্স পড়ে ওই বিষয়েই চাকরি ম্যানেজ করতে হবেএই ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এ জন্য আমাদের কলেজ বা বিশেষায়িত টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা দরকার, যেখানে সাধারণ বিষয়াবলিও থাকবে, তবে টেকনিক্যাল জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা শেখানো হবে বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীকে। সেই চাহিদা বা ছাঁচে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা হতে পারে না।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

(ইট্যাব)

পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ

পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জেলাগুলোতে পাহাড়ধস এখন আর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি নিয়মিত ও মানবসৃষ্ট প্রাণঘাতী ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে বনায়ন ধ্বংসের ফলে পাহাড়গুলোর মাটির অভ্যন্তরীণ বাঁধন সম্পূর্ণ আলগা হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষা এলেই অপরিকল্পিত বসতি আর কম ভাড়ার মারণফাঁদে থাকা শত শত দরিদ্র মানুষের ওপর আছড়ে পড়ছে পাহাড়ি ধস, কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর মিছিল থামাতে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন করতে স্থির ও পুরনো ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বাস্তব সময়ভিত্তিক গতিশীল ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালুকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পুনর্বাসনে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় ও কারিগরি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল, বিশেষ করে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এবং বৃহত্তর সিলেটের পাহাড়গুলোর গঠনশৈলী সমতলের চেয়ে একদম আলাদা। এই পাহাড়ের মাটি মূলত অসংলগ্ন বেলেপাথর, পলি ও দো-আঁশ মাটির মিশ্রণে গঠিত, যা ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। শুষ্ক মৌসুমে এই মাটিতে গভীর ফাটল সৃষ্টি হয় এবং বর্ষা মৌসুমে যখন দীর্ঘস্থায়ী অতিভারি বর্ষণ ঘটে, তখন ওই ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে মাটি অতিরিক্ত ভারী হয়ে পড়ে। এর ফলে মাটির ভেতরের সংহতি শক্তি বা বাঁধন সম্পূর্ণ আলগা হয়ে আস্ত পাহাড়ের ঢাল নিচে ধসে পড়ে। এই প্রাকৃতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে গত কয়েক দশকে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, নির্বিচারে বনায়ন ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ।

পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপপরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে সংঘটিত ভূমিধসের ঘটনাগুলোর প্রায় ৮৩ শতাংশই ঘটে থাকে বর্ষাকালীন মৌসুমে জুন থেকে আগস্ট মাসের অতিবৃষ্টির সময়। গত এক দশকের বিভিন্ন প্রকাশনার তথ্যানুযায়ী, বছরভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। যেমন২০১৫ সালের জুন-জুলাইয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড়ধস ও ঢলের কারণে অন্তত ২৩ জন প্রাণ হারায়। ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা এবং নাজির পাহাড় এলাকায় পাহাড় ও সীমানাপ্রাচীর ধসে ছয়জন নিহত হয় এবং ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর মোট ২৩টি পাহাড়ধসের ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়।

এরপর ২০১৭ সালের ১৩ জুন বাংলাদেশ ইতিহাসের ভয়াবহতম ভূমিধস বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, যখন রাঙামাটিতে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৩৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে একযোগে পাঁচটি জেলার ১৪৫টি স্থানে ভূমিধস ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায় পাঁচজন সেনা সদস্যসহ মোট ১৬০ জন নিহত এবং ১৮৭ জন আহত হয়, যার ফলে প্রায় ছয় হাজার বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং ৮০ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরের ভূ-প্রকৃতি পরিবর্তনের কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবান ও চট্টগ্রামে নিয়মিত বিরতিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালের ১১-১২ জুন রাঙামাটির নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে ১১ জন, ৩ জুলাই বান্দরবানের লামায় চারজন এবং ২৫ জুলাই কক্সবাজারের রামুতে পাঁচজনসহ মোট ২৫ জন মারা যায়। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ১৪ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতে ২৬টি ধসের ঘটনা ঘটে, আর পুরো বর্ষা মৌসুমে মোট ১৭ জন নিহত এবং ৯০ জন আহত হয়।

২০২০ সালে করোনা মহামারির লকডাউনের মধ্যে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধস ঘটলে রোহিঙ্গা শিবিরে ১৪ জন নিহত এবং ৪১ জন আহত হয়। ২০২১ সালের জুলাই ও আগস্টের শেষ ভাগে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ফলে ২৬ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়। ২০২২ সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় চারজন, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে চারজন নারী শ্রমিক এবং কক্সবাজারের রামুতে একই পরিবারের চারজনসহ মোট ১৩ জন প্রাণ হারায়।

২০২৩ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে টানা বর্ষণে পার্বত্য বান্দরবানের ৯০ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় এবং উখিয়া, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে মোট ১৩ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়। ২০২৪ সালের ১৮-১৯ জুন সিলেট অঞ্চলে ২৪২ মিলিমিটার এবং সুনামগঞ্জে ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, আর দেশব্যাপী ভূমিধসে মোট ২১ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়; যার মধ্যে উখিয়া ক্যাম্পে ছোট-বড় অনেক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে এবং ১০ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে সিলেটের গোলাপগঞ্জে টিলাধসে একই পরিবারের চারজন ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায়, আর পুরো বছরে মোট সাতজন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়।

চলতি মৌসুমে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে (৫ থেকে ৯ জুলাই) অতিবৃষ্টির ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে এবং পাহাড়ধস ও বন্যায় মোট ৩০ জন মারা যায় এবং ৪০ জন আহত হয়। জেলাভিত্তিক হিসাবে এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ১৯ জন মারা যায় কক্সবাজারে, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাঁচজন করে এবং রাঙামাটিতে একজন মারা যায়। তবে খাগড়াছড়িতে কোনো প্রাণহানি না হলেও সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ভূমিধসে নিহতদের সামাজিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম সামাজিক সত্য বেরিয়ে আসে। নিহতদের প্রায় শতভাগই দেশের দরিদ্রতম শ্রেণি এবং জলবায়ু শরণার্থী। নদীভাঙন বা সমতলে কাজ হারিয়ে যেসব মানুষ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোতে আসে, তারা নিরাপদ আবাসন মেলাতে পারে না। শহরের নিরাপদ আবাসন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে স্থানীয় প্রভাবশালী দখলদারদের মাধ্যমে অবৈধভাবে গড়ে তোলা স্বল্প ভাড়ার ঘরে সপরিবারে থাকতে শুরু করে। কম ভাড়ায় বাসস্থান পাওয়ার এই অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাটিই মূলত তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানির পর গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির ৩৬ দফা সুপারিশের বেশির ভাগই গত দেড় দশকে আলোর মুখ দেখেনি। প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানগুলো মূলত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে লোক-দেখানো মাইকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং শুকনা মৌসুম আসামাত্রই পুনরায় পাহাড় কাটার সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। বাংলাদেশে ভূমিধস ঝুঁকি নিয়ে গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গবেষণা হয়েছে এবং দেশের বহু বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগসহ দেশি-বিদেশি গবেষকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চলের ভূমিধস ঝুঁকি, ঐতিহাসিক ভূমিধস ইনভেন্টরি  এবং বিভিন্ন ভূপৃষ্ঠীয় ও স্থানিক নিয়ামকগুলোর পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক নিয়ে একাধিক উচ্চমানের গবেষণা ও ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করেছেন। একইভাবে বৃষ্টিপাত, ভূতত্ত্ব, ঢালের প্রকৃতি, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়েও বিস্তারিত কাজ হয়েছে।

তবু কেন প্রতিবছর ভূমিধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে? কেন এখনো আমরা এমন একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যা কার্যকরভাবে প্রাণহানি কমাতে সক্ষম? এর প্রধান কারণ হলো, ভূমিধসের ঝুঁকি কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি অত্যন্ত গতিশীল। আমাদের বেশির ভাগ মডেল বা ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপন, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং ভূমি ব্যবহারের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকির ধরন ও মাত্রা প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। আজ যে এলাকাটিকে মডেলে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ দেখানো হচ্ছে, ছয় মাস পর সেখানে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে তা তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে পুরনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা স্থির মডেলগুলো পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

ভবিষ্যতের ভূমিধস ব্যবস্থাপনায় আমাদের শুধু গবেষণাপত্র বা স্থির ঝুঁকি মানচিত্রের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং স্থির মানচিত্রের পরিবর্তে আমাদের প্রয়োজন বাস্তব সময়ভিত্তিক অথবা নিয়মিত হালনাগাদকৃত গতিশীল তথ্যভাণ্ডার। ভূমিধস পূর্বাভাস ও ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেলগুলোকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তত প্রতিবছর নতুন স্যাটেলাইট ডেটা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ ও হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের থ্রেশহোল্ড (বৃষ্টির পরিমাণ ও সময়কাল) এবং মাটির আর্দ্রতা রিয়াল টাইম মনিটরিং করার আধুনিক ওয়েব-জিআইএস ভিত্তিক সতর্কবার্তা সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে ভূমিধস ঘটার অন্তত আট থেকে ১২ ঘণ্টা আগে অতিঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশের মানুষকে সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিগত মডেল তখনই পরিপূর্ণতা পাবে, যখন এতে সরকারের নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও এবং উপজাতীয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ সব খাতের বা সেক্টরের অংশীজনদের সক্রিয় প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সার্বিক ও সমন্বিত এই উদ্যোগই শুধু পারে পাহাড়ের কান্না থামিয়ে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে।

পাহাড়ি অঞ্চলের সুরক্ষায় স্থায়ী ও কঠোর টেকসই সমাধানেই এখন নজর দিতে হবে। এর জন্য পাহাড়ি জেলাগুলোর ভূ-প্রকৃতি বিবেচনা করে একটি বিশেষায়িত এবং কঠোর কারিগরি ও প্রকৌশল নির্দেশিকা প্রস্তুত করতে হবে, যেখানে কৃত্রিম দেয়ালের চেয়ে প্রকৃতির ওপর জোর দিয়ে পাহাড়ের ঢাল ধরে রাখতে বিন্না ঘাস এবং গভীর শিকড়যুক্ত স্থানীয় গাছ রোপণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টকারী এবং অবৈধ পাহাড় কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভূমিগ্রাসী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের এমন সমন্বিত বাস্তবায়নই শুধু পারে আমাদের পাহাড়গুলোকে রক্ষা করতে এবং বর্ষার চিরচেনা মারণফাঁদ থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে।

লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

মোস্তফা কামাল

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

সৈনিক ও নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিক কর্মতৎপরতায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাম্প্রতিক সাফল্যে মহলবিশেষ গাত্রদাহে ভুগছে। তাদের ভীষণ অসহ্য বাহিনীটির এই বীরত্ব। ভাবনমুনায় স্পষ্ট যে তারা ভিন্ন বা বিপরীত কিছুর অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত পদক্ষেপে ঘটে গেছে মহলটির আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। এর ঝাল মেটাতে তারা নেমেছে নানা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো, গুজব রটানো এবং মতলবি ফটোকার্ড তৈরির এজেন্ডায়।

বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি যখন কঠোর অবস্থান নিয়ে সাফল্যের নজির গড়েছে, তখন কিছু মহল পরিকল্পিতভাবে ভর করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে বাহিনীর মনোবল ভাঙনের মিশনে বাহিনীটির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে অপপ্রচারই করছে না, বিএসএফের হামলায় বিজিবি সদস্য আহত বা নিহত হয়েছেন এমন তথ্য দিয়ে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পুরনো ও অসুস্থতার ভিডিও ছড়ানোও বাদ দেয়নি। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনের পূর্বাপরে ছড়িয়েছে অসম্পূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ ও অনুমানভিত্তিক তথ্য। বাংলাদেশের জমি ভারতের দখলে চলে যাওয়ার মতো ভিত্তিহীন খবর ও রাষ্ট্রবিরোধী গুজবও রটিয়েছে। এসবের অন্যতম উদ্দেশ্য কর্মতৎপর বাহিনীটির অবিরাম কাজে ছেদ ফেলা।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে বিজিবির দৃঢ়, পেশাদার এবং সফল ভূমিকা শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও প্রশংসিত। তা একদিকে বাহিনীটির জন্য গর্ব ও প্রণোদনার, অন্যদিকে মহলবিশেষের জন্য অসহ্যের। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের সাহস, দেশপ্রেম এবং কর্মতৎপরতার সাফল্যের পেছনে শক্তিশালী নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং কার্যকর চেইন অব কমান্ডকে কৌশলে আলোচনার বাইরে রাখার আরেক সূক্ষ্ম চাতুরী তো আছেই। সেই সঙ্গে রয়েছে ‘সৈনিক ও জুনিয়র কর্মকর্তারা দেশপ্রেমিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত’ মর্মে বয়ান তৈরির মতলবি কুচেষ্টা। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর ঐক্য, মনোবল এবং চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করার এমন অপচেষ্টা এই যাত্রায় বেশিদূর এগোতে না পারলেও তা ভবিষ্যতে আরো সাবধান থাকার তাগিদ দেয়। কোনো বাহিনীর শক্তি তার সদস্যদের পারস্পরিক আস্থা, শৃঙ্খলা এবং ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নেতৃত্ব ও সৈনিককে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো মানে সেই বাহিনীর মূল শক্তিকেই আঘাত করা।

এ ধরনের অপচেষ্টায় মাঝেমধ্যে যোগ হয়ে পড়ছে কারো কারো অতি উৎসাহ। সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির ইস্পাত কঠিন অবস্থানের প্রশংসার সমান্তরালে স্থানীয় লোকজনের লাঠি-দা নিয়ে জড়ো হওয়া, ভিডিও ধারণ বা ফেসবুক লাইভ পরিস্থিতির ভিন্ন অর্থ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর ফের বুঝতে পেরে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে, কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা তৎপরতা নজরে এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার না করে দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্প বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে। এর বিপরীতে গুজববাজরা অপেক্ষাই করে ইতিবাচক তথ্য ও ফুটেজকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি মহলের এটি বিশেষ এজেন্ডা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার এবং রাজ্য থেকে কথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’ ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামে এই আবহ নতুন মাত্রা পায়।

এরই অংশ হিসেবে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। আটক করা হয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে। পুশ ইনের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ভারতীয় অপচেষ্টা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে দিচ্ছে বিজিবি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পুশ ইন ইস্যু নিয়ে একাধিকবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিজিবি ও বিএসএফের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে সত্য।  কিন্তু বড় রকমের সংঘাতের ঘটনা নেই। ভারতীয় কিছু প্রচারমাধ্যম সীমান্তে ব্যাপক সংঘাতের ফুটেজ বানাচ্ছে। ছাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঈশান বাংলা নামের ভারতীয় একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজে একজন আহত বিজিবি সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ও হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ফুটেজ প্রচার করেছে। এর পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানোর ধুম পড়ে। ভারতীয় ফেসবুক থেকে বাংলাদেশ ও বিজিবিকে হেয় করে ভিডিওটি রিপোস্ট চালিয়ে মোটামুটি একটা উত্তেজনা ছড়ানো হয়। ভিডিওতে বলা হয়, ওই বিজিবি সদস্য বিএসএফের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন। বিজিবির শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত সময়ের মধ্যে এর রহস্য বুঝে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। নিশ্চিত হয়েছে, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু বা পুশ ইন ইস্যুর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত ভিডিওটি বিজিবি সদস্য রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম চিম্বুলুই সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।

ওই বিজিবি সদস্য হাবিলদার মো. এলাহান মিয়া। বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের (৫৪ বিজিবি) সদস্য। গত ৬ জুন তিনি কান্তালং বিওপি থেকে লিংক টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় চিম্বুলুই বিওপির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছলে হঠাৎ তাঁর বাঁ হাত ও বাঁ পায়ে তীব্র ব্যথা এবং অবশভাব অনুভূত হয়। ঘটনার পরপরই ব্যাটালিয়নের মেডিক্যাল অফিসার তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তাঁর মধ্যে লেফট-সাইডেড হেমিপারেসিস জনিত উপসর্গ পরিলক্ষিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তিলকে তাল নয়, কোনো ছুঁতা পেলেই বিজিবি সদস্যদের মনোবলে আঘাত করার এই চাল বাহিনীটির শীর্ষ কমান্ড যথাসময়ে বুঝতে পারছে। এটিও গা জ্বালার বিষয় মহলবিশেষটির কাছে। তাই বিজিবি সদস্য ও কর্মকর্তা পর্যায়ে ভুল-বোঝাবুঝি রচনার মিশনটি বেশ জোরদার। সীমান্তে বিজিবির সাহসী তৎপরতা ও দৃঢ় অবস্থানে প্রথম দাগে ক্ষতি হয় চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধীচক্রের। দ্বিতীয় দাগে অনুপ্রবেশ রোধ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দাগটি হয়ে গেছে মুখ্য।

বিজিবির এই দৃঢ়তার কারণে দেশ এবং সাধারণ জনগণ সুরক্ষিত। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অটুট থাকছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা হচ্ছে। এতে বিজিবির প্রতি সন্তুষ্ট মহল যেমন আছে, অসন্তুষ্ট মহল থাকাও স্বাভাবিক। এই চক্র বাহিনীটির মনোবল ভাঙতে চাইবে, দুর্বল করতে চাইবে, সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের গল্প বানাবে, বিভ্রান্তি ছড়াবে, তা-ও স্বাভাবিক। সীমান্ত সুরক্ষার সমান্তরালে বিজিবির কাজ বহুমুখী। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রায় চার হাজার ১৫৬ কিলোমিটার পাহারায় সীমিত নয় তাদের কাজ। জরুরি দরকারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সহায়তা, মাদক দমনসহ নানা সামাজিক কাজেও তাদের সারথি হতে হয়। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তাদের বহুমাত্রিক কার্যক্রম কখনো কখনো বেখবরেই থাকছে। গত এক বছরে সীমান্তে তাদের অভিযানে ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিজিবি গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০৮টি মতবিনিময়সভা আয়োজন করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ ৮৮ হাজার মানুষের কাছে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

একটি সামরিক বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাফল্য কখনোই শুধু মাঠের সৈনিকের একক অবদানের ফল নয়, বাহিনীর হাইকমান্ডের দক্ষ পরিচালন। সৈনিকদের সাহস ও দেশপ্রেম যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনি সেই সাহস ও পেশাদারিকে সঠিক পথে পরিচালনে বাহিনীর নেতৃত্ব ব্যাটালিয়ন কমান্ডার থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত সমানভাবে কৃতিত্বের দাবিদার। সামরিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো, যুদ্ধক্ষমতা বা কমবেট পাওয়ার। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে নেতৃত্ব। একজন সৈনিকের সাহস, দক্ষতা এবং দেশপ্রেম তখনই সর্বোচ্চ কার্যকারিতা অর্জন করে, যখন তিনি সঠিক নেতৃত্ব পান, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পান। আর তা অবশ্যই কার্যকর কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে। সম্প্রতি বিজিবি সদস্যদের সীমান্তে দৃঢ়তা, সংযম এবং পেশাদারির পরতে পরতে রয়েছে মহাপরিচালক থেকে শুরু করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যন্ত পুরো নেতৃত্বকাঠামোর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং পেশাদার নেতৃত্ব। মাঠের সৈনিকের বীরত্ব, মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বের কার্যকর কমান্ড এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনার সম্মিলিত রসায়নে আগোয়ান বাহিনীটির চলমান দুরন্ত ধারা ও অর্জন দেশের ইতিহাসের অংশ। তা মহলবিশেষের জন্য অবশ্যই বেদনার, অসহ্যের। এই মহল যে কখনো কখনো সফল হয়েছে, তা-ও আরেক ইতিহাস। 

 

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

 

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা

এ কে এম আতিকুর রহমান

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা

গত ৭ জুন কলেজ শিক্ষকদের জন্য কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে সনদভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যাবহারিক এবং কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, শিক্ষাকে আরো আধুনিক, দক্ষতানির্ভর এবং কর্মমুখী করার জন্য সরকার একটি নতুন শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ওই ব্যবস্থায় শুধু ডিগ্রি অর্জনই লক্ষ্য হবে না, বরং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে শুধু বিপুলসংখ্যক স্নাতক তৈরি করাই সরকারের উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রধান লক্ষ্য হলো একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।

বাংলাদেশে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করাই নয়, সব শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে তাতে শিক্ষার হার হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, না সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা বাড়ছে? তাহলে সার্টিফিকেট অর্জন করাই কি শিক্ষার উদ্দেশ্য? একজন শিক্ষার্থী যে ডিগ্রি অর্জন করছে, সেই স্তরের জ্ঞান কি তার অর্জিত হচ্ছে? সে কি তার সার্টিফিকেট অনুযায়ী মেধার প্রমাণ দিতে সক্ষম হচ্ছে বা কাজ খুঁজে পাচ্ছে, নাকি এই দরিদ্র দেশটির বেকার তালিকাটিকেই শুধু দীর্ঘতর করে চলছে? এমন আরো হাজারো প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি মারে। এ প্রসঙ্গে কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিগত ২০ বছরের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো, ‘অতীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় যে চরম নৈরাজ্য চলেছে, তা এখন স্পষ্ট, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী পাস পর্যন্ত করতে পারে না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে আমাদের দেশের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) লেভেলকে তাদের ষষ্ঠ শ্রেণির সমমান হিসেবে তুলনা করা হয়।’       

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষামাননীয় প্রতিমন্ত্রীর মতো দেশের অনেকেই বিদ্যমান শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। বিএ, এমএ পাস করেও নাকি অনেকে পিয়নের একটি চাকরি খুঁজে পেতে গলদঘর্ম হয়ে পড়ছেন। যে স্বপ্ন দেখে গরিব মা-বাবা সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে বিএ পাস করালেন, সেই সন্তানের এহেন অবস্থা দেখে মা-বাবার দুচোখে দারিদ্র্যের অন্ধকার আরো ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হবে—এই প্রত্যাশা আমাদের সবার। তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য যেন হয় একজন মানুষকে কর্মের উপযোগী করে তৈরি করা। দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম এমন জনশক্তি তৈরি করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের হার শতভাগে উন্নীত হোক, তা সবাই চায়। তবে তারা যেন হয় মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত। একজন শিক্ষার্থী যে স্তর পর্যন্তই লেখাপড়া করুক না কেন, তার সেই লব্ধ জ্ঞান যেন উন্নত বিশ্বের সমমানের হয়। আর সেটি সম্ভব হলে তারা শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পাবে। তাই চলমান শিক্ষার হার বৃদ্ধির পরিকল্পনার সঙ্গে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সার্টিফিকেটধারী লোকের সংখ্যা না বাড়িয়ে শিক্ষাকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানে নিয়ে যেতে হবে। বিদ্যমান অবকাঠামোতেই প্রয়োজনীয় সংস্কার করে শিক্ষার মানকে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা যেন আর শিক্ষিত বেকার সৃষ্টি না করতে পারে, সে জন্য বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার আশু সংস্কার প্রয়োজন।

সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে সেটি হলো, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কর্মমুখী বা উৎপাদনমুখী। আমাদের যে বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের কতজনের কাজের সংস্থান আমরা করতে পারছি? তাদের মধ্যে কতজন তাদের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কর্ম সৃষ্টি করতে সমর্থ হচ্ছে? অন্যদিকে এ ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে ওই সব শিক্ষিত যুবকের আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারণে কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, তা-ও ভাবতে হবে। আমরা শিক্ষা সনদের অবমূল্যায়ন বা অসম্মান হোক, তা চাই না। একটি সনদ যেন হয় তাদের অহংকারের প্রতীক।

বেকারত্ব থেকে উত্তরণ এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য শিক্ষার্থীদের দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। তবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকতে পারে। অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর একটি হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং অন্যটি সাধারণ শিক্ষা। বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় তিনটি স্তরে শিক্ষার্থী নেওয়া যেতে পারে এবং স্তর অনুযায়ী তাদের শিক্ষার মান নির্ধারিত হবে। তবে যে স্তরের শিক্ষার্থীই হোক না কেন, তাকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলাই হবে মুখ্য কাজ। প্রথম স্তরে যেসব শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা ভালো ফল করলেও অভিভাবকের আর্থিক সংগতি নেই পরবর্তী শিক্ষা ব্যয় নির্বাহের, তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে ভর্তি করার সুযোগ থাকতে হবে। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে, যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা আর্থিক কারণে সাধারণ শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারবে না, তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাবে। তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে, যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা আর্থিক কারণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে অক্ষম, তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে। তবে শিক্ষার্থীর শিক্ষাস্তর অনুযায়ী বৃত্তিমূলক শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য দেশে বা বিদেশে কর্মের সংস্থান করা অনেক সহজ। এ ছাড়া পারিশ্রমিকের দিক থেকে তারা সাধারণ কর্মীর চেয়ে অনেক বেশি উপার্জনে সক্ষম হয়ে থাকে।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে যে বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য এত প্রতিষ্ঠান আমরা কোথায় পাব। এর সহজ উত্তর হচ্ছে, বিদ্যমান সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েই বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সরকার নীতিগতভাবে এ বিষয়ে আগ্রহী হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে না। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে যেমন বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, তেমনি কারিগরি বিভাগেও পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার অবকাঠামোগত ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জানা মতে, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের ব্যবস্থা চলমান। আমাদের লক্ষ্য হলো, আমরা কর্মমুখী ও মানসম্পন্ন শিক্ষিতের হার বাড়াব, সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা নয়। অন্যদিকে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী, বিশেষ করে চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যারা পড়াশোনা ও গবেষণা করবে, তারা পরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে শিক্ষা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র সেই অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে এর অর্থ এমন হওয়া উচিত নয় যে লেখাপড়া শিখে কেউ রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হবে, দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই পথ দেখিয়ে দিতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন পথে গেলে সে আর বেকার থাকবে না, রাষ্ট্রকেও তার বোঝা বইতে হবে না। আর এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব একমাত্র কর্মমুখী ও মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। এ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী বেকারের চেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতে সক্ষম একজন স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে তথা দেশের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মানবিক গুণসম্পন্ন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, সেই প্রত্যাশা করি। শুধু তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী লাখ লাখ স্নাতক তৈরি না করে সরকার যেন একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয় এবং জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

গত ২৮ জুন একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পরবর্তী প্রজন্মের একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সক্ষমতার ওপর, যার জন্য তাদের দক্ষ, যোগ্য এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি আমাদের প্রত্যাশার কথাটিই উচ্চারণ করেছেন এবং খুব তাড়াতাড়ি তাঁর কথার বাস্তবায়ন শুরু হবে, তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা প্রয়োজন | কালের কণ্ঠ