বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কর মওকুফের ফলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, উচ্চশিক্ষা একটি অলাভজনক খাত এবং এ খাতের উন্নয়ন দেশের মানবসম্পদ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রবিবার (১২ জুলাই) রাজধানীর দি ওয়েস্টিন ঢাকায় বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি) আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী বছর থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ করের অর্থ তাদের কাছেই থেকে যাবে। আমরা আশা করি, এই অর্থ শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক রেটিং উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।’
তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে মুনাফার সুযোগ নেই। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক চাপ, বিপুল অভ্যন্তরীণ দায় এবং অর্থ পাচারের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সরকার নীতিগতভাবে কর মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির বাইরে থাকা খাতকে জিডিপিতে আনার লক্ষ্য
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক মূলধারার বাইরে থাকা খাত ও জনগোষ্ঠীকে জিডিপির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, জিডিপি শুধু শিল্প ও উৎপাদন নয়; সংস্কৃতি, থিয়েটার, সংগীত, চারুকলা এবং গ্রামীণ কুটিরশিল্পের মতো খাতগুলোরও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘দেশের অনেক সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তা জিডিপিতে প্রতিফলিত হয় না। এসব খাতকে আর্থিক মূল্যায়নের আওতায় এনে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে।’
বেসরকারি খাত-নির্ভর প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্ব
বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনের কথা উল্লেখ করে আমির খসরু জানান, তার দল শুরু থেকেই বেসরকারি খাত-চালিত প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বাসী। সরকার একা উন্নয়ন করতে পারে না; বরং সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়ক বা ‘ফ্যাসিলিটেটর’ হিসেবে কাজ করা।
তিনি বলেন, ‘দেশের টেকসই উন্নয়নে বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে চাই। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হবে।’
অর্থমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেটে পাঁচ বছরের জন্য নীতিগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন।
আইসিটি খাতে দেশীয় দক্ষতা গড়ে তোলার আহ্বান
আইসিটি খাতে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বেশি সুযোগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশের পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালনের তাগিদ দেন।
‘সেলফ-রেগুলেশন’ জরুরি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ-রেগুলেশন’-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার আইন চাপিয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী নয়। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের উদ্যোগেই সুশাসন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করুক। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান নিয়ে সমাজে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে।’
তিনি আরো বলেন, দেশের নৈতিক অবক্ষয় রোধে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষাবিদদের প্রশংসা
এপিইউবির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। সভায় দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
ড. সবুর খান এবং অধ্যাপক মামুন আহমেদ তাদের বক্তব্যে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সরকারের বেসরকারি খাতবান্ধব নীতির প্রশংসা করেন। তারা জাতীয় উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।