• ই-পেপার

স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয় হতে যাচ্ছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  • ফারুক হোসেন চৌধুরী

জিআই পণ্যের প্রসারে কিছু প্রস্তাব

আবু তাহের খান

জিআই পণ্যের প্রসারে কিছু প্রস্তাব

ঐতিহ্য পরম্পরায় জামদানি বা মসলিন যেমন বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য, বাটিক যেমন ইন্দোনেশিয়ার কিংবা শাল কাশ্মীরেরতেমনি পৃথিবীর সব দেশেরই নিজস্ব ঐতিহ্যসংবলিত এমন কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো ওই দেশ বা অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু মুনাফার একচেটিয়াত্বের লোভে পুঁজির মালিকরা যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন, তখন আর তাঁদের ওইসব ঐতিহ্যের দিকে তাকাবার ফুরসত থাকে না। মুনাফার লোভে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সব ন্যায্যতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তাঁরা তখন সম্মুখবর্তী সব কিছুকেই নিজেদের মালিকানায় নিয়ে নিতে চান। আর তেমন অবস্থায়ই সম বা কাছাকাছি ঐতিহ্যের দেশগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝেই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিপেনডেন্সজিআই) এসব পণ্যের মালিকানা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যায়, যেমনটি জামদানি নিয়ে ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হওয়া সত্ত্বেও ভারত তখন এটিকে নিজেদের পণ্য বলে দাবি করে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে এর আইনি মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউআইপিও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র, তথ্য ও বিষয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত এটিকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবেই স্বীকৃতি প্রদান করে।

এ ধরনের বিরোধ ও বিবাদের মোকাবেলা বাংলাদেশকে পরবর্তীতে আরো একাধিকবার করতে হয়েছে। তবে এর জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীদের লোভ যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অজ্ঞতা, অনুদ্যোগ ও অদক্ষতা। দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব পণ্যের জিআই স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে বিরোধ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিষয়টি ঘটেছে আগে থেকে এসব পণ্যকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা না করার কারণে। লক্ষ করা গেছে যে ভারত যখনই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো পণ্যকে তাদের জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখনই বাংলাদেশের হুঁশ হয়েছে যে এ কাজটি আরো আগেই করা উচিত ছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধারার অদক্ষতার সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আরো একবার ডব্লিউআইপিও পর্যন্ত যাওয়া। ২০১৫ সালে জামদানির জিআই স্বত্বের মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে যে পরিমাণ দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছিল, সেটি মনে রেখে বাংলাদেশ যদি পরবর্তী সময়ের কাজগুলো যথাসময়ে করে ফেলত, তাহলে আর ২০২৪ সালে এসে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে পুনরায় বিবাদে লিপ্ত হতে হতো না।

২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগটিও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারত যে সে সময় তাদের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে বসল, সেটি বাংলাদেশের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিআইটি) জানতই না। এ তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা যখন বিষয়টির প্রতি ডিপিআইটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখনই প্রথম বোঝা যায় যে এ বিষয়ে কোনো খোঁজখবরই তারা রাখেন না। যাহোক, এরপর মাত্র এক বছরের মধ্যে ডিপিআইটি আরো ৩৩টি পণ্যকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যেগুলোর মধ্যকার অন্তত ১০টিই উক্ত দপ্তরে এক থেকে সাত বছর যাবৎ অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু জনমতের চাপজনিত উত্তেজনা থিতিয়ে যেতেই আবার সেই পুরনো স্থবিরতা ভর করে বসেছে। ২০২৪ সালে আবেদনকৃত মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে ৬৪তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের পর আর এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি আছে বলে জানা যায়নি। এ বিষয়ে ডিপিআইটি হয়তো বলবে যে তাদের কাছে এসংক্রান্ত আর কোনো আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে নেই; অতএব তারা অভিযোগমুক্ত।

তথ্যগতভাবে ডিপিআইটির উপরোক্ত সম্ভাব্য  বক্তব্যের মধ্যে হয়তো কোনোই ভুল নেই, যেমন ভুল থাকে না পুলিশের বক্তব্যের মধ্যেও। কোনো অপরাধ বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় এ ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন, তখন তাদের অকপট জবাব হচ্ছে, এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। জিআই পণ্যের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ডিপিআইটিও কি সেই একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে যে তাদের কাছে কেউ আবেদন না করা পর্যন্ত এ ব্যাপারে তাদের কোনো দায় নেই? তারা কি এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জিআই সনদ সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের আরো উৎসাহিত করতে পারেন না? কেউ তাদের কাছে সাহায্য না চাওয়ায় এ বিষয়ে তাদের কোনো দায় নেই বা তারা স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে উদ্যোক্তার কাছে এগিয়ে যাবেন নাএটি তো অগ্রসর চিন্তাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রসেবকের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না।

দেশে এখন স্বীকৃত জিআই পণ্যের সংখ্যা ৬৪টি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্প ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পশ্চাৎ সারির দেশ হলেও এর দীর্ঘ ও বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী পটভূমি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ডিপিআইটি ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিদান বা স্বীকৃতির জন্য সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে নতুন কোনো ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও সৃজনশীল সেবামূলক কর্মকাণ্ড খুঁজে পাচ্ছেন না কেন? এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বহুধাবিস্তৃত ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে আরো বহুসংখ্যক নতুন জিআই পণ্য খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে নিম্নে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো।

এক. শিল্পনীতিতে উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) শিল্পের পাশাপাশি সেবা কার্যক্রমকেও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে (যদিও এটি একটি অনেক বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত)। অন্যদিকে রুগ্ণ শিল্প চালুকরণ ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, সেখানেও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমকে সহায়তাদানের কথা বলা হয়েছে। আর সরকারের এরূপ নীতি ও সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে এখন অতি সহজেই জিআই পণ্য/সেবা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা যেতে পারে।

দুই. জিআই পণ্যের বর্তমান তালিকায় ইলিশ বা চিংড়ির মতো মাছের নাম থাকলেও এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যোগ করা প্রয়োজন রূপচাঁদা, লইট্টা, কোরাল, টুনা ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছের নাম, যেগুলোর জিআই স্বত্ব নিয়ে যেকোনো সময় মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া চলনবিলের শিং, কই, শোল, টাকি; বেলাই বিলের আইড়, মাগুর, বাইন, গুতুম, পাবদা, টেংরা; সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের সরপুঁটি, মহাশোল, পাঙ্গাশ, কাচকি, রিটা, ঘাউরা, বাচা ইত্যাদি মিঠাপানির মাছের নাম যুক্ত করা যেতে পারে। অধিকন্তু কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি ও কক্সবাজারের শুঁটকির নামও এ ক্ষেত্রে অনায়াসে আসতে পারে।

তিন. বাংলাদেশে রান্নাবান্না ও খাদ্যের কিছু নিজস্ব ধরন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের পিঠা-পায়েসের সুনাম উপমহাদেশজুড়েই বিস্তৃত। এর বাইরে এ দেশের কাচ্চি বিরিয়ানির নামদাম এখন ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের পাপর কিংবা যশোরের নলেন গুড়ের সন্দেশসহ আরো অনেক খাদ্যপণ্যের নামই এখন পর্যন্ত জিআই পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ওইসব পিঠা-পায়েস, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, হালিম, পাপর, সন্দেশ ইত্যাদি খাদ্যপণ্যকে জিআই সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

চার. ডিপিআইটির ৬৪টি জিআই পণ্যের তালিকায় কোনো কোনো আম বিশেষত আশ্বিনার মতো কম স্বাদের আম থাকলেও আম্রপালি, গোপালভোগ ইত্যাদির নাম নেই। ফলে এ আমগুলোর নাম উক্ত তালিকায় অবশ্যই যোগ করা প্রয়োজন। তদুপরি শেরপুরের বেগুন, শ্রীমঙ্গলের চা ও আনারস, নরসিংদীর সাগর কলা, ভোলা ও পটুয়াখালীর তরমুজ, কাপাসিয়ার বেল ইত্যাদি কৃষিপণ্যকেও সেখানে যুক্ত করা যেতে পারে।

পাঁচ. বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকায় ধামরাইয়ের তামা-কাঁসার তৈজসপত্র, সিলেটের বেতের আসবাব, কক্সবাজারের ঝিনুকজাত হস্তশিল্প, জলিরপারের কৃত্রিম গহনা, ভৈরবের পাদুকা, রায়েরবাজারের তৈজসপত্র ইত্যাদি যুক্ত করাটা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়জরুরিও বটে। কারণ এসব পণ্যের বেশির ভাগই এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং জিআই পণ্যের তালিকায় এসব নাম যুক্ত হলে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনা আরো বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

ছয়. বাংলাদেশের জিআই পণ্য তালিকার একেবারে প্রথমেই জামদানির নাম থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর মারমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক থামি ইত্যাদির নাম এখনো যুক্ত হয়নি। জিআই পণ্যের তালিকায় এসবের সংযুক্তি এগুলোর গুরুত্বই শুধু বাড়াবে না, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকার একটি ইতিবাচক বার্তাও দেশে-বিদেশে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে তাই বলব, বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকা আরো ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারিত করার যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ ও তৎপরতায় এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অথচ সে সম্ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এসবের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক ঐতিহ্যই শুধু রক্ষা পাবে না, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাও আরো বেগবান হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে এসব পণ্য ও সেবা জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনাও বহুলাংশে বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে নিবেদিতপ্রাণ সেবার মানসিকতা নিয়ে ও পেশাদারিপূর্ণ দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে সহসাই এ ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যযোগ্য বড় অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।

লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়; অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে

নিরঞ্জন রায়

বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে

যেকোনো দেশের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুযোগ। সব দেশই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। এই উদ্দেশ্যে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা হয় এবং কিছু প্রণোদনাও দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি চলে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা। বিশ্বে এই যে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিবাদ, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং প্রতিযোগিতা, এর মূলে আছে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য, যার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বিনিয়োগ। সব কিছুর মূলে আছে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে কি না, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে কি না এবং এই উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে কি না। যখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় তখন ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে, যার সার্বিক প্রতিফলন ঘটে অর্থনৈতিক উন্নতিতে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়, যখন দেশে বিনিয়োগ থাকে না।

বিনিয়োগ সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে, যথা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ। বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে অন্য দেশ থেকে যখন পুঁজি নিজের দেশে আসে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত হয়, তখনই আমরা তাকে বৈদেশিক বিনিয়োগ বলে অভিহিত করে থাকি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বৈদেশিক বিনিয়োগের ধারণা বদলে গেছে। এখন ক্রসবর্ডার ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বা এক দেশ থেকে আরেক দেশ অথবা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যখন ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন বা বাজারজাতকরণ সম্প্রসারণ করা এবং সেই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে ও অঞ্চলে অর্থ, দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়োজিত করা হয়, তখন তা বৈদেশিক বিনিয়োগের পর্যায় পড়ে। এ কারণেই এখন বৈদেশিক বিনিয়োগকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বা ক্রসবর্ডার বিনিয়োগও বলা হয়ে থাকে।

বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ যেমন অন্য দেশ থেকে নিজের দেশে আসতে পারে, তেমনি নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে যেতেও পারে। যেমনবিদেশ থেকে অনেক বিনিয়োগ যেমন বাংলাদেশে আসতে পারে, তেমনি বাংলাদেশ থেকে কিছু বিনিয়োগ বিদেশেও যেতে পারে। আমেরিকার কোনো বিনিয়োগকারী যখন বাংলাদেশে ব্যবসা বা উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ এনে এখানে বিনিয়োগ করবে, তখন সেটি হবে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ, অর্থাৎ অন্তর্মুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ বা ইনওয়ার্ড ফরেন ইনভেস্টমেন্ট। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের কোনো ব্যবসায়ী যখন বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা বা উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ থেকে অর্থ নিয়ে সেখানে বিনিয়োগ করবে, তখনো সেটা বৈদেশিক বিনিয়োগের আওতায় পড়বে। তবে সেটি হবে বহির্মুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ বা আউটওয়ার্ড ফরেন ইনভেস্টমেন্ট। এ কারণেই বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ বা নিট ফরেন ইনভেস্টমেন্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। কেননা প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব যে সত্যিকার অর্থেই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে কি না এবং কী পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে। প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ যখন ধনাত্মক বা পজিটিভ হয়, তখনই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়ে থাকে।

বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনব্যবস্থা, সরবরাহ নেটওয়ার্ক বা সাপ্লাই চেইন যেমন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি বিনিয়োগও এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। মূলধন বা আর্থিক বিনিয়োগ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিনিয়োগ এখন বিভিন্ন দেশে এবং অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। যে দেশ বা অঞ্চলে ব্যাবসায়িক সুযোগ বেশি থাকে, সেখানে বিনিয়োগ জেঁকে বসে। এ কারণেই দেখা যায় কোনো এক বছর এক দেশে বা অঞ্চলে অধিক বিনিয়োগ হলেও পরের বছর সেটি নাও হতে পারে এবং বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। তবে যদি কোনো বছর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ সেভাবে সম্প্রসারিত না হয়, তাহলে সে বছর বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় না। যখন বেশির ভাগ দেশে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ ধনাত্মক না হয়, তখনই এ রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে যখন বিশ্বের  বেশির ভাগ দেশে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় তখনই বিশ্বে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগের হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সংরক্ষণ করে এবং প্রতিবছর এর ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে জাতিসংঘের প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর তথ্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে জাতিসংঘ বিশ্বের বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০২৫ সালে বিশ্বে সার্বিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ ৬% বৃদ্ধি পেয়ে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির  বেশির ভাগই হয়েছে উন্নত বিশ্বে। বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাত্র ২% পেয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমেরিকা বরাবরের মতো প্রথম স্থানেই অবস্থান করছে, যদিও তাদের দেশে এই বিনিয়োগ ২০২৪ সালের ২৮৪ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে ২৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চীনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তারা ২০২৫ সালে ১০৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ পেলেও সেটা ২০২৪ সালের ১১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়েছে। অঞ্চল হিসেবে ইউরোপ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ভালো সুবিধা নিতে পেরেছে। কেননা ইউরোপে ২০২৪ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২০৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শুধু ব্রাজিল ও ভারত ভালো অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ পেয়েছে ২০২৫ সালে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও আমাদের দেশ এর ছিটেফোঁটাও আনতে পারল না কেন। অথচ ২০২৫ সালে আমাদের দেশেই তো সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আসার কথা ছিল। কেননা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এক সরকারকে সরিয়ে দায়িত্বে ছিলেন এক অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধান আবার ছিলেন নোবেলবিজয়ী ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞ। উন্নত বিশ্বে উনার পরিচিতি এবং নেটওয়ার্ক বেশ শক্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়ে অনেক আশার কথাও তিনি দেশবাসীকে শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেশে অঢেল বিনিয়োগ হবে, প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে, চাকরির বন্যা বয়ে যাবে, আরো অনেক আশার কথা। বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার দায়িত্বে থাকা সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আরেক প্রবাসী আর্থিক বিশেষজ্ঞকে। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন যে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানো হবে। সিঙ্গাপুর তো দূরের কথা, দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো পিছিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে।

বিগত দুই বছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ তো আসেইনি, দেশীয় বিনিয়োগও সেভাবে হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এক ধরনের আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে তাঁরা বিনিয়োগ করার মনোবল ও উৎসাহ, দুটোই হারিয়ে ফেলেছেন। অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে যে বিনিয়োগ হয় না, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে গত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে। এর সঙ্গে এবার নতুন করে যোগ হয়েছে মব সন্ত্রাস করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রমণ করা এবং ব্যবসায়ীদের আতঙ্কের মধ্যে রাখা। এই যেখানে অবস্থা, সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ তো অনেক পরের কথা, দেশীয় বিনিয়োগই তো হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সরকারি সংস্থা বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে পারে না। সরকার এবং সরকারি সংস্থা দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা দিতে পারবে। মূল বিনিয়োগ আনতে পারবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। ব্যবসায়ীরা অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের সখ্য বা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ সুবিধাগুলো তুলে ধরে তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। যেমনএখন এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ চলছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে তথ্যভাণ্ডার বা ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার জন্য আমেরিকা-ইউরোপের প্রযুক্তি কম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই ডেটা সেন্টার তৈরিতে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। ভারত এই ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমেরিকার কয়েকটি প্রযুক্তি কম্পানির কাছ থেকে প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আমরা কি এ রকম কয়েকটি ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিতে পারতাম না। বৃহৎ প্রযুক্তি কম্পানি না হোক, মধ্যম সারির প্রযুক্তি কম্পানির জন্য ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার সুযোগ অবশ্যই নিতে পারতাম। কিন্তু সেই চেষ্টা আমরা করিনি।

এ ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ শুধু মুখের কথায় আসে না। এর জন্য প্রয়োজন সবার আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত এবং সুযোগ সৃষ্টি করা। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন দেশের ব্যবসায়ীদের মধে আস্থা ফিরে আসবে এবং তাঁরা নিজ উদ্যোগে দেশে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। সরকারের উচিত এদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সময় দ্রুত চলে যেতে শুরু করেছে। বিনিয়োগের প্রবাহ থেকে দেশ একবার দীর্ঘ মেয়াদে ছিটকে পড়লে, আর কোনোভাবেই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে না। তাই সময় থাকতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামত

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামত

গত ১৮ জুলাই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত সাড়ে সাত বছরে পুলিশের ৭৯ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১০ জনের বেশি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন এবং তাঁদের বড় অংশই কনস্টেবল ও এএসআই পদমর্যাদার। খবরটি সবার জন্য রীতিমতো উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য। ৭৯ জন পুলিশ সদসস্যের আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আত্মহত্যাকারীদের অনেক পুলিশ সদস্যই ব্যক্তিগত, পারিবারিক নানা কারণসহ চাকরিজীবনের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। এসবের পাশাপাশি অনেকের মানসিকভাবে অসুস্থতা, বদলি ও পদায়ন জনিত সমস্যা, দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি না পাওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ইত্যাদি কারণ জড়িত থাকতে পারে। আর পুলিশের চাকরিতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক টানাপড়েন, অপ্রতুল বেতন তথা আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অনীহা প্রভৃতি বিষয় সাধারণত একসঙ্গে কাজ করে থাকে, যা রীতিমতো দুঃখজনক।

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামতপুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই স্মরণে রাখতে হবে, মানুষের জীবনে সমস্যা আসে এবং সমস্যা আসবেই। আর এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে জীবনে সমস্যা এলে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে কোনো ধরনের সমস্যা এলে পুলিশ সদস্যসহ সবাইকে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোনো কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেওয়া হয়, তেমনি একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। শুধু পুলিশ সদস্যই নয়, বরং যেকোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ সাধারণভাবে নিহিত থাকে, তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনঃকষ্ট, বাইপোলার ডিস-অর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিস-অর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিস-অর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহার জনিত ডিস-অর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। ডব্লিউএইচওর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১.৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আট লাখ। হিসাব মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের ঘাটতি বা বিচ্ছেদ ঘটা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তি সংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার সংবাদ, কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা ইত্যাদি। এসব চিন্তা-ভাবনার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। তখন থেকেই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতা কিংবা কোনো কিছু কারো কাছ থেকে চেয়ে না পাওয়ার বিষয়টিও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।

হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পুলিশে দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি সদস্য কর্মরত। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের চিকিৎসাসেবার জন্য রাজধানী ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও নেই স্থায়ী কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেখানে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আরো আশ্চর্যের বিষয়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও কোথাও নেই পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময়ের ডিউটি পালন, ছুটির সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ঝুঁকির কাজ এবং ট্রমার অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই এসব বিষয় পুলিশপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করে এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।   

বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। বেশির ভাগ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে প্রটেক্টিভ ফ্যাক্টর বলা হয়। যেমনজীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। এসব ফ্যাক্টরকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তা ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যার প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। সুতরাং পুলিশ সদস্যদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনমাফিক সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি শুধু আত্মহত্যার ঘটনা-পরবর্তী তদন্ত নয়, বরং এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে তাঁদের বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন পুলিশ সদস্যদের জন্য থাকার ব্যারাকগুলোর আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা। সর্বোপরি প্রয়োজন তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যা এখন সময়ের দাবি। পুলিশপ্রধান, সরকার তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এ ক্ষেত্রে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে এলে পুলিশ বাহিনীকে সর্বাধুনিক বাহিনীতে পরিণত করা সম্ভব। সম্ভব পুলিশকে জনগণের সত্যিকারের বন্ধুতে পরিণত করা। পুলিশ বাহিনীতে বিরাজমান নানা রকম সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক হলে এবং ওই সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। তাঁদের বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। পুলিশ সদস্যসহ সবারই স্মরণে রাখা প্রয়োজন, জীবনকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই সবার উচিত আত্মহত্যার পথ পরিহার করে জীবনকে ভালোবাসতে শেখা; জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে শেখা এবং জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে শেখা।

লেখক : অধ্যাপক (আইন বিভাগ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং মেন্টর, রিমোর্ট লার্নিং ইন ক্রাইসিস অ্যান্ড ইমার্জেন্সিস ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)

আন্দোলনে ভাষা ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

আন্দোলনে ভাষা ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন

অনেক সময় একটি দেশের ভবিষ্যেক বোঝা যায় তার শিশু বা কিশোরদের দিকে তাকিয়েই। শিশুরা নিজে থেকে কোনো সমাজকে বদলে দিতে পারে না। তারা প্রথমে বিদ্যমান সমাজকেই অনুকরণ করে। তারা বড়দের ভাষা ধার করে, বড়দের আচরণ নকল করে, বড়দের রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। কয়েক দিন আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রবল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া হয়েছে; অনেক পরীক্ষার্থী চরম ভোগান্তির মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছেছে, কেউ কেউ পরীক্ষায় অংশ নিতেও ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো কোনো প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রীর কিছু মন্তব্য নিয়েও শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচার করা নয়। এখানে আমি একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। আমাদের শিশুরা আন্দোলন করতে গিয়ে যেসব আচরণ করছে, যেসব ভাষা ব্যবহার করছে, সেগুলোর সবকিছু কি কাঙ্ক্ষিত? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, শিশুরা কেন আজ এমন ভাষায় কথা বলছে? তাদের ব্যবহৃত ভাষা, অনেক শব্দ একসময় প্রাপ্তবয়স্ক রাজনীতিকদের কাছেও অশোভন বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু আজ তা কি স্বাভাবিকে পরিণত হতে চলেছে? এর কারণ কি শিশু বা কিশোররা? এর উত্তরে সহজেই বলা যায়, না।

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি আন্দোলনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সেটি হলো কিছু স্লোগান ও বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটাক্ষ এবং অসম্মানজনক ভাষার ব্যবহার। আবার অন্যদিকে অনেকেই বলেছে, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিষয়টি দেখা উচিত। অর্থাৎ জনপরিসরে দুটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছেএকটি প্রতিবাদের অধিকারের পক্ষে, অন্যটি প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্নতা।

আন্দোলনে ভাষা ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্নএই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করা দরকার। শিশুরা এমন ভাষা শিখল কোথা থেকে? শিশু জন্মের সময় কোনো রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। সে জানে না কাকে অপমান করতে হয়, কাকে বিদ্রুপ করতে হয় কিংবা কিভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করতে হয়। এসব সে শেখে পরিবার থেকে, আশপাশের সমাজ থেকে, টেলিভিশনের পর্দা থেকে, ফেসবুকের ভিডিও থেকে, ইউটিউবের শর্টস থেকে এবং সর্বোপরি বড়দের কাছ থেকে। অর্থাৎ শিশুর মুখে যে ভাষা আমরা শুনি, সেটি আসলে আমাদেরই ভাষা।

আমরা যদি গত এক দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকাই, তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মতের অমিলকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, প্রতিপক্ষকে অপমান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলএসব ধীরে ধীরে যেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সংসদে, রাজনৈতিক সমাবেশে, টক শোতে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আমরা প্রতিদিন এমন সব ভাষা শুনছি, যা কয়েক বছর আগেও অস্বাভাবিক বলে মনে হতো। এমন বাস্তবতায় বড় হওয়া একটি শিশু যখন আন্দোলনে নামে, তখন সে কি হঠাৎ করেই ভদ্র, সংযত ও যুক্তিনির্ভর ভাষা ব্যবহার করবে? সম্ভবত না।

মনোবিজ্ঞানে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, অবজারভেশনাল লার্নিং বা পর্যবেক্ষণভিত্তিক শিক্ষা। মানুষ, বিশেষ করে শিশু অন্যকে দেখে আচরণ শেখে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে কিংবা সমাজে যে আচরণকে পুরস্কৃত হতে দেখে, সেটিকেই সে গ্রহণ করতে শুরু করে।

আজ যদি কোনো শিশু দেখে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে; রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে তীব্র ভাষা ব্যবহার করে; তাহলে সে অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করবে, নেতৃত্ব মানেই উচ্চকণ্ঠ হওয়া, আর প্রতিবাদ মানেই প্রতিপক্ষকে অপমান করা। এই বিশ্বাসের জন্ম এক দিনে হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সাল একটি বড় মোড়। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলন শুধু একটি নীতিগত দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী পর্যায়ে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশে পরিণত হয়েছিল। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবির ধরন বদলেছে, নতুন নেতৃত্ব উঠে এসেছে এবং পরে সেই আন্দোলনের কিছু মুখ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিসরেও সক্রিয় হয়েছেন। আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা ছিলেন। কেউ কেউ এখন দেশের সংসদ সদস্য। অনেকটা ধারণা করে বলা যায় যে ২০২৪ সালের ওই আন্দোলন না হলে তাঁরা অনেকেই এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে এত সহজে যেতে পারতেন কি না, সন্দেহ আছে। তবে এটি গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক নেতা ছাত্র আন্দোলন থেকেই উঠে এসেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের পর এ ক্ষেত্রে একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে।

আজকের কিশোর-কিশোরীরা খুব কাছ থেকে দেখেছে একটি আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। আন্দোলনের নেতৃত্ব জাতীয় পরিচিতি এনে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এখানেই একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটেছে। আগে আন্দোলন ছিল মূলত দাবি আদায়ের মাধ্যম। এখন অনেকের কাছে আন্দোলন ব্যক্তিগত দৃশ্যমানতারও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। অবশ্যই এটি সব আন্দোলনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আন্তরিকভাবেই নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত পরিচিতি অর্জনের আকর্ষণও শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করছে।

যদি কোনো শিশু কিংবা কিশোর বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সবচেয়ে জোরে স্লোগান দিলেই সে নেতা হয়ে যাবে, সবচেয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেই তার ভিডিও ভাইরাল হবে, তাহলে আমরা তাকে আসলে কী শিক্ষা দিচ্ছি? রাজনীতি কি তখন আর জনসেবার শিক্ষা থাকে, নাকি জনদৃষ্টিতে আসার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়? আমাদের আত্মসমালোচনা সেখানেই প্রয়োজন। কারণ শিশুরা আমাদের শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা আমাদের বর্তমানেরই প্রতিফলন। তারা আমাদের ভাষা ধার করে, আমাদের রাগ ধার করে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও ধার করে। শিশুরা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনে নামে। কিন্তু তারা কিভাবে আন্দোলন করে, তাদের ভাষা কেমন থাকে, সেটি একটি নতুন গবেষণাযোগ্য বিষয়।

শিশুরা শুধু আমাদের উপদেশ শোনে না, তারা আমাদের আচরণও পর্যবেক্ষণ করে। যদি মা-বাবা প্রতিদিন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গালি দেন, যদি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভিন্নমতকে বিদ্রুপ করেন, যদি সমাজে অসহিষ্ণুতা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে শিশুদের কাছ থেকে সহনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা পরীক্ষার ফল নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, নাগরিক চরিত্র গঠনের বিষয়ে ততটা নই। একজন শিক্ষার্থী গণিতে এ প্লাস পেলেও যদি সে ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে, যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে না শেখে, পরাজয় মেনে নিতে না শেখে, তাহলে সে শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক নাগরিক হয়ে ওঠে না।

বিদ্যালয়ে নাগরিক শিক্ষা, বিতর্কচর্চা, মতবিনিময়, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংস্কৃতি নিয়ে আরো বেশি কাজ করা দরকার। প্রতিবাদ শেখাতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে শেখাতে হবে প্রতিপক্ষকে অপমান না করেও প্রতিবাদ করা যায়।

আজ অনেক শিশুই মনে করে, প্রতিবাদ মানেই রাস্তা অবরোধ, চিৎকার, ভাইরাল ভিডিও এবং উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান। কিন্তু ইতিহাস বলে, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল আন্দোলনগুলোর অনেকগুলোই টিকে ছিল শৃঙ্খলা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সংগঠনের ওপর। আজকের শিশুরা আগামী দিনের নেতা, শিক্ষক, বিচারক, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক ও প্রশাসক। আমরা যদি আজ তাদের শেখাই যুক্তির চেয়ে গালি শক্তিশালী, তাহলে আগামী দিনের গণতন্ত্রও সেই ভাষায়ই কথা বলবে। অতএব প্রশ্নটি শুধু একটি আন্দোলন ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আরো বড়। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ছি, যেখানে শিশুদের প্রথম রাজনৈতিক শিক্ষা হবে শালীনতা, সহনশীলতা ও যুক্তি; নাকি এমন একটি সমাজ গড়ছি, যেখানে নেতৃত্বের প্রথম পাঠই হবে বিদ্বেষ, বিভাজন ও চিৎকার? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে যেমন দিতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকে, শিক্ষককে, অভিভাবককে, গণমাধ্যমকে এবং আমাদের প্রত্যেককেও দিতে হবে। কারণ শিশুরা কখনো একা বদলে যায় না। তারা বড়দের পৃথিবী থেকেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের ভাষা ধার করে।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয় হতে যাচ্ছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় | কালের কণ্ঠ