• ই-পেপার

বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা

  • ড. শাহরীনা আখতার

বর্ষাকালীন কৃষি : আশা-নিরাশার দোলাচলে কৃষক

ড. জাহাঙ্গীর আলম

বর্ষাকালীন কৃষি : আশা-নিরাশার দোলাচলে কৃষক

ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে ছয়টি ঋতু। সেগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের দিনগুলোতে মানুষ যখন অসহ্য গরমে ছটফট করতে থাকে, তখন বৃষ্টির বর্ষণ এসে বুলিয়ে দেয় শীতল পরশ। এ দেশে বৃষ্টি হয়ে থাকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে। বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ু অনেক জলীয় বাষ্প বয়ে আনে। এরপর তা হিমালয়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এ দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, যার ফলে বর্ষা শুরু হয়।

পঞ্জিকান্তরে আষাঢ় ও শ্রাবণএই দুই মাস বর্ষাকাল। কিন্তু বাংলাদেশে এ ঋতুর আগমন আগেই ঘটে যায়, শেষ হয় দেরিতে। এ দেশে সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে বর্ষণ শুরু হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। হাওর এলাকায় এর স্থায়িত্ব আরো বেশি হয়, ছয় মাসেরও অধিক। দেশের মধ্য অঞ্চলে এর স্থায়িত্ব কম, প্রায় চার মাস। তখন মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, খাল-বিল ও নদী-নালা জলপূর্ণ থাকে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায় সব ময়লা-আবর্জনা। এ সময় তরুলতা ও গাছপালা খুব সতেজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে দেখা যায় নানা রকম ফলের সম্ভার, ঘটে বিচিত্র ফুলের সমারোহ। বর্ষাই এই বাংলাকে করেছে শস্য-শ্যামল। এ ঋতুতে কৃষকরা বীজতলা প্রস্তুত করেন। বীজ বোনার পর চারাগাছ তুলে তা রোপণ করেন। এ ঋতুই ধান কাটা ও পাট কাটার উপযুক্ত সময়। এ সময় কৃষকরা বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলানোর জন্য ব্যস্ত থাকেন। তখন জলমগ্ন প্লাবনভূমিগুলো মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল আবাসক্ষেত্রে পরিণত হয়। জেলেদের হাতে ধরা পড়ে বিভিন্ন জাতের মাছ।

বর্ষাকালীন কৃষি : আশা-নিরাশার দোলাচলে কৃষকবাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান। তিনটি প্রধান ধানের মধ্যে দুটিই উৎপাদিত হয় বর্ষাকালে। এ মৌসুমে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়। আর বোরো ধানের চাষ হয় শীতকালে। মোট ধান উৎপাদনের দিক থেকে আউশের অবস্থান তৃতীয়, শতকরা আট ভাগ। আমন ধানের শরিকানা ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ধানের শতকরা ৪৬ ভাগ উৎপাদিত হয় বর্ষা মৌসুমে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বোরো ধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। এখন অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা ও উৎপাদন খরচের কারণে বোরো ধানের প্রতি কৃষকের নিরবচ্ছিন্ন আগ্রহ কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে। আউশ ও আমনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এই দুটি ধানের ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে তা সম্প্রসারণের ফলে একরপ্রতি ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বর্ষায় ঘন ঘন বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে খরার কারণে অনেক সময় ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হন এই দুটি ধানের উৎপাদনকারী কৃষকরা।

এবার আউশের উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছে বন্যার কারণে। আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের প্রাথমিক বন্যায়। স্থানভেদে কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে মূল জমিতে আমনের চারা রোপণ কার্যক্রম। এরই মধ্যে প্রাপ্ত হিসাবে ১৫ শতাংশ আউশ ধানের উৎপাদন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগে বোরো ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাওরের বন্যায়। ফলে ছয়-সাত লাখ টন চালের উৎপাদন কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বাজারে চালের সরবরাহ হ্রাস পেতে পারে। দামও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেড়ে যেতে পারে আমদানির পরিমাণ। সামনের আগস্ট পর্যন্ত এখনো বন্যার আশঙ্কা আছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। বন্যা হতে পারে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও। এর জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আউশ ধানের বন্যাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও আমন ধানের ঘাতসহিষ্ণু বিলম্বিত জাত সম্প্রসারণের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। তা ছাড়া উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের অধীন এলাকা সম্প্রসারিত করতে হবে। হাওরের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে লাগসই গভীর পানি সহনশীল আমন জাতের। এর জন্য গুরুত্ব দিতে হবে গবেষণার ওপর। বর্ষাকালীন ধান অনেক সময় মার খায় বন্যার কারণে। এর জন্য শস্য বীমা চালু করা উচিত। এতে কৃষকদের হতাশা হ্রাস পাবে। বর্ষাকালীন কৃষির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে কৃষকদের।

বর্ষাকালীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাট। এটি বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। রপ্তানি বাণিজ্যে পাটের অবস্থান দ্বিতীয়। একসময় ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় আসত পাট থেকে। এখন তা নেমে এসেছে ৩ শতাংশে। রপ্তানি বাণিজ্যে গার্মেন্টস পণ্যসামগ্রীর আধিপত্যের কারণে পাটের শরিকানা কমেছে। কিন্তু নিরঙ্কুশ অঙ্কে তা বেড়েছে। পাটের আওতায় চাষকৃত জমির পরিমাণও কমেছে। তবে ফলন বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ একর জমিতে পাটের চাষ হয়। উৎপাদিত হয় প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাট। বাংলাদেশে পাট গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য আছে। সম্প্রতি সাদা পাটের ১২টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তোষা পাটের আটটি, কেনাফের চারটি এবং মেস্তার তিনটি উচ্চ ফলনশীল জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর সম্প্রসারণ চলছে মাঠ পর্যায়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়া এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এ দেশের কৃষি পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এখন আমাদের লবণাক্ততা, খরা ও শীত সহিষ্ণু জাতের পাট উদ্ভাবন করা দরকার। এরই মধ্যে দুইবার অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে পাট বোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তবে গবেষণার মাঠে নতুন উদ্ভাবিত পাটজাতের ফলন যত বেশি, কৃষকের মাঠে তত বেশি নয়। এই ফারাক কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে জোরালো সমন্বয় দরকার। পাট গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

দেশের বিভিন্ন জেলায় মাটির ধরন, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে পাটের উৎপাদন, গুণাগুণ ও মানের তারতম্য ঘটে। পাট পচানোর ওপর নির্ভর করে এর রং ও ঔজ্জ্বল্য। পরিষ্কার পানিতে পাট পচালে ও ধুলে এর রং ভালো ও উজ্জ্বল হয়। বর্তমানে আমাদের কৃষকের বড় সমস্যা পাট পচানো। বর্ষার পানি অনেক সময় দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে ঠিকভাবে পাট জাগ দিতে পারেন না কৃষকরা। পুকুর, ডোবা, খাল-বিল, দিঘি ও নালায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এই সমস্যা হয়। এবার সে সমস্যা নেই। অনবরত ভারি বৃষ্টিতে খাল-বিল-ডোবা পানিতে ভরপুর। দামও ভালো পাটের। এতে লাভবান হবেন কৃষক। পাটের বীজের অপ্রতুলতা এ দেশে পাট চাষের একটি বড় সমস্যা। দেশে উৎপাদিত বীজে চাষ হয় প্রায় ২০ শতাংশ জমি। বাকি জমি চাষ হয় আমদানীকৃত বীজ দিয়ে, যার গুণগত মান সম্পর্কে অনেক সময় কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

বর্ষাকালের অন্যতম ফসল সবজি। অনেক সময় তা বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এর দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে শীত মৌসুমেই সবজির উৎপাদন হয় বেশি। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় এর উৎপাদন কিছুটা কম হয়। এ সময়ে উৎপাদিত সবজির মধ্যে রয়েছে ঢেঁড়স, পটোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, করলা, শসা ইত্যাদি। কিছু সবজি সব মৌসুমে উৎপাদিত হয়। এগুলোর মধ্যে আছে বেগুন, কচু, পেঁপে, কাঁচকলা, শজনে ইত্যাদি। বর্ষাকালে মরিচ হয় কম। তাই দাম থাকে বেশি। পেঁয়াজ, রসুন, টমেটোএগুলোর প্রাপ্যতাও বর্ষাকালে থাকে কম। তাই বাজারমূল্য বেশি থাকে। তবে শীতকালীন কিছু সবজি; যেমনফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, টমেটো এখন গ্রীষ্মকালেও উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। এগুলোর ওপর আরো গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সবজির হিমায়িত সংরক্ষণাগার স্থাপন প্রয়োজন। এতে সারা বছর সবজির সরবরাহ ঠিক রাখা এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। এবার বন্যা ও ভারি বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে শাক-শবজির উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে দাম বেড়ে গেছে। শীতকালীন শবজি ওঠা পর্যন্ত শবজির দাম কিছুটা চড়াই থাকবে।

বর্ষায় ফলের সরবরাহ থাকে প্রচুর। দামও থাকে ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে। গ্রীষ্মকালে শুরু হয়ে বর্ষার শেষ নাগাদ পাওয়া যায় অনেক দেশি ফল। এর মধ্যে আছে আম, কাঁঠাল, আনারস, তাল, আমড়া, পেয়ারা ও সবুজ মাল্টা। গবেষণার মাধ্যমে এগুলোর নতুন জাত উদ্ভাবিত হচ্ছে। উৎপাদনও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা বৃদ্ধি পেলে ফল উৎপাদনে অচিরেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ।

বর্ষায় নানা ধরনের ফুল ফোটে। বিভিন্ন ফুলের গন্ধে বিমোহিত থাকে প্রকৃতি। আবেগপ্রবণ হয় মানুষের মন। বর্ষাকালে ফোটা ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে কদম, কেয়া, কামিনী, লিলি, বেলি, বকুল, দোলনচাঁপা, শাপলা, সন্ধ্যামালা, হাসনাহেনা প্রভৃতি। দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে এখন বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে অনেক ফুলের বাগান। ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে এর ব্যবসা বেশ জমজমাট। বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে ফুল। এতে উৎসাহিত হচ্ছেন ফুল চাষিরা। তাঁদের উৎপাদনে ধরে রাখা ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত জলাশয় ও নদী-নালা বর্ষার পানিতে ভরপুর থাকে। এতে পাওয়া যায় অনেক ধরনের মাছ। তখন জেলেদের মধ্যে মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনের হার কম। অতিরিক্ত মাছ আহরণই এর প্রধান কারণ। প্রতিকার হিসেবে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। এবার বন্যার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে অনেক মাছের ঘের ভেসে গেছে। পুকুর থেকেও বেরিয়ে গেছে মাছ। এই চাষিদের পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা প্রয়োজন।

পশুপাখির প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বর্ষাকালে বেশ সতর্ক থাকতে হয় কৃষকদের। এ সময় পশুপাখির রোগ বেশি হয়। খাদ্য সমস্যা হয় প্রকট। কাঁচা ঘাসের অপ্রতুলতা দেখা দেয়। ফলে পশুপাখির উৎপাদন কমে যায়। মূল্য বৃদ্ধি পায় পশুপাখিজাত পণ্যের। এ সময় বিভিন্ন রোগের প্রতিকারে এবং সাইলেজ তৈরির জন্য কৃষকদের সহায়তা দেওয়া দরকার। তা ছাড়া বর্ষাকালে সবুজ আকার ধারণ করে বনরাজি। এ সময় বেশি করে গাছ লাগানো দরকার। সামাজিক বনায়নে সহায়তা দিয়ে কৃষকদের উৎসাহিত করা দরকার।

বর্ষাকাল কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন মৌসুম। এ সময়ের ফসল বৃষ্টিনির্ভর। খাদ্যপণ্য, ফল, ফুল, শাক-সবজির উৎপাদন হয় অপেক্ষাকৃত কম খরচে। মাছের সরবরাহ থাকে প্রচুর। পশুপাখির উৎপাদন হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তবে এ মৌসুমে সমস্যা আছে অনেক। সম্ভাবনাও কম না। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে বর্ষাকালীন কৃষির উন্নয়ন সাধন অপরিহার্য। এতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে দেশ। অর্জিত হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ। সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট

জিআই পণ্যের প্রসারে কিছু প্রস্তাব

আবু তাহের খান

জিআই পণ্যের প্রসারে কিছু প্রস্তাব

ঐতিহ্য পরম্পরায় জামদানি বা মসলিন যেমন বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য, বাটিক যেমন ইন্দোনেশিয়ার কিংবা শাল কাশ্মীরেরতেমনি পৃথিবীর সব দেশেরই নিজস্ব ঐতিহ্যসংবলিত এমন কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো ওই দেশ বা অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু মুনাফার একচেটিয়াত্বের লোভে পুঁজির মালিকরা যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন, তখন আর তাঁদের ওইসব ঐতিহ্যের দিকে তাকাবার ফুরসত থাকে না। মুনাফার লোভে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সব ন্যায্যতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তাঁরা তখন সম্মুখবর্তী সব কিছুকেই নিজেদের মালিকানায় নিয়ে নিতে চান। আর তেমন অবস্থায়ই সম বা কাছাকাছি ঐতিহ্যের দেশগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝেই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিপেনডেন্সজিআই) এসব পণ্যের মালিকানা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যায়, যেমনটি জামদানি নিয়ে ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হওয়া সত্ত্বেও ভারত তখন এটিকে নিজেদের পণ্য বলে দাবি করে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে এর আইনি মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউআইপিও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র, তথ্য ও বিষয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত এটিকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবেই স্বীকৃতি প্রদান করে।

এ ধরনের বিরোধ ও বিবাদের মোকাবেলা বাংলাদেশকে পরবর্তীতে আরো একাধিকবার করতে হয়েছে। তবে এর জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীদের লোভ যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অজ্ঞতা, অনুদ্যোগ ও অদক্ষতা। দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব পণ্যের জিআই স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে বিরোধ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিষয়টি ঘটেছে আগে থেকে এসব পণ্যকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা না করার কারণে। লক্ষ করা গেছে যে ভারত যখনই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো পণ্যকে তাদের জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখনই বাংলাদেশের হুঁশ হয়েছে যে এ কাজটি আরো আগেই করা উচিত ছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধারার অদক্ষতার সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আরো একবার ডব্লিউআইপিও পর্যন্ত যাওয়া। ২০১৫ সালে জামদানির জিআই স্বত্বের মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে যে পরিমাণ দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছিল, সেটি মনে রেখে বাংলাদেশ যদি পরবর্তী সময়ের কাজগুলো যথাসময়ে করে ফেলত, তাহলে আর ২০২৪ সালে এসে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে পুনরায় বিবাদে লিপ্ত হতে হতো না।

২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগটিও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারত যে সে সময় তাদের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে বসল, সেটি বাংলাদেশের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিআইটি) জানতই না। এ তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা যখন বিষয়টির প্রতি ডিপিআইটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখনই প্রথম বোঝা যায় যে এ বিষয়ে কোনো খোঁজখবরই তারা রাখেন না। যাহোক, এরপর মাত্র এক বছরের মধ্যে ডিপিআইটি আরো ৩৩টি পণ্যকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যেগুলোর মধ্যকার অন্তত ১০টিই উক্ত দপ্তরে এক থেকে সাত বছর যাবৎ অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু জনমতের চাপজনিত উত্তেজনা থিতিয়ে যেতেই আবার সেই পুরনো স্থবিরতা ভর করে বসেছে। ২০২৪ সালে আবেদনকৃত মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে ৬৪তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের পর আর এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি আছে বলে জানা যায়নি। এ বিষয়ে ডিপিআইটি হয়তো বলবে যে তাদের কাছে এসংক্রান্ত আর কোনো আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে নেই; অতএব তারা অভিযোগমুক্ত।

তথ্যগতভাবে ডিপিআইটির উপরোক্ত সম্ভাব্য  বক্তব্যের মধ্যে হয়তো কোনোই ভুল নেই, যেমন ভুল থাকে না পুলিশের বক্তব্যের মধ্যেও। কোনো অপরাধ বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় এ ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন, তখন তাদের অকপট জবাব হচ্ছে, এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। জিআই পণ্যের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ডিপিআইটিও কি সেই একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে যে তাদের কাছে কেউ আবেদন না করা পর্যন্ত এ ব্যাপারে তাদের কোনো দায় নেই? তারা কি এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জিআই সনদ সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের আরো উৎসাহিত করতে পারেন না? কেউ তাদের কাছে সাহায্য না চাওয়ায় এ বিষয়ে তাদের কোনো দায় নেই বা তারা স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে উদ্যোক্তার কাছে এগিয়ে যাবেন নাএটি তো অগ্রসর চিন্তাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রসেবকের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না।

দেশে এখন স্বীকৃত জিআই পণ্যের সংখ্যা ৬৪টি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্প ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পশ্চাৎ সারির দেশ হলেও এর দীর্ঘ ও বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী পটভূমি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ডিপিআইটি ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিদান বা স্বীকৃতির জন্য সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে নতুন কোনো ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও সৃজনশীল সেবামূলক কর্মকাণ্ড খুঁজে পাচ্ছেন না কেন? এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বহুধাবিস্তৃত ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে আরো বহুসংখ্যক নতুন জিআই পণ্য খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে নিম্নে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো।

এক. শিল্পনীতিতে উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) শিল্পের পাশাপাশি সেবা কার্যক্রমকেও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে (যদিও এটি একটি অনেক বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত)। অন্যদিকে রুগ্ণ শিল্প চালুকরণ ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, সেখানেও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমকে সহায়তাদানের কথা বলা হয়েছে। আর সরকারের এরূপ নীতি ও সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে এখন অতি সহজেই জিআই পণ্য/সেবা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা যেতে পারে।

দুই. জিআই পণ্যের বর্তমান তালিকায় ইলিশ বা চিংড়ির মতো মাছের নাম থাকলেও এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যোগ করা প্রয়োজন রূপচাঁদা, লইট্টা, কোরাল, টুনা ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছের নাম, যেগুলোর জিআই স্বত্ব নিয়ে যেকোনো সময় মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া চলনবিলের শিং, কই, শোল, টাকি; বেলাই বিলের আইড়, মাগুর, বাইন, গুতুম, পাবদা, টেংরা; সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের সরপুঁটি, মহাশোল, পাঙ্গাশ, কাচকি, রিটা, ঘাউরা, বাচা ইত্যাদি মিঠাপানির মাছের নাম যুক্ত করা যেতে পারে। অধিকন্তু কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি ও কক্সবাজারের শুঁটকির নামও এ ক্ষেত্রে অনায়াসে আসতে পারে।

তিন. বাংলাদেশে রান্নাবান্না ও খাদ্যের কিছু নিজস্ব ধরন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের পিঠা-পায়েসের সুনাম উপমহাদেশজুড়েই বিস্তৃত। এর বাইরে এ দেশের কাচ্চি বিরিয়ানির নামদাম এখন ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের পাপর কিংবা যশোরের নলেন গুড়ের সন্দেশসহ আরো অনেক খাদ্যপণ্যের নামই এখন পর্যন্ত জিআই পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ওইসব পিঠা-পায়েস, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, হালিম, পাপর, সন্দেশ ইত্যাদি খাদ্যপণ্যকে জিআই সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

চার. ডিপিআইটির ৬৪টি জিআই পণ্যের তালিকায় কোনো কোনো আম বিশেষত আশ্বিনার মতো কম স্বাদের আম থাকলেও আম্রপালি, গোপালভোগ ইত্যাদির নাম নেই। ফলে এ আমগুলোর নাম উক্ত তালিকায় অবশ্যই যোগ করা প্রয়োজন। তদুপরি শেরপুরের বেগুন, শ্রীমঙ্গলের চা ও আনারস, নরসিংদীর সাগর কলা, ভোলা ও পটুয়াখালীর তরমুজ, কাপাসিয়ার বেল ইত্যাদি কৃষিপণ্যকেও সেখানে যুক্ত করা যেতে পারে।

পাঁচ. বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকায় ধামরাইয়ের তামা-কাঁসার তৈজসপত্র, সিলেটের বেতের আসবাব, কক্সবাজারের ঝিনুকজাত হস্তশিল্প, জলিরপারের কৃত্রিম গহনা, ভৈরবের পাদুকা, রায়েরবাজারের তৈজসপত্র ইত্যাদি যুক্ত করাটা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়জরুরিও বটে। কারণ এসব পণ্যের বেশির ভাগই এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং জিআই পণ্যের তালিকায় এসব নাম যুক্ত হলে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনা আরো বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

ছয়. বাংলাদেশের জিআই পণ্য তালিকার একেবারে প্রথমেই জামদানির নাম থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর মারমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক থামি ইত্যাদির নাম এখনো যুক্ত হয়নি। জিআই পণ্যের তালিকায় এসবের সংযুক্তি এগুলোর গুরুত্বই শুধু বাড়াবে না, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকার একটি ইতিবাচক বার্তাও দেশে-বিদেশে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে তাই বলব, বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকা আরো ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারিত করার যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ ও তৎপরতায় এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অথচ সে সম্ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এসবের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক ঐতিহ্যই শুধু রক্ষা পাবে না, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাও আরো বেগবান হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে এসব পণ্য ও সেবা জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনাও বহুলাংশে বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে নিবেদিতপ্রাণ সেবার মানসিকতা নিয়ে ও পেশাদারিপূর্ণ দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে সহসাই এ ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যযোগ্য বড় অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।

লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়; অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে

নিরঞ্জন রায়

বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে

যেকোনো দেশের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুযোগ। সব দেশই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। এই উদ্দেশ্যে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা হয় এবং কিছু প্রণোদনাও দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি চলে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা। বিশ্বে এই যে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিবাদ, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং প্রতিযোগিতা, এর মূলে আছে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য, যার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বিনিয়োগ। সব কিছুর মূলে আছে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে কি না, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে কি না এবং এই উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে কি না। যখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় তখন ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে, যার সার্বিক প্রতিফলন ঘটে অর্থনৈতিক উন্নতিতে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়, যখন দেশে বিনিয়োগ থাকে না।

বিনিয়োগ সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে, যথা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ। বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে অন্য দেশ থেকে যখন পুঁজি নিজের দেশে আসে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত হয়, তখনই আমরা তাকে বৈদেশিক বিনিয়োগ বলে অভিহিত করে থাকি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বৈদেশিক বিনিয়োগের ধারণা বদলে গেছে। এখন ক্রসবর্ডার ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বা এক দেশ থেকে আরেক দেশ অথবা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যখন ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন বা বাজারজাতকরণ সম্প্রসারণ করা এবং সেই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে ও অঞ্চলে অর্থ, দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়োজিত করা হয়, তখন তা বৈদেশিক বিনিয়োগের পর্যায় পড়ে। এ কারণেই এখন বৈদেশিক বিনিয়োগকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বা ক্রসবর্ডার বিনিয়োগও বলা হয়ে থাকে।

বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ যেমন অন্য দেশ থেকে নিজের দেশে আসতে পারে, তেমনি নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে যেতেও পারে। যেমনবিদেশ থেকে অনেক বিনিয়োগ যেমন বাংলাদেশে আসতে পারে, তেমনি বাংলাদেশ থেকে কিছু বিনিয়োগ বিদেশেও যেতে পারে। আমেরিকার কোনো বিনিয়োগকারী যখন বাংলাদেশে ব্যবসা বা উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ এনে এখানে বিনিয়োগ করবে, তখন সেটি হবে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ, অর্থাৎ অন্তর্মুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ বা ইনওয়ার্ড ফরেন ইনভেস্টমেন্ট। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের কোনো ব্যবসায়ী যখন বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা বা উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ থেকে অর্থ নিয়ে সেখানে বিনিয়োগ করবে, তখনো সেটা বৈদেশিক বিনিয়োগের আওতায় পড়বে। তবে সেটি হবে বহির্মুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ বা আউটওয়ার্ড ফরেন ইনভেস্টমেন্ট। এ কারণেই বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ বা নিট ফরেন ইনভেস্টমেন্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। কেননা প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব যে সত্যিকার অর্থেই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে কি না এবং কী পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে। প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ যখন ধনাত্মক বা পজিটিভ হয়, তখনই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়ে থাকে।

বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনব্যবস্থা, সরবরাহ নেটওয়ার্ক বা সাপ্লাই চেইন যেমন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি বিনিয়োগও এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। মূলধন বা আর্থিক বিনিয়োগ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিনিয়োগ এখন বিভিন্ন দেশে এবং অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। যে দেশ বা অঞ্চলে ব্যাবসায়িক সুযোগ বেশি থাকে, সেখানে বিনিয়োগ জেঁকে বসে। এ কারণেই দেখা যায় কোনো এক বছর এক দেশে বা অঞ্চলে অধিক বিনিয়োগ হলেও পরের বছর সেটি নাও হতে পারে এবং বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। তবে যদি কোনো বছর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ সেভাবে সম্প্রসারিত না হয়, তাহলে সে বছর বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় না। যখন বেশির ভাগ দেশে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ ধনাত্মক না হয়, তখনই এ রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে যখন বিশ্বের  বেশির ভাগ দেশে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় তখনই বিশ্বে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগের হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সংরক্ষণ করে এবং প্রতিবছর এর ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে জাতিসংঘের প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর তথ্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে জাতিসংঘ বিশ্বের বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০২৫ সালে বিশ্বে সার্বিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ ৬% বৃদ্ধি পেয়ে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির  বেশির ভাগই হয়েছে উন্নত বিশ্বে। বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাত্র ২% পেয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমেরিকা বরাবরের মতো প্রথম স্থানেই অবস্থান করছে, যদিও তাদের দেশে এই বিনিয়োগ ২০২৪ সালের ২৮৪ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে ২৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চীনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তারা ২০২৫ সালে ১০৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ পেলেও সেটা ২০২৪ সালের ১১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়েছে। অঞ্চল হিসেবে ইউরোপ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ভালো সুবিধা নিতে পেরেছে। কেননা ইউরোপে ২০২৪ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২০৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শুধু ব্রাজিল ও ভারত ভালো অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ পেয়েছে ২০২৫ সালে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও আমাদের দেশ এর ছিটেফোঁটাও আনতে পারল না কেন। অথচ ২০২৫ সালে আমাদের দেশেই তো সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আসার কথা ছিল। কেননা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এক সরকারকে সরিয়ে দায়িত্বে ছিলেন এক অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধান আবার ছিলেন নোবেলবিজয়ী ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞ। উন্নত বিশ্বে উনার পরিচিতি এবং নেটওয়ার্ক বেশ শক্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়ে অনেক আশার কথাও তিনি দেশবাসীকে শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেশে অঢেল বিনিয়োগ হবে, প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে, চাকরির বন্যা বয়ে যাবে, আরো অনেক আশার কথা। বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার দায়িত্বে থাকা সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আরেক প্রবাসী আর্থিক বিশেষজ্ঞকে। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন যে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানো হবে। সিঙ্গাপুর তো দূরের কথা, দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো পিছিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে।

বিগত দুই বছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ তো আসেইনি, দেশীয় বিনিয়োগও সেভাবে হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এক ধরনের আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে তাঁরা বিনিয়োগ করার মনোবল ও উৎসাহ, দুটোই হারিয়ে ফেলেছেন। অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে যে বিনিয়োগ হয় না, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে গত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে। এর সঙ্গে এবার নতুন করে যোগ হয়েছে মব সন্ত্রাস করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রমণ করা এবং ব্যবসায়ীদের আতঙ্কের মধ্যে রাখা। এই যেখানে অবস্থা, সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ তো অনেক পরের কথা, দেশীয় বিনিয়োগই তো হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সরকারি সংস্থা বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে পারে না। সরকার এবং সরকারি সংস্থা দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়তা দিতে পারবে। মূল বিনিয়োগ আনতে পারবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। ব্যবসায়ীরা অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের সখ্য বা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ সুবিধাগুলো তুলে ধরে তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। যেমনএখন এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ চলছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে তথ্যভাণ্ডার বা ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার জন্য আমেরিকা-ইউরোপের প্রযুক্তি কম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই ডেটা সেন্টার তৈরিতে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। ভারত এই ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমেরিকার কয়েকটি প্রযুক্তি কম্পানির কাছ থেকে প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আমরা কি এ রকম কয়েকটি ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিতে পারতাম না। বৃহৎ প্রযুক্তি কম্পানি না হোক, মধ্যম সারির প্রযুক্তি কম্পানির জন্য ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠার সুযোগ অবশ্যই নিতে পারতাম। কিন্তু সেই চেষ্টা আমরা করিনি।

এ ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ শুধু মুখের কথায় আসে না। এর জন্য প্রয়োজন সবার আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত এবং সুযোগ সৃষ্টি করা। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন দেশের ব্যবসায়ীদের মধে আস্থা ফিরে আসবে এবং তাঁরা নিজ উদ্যোগে দেশে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। সরকারের উচিত এদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সময় দ্রুত চলে যেতে শুরু করেছে। বিনিয়োগের প্রবাহ থেকে দেশ একবার দীর্ঘ মেয়াদে ছিটকে পড়লে, আর কোনোভাবেই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সহজ হবে না। তাই সময় থাকতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামত

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামত

গত ১৮ জুলাই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত সাড়ে সাত বছরে পুলিশের ৭৯ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১০ জনের বেশি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন এবং তাঁদের বড় অংশই কনস্টেবল ও এএসআই পদমর্যাদার। খবরটি সবার জন্য রীতিমতো উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য। ৭৯ জন পুলিশ সদসস্যের আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আত্মহত্যাকারীদের অনেক পুলিশ সদস্যই ব্যক্তিগত, পারিবারিক নানা কারণসহ চাকরিজীবনের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। এসবের পাশাপাশি অনেকের মানসিকভাবে অসুস্থতা, বদলি ও পদায়ন জনিত সমস্যা, দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি না পাওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ইত্যাদি কারণ জড়িত থাকতে পারে। আর পুলিশের চাকরিতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক টানাপড়েন, অপ্রতুল বেতন তথা আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অনীহা প্রভৃতি বিষয় সাধারণত একসঙ্গে কাজ করে থাকে, যা রীতিমতো দুঃখজনক।

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামতপুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই স্মরণে রাখতে হবে, মানুষের জীবনে সমস্যা আসে এবং সমস্যা আসবেই। আর এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে জীবনে সমস্যা এলে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে কোনো ধরনের সমস্যা এলে পুলিশ সদস্যসহ সবাইকে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোনো কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেওয়া হয়, তেমনি একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। শুধু পুলিশ সদস্যই নয়, বরং যেকোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ সাধারণভাবে নিহিত থাকে, তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনঃকষ্ট, বাইপোলার ডিস-অর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিস-অর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিস-অর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহার জনিত ডিস-অর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। ডব্লিউএইচওর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১.৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আট লাখ। হিসাব মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের ঘাটতি বা বিচ্ছেদ ঘটা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তি সংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার সংবাদ, কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা ইত্যাদি। এসব চিন্তা-ভাবনার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। তখন থেকেই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতা কিংবা কোনো কিছু কারো কাছ থেকে চেয়ে না পাওয়ার বিষয়টিও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।

হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পুলিশে দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি সদস্য কর্মরত। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের চিকিৎসাসেবার জন্য রাজধানী ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও নেই স্থায়ী কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেখানে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আরো আশ্চর্যের বিষয়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও কোথাও নেই পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময়ের ডিউটি পালন, ছুটির সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ঝুঁকির কাজ এবং ট্রমার অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই এসব বিষয় পুলিশপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করে এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।   

বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। বেশির ভাগ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে প্রটেক্টিভ ফ্যাক্টর বলা হয়। যেমনজীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। এসব ফ্যাক্টরকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তা ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যার প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। সুতরাং পুলিশ সদস্যদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনমাফিক সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি শুধু আত্মহত্যার ঘটনা-পরবর্তী তদন্ত নয়, বরং এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে তাঁদের বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন পুলিশ সদস্যদের জন্য থাকার ব্যারাকগুলোর আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা। সর্বোপরি প্রয়োজন তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যা এখন সময়ের দাবি। পুলিশপ্রধান, সরকার তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এ ক্ষেত্রে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে এলে পুলিশ বাহিনীকে সর্বাধুনিক বাহিনীতে পরিণত করা সম্ভব। সম্ভব পুলিশকে জনগণের সত্যিকারের বন্ধুতে পরিণত করা। পুলিশ বাহিনীতে বিরাজমান নানা রকম সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক হলে এবং ওই সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। তাঁদের বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। পুলিশ সদস্যসহ সবারই স্মরণে রাখা প্রয়োজন, জীবনকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই সবার উচিত আত্মহত্যার পথ পরিহার করে জীবনকে ভালোবাসতে শেখা; জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে শেখা এবং জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে শেখা।

লেখক : অধ্যাপক (আইন বিভাগ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং মেন্টর, রিমোর্ট লার্নিং ইন ক্রাইসিস অ্যান্ড ইমার্জেন্সিস ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)