আনন্দ, বেদনা, আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের বিশ্বকাপের বৃহৎ জাহাজটি কোয়ার্টার ফাইনালের ঘাটে এসে পৌঁছেছে। আমাদের নিজস্ব মনোভাব, বক্তব্য, প্রতিবাদ, অনুভূতির পেছনে আছে প্রত্যেকের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার হিসাব। আর তাই বিষয়টিকে খারাপ বলার সুযোগ নেই। এই পৃথিবী চলছে কিভাবে? কিভাবে চলছে আমাদের জীবন, সমাজ ও দেশ? আর তাই ফুটবলের জীবনকে সন্দেহের চোখে দেখব কেন?
ফুটবল নিয়ে ভীষণ আনন্দ, ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদ আছে, তা সত্ত্বেও সবাই কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবল ফিরে আসে। সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেই উৎসবকে দুই হাত ভরে লুফে নেয়। অথচ বিশ্বকাপের সঙ্গে আমাদের কী ধরনের সম্পর্ক, তা সবাই জানি। তা সত্ত্বেও ফুটবলের পূর্ণিমার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়।
ঢাকা নগরীর পাশেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ক্যাম্পাসে প্রতিদিন রাতে ও ভোরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী খুব মজা করে খেলা দেখে। ওরা অবশ্যই বিভিন্ন দলের সমর্থক। এর পরও খেলা দেখছে একসঙ্গে। ফুটবল পেরেছে সব মতকে একসঙ্গে খেলাতে। অসাধারণ বিষয়। যে আটটি দেশ কোয়ার্টার ফাইনালের ভিসা নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে একটি দেশেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এভাবে এত হাজার হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে বিশাল বড় পর্দায় খেলা দেখে—এ ধরনের উদাহরণ নেই। অথচ বিশ্বকাপের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। শুধু নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য মেতে ওঠা। দুঃখের বিষয় হলো, এই ফুটবল উৎসবে আবার বিষাদও নেমে এসেছে। অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়ে গেছে শুধু ফুটবলের উৎসব ঘিরে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার খবরগুলো অনুসরণ করি মনোযোগের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য। চোখে এখনো পড়েনি বিগত দিনগুলোতে বিশ্বকাপ বিজয়ী দল উরুগুয়ে, জার্মানি ও ব্রাজিল। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের মতো দলগুলো যে অসময়ে বিদায় হয়েছে, এরপর সেই দেশের মানুষ কি প্রাণ দিয়েছে ফুটবলের পরাজয়ের দুঃখে? ফুটবল ঘিরে অতিরিক্ত আবেগ কখনো কাম্য নয়। ফুটবল একটি খেলা। অবশ্যই জীবনের খেলা। কিন্তু জীবন থেকে যেন ফুটবল বড় নয়। তা ছাড়া খেলাধুলা তো একটি জিনিস, যেটি পরাজয় মেনে নিতে শেখায়। আমরা সবাই জিততে চাই। সেটি তো সম্ভব নয়। জীবন সুন্দর করতে ফুটবলের নির্মল বিনোদন সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমিত হবে—এটি লক্ষ্য হওয়া উচিত। খেলার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়া ঠিক নয়। আমরা সবাই জানি, বৃহৎ খেলার অনুষ্ঠানের প্রভাবকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখা হয়। চলমান বিশ্বকাপ এর বাইরে নয়। খেলার ভেতরেও অন্য খেলা হয়েছে। খেলা হয়েছে বাইরে। এর পরও ফুটবলের আলো নিভে যায়নি। এখানেই ফুটবলের আবেদনের জয়।
ফুটবল ঘিরে আন্তর্জাতিক কূট রাজনীতি। ফিফার বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ। মতলব হাসিলের খেলা। বৃহৎ শক্তির প্রকাশ্য ক্ষমতা প্রদর্শন। অমানবিক আচরণ অংশগ্রহণকারী দলের প্রতি। প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য চোখে পড়া ফিফার ডিগবাজি। ব্যবসায়ীদের শতভাগ স্বার্থ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা। ফিফার প্রেসিডেন্ট মুখে মুখে লম্বা কথা বললেও শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে চাটুকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ফুটবল থেকে বাণিজ্যকে বড় করে দেখা হচ্ছে। ২১১ দেশের ফুটবল প্রতিষ্ঠান একটি বৃহৎ শক্তির কাছে কিছুই নয়—এর প্রমাণ সবাই দেখলেন। তবে একটি সান্ত্বনা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি ফুটবলের সব আলোকে তাঁর দিকে নিয়ে নিতে।
তিন দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ৪৮টি দেশ নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু। শেষ পর্যায়ে ১৬টি দেশ বাদ পড়েছে। এরপর ৩২ থেকে ১৬ দেশের নক আউট, যাকে বলা হয় প্রাক-কোয়ার্টার। এখানে স্থান হয়নি স্বাগতিক দেশগুলোর। এখানে এসেই ব্রাজিলের যাত্রা থেমে গেছে। ২৪ বছর অপেক্ষার অবসান হলো না। এখন আবার চার বছর পর বড় লড়াইয়ের মাঠে আসা নিশ্চিত করতে হবে। ব্রাজিল নিয়ে এত বেশি লেখালেখি আর কথাবার্তা হয়েছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে—আর তাই চর্বিতচর্বণ অর্থহীন। ব্রাজিল কেন অসময়ে চলে গেছে, কমবেশি সবাই বুঝেছে। আমাদের ফুটবল মননে স্থান জুড়ে আছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। ব্রাজিল না থাকায় এরই মধ্যে বিশ্বকাপ বাংলাদেশে রং হারিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটিই নিয়ম—কেউ সফল হবে, কেউ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে অসময়ে চলে যাবে। দেশের মানুষের কাছে আরেকটি জনপ্রিয় দল হলো আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে লড়বে ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। শেষ আটে চলে এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসব। তা সত্ত্বেও বলা মুশকিল শেষ পর্যন্ত কোন দল শিরোপা জিতবে। আট দলের মধ্যে লাতিন আমেরিকার আছে আর্জেন্টিনা, আফ্রিকার মরক্কো। বাকি ছয়টি ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড ইউরোপের দেশ। অর্থাৎ ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি ডমিনেট করছে ফুটবল বিশ্বকাপের উৎসবে। ২০২২ সালে কাতারে ইউরোপের ফ্রান্সকে পরাজিত করে জিতেছিল আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর। মেসির জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত এবার কী ঘটতে যাচ্ছে, তা এখন বলা মুশকিল। ইউরোপের দলগুলো কিন্তু ক্রমেই গোছানো এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। মরক্কো গত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। এবার তাদের মোকাবেলা করতে হবে ফ্রান্সকে। মরক্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তারা ইতিবাচক ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলছে। এখন যে আটটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে আছে, এর মধ্যে তো আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে। নরওয়ে, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও মরক্কো অতীতের বিশ্বকাপে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান (২০১৮), কোয়ার্টার ফাইনাল এবং কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে। শিরোপা জয় এখন উন্মুক্ত অবস্থায় আছে।
যে চারটি দেশ অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের মধ্যে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বেশি, তিনবার জিতেছে। আর রানার্স আপ হয়েছে তিনবার। ফুটবলকে বোঝা মুশকিল। ফুটবলের নাটকের ‘স্ক্রিপ্ট’ অনেক আগে থেকে লেখার সুযোগ নেই। আর সব রোমাঞ্চ ও উত্তেজনার মাঠেই জন্ম হয় মিনিটে মিনিটে। ৯০ মিনিট সেখানে কিছু না হলে অতিরিক্ত সময়, সেখানেও না হলে পেনাল্টি শ্যুট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্প সৃষ্টি হচ্ছে। এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। শুধু প্রার্থনা করা, যাতে প্রিয় দল শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে আর শেষ হাসি হাসতে পারে। আর এই হাসি কেড়ে নেওয়ার জন্য একটি খেলাই এখন যথেষ্ট। কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ—এটি তো জগৎসংসারের অতিপরিচিত খেলা।
বিশ্বকাপের মাঠে লক্ষ করেছি যে ইউরোপের সেরা দলগুলো কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। এই দেশগুলোর খেলোয়াড়দের বড় অংশই অভিবাসী বা অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি দলের প্রাণভোমরা এখন অভিবাসী এবং অভিবাসী পরিবারের সন্তান। এই সবকিছুই ফুটবলের বিশ্বায়নের অবদান।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া



বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, বিটিআইয়ের নানা স্ট্রেইন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও জলাশয়ে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা স্ট্রেইন সেই এলাকার মশা দমনে বিদেশ থেকে আনা স্ট্রেইনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কারণ স্থানীয় স্ট্রেইন বছরের পর বছর ধরে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, জলাশয়ের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় মশার প্রজাতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে জীববৈচিত্র্যকে সামঞ্জস্য গড়ে তোলে, যা বহিরাগত স্ট্রেইনের পক্ষে সহজে অর্জন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের জলাভূমি, ডোবা, খাল-বিল, ধানক্ষেত ও অন্যান্য কৃষিজমিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর সম্ভাবনাময় বিটিআই স্ট্রেইন বিদ্যমান। সেগুলো সংগ্রহ, বিশুদ্ধকরণ ও মাননির্ধারণের মাধ্যমে সহজেই দেশীয় বায়োপেস্টিসাইড গড়ে তুলতে পারি
