ইসলাম কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার দিকে নিয়ে যায়—এমন সব পথ ও উপায় বন্ধ করে দিয়েছে। এ বিষয়ে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বহু হাদিস আছে। নিচে সেগুলোর উপস্থাপন করা হলো—
মুসলিমকে ভয় দেখানোও হারাম : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা বৈধ নয়।’
(সহিহুল জামে, হাদিস : ৭৬৫৮)
অস্ত্র তাক করা বা ইশারা করাও নিষিদ্ধ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র নিয়ে না চলে এবং অস্ত্র দ্বারা ইশারা না করে। কারণ সে জানে না, হয়তো শয়তান তার হাতকে ফসকে দেবে। ফলে সে জাহান্নামের গর্তে পতিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৭২)
লোহার অস্ত্র দিয়ে ইশারা করলেও ফেরেশতাদের অভিশাপ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দিকে লোহার অস্ত্র দিয়ে ইশারা করে, ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে, যদিও সে তার আপন সহোদর ভাই হয়।’
(মুসলিম, হা : ২৬১৬)
মুসলমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৭১)
দুই মুসলিম অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি হলে : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন দুই মুসলিম একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, তখন তারা উভয়েই জাহান্নামের কিনারায় থাকে। আর যদি একজন অন্যজনকে হত্যা করে, তবে উভয়েই জাহান্নামে যাবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৮৮)। বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন দুই মুসলিম তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হয় তখন হত্যাকারী ও নিহত উভয়েই জাহান্নামি।’ সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! হত্যাকারীর ব্যাপারটি তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন?’ তিনি বললেন, ‘কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১)
বাজার বা মসজিদে অস্ত্র বহনের আদব : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে বা বাজারে তীর-ধনুক নিয়ে যাবে, তখন যেন তীরের ফলাগুলো ধরে রাখে, যাতে কোনো মুসলিম আহত না হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৭০৭৫, মুসলিম : ২৬১৫)। জাবির (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি মসজিদে খোলা তীর নিয়ে যাচ্ছিল। তখন তাকে নির্দেশ দেওয়া হলো ‘তীরের ফলা ধরে রাখো, যাতে কোনো মুসলিমের গায়ে আঁচড় না লাগে।’
(বুখারি : ৭০৭৪, মুসলিম : ২৬১৪)
ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মারা যায় অথবা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার ব্যাপার ভিন্ন।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৪৫২৪)
মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান পবিত্র : রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান—এগুলো একে অপরের জন্য ততটাই পবিত্র, যেমন আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই নগর পবিত্র। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে এ কথা পৌঁছে দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭)
হত্যার জন্য বাধ্য করা হলেও হত্যা বৈধ নয়
যদি কাউকে বলা হয়, ‘অমুককে হত্যা করো, না হলে তোমার সম্পদ কেড়ে নেওয়া হবে’ অথবা তাকে মারধরের ভয় দেখানো হয়, তবু নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করা ইসলামে বৈধ নয়।
অনেক আলেমের মতে, হত্যার নির্দেশদাতা ও হত্যাকারী—উভয়েই অপরাধে অংশীদার এবং উভয়ের ওপর কিসাস প্রযোজ্য হতে পারে। ইমাম আবু ইসহাক আশ-শিরাজি (রহ.) বলেন, ‘উম্মতের ঐকমত্য হলো, যাকে হত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে, তারও হত্যা করা বৈধ নয়। সে যদি হত্যা করে, তবে সে গুনাহগার হবে।’
ফাতহুল বারি : ১২/৩১২)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘যাকে অন্যকে হত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে, তার জন্য সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা, প্রহার করা বা তার সম্মান লঙ্ঘন করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। বরং সে নিজে কষ্ট সহ্য করবে; নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যের জীবন নেওয়া বৈধ নয়।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ১০/১৮৩)। অতএব জবরদস্তি করে হত্যার আদেশ দেওয়া হলেও তা পালন করা ইসলামে বৈধ নয়।
আর ‘আমি শুধু আদেশ পালন করেছি’—এ অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।
‘আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন করেছি’, এমন কথা মানুষ হত্যার বৈধ দলিল হতে পারে না। এই অজুহাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দুনিয়ার আদালতেও গ্রহণযোগ্য নয়।