দিল্লির যন্তর মন্তরের কাছে বুধবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দিল্লি পুলিশের দুইজন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসিপি), দুইজন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) এবং আরো একজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কানাট প্লেস এলাকার এসিপি বিবেক ভগতকে দ্রুত রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দিল্লি পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ) ও পুলিশ সদস্যরা সীমিত শক্তি ব্যবহার করেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দুই থেকে তিনটি কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কানাট প্লেসের টলস্টয় মার্গ এলাকায় উত্তেজনা শুরু হয়। যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পরে টলস্টয় মার্গে চলে যায়। সেখানে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ পুলিশের। পুলিশের ভাষ্য, কিছু বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ও কাচের বোতল ছুড়ে মারেন। এতে এসিপি বিবেক ভগত আহত হন। এছাড়া আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আঘাত পান। ঘটনার পর আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দিল্লি পুলিশ জানায়, শুরুতে তারা বলপ্রয়োগ না করে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করে। আন্দোলনের আয়োজক ও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদেরও ঘটনাস্থলে ডেকে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে পুলিশের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ আয়োজকদের কথাও শোনেনি। পুলিশের দাবি, পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে বড় বড় পাথর ছোড়া হয়। কিছু বিক্ষোভকারীর হাতে লাঠি ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজনকে তলোয়ার ও খুকরি প্রদর্শন করতে দেখা গেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাফ ও দিল্লি পুলিশ সীমিত শক্তি ব্যবহার করে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এলাকা খালি করে।
দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ তাকে চারদিক থেকে ঘিরে হামলা চালায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কিছু মানুষ গালিগালাজ ও উসকানিমূলক স্লোগানও দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ আরো জানায়, টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। তাদের দাবি, সন্ধ্যার পর কিছু সমাজবিরোধী ব্যক্তি বিক্ষোভে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরো উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তবে যন্তর মন্তর এবং আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জানিয়েছে, তারা কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে সেই আলোচনা কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়ি বা দপ্তরে নয়, নিরপেক্ষ কোনো স্থানে হতে হবে। বুধবার যন্তর মন্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস। তিনি বলেন, পুলিশ তাদের জানিয়েছে যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা তার বাসভবনে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি সিজেপি। দলটির বক্তব্য, সরকারের প্রতিনিধিদের বিক্ষোভস্থলের কাছাকাছি কোনো নিরপেক্ষ জায়গায় এসে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। নিরাপত্তার কারণে যন্তর মন্তরে না এলে কাছাকাছি অন্য কোনো স্থানে বৈঠক করা যেতে পারে বলেও জানিয়েছে তারা। সিজেপি আরো জানিয়েছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন লিখিত আশ্বাস তারা সরকারের কাছে চাইবে।
গত ২০ জুন থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং আরো কয়েকটি পরীক্ষায় অনিয়ম ঘটেছে। পরে এই আন্দোলনে যোগ দেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে আন্দোলন আরো জোরালো হয়। সিজেপি ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানালেও তিনি তাতে রাজি হননি। তার বক্তব্য, সরকার স্পষ্টভাবে নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন। বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন নিশ্চয়তা চান তিনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এখন দিল্লির বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিহার, তামিলনাড়ু, গোয়া, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। বিহারের রাজধানী পাটনায় রাজ্যপালের বাসভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। অন্য রাজ্যগুলোতেও একই দাবিতে সংহতি কর্মসূচি ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিকে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে দায়ের করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্র সরকার ও দিল্লি পুলিশকে জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের অভিযানের সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশও দিয়েছে আদালত। অন্যদিকে, পুলিশের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে করা একটি আবেদনের জরুরি শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।










