প্রবল ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর মায়ের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে দারিদ্র্যকে হার মানিয়েছেন মির্জাপুরের তরুণ মোহাম্মদ সাগর খান। ৪৬তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডার এবং ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি এখন সবার প্রশংসায় ভাসছেন।
মোহাম্মদ সাগর খান টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের কহেলা গ্রামের অটোরিকশা চালক আকবর খান ও সেলিনা বেগমের ছেলে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সাগর খান দ্বিতীয়।
পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অটোরিকশা চালক বাবার স্বল্প আয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা সাগর ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। কহেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রাজাপুর কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে ২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে ঢাকা সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। সংসারের অভাব-অনটন কখনোই থামাতে পারেনি তাকে। বর্তমান যুগেও এসএসসি পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছাড়াই কুপি ও হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে। অনেক সময় কেরোসিন না থাকায় দিনের আলোতেই পড়া শেষ করতে হয়েছে। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি।
এরপর ২০২৫ সালের ২ জুলাই ওয়ান ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি পান সাগর। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের মাত্র ৯ দিনের মাথায় মারা যান তার মমতাময়ী মা সেলিনা বেগম। শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ৪৬তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন এবং তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পান। মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করবেন। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রস্তুতি চালিয়ে যান সাগর। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন সাগর।
সাগর খানের বাল্যবন্ধু কল্লোল বলেন, সাগরের অধ্যবসায় ও সততা তাকে আরো অনেক দূর নিয়ে যাবে। তার এই সাফল্যে কহেলা গ্রামসহ গর্বিত পুরো এলাকার মানুষ।
বাবা আকবর খান বলেন, সাগরের এই অর্জনে আমরা গর্বিত। সাগর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করবে বলে বিশ্বাস। সেবার মাধ্যমে সাগর একজন আদর্শ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে এই দোয়া করি। তিনি ছেলের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
মোহাম্মদ সাগর খান বলেন, দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি এবং দারিদ্র্যতার মধ্যে বেড়ে উঠেছি। এই দারিদ্র্যতার মধ্যে আমি একটা জিনিস বেছে নিয়েছি, সেটি হচ্ছে লেখাপড়া। সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করতে হলে লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। সব সময় একটা বিষয় বিশ্বাস করতাম প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকলে দারিদ্র্যতা কখনো মানুষকে দমাতে পারে না। আমারও সেই ইচ্ছা-শক্তি থেকেই আজ এ পর্যন্ত এসেছি। মায়ের ইচ্ছা ছিল প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করে দেশ ও মানুষের সেবা করা। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। বিভিন্ন কারণে আমি তা করতে পারিনি। এসময় তিনি তার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
রাজাপুর কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ আব্দুল খালেক বলেন, সাগর শুধু আমাদের বিদ্যালয়ের নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দারিদ্র্যকে হারিয়ে তার এই সাফল্য নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাবে।
সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর মায়ের স্বপ্নকে শক্তি করে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন মোহাম্মদ সাগর খান। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, পরিস্থিতি নয়, ইচ্ছাশক্তিই মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।