• ই-পেপার

স্বাস্থ্যখাতের অবক্ষয় ও বিদেশমুখী চিকিৎসা

এআই অভিশাপ না আশীর্বাদ

মন্‌জুরুল ইসলাম
এআই অভিশাপ না আশীর্বাদ

পৃথিবী এখন টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে। মহাপরাক্রমশালী ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষেত্রবিশেষ টেক জায়ান্টদের কাছে ধরাশায়ী। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বা এআই মানুষকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এআইয়ের কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে মানব শ্রমশক্তি। প্রশ্ন, এআই কি জনশক্তির বিকল্প হতে যাচ্ছে? মানুষ কীভাবে এআইয়ে দক্ষ হবে? নাকি মানুষই এআইয়ের দাসে পরিণত হবে? এআই কি মনের গোপন কথা প্রকাশ করে মানুষের মুখোশ উন্মোচন করতে পারবে? পৃথিবী নিয়ে খেলা করতে এআইয়ের পর আর কী প্রযুক্তি আসছে? এআইয়ের অ্যাডভান্সড ভার্সনই বা কী? এসব মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে নাকি ডেকে আনবে সর্বনাশ?

পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষই তার প্রয়োজনে নানান উদ্ভাবনে নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি সভ্যতা মানুষকে বদলে দিয়েছে। কখনো কাজের ধরন বদলে গেছে, কখনো বদলে গেছে চিন্তার ধরন। প্রযুক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে মানবসভ্যতার তিনটি যুগ। প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ ও লোহার যুগ। আর ঐতিহাসিক সময়ের ভিত্তিতে সভ্যতার যুগ হলো চারটি। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক ও সমকালীন যুগ। শিল্পবিপ্লব মানুষের শারীরিক শ্রমের ধরন পাল্টে দিয়েছে। ইন্টারনেট তথ্যপ্রবাহের ধারা বদলে দিয়েছে। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আই বদলে দিচ্ছে মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এআইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব কি না। অনেকের মনে এখনো একটি ভয় কাজ করছে, এআই কি মানুষকে কর্মচ্যুত করবে?

পৃথিবীতে কি মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে? তবে প্রশ্ন যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো এআই মানুষের বিকল্প নয়। বরং যে ব্যক্তি এআই ব্যবহার করতে জানে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনায় পারদর্শী সে ধীরে ধীরে সেই সব ব্যক্তির চেয়ে এগিয়ে যাবে, যারা এআই সম্পর্কে অজ্ঞ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মানুষ। একজন হবেন এআই-দক্ষ, অন্যজন এআই-অদক্ষ। ভবিষ্যতের কর্মবাজারে এ পার্থক্যই সবচেয়ে বড় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

আজকের বিশ্বে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকিং, মার্কেটিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজাইন, কৃষি ও উৎপাদন শিল্পে এআই দ্রুত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের কপি লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট তৈরি, ছবি ও ভিডিও নির্মাণ, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা দৈনন্দিন অফিসের কাজসহ সব ক্ষেত্রেই এআই ঢুকে পড়ছে। ফলে যারা এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছেন, তারা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারছেন এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে এআই ব্যবহার মানেই শুধু একটি সফটওয়্যার খুলে প্রশ্ন করা নয়। এর জন্য প্রয়োজন নতুন ধরনের দক্ষতা। প্রথমেই জানতে হবে এআই কীভাবে কাজ করে এবং কোন কাজের জন্য কোন টুল উপযুক্ত। যেমন লেখালেখি ও বিশ্লেষণের জন্য এক ধরনের টুল কার্যকর, গবেষণার জন্য আরেকটি। আবার ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠস্বর তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন টুল ব্যবহার করতে হয়। এ মৌলিক ধারণা না থাকলে এআই থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।

এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার একটি হলো প্রম্পট লেখার প্রকৌশল (Prompt Engineering)। এআইকে কী করতে হবে, কোন ভাষায় করতে হবে, কী ধরনের উত্তর দরকার, কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে এসব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই ভালো ফলের দক্ষতা। একই প্রশ্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলে এআই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের উত্তর দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল রপ্ত করা। এরপর আসে কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা। ব্লগ, সংবাদ, বিজ্ঞাপনের লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট, ইমেইল, প্রতিবেদন কিংবা ব্যবসায়িক বিষয়-সব ক্ষেত্রেই এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবোধ ও সম্পাদনার ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে সেই কনটেন্টের মান। তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দক্ষ সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। অর্থাৎ এআইয়ের বশ্যতা নয় বরং এআইকে অধীন করতে হবে।

বর্তমান সময়ে ছবি, ভিডিও ও ভয়েস তৈরির প্রযুক্তিও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একটি ধারণা থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রচারমূলক পোস্টার, সমাজমাধ্যমের ভিডিও, এমনকি মানুষের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যবসা, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বিনোদনশিল্পে এসব প্রযুক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে এ ক্ষেত্রগুলোতেও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে অটোমেশনে। একই ধরনের কাজ বারবার করার পরিবর্তে এআই সেই কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে ইমেইল পাঠানো, সমাজমাধ্যমে পোস্ট প্রকাশ, তথ্য বিশ্লেষণ, রিপোর্ট তৈরি কিংবা গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজ এখন ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। এতে মানুষের সময় বাঁচছে এবং তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিতে পারছে।

AI Researcher I Machine Learning Engineer শুধু শেখাই যথেষ্ট নয়; বাস্তব ক্ষেত্রে কাজের প্রমাণও জরুরি। তাই যারা এআই নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের ছোট ছোট বাস্তব প্রকল্প তৈরি করতে হবে। নিজস্ব পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে হবে, যেখানে থাকবে কনটেন্ট, ডিজাইন, ভিডিও, অটোমেশন বা অন্যান্য কাজের নমুনা। বর্তমান চাকরির বাজার ও ফ্রিল্যান্সিং জগতে সনদের চেয়ে বাস্তব দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি। বাংলাদেশের জন্য এআই একটি বড় সুযোগও বটে।

দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যদি সময়মতো এআই-দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এআই কখনো মানুষের বিবেক, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প হতে পারে না। তথ্য যাচাই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় মানুষকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই এআইকে ব্যবহার করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এবং মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে ব্যক্তি আজ এআই শেখার উদ্যোগ নেবে, আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে সে-ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে থাকবে। আর যারা প্রযুক্তির এ পরিবর্তনকে উপেক্ষা করবে, তাদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। তাই সময়ের দাবি একটাই—এআইকে ভয় নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আপন করে নেওয়া।

এখন দেশে এআই ইন্টিগ্রেটর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের যথেষ্ট অভাব আছে। এআইয়ের যেসব টুল এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো কীভাবে ব্যবসার সঙ্গে সংযোগ করা যায়, তার দক্ষ জনশক্তির খুবই সংকট। বর্তমানে যেখানে একজন সাধারণ ওয়েভ ডেভেলপার এক ঘণ্টা কাজ করলে সর্বোচ্চ ৩০ ডলার আয় করছেন, সেখানে একজন দক্ষ এআই ইন্টিগ্রেটর ঘণ্টায় আয় করছেন সর্বনিম্ন ৭০ ডলার। বর্তমান বাজারে এর একটি বিশাল দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একদিকে আছে অসংখ্য ওয়েভ ডেভেলপার, যারা চমৎকার ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এআই কীভাবে কাজ করে, এআই-এপিআই (Application Programming Interface) কীভাবে ব্যবহার করতে হয় বা এআইকে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত।

অন্যদিকে আছে AI Researcher I Machine Learning Engineer, যারা মডেল তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়নে দক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ব্যবসার বাস্তব সমস্যা, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বা বাণিজ্যিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে না। ফলে মাঝখানে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ শূন্যস্থান পূরণ করে এমন একজন পেশাজীবী, যে ব্যবসার সমস্যা বোঝে, এআইয়ের সক্ষমতা বোঝে এবং ক্লায়েন্টকে বোঝাতে পারে যে এ কাজটি এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করা সম্ভব। আর সেটি ক্লায়েন্টের বর্তমান সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়াও সম্ভব। এই মানুষটিই হলো একজন এআই ইন্টিগ্রেটর। বর্তমান পৃথিবীতে এমন দক্ষ মানুষের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আর এ কারণেই তাদের পারিশ্রমিকও অনেক বেশি।

প্রযুক্তির আরেক আধুনিক সংযোজন হলো স্মার্টফোন। স্মার্টফোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই অনেক কিছু ছাড়তে পারি, কিন্তু স্মার্টফোন ছাড়া একদণ্ডও থাকতে পারি না। শিশু থেকে বৃদ্ধ, দিনমজুর, রিকশাচালক এমনকি ভিখারির হাতেও ফোন শোভা পাচ্ছে। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানবসভ্যতার বিরাট অর্জন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, সেই প্রিয় সঙ্গী ফোনটিও আমাদের বিশ্বস্ত নয়। আমরা কোথায় যাই, কার সঙ্গে সময় কাটাই, কী বিষয়ে গালগল্প বা ব্যক্তিগত অন্য কিছু করি—সবই জানে এই প্রিয় ডিভাইস। সে কারণে অপরাধ তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দারা সবার আগে খোঁজ করেন ওই ফোনটির। এক সময় অপরাধ তদন্তে সবার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো ড্রাইভার, দারোয়ান অথবা কাজের লোককে।  এখন সেই ধরন পাল্টে গেছে। প্রিয় স্মার্টফোনই এখন আমাদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এখন যে ভার্সন চলছে, তাতে মনে হচ্ছে এটি প্রাথমিক ধাপ। আগামী দিনগুলোতে এটির হয়তো আরও অনেক বেশি অ্যাডভান্সড ভার্সন আসবে। তখন এমনও হতে পারে, এআই হয়তো মানুষের মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে পারবে। তখন হয়তো মুখোশধারী মানুষের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে সেটা হবে ব্যক্তি মানুষের জন্য বিপজ্জনক, কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ। কারণ মুখোশধারী মানুষই ধ্বংস করছে পৃথিবী ও কল্যাণকর মানবসভ্যতা।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?

আহসান হাবিব বরুন
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?

উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র—এ দুটি ধারণা পরস্পরের পরিপূরক। একটি রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি-নির্ধারণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তৃণমূল পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি স্বাধীন, কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে এক ধরনের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেন্দ্রীয় রাজনীতির, বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যের যাঁতাকলে পিষ্ট। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে—স্থানীয় সরকারকে পঙ্গু করে এবং এমপিদের সর্বব্যাপী প্রভাব বজায় রেখে আদৌ কি টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা। একটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের চাহিদা সবচেয়ে ভালো বোঝেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো—জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ—স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে বন্টিত হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্য এবং অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের।

বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে আইনপ্রণেতা তথা সংসদ সদস্যদের প্রশাসনিক কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। আইনপ্রণেতাদের মূল দায়িত্ব জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশে এমপিরা স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, ইজারা, প্রশাসনিক বদলি থেকে শুরু করে একদম ছোটখাটো সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করেন।

আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদে এমপিদের ‘উপদেষ্টা’ ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এই আস্কারা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসনে এক ধরনের অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছে—এমপির ইশারা ছাড়া কিছুই হবে না। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিছক ঠুঁটো জগন্নাথ বা রাজনৈতিক অনুঘটে পরিণত হয়েছেন। প্রশাসন ও পুলিশ অনেক সময় ক্ষমতার দাপটের সামনে দেখেও না দেখার ভান করে, যা স্থানীয় সুশাসনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

এমপিদের এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। হাটবাজার, বালুমহাল, জলমহাল কিংবা পরিবহনের ইজারা প্রক্রিয়ায় কোনো উন্মুক্ত ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা হতে দেওয়া হয় না। এমপির পছন্দের লোক বা তাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের হাতে নামমাত্র মূল্যে এসব রাজস্ব আয়ের উৎস তুলে দেওয়া হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার একটি গরুর হাটের কথা। ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে যে হাটটি প্রায় পৌনে চার কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদে রাজনৈতিক প্রভাব ও ইশারায় সেই একই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র এক কোটি টাকার কিছু বেশিতে। অর্থাৎ, মাত্র একটি হাটের ইজারাতেই সরকার প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

দেশজুড়ে হাজার হাজার হাটবাজার, বালুমহাল ও জলমহালে প্রতিদিন এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। উন্মুক্ত দরপত্রের তোয়াক্কা না করে দলীয় প্রভাব ও এমপির আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার এই অলিখিত সংস্কৃতির কারণে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব লোপাট হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।

যুগ যুগ ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি এক মারাত্মক ব্যাধি বা সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল যখন যেই থাকুক, এমপিদের ছত্রছায়ায় এলাকায় কিছু কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও ক্যাডার বাহিনী গড়ে ওঠে। তারা যা বলে, সেটাই যেন স্থানীয় আইনে পরিণত হয়। আইনি শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে টেন্ডারবাজি, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং সরকারি সম্পত্তি দখলের মহোৎসব চলে।

এই গভীর সংকট সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্য। বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিতে বিচার করলে, এককভাবে কোনো সরকারের পক্ষে বা সরকারপ্রধানের পক্ষে রাতারাতি এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ চাঁদাবাজি কেবল কোনো নির্দিষ্ট একক দলের বলয়ে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবনতির কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। চাঁদাবাজির ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এটি যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে—তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

এই চরম সংকট থেকে উত্তরণ পেতে এবং স্থানীয় সরকারকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি :

১. রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রকাশ্যে, রশিদের মাধ্যমে ও আইনগত কাঠামো মেনে চাঁদা বা ফান্ড সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও গোপনে চাঁদা বা তোলাবাজির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আইন করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো যাতে গোপনে বা বলপ্রয়োগ করে টাকা না তুলে, বৈধভাবে রশিদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে সাহায্য বা চাঁদা গ্রহণ করতে পারে—তা আইনগতভাবে মঞ্জুর করা দরকার।

২. চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন স্বয়ং সরকারপ্রধান। সরকারপ্রধান (যেমন বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনাব তারেক রহমান)-কে স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিতে হবে। সরকার যদি একটি কঠোর ঐতিহাসিক ঘোষণা জারি করে যে—'কোনো এমপি বা তার সংসদীয় এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দখলবাজির সত্যতা গণমাধ্যমে কিংবা তদন্তে প্রমাণিত হলে, তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এমপিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং আইনগত তদন্তের মাধ্যমে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হবে।'

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন একটি কঠোর নীতি ও তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির পরিমাণ বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

পরিশেষে বলতে চাই, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বিক ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত। এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন, স্থানীয় শাসনের ওপর ছড়ি ঘোরানো নয়। জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আত্মনির্ভরশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

সরকারের যদি প্রকৃত সদিচ্ছা থাকে, তবে অবিলম্বে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার আনা সম্ভব। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই কেবল বাংলাদেশে প্রকৃত সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সুষম টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’ : সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা

বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’ : সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা
সংগৃহীত ছবি

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও দলীয় পর্যায়ে বেশ কিছু বড় চুক্তি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে নতুন এই সম্পৃক্ততার গতি ও বিস্তৃতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে যে— ‘নিজস্ব কৌশল’ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ কিভাবে এর সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে পারে?

এবারের সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক। সাধারণ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরে গিয়ে এ ধরনের চুক্তি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে। বেইজিংয়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রসারের অংশ হিসেবে সিপিসি তাদের আন্তর্জাতিক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়েই দীর্ঘকাল ধরে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। প্রবাসীদের সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়াতে দেশটির ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট'-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন গবেষকরা।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ রয়েছে এবং নতুন চুক্তির আওতায় এমন আরো কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষা, বৃত্তি ও শিক্ষাবিনিময়ের দারুণ সুযোগ দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রতিষ্ঠান গভীর পর্যবেক্ষণের মুখেও পড়েছে।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ' (সিএমজি) কনটেন্ট শেয়ারিং, সাংবাদিকদের পারস্পরিক সফর এবং স্থানীয় সম্প্রচারকদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া কূটনীতিতে এমন অংশীদারি সাধারণ বিষয় হলেও এর মাধ্যমে বেইজিং বিদেশে নিজেদের বয়ান প্রচারের বড় সুযোগ পাচ্ছে। 

চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সমানভাবে দৃশ্যমান অবকাঠামো খাতে। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, এর কাছাকাছি প্রস্তাবিত চীনা শিল্পপার্ক এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল—বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের বড় সম্ভাবনা জাগিয়েছে। দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিচালিত হলে এসব প্রকল্প বাংলাদেশের দারুণ উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তবে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।  

অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়টিও সমান মনোযোগ দাবি করে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বার্ষিক ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ সামান্য। তাই ভবিষ্যৎ আলোচনায় শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বরং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দিকেও জোর দিতে হবে।

এসব পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করা যাবে না। বাংলাদেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারি প্রয়োজন, যেখানে চীন বড় অবদান রাখতে পারে। তবে সফল অংশীদারি গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সমান স্পষ্টতা, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কি না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উন্নয়নের নিশানা

মোস্তফা কামাল
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উন্নয়নের নিশানা

বিজ্ঞানের আশীর্বাদের আরেক পাশে কিছুটা অভিশাপও অবধারিত। এ আশীর্বাদ ও অভিশাপের সমন্বয়ে এগোয় সভ্যতা। এ জাগতিক নিয়মেই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা- এআই প্রযুক্তি সুযোগ তৈরি করছে, ঝুঁকিও আনছে। ভুয়া ছবি-ভিডিও (ডিপফেক), স্বয়ংক্রিয় ভুল তথ্য তৈরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের মতো ঝুঁকির মাঝেও খুলছে সম্ভবনার দুয়ার। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও এআইনির্ভর ঝুঁকি মোকাবিলার পর্বও রাখতে হচ্ছে। ভালো-মন্দ বাস্তবতা মিলিয়ে দেশে এআই সম্ভাবনা ক্রমেই অসীমে পৌঁছার হাতছানি দেশে দেশে। বাংলাদেশ এ দুনিয়ার বাইরে নয়। স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু সীমাবদ্ধতাও দৃশ্যমান। সম্ভাবনার বেশিরভাগই নির্ভর করছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর। এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার জানান দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সরকার সেবা খাত, ফ্রিল্যান্সিং ও কৃষিতে বড় অগ্রগতি আনতে চায়।

দাতা-গ্রহিতা কে না চায় কয়েক মাসের কাজ কয়েক ঘণ্টায় শেষ করতে? বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ প্রযুক্তিতে আগ্রহী। অনেকে ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কাজ করছে। এআই-সম্পর্কিত স্কিল শেখার প্রবণতাও বাড়ছে। এআই খাতে শুধু আগ্রহ যথেষ্ট নয়। গবেষণা ও শিল্প খাতের জন্য দরকার অভিজ্ঞ মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, ডেটা প্রকৌশলী, এআই পণ্য ব্যবস্থাপক এবং নৈতিকতা ও নিরাপত্তা জ্ঞানের পেশাজীবী। এ স্তরের দক্ষ জনবল এখনো তুলনামূলক কম। এরইমধ্যে তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের এআইভিত্তিক কাজ করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থানের নিদর্শন রেখেছে। আলোচিত চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নির্ভর করছে তাদের ওপরই। অবস্থার অনিবার্যতায় সরকার জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে কৌশল প্রণয়ন করেছে, তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে এআই ব্যবহারের পথ দেখাবে। তা বেগবান রাখতে উন্নত এআই চিপ ও জাতীয় পর্যায়ের জিপিইউ অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। এখানে এখনো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। অটোমেশন ও এআইয়ের কারণে কিছু সনাতন খাতে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। তা মেনে নিতে হবে। সমান্তরালে আরো মানতে হবে এআই প্রযুক্তি এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। তা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং, শিল্প উৎপাদন ও গণমাধ্যমসহ প্রায় সব খাতেই।

এর ব্যবহার ও প্রসার বাড়ছে দ্রুত। যুগের চাহিদা ও আবশ্যকতায় দেশে কিছু জায়গায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। এআই প্রযুক্তিকে সরকারি সেবা ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় এআই-সম্পর্কিত রোডম্যাপ, কৌশলপত্র ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ দেখা গেছে। এর বিপরীতে গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত কাঠামোতে ঘাটতিও রয়েছে। তবে, সরকারের নীতিগত উদ্যোগ দৃশ্যমান। বাকি থাকছে বাস্তবায়ন। সেটা অবশ্যই কিছুটা অপেক্ষা ও সময়সাপেক্ষ। সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং একক মানদণ্ডে কাজ করার সক্ষমতা-মানসিকতা বাড়াতেই হবে। ইতিবাচক দিক হলো, দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমেও অনেকে দক্ষ হচ্ছে। এ ব্যাপারে তরুণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আশাব্যাঞ্জক। কিছু স্টার্টআপ কৃষিতে রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য খাতে সহায়ক প্রযুক্তি এবং ভাষাভিত্তিক টুল নিয়ে কাজ করছে। ব্যাংকিং ও ফিনটেক, ই-কমার্স, কাস্টমার সার্ভিস, বিজ্ঞাপন এবং সাইবার নিরাপত্তায় এআইভিত্তিক সমাধান খোঁজার চর্চাও ভালো লক্ষণ। এখানে সীমাবদ্ধতা সলিউশন মাধ্যম নিয়ে। দেশীয় প্রযুক্তির তুলনায় বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশি মাধ্যমের ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত এআই সলিউশন আসলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির তৈরি মডেল বা সফটওয়্যার। এতে নিজস্ব সক্ষমতা ও স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি এগোচ্ছে না। সেখানে মানোন্নয়ন আনতেই হবে।

এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ডেটা। বাংলাদেশে মানসম্মত ডেটাসেট তৈরি, সংরক্ষণ কাঠামো এখনো দুর্বল। সরকারি তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন, অগোছালো। বেসরকারি খাতেও ডেটা ব্যবস্থাপনার মান ইউনিফাইড নয়। একই সমস্যা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও। উন্নত মানের বাংলা ভাষার ডেটাসেট কম। মানেও ভিন্নতা। এতে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই- যেমন উন্নত অনুবাদ, ভয়েস রিকগনিশন বা স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝে এমন চ্যাটবট খাপ খায় না। এর মাঝেই এগিয়ে চলা। সম্ভাবনা তথা ভালো অংশ আয়ত্ত করা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কৃষিতে রোগ ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং, শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সহায়তার মতো ক্ষেত্রে এআই ভূমিকা রাখতে পারে। ডেটা অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গবেষণা-শিল্প খাত সংযোগ বাড়াতে পারলে এআইকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন নিশানা দেখাবে। বাস্তবতা উপলব্ধি করে দেশে এআই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং কিছু বাস্তব প্রয়োগও দেখা যাচ্ছে। কারণ, এআই প্রযুক্তি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার বড় রূপান্তরের বিষয়ও। আগপিছ ভেবে সরকারিভাবেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বিষয়টিতে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে তা এখন সরকারের টপ প্রায়োরিটিতে। বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এআই শাসনে নিরাপত্তা, সমতা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায়সঙ্গত অধিকারের দাবি জানানো হয়েছে। চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল এআই গভার্নেন্স মিটিংয়ে বাংলাদেশ প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থাপনায় সমতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। দেশব্যাপী এআইভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক জোর দেয়া হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এআই গবেষণা ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পে এআই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এআই প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এর ব্যবহার ও অপব্যবহার দুইই বাড়ছে।

বিশ্বের অনেক দেশেই এ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। রয়েছে দেশগুলোর পূর্ণাঙ্গ আইন, এক্সিকিউটিভ আদেশ, নীতিমালা, পলিসি বা স্ট্রাটেজি, বিল এমন নানা ধরনের আইনি পরিকাঠামোও। কারণ, এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে কোন ছবি, ভিডিও বা কনটেন্ট তৈরির সীমা যেমন রয়েছে তেমনি অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশেও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সীমা বা অপব্যবহার রোধে আইনি কাঠামো ও সমন্বিত বিধিমালা নির্ধারণ করলে তা সম্ভাবনার দুয়ারই বেশি খুলবে। সেইক্ষেত্রে প্রযুক্তি কতটুকু ব্যবহার করা যাবে আর কতটুকু যাবে না, সেটির সীমানা থাকতে হবে। মোটকথা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে শক্ত আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০২১ সালের নভেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে 'এথিকস অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনুমোদন করে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ঝুঁকি হ্রাস করাই ইউনেস্কোর এই বৈশ্বিক কাঠামোর লক্ষ্য। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ যাতে তাদের পলিসি ও প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেজন্যই ইউনেস্কো 'রেডিনেস অ্যাসেসম্যান্ট মেথোডলজি' তৈরি করেছে। নৈতিক এআই অনুশীলনের ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রস্তুতি নির্ধারণ করা হয় এই র‍্যামের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর ওই র‍্যামে যুক্ত হয়। সেটিতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা হয়। বাস্তবায়ন হয়নি সেটি। পতনের আগে শেখ হাসিনার সরকারও এআইয়ের একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছিল। সেটিও খসড়াতেই থেকে যায়।

এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও বৈচিত্রের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রণীত আইন ও নীতিমালা যদ্দুর সম্ভব বাস্তবায়নও করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এআই আক্টের মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাকে আলাদা শ্রেণিভুক্ত করে নির্দিষ্ট নীতিমালায় বেঁধে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে স্বতন্ত্র আইন। এছাড়া এআই সম্পর্কিত আইনের ধারা বা বিধানও রয়েছে দেশটিতে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আইন হলো 'ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইনিশিয়েটিভ অ্যাক্ট, ২০২০, এআই ইন গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট এবং অ্যাডভান্সিং অ্যামেরিকান এআই অ্যাক্ট'। যুক্তরাষ্ট্রের ১১৭তম কংগ্রেসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত কমপক্ষে ৭৫টি বিল উত্থাপন হয়। যার মধ্যে আইনে পরিণত করা হয় ছয়টিকে। কানাডায় এআই এবং ডেটা অ্যাক্ট দুটোই রয়েছে। ভারত ২০১৮ সালেই 'ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' নামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক এআই ব্যবহারের কৌশলপত্র করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতও এআই নিয়ে কৌশলনীতি করেছে। চীন তো অ্যালগরিদমের ব্যবহারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছে যেন তা রাষ্ট্রবিরোধী বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে ব্যবহার না হয়। এসব দেশের সাথে তুলনা করলে আইন বা বিধিবিধানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। গুরুত্ব যখন অনুভব করেছে, তখন নীতি, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও নিশ্চয়ই সম্ভব হবে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এখানে প্রাসঙ্গিক। সেইসাথে সমন্বিত পরিকল্পনাও আবশ্যক। বিদ্যমান যেসব আইন রয়েছে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হলেও এ অভিযাত্রার সফল যাত্রী হতে পারবে বাংলাদেশ। সেইসাথে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ তৈরি ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন