পৃথিবী এখন টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে। মহাপরাক্রমশালী ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষেত্রবিশেষ টেক জায়ান্টদের কাছে ধরাশায়ী। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বা এআই মানুষকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এআইয়ের কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে মানব শ্রমশক্তি। প্রশ্ন, এআই কি জনশক্তির বিকল্প হতে যাচ্ছে? মানুষ কীভাবে এআইয়ে দক্ষ হবে? নাকি মানুষই এআইয়ের দাসে পরিণত হবে? এআই কি মনের গোপন কথা প্রকাশ করে মানুষের মুখোশ উন্মোচন করতে পারবে? পৃথিবী নিয়ে খেলা করতে এআইয়ের পর আর কী প্রযুক্তি আসছে? এআইয়ের অ্যাডভান্সড ভার্সনই বা কী? এসব মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে নাকি ডেকে আনবে সর্বনাশ?
পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষই তার প্রয়োজনে নানান উদ্ভাবনে নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি সভ্যতা মানুষকে বদলে দিয়েছে। কখনো কাজের ধরন বদলে গেছে, কখনো বদলে গেছে চিন্তার ধরন। প্রযুক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে মানবসভ্যতার তিনটি যুগ। প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ ও লোহার যুগ। আর ঐতিহাসিক সময়ের ভিত্তিতে সভ্যতার যুগ হলো চারটি। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক ও সমকালীন যুগ। শিল্পবিপ্লব মানুষের শারীরিক শ্রমের ধরন পাল্টে দিয়েছে। ইন্টারনেট তথ্যপ্রবাহের ধারা বদলে দিয়েছে। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আই বদলে দিচ্ছে মানুষের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা এআইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব কি না। অনেকের মনে এখনো একটি ভয় কাজ করছে, এআই কি মানুষকে কর্মচ্যুত করবে?
পৃথিবীতে কি মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে? তবে প্রশ্ন যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো এআই মানুষের বিকল্প নয়। বরং যে ব্যক্তি এআই ব্যবহার করতে জানে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনায় পারদর্শী সে ধীরে ধীরে সেই সব ব্যক্তির চেয়ে এগিয়ে যাবে, যারা এআই সম্পর্কে অজ্ঞ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মানুষ। একজন হবেন এআই-দক্ষ, অন্যজন এআই-অদক্ষ। ভবিষ্যতের কর্মবাজারে এ পার্থক্যই সবচেয়ে বড় নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
আজকের বিশ্বে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকিং, মার্কেটিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজাইন, কৃষি ও উৎপাদন শিল্পে এআই দ্রুত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপনের কপি লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট তৈরি, ছবি ও ভিডিও নির্মাণ, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা দৈনন্দিন অফিসের কাজসহ সব ক্ষেত্রেই এআই ঢুকে পড়ছে। ফলে যারা এআইকে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছেন, তারা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারছেন এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে এআই ব্যবহার মানেই শুধু একটি সফটওয়্যার খুলে প্রশ্ন করা নয়। এর জন্য প্রয়োজন নতুন ধরনের দক্ষতা। প্রথমেই জানতে হবে এআই কীভাবে কাজ করে এবং কোন কাজের জন্য কোন টুল উপযুক্ত। যেমন লেখালেখি ও বিশ্লেষণের জন্য এক ধরনের টুল কার্যকর, গবেষণার জন্য আরেকটি। আবার ছবি, ভিডিও কিংবা কণ্ঠস্বর তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন টুল ব্যবহার করতে হয়। এ মৌলিক ধারণা না থাকলে এআই থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।
এআই ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার একটি হলো প্রম্পট লেখার প্রকৌশল (Prompt Engineering)। এআইকে কী করতে হবে, কোন ভাষায় করতে হবে, কী ধরনের উত্তর দরকার, কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে এসব স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই ভালো ফলের দক্ষতা। একই প্রশ্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলে এআই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানের উত্তর দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল রপ্ত করা। এরপর আসে কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা। ব্লগ, সংবাদ, বিজ্ঞাপনের লেখা, সমাজমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিওর স্ক্রিপ্ট, ইমেইল, প্রতিবেদন কিংবা ব্যবসায়িক বিষয়-সব ক্ষেত্রেই এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবোধ ও সম্পাদনার ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে সেই কনটেন্টের মান। তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং দক্ষ সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। অর্থাৎ এআইয়ের বশ্যতা নয় বরং এআইকে অধীন করতে হবে।
বর্তমান সময়ে ছবি, ভিডিও ও ভয়েস তৈরির প্রযুক্তিও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একটি ধারণা থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রচারমূলক পোস্টার, সমাজমাধ্যমের ভিডিও, এমনকি মানুষের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যবসা, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বিনোদনশিল্পে এসব প্রযুক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে এ ক্ষেত্রগুলোতেও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে অটোমেশনে। একই ধরনের কাজ বারবার করার পরিবর্তে এআই সেই কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে ইমেইল পাঠানো, সমাজমাধ্যমে পোস্ট প্রকাশ, তথ্য বিশ্লেষণ, রিপোর্ট তৈরি কিংবা গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজ এখন ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। এতে মানুষের সময় বাঁচছে এবং তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিতে পারছে।
AI Researcher I Machine Learning Engineer শুধু শেখাই যথেষ্ট নয়; বাস্তব ক্ষেত্রে কাজের প্রমাণও জরুরি। তাই যারা এআই নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের ছোট ছোট বাস্তব প্রকল্প তৈরি করতে হবে। নিজস্ব পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে হবে, যেখানে থাকবে কনটেন্ট, ডিজাইন, ভিডিও, অটোমেশন বা অন্যান্য কাজের নমুনা। বর্তমান চাকরির বাজার ও ফ্রিল্যান্সিং জগতে সনদের চেয়ে বাস্তব দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি। বাংলাদেশের জন্য এআই একটি বড় সুযোগও বটে।
দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যদি সময়মতো এআই-দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এআই কখনো মানুষের বিবেক, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প হতে পারে না। তথ্য যাচাই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় মানুষকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই এআইকে ব্যবহার করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এবং মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে ব্যক্তি আজ এআই শেখার উদ্যোগ নেবে, আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে সে-ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে থাকবে। আর যারা প্রযুক্তির এ পরিবর্তনকে উপেক্ষা করবে, তাদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। তাই সময়ের দাবি একটাই—এআইকে ভয় নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আপন করে নেওয়া।
এখন দেশে এআই ইন্টিগ্রেটর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের যথেষ্ট অভাব আছে। এআইয়ের যেসব টুল এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো কীভাবে ব্যবসার সঙ্গে সংযোগ করা যায়, তার দক্ষ জনশক্তির খুবই সংকট। বর্তমানে যেখানে একজন সাধারণ ওয়েভ ডেভেলপার এক ঘণ্টা কাজ করলে সর্বোচ্চ ৩০ ডলার আয় করছেন, সেখানে একজন দক্ষ এআই ইন্টিগ্রেটর ঘণ্টায় আয় করছেন সর্বনিম্ন ৭০ ডলার। বর্তমান বাজারে এর একটি বিশাল দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একদিকে আছে অসংখ্য ওয়েভ ডেভেলপার, যারা চমৎকার ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এআই কীভাবে কাজ করে, এআই-এপিআই (Application Programming Interface) কীভাবে ব্যবহার করতে হয় বা এআইকে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত।
অন্যদিকে আছে AI Researcher I Machine Learning Engineer, যারা মডেল তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়নে দক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ব্যবসার বাস্তব সমস্যা, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন বা বাণিজ্যিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে না। ফলে মাঝখানে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ শূন্যস্থান পূরণ করে এমন একজন পেশাজীবী, যে ব্যবসার সমস্যা বোঝে, এআইয়ের সক্ষমতা বোঝে এবং ক্লায়েন্টকে বোঝাতে পারে যে এ কাজটি এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করা সম্ভব। আর সেটি ক্লায়েন্টের বর্তমান সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়াও সম্ভব। এই মানুষটিই হলো একজন এআই ইন্টিগ্রেটর। বর্তমান পৃথিবীতে এমন দক্ষ মানুষের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আর এ কারণেই তাদের পারিশ্রমিকও অনেক বেশি।
প্রযুক্তির আরেক আধুনিক সংযোজন হলো স্মার্টফোন। স্মার্টফোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই অনেক কিছু ছাড়তে পারি, কিন্তু স্মার্টফোন ছাড়া একদণ্ডও থাকতে পারি না। শিশু থেকে বৃদ্ধ, দিনমজুর, রিকশাচালক এমনকি ভিখারির হাতেও ফোন শোভা পাচ্ছে। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানবসভ্যতার বিরাট অর্জন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, সেই প্রিয় সঙ্গী ফোনটিও আমাদের বিশ্বস্ত নয়। আমরা কোথায় যাই, কার সঙ্গে সময় কাটাই, কী বিষয়ে গালগল্প বা ব্যক্তিগত অন্য কিছু করি—সবই জানে এই প্রিয় ডিভাইস। সে কারণে অপরাধ তদন্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দারা সবার আগে খোঁজ করেন ওই ফোনটির। এক সময় অপরাধ তদন্তে সবার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো ড্রাইভার, দারোয়ান অথবা কাজের লোককে। এখন সেই ধরন পাল্টে গেছে। প্রিয় স্মার্টফোনই এখন আমাদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এখন যে ভার্সন চলছে, তাতে মনে হচ্ছে এটি প্রাথমিক ধাপ। আগামী দিনগুলোতে এটির হয়তো আরও অনেক বেশি অ্যাডভান্সড ভার্সন আসবে। তখন এমনও হতে পারে, এআই হয়তো মানুষের মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে পারবে। তখন হয়তো মুখোশধারী মানুষের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে। যদি তেমন কিছু হয় তাহলে সেটা হবে ব্যক্তি মানুষের জন্য বিপজ্জনক, কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ। কারণ মুখোশধারী মানুষই ধ্বংস করছে পৃথিবী ও কল্যাণকর মানবসভ্যতা।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন









