• ই-পেপার

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?

বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’ : সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা

বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’ : সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা
সংগৃহীত ছবি

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও দলীয় পর্যায়ে বেশ কিছু বড় চুক্তি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে নতুন এই সম্পৃক্ততার গতি ও বিস্তৃতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে যে— ‘নিজস্ব কৌশল’ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ কিভাবে এর সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে পারে?

এবারের সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক। সাধারণ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরে গিয়ে এ ধরনের চুক্তি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে। বেইজিংয়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রসারের অংশ হিসেবে সিপিসি তাদের আন্তর্জাতিক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়েই দীর্ঘকাল ধরে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। প্রবাসীদের সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়াতে দেশটির ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট'-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন গবেষকরা।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ রয়েছে এবং নতুন চুক্তির আওতায় এমন আরো কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষা, বৃত্তি ও শিক্ষাবিনিময়ের দারুণ সুযোগ দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রতিষ্ঠান গভীর পর্যবেক্ষণের মুখেও পড়েছে।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ' (সিএমজি) কনটেন্ট শেয়ারিং, সাংবাদিকদের পারস্পরিক সফর এবং স্থানীয় সম্প্রচারকদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া কূটনীতিতে এমন অংশীদারি সাধারণ বিষয় হলেও এর মাধ্যমে বেইজিং বিদেশে নিজেদের বয়ান প্রচারের বড় সুযোগ পাচ্ছে। 

চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সমানভাবে দৃশ্যমান অবকাঠামো খাতে। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, এর কাছাকাছি প্রস্তাবিত চীনা শিল্পপার্ক এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল—বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের বড় সম্ভাবনা জাগিয়েছে। দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিচালিত হলে এসব প্রকল্প বাংলাদেশের দারুণ উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তবে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।  

অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়টিও সমান মনোযোগ দাবি করে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বার্ষিক ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ সামান্য। তাই ভবিষ্যৎ আলোচনায় শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বরং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দিকেও জোর দিতে হবে।

এসব পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করা যাবে না। বাংলাদেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারি প্রয়োজন, যেখানে চীন বড় অবদান রাখতে পারে। তবে সফল অংশীদারি গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সমান স্পষ্টতা, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কি না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উন্নয়নের নিশানা

মোস্তফা কামাল
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উন্নয়নের নিশানা

বিজ্ঞানের আশীর্বাদের আরেক পাশে কিছুটা অভিশাপও অবধারিত। এ আশীর্বাদ ও অভিশাপের সমন্বয়ে এগোয় সভ্যতা। এ জাগতিক নিয়মেই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা- এআই প্রযুক্তি সুযোগ তৈরি করছে, ঝুঁকিও আনছে। ভুয়া ছবি-ভিডিও (ডিপফেক), স্বয়ংক্রিয় ভুল তথ্য তৈরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের মতো ঝুঁকির মাঝেও খুলছে সম্ভবনার দুয়ার। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও এআইনির্ভর ঝুঁকি মোকাবিলার পর্বও রাখতে হচ্ছে। ভালো-মন্দ বাস্তবতা মিলিয়ে দেশে এআই সম্ভাবনা ক্রমেই অসীমে পৌঁছার হাতছানি দেশে দেশে। বাংলাদেশ এ দুনিয়ার বাইরে নয়। স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু সীমাবদ্ধতাও দৃশ্যমান। সম্ভাবনার বেশিরভাগই নির্ভর করছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর। এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার জানান দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সরকার সেবা খাত, ফ্রিল্যান্সিং ও কৃষিতে বড় অগ্রগতি আনতে চায়।

দাতা-গ্রহিতা কে না চায় কয়েক মাসের কাজ কয়েক ঘণ্টায় শেষ করতে? বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ প্রযুক্তিতে আগ্রহী। অনেকে ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কাজ করছে। এআই-সম্পর্কিত স্কিল শেখার প্রবণতাও বাড়ছে। এআই খাতে শুধু আগ্রহ যথেষ্ট নয়। গবেষণা ও শিল্প খাতের জন্য দরকার অভিজ্ঞ মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, ডেটা প্রকৌশলী, এআই পণ্য ব্যবস্থাপক এবং নৈতিকতা ও নিরাপত্তা জ্ঞানের পেশাজীবী। এ স্তরের দক্ষ জনবল এখনো তুলনামূলক কম। এরইমধ্যে তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের এআইভিত্তিক কাজ করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থানের নিদর্শন রেখেছে। আলোচিত চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নির্ভর করছে তাদের ওপরই। অবস্থার অনিবার্যতায় সরকার জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে কৌশল প্রণয়ন করেছে, তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে এআই ব্যবহারের পথ দেখাবে। তা বেগবান রাখতে উন্নত এআই চিপ ও জাতীয় পর্যায়ের জিপিইউ অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। এখানে এখনো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। অটোমেশন ও এআইয়ের কারণে কিছু সনাতন খাতে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। তা মেনে নিতে হবে। সমান্তরালে আরো মানতে হবে এআই প্রযুক্তি এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। তা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং, শিল্প উৎপাদন ও গণমাধ্যমসহ প্রায় সব খাতেই।

এর ব্যবহার ও প্রসার বাড়ছে দ্রুত। যুগের চাহিদা ও আবশ্যকতায় দেশে কিছু জায়গায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। এআই প্রযুক্তিকে সরকারি সেবা ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় এআই-সম্পর্কিত রোডম্যাপ, কৌশলপত্র ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ দেখা গেছে। এর বিপরীতে গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত কাঠামোতে ঘাটতিও রয়েছে। তবে, সরকারের নীতিগত উদ্যোগ দৃশ্যমান। বাকি থাকছে বাস্তবায়ন। সেটা অবশ্যই কিছুটা অপেক্ষা ও সময়সাপেক্ষ। সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং একক মানদণ্ডে কাজ করার সক্ষমতা-মানসিকতা বাড়াতেই হবে। ইতিবাচক দিক হলো, দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমেও অনেকে দক্ষ হচ্ছে। এ ব্যাপারে তরুণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আশাব্যাঞ্জক। কিছু স্টার্টআপ কৃষিতে রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য খাতে সহায়ক প্রযুক্তি এবং ভাষাভিত্তিক টুল নিয়ে কাজ করছে। ব্যাংকিং ও ফিনটেক, ই-কমার্স, কাস্টমার সার্ভিস, বিজ্ঞাপন এবং সাইবার নিরাপত্তায় এআইভিত্তিক সমাধান খোঁজার চর্চাও ভালো লক্ষণ। এখানে সীমাবদ্ধতা সলিউশন মাধ্যম নিয়ে। দেশীয় প্রযুক্তির তুলনায় বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশি মাধ্যমের ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত এআই সলিউশন আসলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির তৈরি মডেল বা সফটওয়্যার। এতে নিজস্ব সক্ষমতা ও স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি এগোচ্ছে না। সেখানে মানোন্নয়ন আনতেই হবে।

এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ডেটা। বাংলাদেশে মানসম্মত ডেটাসেট তৈরি, সংরক্ষণ কাঠামো এখনো দুর্বল। সরকারি তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন, অগোছালো। বেসরকারি খাতেও ডেটা ব্যবস্থাপনার মান ইউনিফাইড নয়। একই সমস্যা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও। উন্নত মানের বাংলা ভাষার ডেটাসেট কম। মানেও ভিন্নতা। এতে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই- যেমন উন্নত অনুবাদ, ভয়েস রিকগনিশন বা স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝে এমন চ্যাটবট খাপ খায় না। এর মাঝেই এগিয়ে চলা। সম্ভাবনা তথা ভালো অংশ আয়ত্ত করা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কৃষিতে রোগ ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং, শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সহায়তার মতো ক্ষেত্রে এআই ভূমিকা রাখতে পারে। ডেটা অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গবেষণা-শিল্প খাত সংযোগ বাড়াতে পারলে এআইকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন নিশানা দেখাবে। বাস্তবতা উপলব্ধি করে দেশে এআই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং কিছু বাস্তব প্রয়োগও দেখা যাচ্ছে। কারণ, এআই প্রযুক্তি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার বড় রূপান্তরের বিষয়ও। আগপিছ ভেবে সরকারিভাবেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বিষয়টিতে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে তা এখন সরকারের টপ প্রায়োরিটিতে। বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এআই শাসনে নিরাপত্তা, সমতা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায়সঙ্গত অধিকারের দাবি জানানো হয়েছে। চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল এআই গভার্নেন্স মিটিংয়ে বাংলাদেশ প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থাপনায় সমতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। দেশব্যাপী এআইভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক জোর দেয়া হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এআই গবেষণা ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পে এআই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এআই প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এর ব্যবহার ও অপব্যবহার দুইই বাড়ছে।

বিশ্বের অনেক দেশেই এ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। রয়েছে দেশগুলোর পূর্ণাঙ্গ আইন, এক্সিকিউটিভ আদেশ, নীতিমালা, পলিসি বা স্ট্রাটেজি, বিল এমন নানা ধরনের আইনি পরিকাঠামোও। কারণ, এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে কোন ছবি, ভিডিও বা কনটেন্ট তৈরির সীমা যেমন রয়েছে তেমনি অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশেও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সীমা বা অপব্যবহার রোধে আইনি কাঠামো ও সমন্বিত বিধিমালা নির্ধারণ করলে তা সম্ভাবনার দুয়ারই বেশি খুলবে। সেইক্ষেত্রে প্রযুক্তি কতটুকু ব্যবহার করা যাবে আর কতটুকু যাবে না, সেটির সীমানা থাকতে হবে। মোটকথা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে শক্ত আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০২১ সালের নভেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে 'এথিকস অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনুমোদন করে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ঝুঁকি হ্রাস করাই ইউনেস্কোর এই বৈশ্বিক কাঠামোর লক্ষ্য। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ যাতে তাদের পলিসি ও প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেজন্যই ইউনেস্কো 'রেডিনেস অ্যাসেসম্যান্ট মেথোডলজি' তৈরি করেছে। নৈতিক এআই অনুশীলনের ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রস্তুতি নির্ধারণ করা হয় এই র‍্যামের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর ওই র‍্যামে যুক্ত হয়। সেটিতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা হয়। বাস্তবায়ন হয়নি সেটি। পতনের আগে শেখ হাসিনার সরকারও এআইয়ের একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছিল। সেটিও খসড়াতেই থেকে যায়।

এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও বৈচিত্রের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রণীত আইন ও নীতিমালা যদ্দুর সম্ভব বাস্তবায়নও করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এআই আক্টের মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাকে আলাদা শ্রেণিভুক্ত করে নির্দিষ্ট নীতিমালায় বেঁধে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে স্বতন্ত্র আইন। এছাড়া এআই সম্পর্কিত আইনের ধারা বা বিধানও রয়েছে দেশটিতে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আইন হলো 'ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইনিশিয়েটিভ অ্যাক্ট, ২০২০, এআই ইন গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট এবং অ্যাডভান্সিং অ্যামেরিকান এআই অ্যাক্ট'। যুক্তরাষ্ট্রের ১১৭তম কংগ্রেসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত কমপক্ষে ৭৫টি বিল উত্থাপন হয়। যার মধ্যে আইনে পরিণত করা হয় ছয়টিকে। কানাডায় এআই এবং ডেটা অ্যাক্ট দুটোই রয়েছে। ভারত ২০১৮ সালেই 'ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' নামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক এআই ব্যবহারের কৌশলপত্র করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতও এআই নিয়ে কৌশলনীতি করেছে। চীন তো অ্যালগরিদমের ব্যবহারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছে যেন তা রাষ্ট্রবিরোধী বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে ব্যবহার না হয়। এসব দেশের সাথে তুলনা করলে আইন বা বিধিবিধানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। গুরুত্ব যখন অনুভব করেছে, তখন নীতি, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও নিশ্চয়ই সম্ভব হবে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এখানে প্রাসঙ্গিক। সেইসাথে সমন্বিত পরিকল্পনাও আবশ্যক। বিদ্যমান যেসব আইন রয়েছে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হলেও এ অভিযাত্রার সফল যাত্রী হতে পারবে বাংলাদেশ। সেইসাথে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ তৈরি ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

নতুন টানাপড়েনে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা

বিশেষ প্রতিনিধি
নতুন টানাপড়েনে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা
এআই দিয়ে বানানো ছবি

প্রতিটি ফিফা বিশ্বকাপই ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশকে উৎসবের এক মিলনমেলায় পরিণত করে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন বা জার্মানির পতাকায় ভরে ওঠে দেশের সড়ক ও অলিগলি। এসব পতাকা কখনোই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক ছিল না। প্রিয় ফুটবল দলের পতাকা টানানো ছিল খেলার প্রতি ভালোবাসা যা শ্রেণি, ধর্ম ও মতাদর্শের বিভেদ পেরিয়ে দেশের সব মানুষকে এক করেছে।

তবে এবারের বিশ্বকাপে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন ছিল। অনেক জায়গায় ফুটবল দলের পতাকার বদলে দেখা গেছে ধর্মীয় পতাকা। দেশের কিছু এলাকায় সংগঠিতভাবে ফুটবলের বিরুদ্ধে বিশেষ করে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে প্রচারণাও চালানো হয়েছে। আলাদাভাবে দেখলে এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। আর সেটি হল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিচয় কি ক্রমেই আরও বেশি চাপে পড়ছে? 

দেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ ক্রমেই জনগণের আলোচনায় বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ভারতবিরোধী বক্তব্যও এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ভারতের নীতির সমালোচনা গণতান্ত্রিক বিতর্কের স্বাভাবিক অংশ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক ভারতবিরোধী প্রচারণা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব তৈরি করেছে। একটি মহল বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘হিন্দুয়ানী’ হিসেবে তুলে ধরছে এবং মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে প্রচার করছে। এ ধরনের বয়ান সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক সংস্কৃতিকেও দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পহেলা বৈশাখসহ বড় জাতীয় উৎসব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মূল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। সমালোচকদের মতে সরকারি আয়োজন হলেও বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসরকে ভয়ভীতি, ভাঙচুর এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আদর্শিক প্রচারণা থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রকে যথেষ্ট কার্যকর মনে হয়নি।

এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা প্রতীকের ওপর হামলার ঘটনায়। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, ম্যুরাল, জাদুঘর এবং দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ ভাঙচুর ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু স্থাপনা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকদের মতে এগুলো একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর এমন আঘাত, যে জাতি অসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

এই চাপ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়েছে। ছায়ানট ও উদীচী বাংলা গান, সাহিত্য এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চাকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে নেওয়া দু’টি সংগঠন। অতীতেও প্রতিষ্ঠান দুইটি উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও এদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ধারাবাহিক প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা শিল্প—সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক চর্চার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে, জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করার বারবার চেষ্টা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মেয়েদের ফুটবল টুর্নামেন্টের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা এবং নারীদের পোশাক ও আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি ও সমালোচনামূলক প্রচার আরও রক্ষণশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন সমালোচকরা। অন্যদিকে, সুফি দরগাহ এবং লোকজ ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারাই বাংলাদেশের সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এসব ঘটনার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি থেকে সরে যাচ্ছে। 

তবে এসব ঘটনা পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। এই বিষয়গুলো দেখবাল করার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজ-সবারই দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য রক্ষায় ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষাকে কখনোই একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা অন্য একটি দলের বিরোধিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয় যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং সমান নাগরিক অধিকারের আদর্শকে ভিত্তি করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। এই আদর্শগুলো এখনো দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই এখন আর যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। এই লড়াই চলছে শ্রেণিকক্ষে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে, জনপরিসরে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। 

বাংলাদেশ যদি বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার হাত থেকে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু স্মৃতিস্তম্ভ বা ঐতিহ্যই নয়, বরং স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে দেওয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বীমা খাতে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী (জুয়েল)

অনলাইন ডেস্ক
বীমা খাতে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

দেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিধি বিস্তৃত ও নগরায়ণ ত্বরান্বিত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সাধারণত বীমা শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশে সে চিত্র স্পষ্ট নয়। অর্থনীতির আকার বাড়লেও বীমা খাতের বিস্তার সে হারে বাড়েনি। বরং জিডিপির তুলনায় বীমার অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে। এ খাতে সম্ভাবনার অভাব নেই; বরং ঘাটতি রয়েছে আস্থা, পণ্যের বৈচিত্র্য, কার্যকর বিতরণব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের। ফলে যে খাতটি আর্থিক নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হওয়ার কথা, সেটিই এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে আটকে আছে।

অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু বীমার প্রসার নয় : দেশের বীমাবাজার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির সম্প্রসারণের তুলনায় ধীর। ২০২৩ সালে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জীবন প্রিমিয়াম ছিল ১২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে প্রায় ৭ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যা দেশের নামমাত্র জিডিপির ০.৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, বীমা খাত তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে পারছে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম অনুপ্রবেশ : বীমা শিল্পের উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম সূচক ইনস্যুরেন্স পেনিট্রেশন বা জিডিপির তুলনায় মোট বীমা প্রিমিয়ামের অনুপাত। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। সুইস রি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বীমা অনুপ্রবেশ হার ছিল মাত্র ০.৫০ শতাংশ। আর বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ০.৩৩ শতাংশে। তুলনামূলকভাবে ভারতে এই হার প্রায় ৪ শতাংশ। ভিয়েতনামে ২ শতাংশের বেশি। পাকিস্তানে প্রায় ১ শতাংশ। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ১ শতাংশের বেশি। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো অর্থনীতিতে এটি ৪ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০০৩ সালে বাংলাদেশের বীমা অনুপ্রবেশ ছিল প্রায় ০.৫৭ শতাংশ। দুই দশক পরও সেই অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি; বরং কিছু সূচকে অবনতি হয়েছে। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা তাদের বীমা বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে। বাজারের বড় অংশ জীবন বীমার কিন্তু সুরক্ষামূলক বীমা এখনো দুর্বল। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫টি জীবন বীমা এবং ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে জীবন বীমা থেকে এবং ৩০ শতাংশ সাধারণ বীমা থেকে। তবে এখানেও বৈপরীত্য রয়েছে। জীবনের বড় অংশই আসে সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্য থেকে। প্রকৃত ঝুঁকি সুরক্ষা বা প্রটেকশন প্রডাক্টস যেমন টার্ম লাইফ, স্বাস্থ্য বীমা কিংবা আয় সুরক্ষাবাজার এখনো সীমিত। অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাত মূলত মোটর, মেরিন ও করপোরেট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। খুচরা স্বাস্থ্য বীমা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বীমা কিংবা পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা পণ্যের বিস্তার খুবই কম। ফলে বীমা এখনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারেনি।

কারণ বাংলাদেশে বেশির ভাগ জীবন বীমা পলিসি খুব সাধারণ ও গতানুগতিক। উন্নত দেশগুলোর মতো স্বাস্থ্যবীমা, জটিল রোগ, কিংবা পেনশন প্ল্যানের মতো আধুনিক ও দরকারি পলিসি বাড়াতে হবে। এই খাতে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সঠিক প্রিমিয়াম নির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত ও যোগ্য অ্যাকচুয়ারি তৈরি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং বা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পেশাদারি বাড়াতে হবে।

সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করছে জনমিতিক পরিবর্তন : যেখানে বর্তমান চিত্র হতাশাজনক, সেখানেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখছেন দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। প্রতিবছর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অর্থ হলো আগামী বছরগুলোতে অবসর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ব্যয়, সম্পদ সুরক্ষা, শিক্ষা তহবিল এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের চাহিদা আরো বাড়বে।

আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা : বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকটকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন বিশ্বাসের ঘাটতি হিসেবে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক কোম্পানির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে। সীমিত প্রিমিয়াম আয়ের বাজারে এত বেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক সক্ষমতা ও সেবার মানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। বাজার সম্প্রসারণের আগে বিদ্যমান গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

নিয়ন্ত্রকের সামনে সংস্কারের বড় চ্যালেঞ্জ : সাম্প্রতিক সময়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনাদায়ী দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ, আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ। নতুন নেতৃত্বও গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার বীমা দাবি নিষ্পত্তিকে খাত পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন সম্ভাবনার নাম ব্যাংকাস্যুরেন্স : বাংলাদেশে বীমা বিক্রির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে ব্যাংকাস্যুরেন্স। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০৭টি বীমা পলিসি বিক্রি হয়েছে। এসব পলিসির আওতায় বীমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১৪৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং সংগৃহীত প্রিমিয়াম ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো কমিশন আয় করেছে প্রায় ১ কোটি টাকা। পরিমাণ এখনো খুব বড় না হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিংব্যবস্থার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বীমাকে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে বীমা ব্যবসা : বিশ্বব্যাপী বীমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে অনলাইন পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং স্বয়ংক্রিয় দাবি নিষ্পত্তির ব্যবহার বাড়ছে। এআই ভবিষ্যতে ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পণ্য নকশা এবং দ্রুত গ্রাহকসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জনই শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ধারণ করবে।

সামনে কোন পথ? বাংলাদেশের বীমা খাত এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক বড়। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতি, তরুণ জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্তের বিস্তার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি খাতটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে অনুপ্রবেশ হার, গ্রাহক আস্থা, পণ্যের সীমাবদ্ধতা এবং সুশাসনের ঘাটতি সেই সম্ভাবনা আটকে রেখেছে। আগামী দশকে দেশের বীমা শিল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন পলিসি বিক্রির ওপর নয়; বরং দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভাবনী পণ্য, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং সর্বোপরি মানুষের বিশ্বাস অর্জনের ওপর। কারণ বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় মূলধন প্রিমিয়াম নয়, আস্থা।

অর্থনীতির আকার যত দ্রুত বেড়েছে, বীমা খাতের বিস্তার ততটা হয়নি। জিডিপির তুলনায় বীমা অনুপ্রবেশ এখনো বিশ্বের নিম্নতম পর্যায়ের একটি। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় যে ভূমিকা থাকার কথা, তা এখনো সীমিত।

কেন পিছিয়ে আছে বীমা খাত? : বাংলাদেশে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা মূলধনের অভাব নয়, বরং আস্থার সংকট। অনেক গ্রাহক দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার কারণে অনীহা তৈরি করেছেন। একটি শিল্পের প্রতি জন-আস্থা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠন করতে অনেক সময় লাগে।

পণ্যে বৈচিত্র্যের ঘাটতি : বাংলাদেশের জীবন বীমা বাজার এখনো প্রধানত সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আধুনিক বিশ্বে মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি সুরক্ষা। স্বাস্থ্য বীমা, ক্যানসার ও জটিল রোগের কভারেজ, আয় সুরক্ষা, অবসরভাতা (পেনশন) পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার এবং পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা পণ্যের চাহিদা আগামী দশকে দ্রুত বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষি ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্যও নতুন ধরনের বীমা পণ্য প্রয়োজন।

দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর লাখ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বীমা শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করছে। আজকের তরুণ পেশাজীবীরা ভবিষ্যতে বাড়ি কিনবেন, পরিবার গড়বেন, সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করবেন এবং অবসর পরিকল্পনা করবেন। এই প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন রয়েছে বীমার। ফলে সঠিক পণ্য ও কার্যকর বিপণন কৌশল থাকলে বাংলাদেশের বীমা বাজার আগামী এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রযুক্তি হবে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি : বিশ্বজুড়ে বীমা শিল্প দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল আন্ডাররাইটিং এবং স্বয়ংক্রিয় দাবি নিষ্পত্তি গ্রাহকসেবার মান পরিবর্তন করছে। বাংলাদেশেও অনলাইন পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম সংগ্রহ, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং ই-কেয়াইসি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বীমা পণ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যাংকাস্যুরেন্সও দেশের বীমা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দেশের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে লাখো নতুন গ্রাহকের কাছে বীমা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তবে এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে গ্রাহকের প্রয়োজনভিত্তিক পরামর্শ, স্বচ্ছ বিক্রয় প্রক্রিয়া এবং বিক্রয়ের পর মানসম্মত সেবার ওপর।

নিয়ন্ত্রকের করণীয় : শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

প্রাধান্য পাওয়া উচিত-

১. অনাদায়ী দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি; ২. ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বাস্তবায়ন; ৩. করপোরেট গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী করা; ৪. আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন; ৫. অ্যাকচুয়ারিয়াল দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; ৬. গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা চালু করা; ৭. ডিজিটাল রূপান্তরকে উৎসাহ দেওয়া।

লেখক : এমডি জেসিএক্স গ্রুপ ও উদ্যোক্তা বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স