উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র—এ দুটি ধারণা পরস্পরের পরিপূরক। একটি রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি-নির্ধারণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তৃণমূল পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি স্বাধীন, কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে এক ধরনের তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেন্দ্রীয় রাজনীতির, বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যের যাঁতাকলে পিষ্ট। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে—স্থানীয় সরকারকে পঙ্গু করে এবং এমপিদের সর্বব্যাপী প্রভাব বজায় রেখে আদৌ কি টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা। একটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের চাহিদা সবচেয়ে ভালো বোঝেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো—জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ—স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে বন্টিত হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্য এবং অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের।
বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে আইনপ্রণেতা তথা সংসদ সদস্যদের প্রশাসনিক কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। আইনপ্রণেতাদের মূল দায়িত্ব জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশে এমপিরা স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, ইজারা, প্রশাসনিক বদলি থেকে শুরু করে একদম ছোটখাটো সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করেন।
আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদে এমপিদের ‘উপদেষ্টা’ ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এই আস্কারা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসনে এক ধরনের অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছে—এমপির ইশারা ছাড়া কিছুই হবে না। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিছক ঠুঁটো জগন্নাথ বা রাজনৈতিক অনুঘটে পরিণত হয়েছেন। প্রশাসন ও পুলিশ অনেক সময় ক্ষমতার দাপটের সামনে দেখেও না দেখার ভান করে, যা স্থানীয় সুশাসনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
এমপিদের এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। হাটবাজার, বালুমহাল, জলমহাল কিংবা পরিবহনের ইজারা প্রক্রিয়ায় কোনো উন্মুক্ত ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা হতে দেওয়া হয় না। এমপির পছন্দের লোক বা তাদের গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের হাতে নামমাত্র মূল্যে এসব রাজস্ব আয়ের উৎস তুলে দেওয়া হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার একটি গরুর হাটের কথা। ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে যে হাটটি প্রায় পৌনে চার কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালের কোরবানির ঈদে রাজনৈতিক প্রভাব ও ইশারায় সেই একই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র এক কোটি টাকার কিছু বেশিতে। অর্থাৎ, মাত্র একটি হাটের ইজারাতেই সরকার প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
দেশজুড়ে হাজার হাজার হাটবাজার, বালুমহাল ও জলমহালে প্রতিদিন এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। উন্মুক্ত দরপত্রের তোয়াক্কা না করে দলীয় প্রভাব ও এমপির আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার এই অলিখিত সংস্কৃতির কারণে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব লোপাট হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।
যুগ যুগ ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি এক মারাত্মক ব্যাধি বা সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল যখন যেই থাকুক, এমপিদের ছত্রছায়ায় এলাকায় কিছু কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও ক্যাডার বাহিনী গড়ে ওঠে। তারা যা বলে, সেটাই যেন স্থানীয় আইনে পরিণত হয়। আইনি শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে টেন্ডারবাজি, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং সরকারি সম্পত্তি দখলের মহোৎসব চলে।
এই গভীর সংকট সমাধানের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্য। বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিতে বিচার করলে, এককভাবে কোনো সরকারের পক্ষে বা সরকারপ্রধানের পক্ষে রাতারাতি এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ চাঁদাবাজি কেবল কোনো নির্দিষ্ট একক দলের বলয়ে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবনতির কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। চাঁদাবাজির ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এটি যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে—তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
এই চরম সংকট থেকে উত্তরণ পেতে এবং স্থানীয় সরকারকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি :
১. রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রকাশ্যে, রশিদের মাধ্যমে ও আইনগত কাঠামো মেনে চাঁদা বা ফান্ড সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও গোপনে চাঁদা বা তোলাবাজির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আইন করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো যাতে গোপনে বা বলপ্রয়োগ করে টাকা না তুলে, বৈধভাবে রশিদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে সাহায্য বা চাঁদা গ্রহণ করতে পারে—তা আইনগতভাবে মঞ্জুর করা দরকার।
২. চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন স্বয়ং সরকারপ্রধান। সরকারপ্রধান (যেমন বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনাব তারেক রহমান)-কে স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিতে হবে। সরকার যদি একটি কঠোর ঐতিহাসিক ঘোষণা জারি করে যে—'কোনো এমপি বা তার সংসদীয় এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দখলবাজির সত্যতা গণমাধ্যমে কিংবা তদন্তে প্রমাণিত হলে, তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট এমপিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং আইনগত তদন্তের মাধ্যমে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হবে।'
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন একটি কঠোর নীতি ও তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দেশে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির পরিমাণ বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
পরিশেষে বলতে চাই, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বিক ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত। এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন, স্থানীয় শাসনের ওপর ছড়ি ঘোরানো নয়। জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আত্মনির্ভরশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
সরকারের যদি প্রকৃত সদিচ্ছা থাকে, তবে অবিলম্বে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার আনা সম্ভব। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই কেবল বাংলাদেশে প্রকৃত সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সুষম টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক




