• ই-পেপার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উন্নয়নের নিশানা

নতুন টানাপড়েনে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা

বিশেষ প্রতিনিধি
নতুন টানাপড়েনে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা
এআই দিয়ে বানানো ছবি

প্রতিটি ফিফা বিশ্বকাপই ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশকে উৎসবের এক মিলনমেলায় পরিণত করে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন বা জার্মানির পতাকায় ভরে ওঠে দেশের সড়ক ও অলিগলি। এসব পতাকা কখনোই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক ছিল না। প্রিয় ফুটবল দলের পতাকা টানানো ছিল খেলার প্রতি ভালোবাসা যা শ্রেণি, ধর্ম ও মতাদর্শের বিভেদ পেরিয়ে দেশের সব মানুষকে এক করেছে।

তবে এবারের বিশ্বকাপে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন ছিল। অনেক জায়গায় ফুটবল দলের পতাকার বদলে দেখা গেছে ধর্মীয় পতাকা। দেশের কিছু এলাকায় সংগঠিতভাবে ফুটবলের বিরুদ্ধে বিশেষ করে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে প্রচারণাও চালানো হয়েছে। আলাদাভাবে দেখলে এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। আর সেটি হল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিচয় কি ক্রমেই আরও বেশি চাপে পড়ছে? 

দেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ ক্রমেই জনগণের আলোচনায় বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ভারতবিরোধী বক্তব্যও এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ভারতের নীতির সমালোচনা গণতান্ত্রিক বিতর্কের স্বাভাবিক অংশ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক ভারতবিরোধী প্রচারণা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব তৈরি করেছে। একটি মহল বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘হিন্দুয়ানী’ হিসেবে তুলে ধরছে এবং মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে প্রচার করছে। এ ধরনের বয়ান সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক সংস্কৃতিকেও দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পহেলা বৈশাখসহ বড় জাতীয় উৎসব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মূল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। সমালোচকদের মতে সরকারি আয়োজন হলেও বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসরকে ভয়ভীতি, ভাঙচুর এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আদর্শিক প্রচারণা থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রকে যথেষ্ট কার্যকর মনে হয়নি।

এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা প্রতীকের ওপর হামলার ঘটনায়। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, ম্যুরাল, জাদুঘর এবং দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ ভাঙচুর ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু স্থাপনা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকদের মতে এগুলো একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর এমন আঘাত, যে জাতি অসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

এই চাপ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়েছে। ছায়ানট ও উদীচী বাংলা গান, সাহিত্য এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চাকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে নেওয়া দু’টি সংগঠন। অতীতেও প্রতিষ্ঠান দুইটি উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও এদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ধারাবাহিক প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা শিল্প—সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক চর্চার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে, জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করার বারবার চেষ্টা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মেয়েদের ফুটবল টুর্নামেন্টের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা এবং নারীদের পোশাক ও আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি ও সমালোচনামূলক প্রচার আরও রক্ষণশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন সমালোচকরা। অন্যদিকে, সুফি দরগাহ এবং লোকজ ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারাই বাংলাদেশের সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এসব ঘটনার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি থেকে সরে যাচ্ছে। 

তবে এসব ঘটনা পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। এই বিষয়গুলো দেখবাল করার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজ-সবারই দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য রক্ষায় ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষাকে কখনোই একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা অন্য একটি দলের বিরোধিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয় যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং সমান নাগরিক অধিকারের আদর্শকে ভিত্তি করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। এই আদর্শগুলো এখনো দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই এখন আর যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। এই লড়াই চলছে শ্রেণিকক্ষে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে, জনপরিসরে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। 

বাংলাদেশ যদি বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার হাত থেকে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু স্মৃতিস্তম্ভ বা ঐতিহ্যই নয়, বরং স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে দেওয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বীমা খাতে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী (জুয়েল)

অনলাইন ডেস্ক
বীমা খাতে আস্থা ফেরানোই চ্যালেঞ্জ

দেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিধি বিস্তৃত ও নগরায়ণ ত্বরান্বিত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সাধারণত বীমা শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশে সে চিত্র স্পষ্ট নয়। অর্থনীতির আকার বাড়লেও বীমা খাতের বিস্তার সে হারে বাড়েনি। বরং জিডিপির তুলনায় বীমার অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে। এ খাতে সম্ভাবনার অভাব নেই; বরং ঘাটতি রয়েছে আস্থা, পণ্যের বৈচিত্র্য, কার্যকর বিতরণব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের। ফলে যে খাতটি আর্থিক নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হওয়ার কথা, সেটিই এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে আটকে আছে।

অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু বীমার প্রসার নয় : দেশের বীমাবাজার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির সম্প্রসারণের তুলনায় ধীর। ২০২৩ সালে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জীবন প্রিমিয়াম ছিল ১২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকায় পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে প্রায় ৭ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যা দেশের নামমাত্র জিডিপির ০.৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, বীমা খাত তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে পারছে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম অনুপ্রবেশ : বীমা শিল্পের উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম সূচক ইনস্যুরেন্স পেনিট্রেশন বা জিডিপির তুলনায় মোট বীমা প্রিমিয়ামের অনুপাত। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। সুইস রি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের বীমা অনুপ্রবেশ হার ছিল মাত্র ০.৫০ শতাংশ। আর বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ০.৩৩ শতাংশে। তুলনামূলকভাবে ভারতে এই হার প্রায় ৪ শতাংশ। ভিয়েতনামে ২ শতাংশের বেশি। পাকিস্তানে প্রায় ১ শতাংশ। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ১ শতাংশের বেশি। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো অর্থনীতিতে এটি ৪ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০০৩ সালে বাংলাদেশের বীমা অনুপ্রবেশ ছিল প্রায় ০.৫৭ শতাংশ। দুই দশক পরও সেই অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি; বরং কিছু সূচকে অবনতি হয়েছে। একই সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা তাদের বীমা বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে। বাজারের বড় অংশ জীবন বীমার কিন্তু সুরক্ষামূলক বীমা এখনো দুর্বল। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫টি জীবন বীমা এবং ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে জীবন বীমা থেকে এবং ৩০ শতাংশ সাধারণ বীমা থেকে। তবে এখানেও বৈপরীত্য রয়েছে। জীবনের বড় অংশই আসে সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্য থেকে। প্রকৃত ঝুঁকি সুরক্ষা বা প্রটেকশন প্রডাক্টস যেমন টার্ম লাইফ, স্বাস্থ্য বীমা কিংবা আয় সুরক্ষাবাজার এখনো সীমিত। অন্যদিকে সাধারণ বীমা খাত মূলত মোটর, মেরিন ও করপোরেট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। খুচরা স্বাস্থ্য বীমা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বীমা কিংবা পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা পণ্যের বিস্তার খুবই কম। ফলে বীমা এখনো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারেনি।

কারণ বাংলাদেশে বেশির ভাগ জীবন বীমা পলিসি খুব সাধারণ ও গতানুগতিক। উন্নত দেশগুলোর মতো স্বাস্থ্যবীমা, জটিল রোগ, কিংবা পেনশন প্ল্যানের মতো আধুনিক ও দরকারি পলিসি বাড়াতে হবে। এই খাতে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সঠিক প্রিমিয়াম নির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত ও যোগ্য অ্যাকচুয়ারি তৈরি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং বা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পেশাদারি বাড়াতে হবে।

সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করছে জনমিতিক পরিবর্তন : যেখানে বর্তমান চিত্র হতাশাজনক, সেখানেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখছেন দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। প্রতিবছর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অর্থ হলো আগামী বছরগুলোতে অবসর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ব্যয়, সম্পদ সুরক্ষা, শিক্ষা তহবিল এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের চাহিদা আরো বাড়বে।

আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা : বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকটকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন বিশ্বাসের ঘাটতি হিসেবে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক কোম্পানির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে। সীমিত প্রিমিয়াম আয়ের বাজারে এত বেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক সক্ষমতা ও সেবার মানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। বাজার সম্প্রসারণের আগে বিদ্যমান গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

নিয়ন্ত্রকের সামনে সংস্কারের বড় চ্যালেঞ্জ : সাম্প্রতিক সময়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনাদায়ী দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ, আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ। নতুন নেতৃত্বও গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার বীমা দাবি নিষ্পত্তিকে খাত পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন সম্ভাবনার নাম ব্যাংকাস্যুরেন্স : বাংলাদেশে বীমা বিক্রির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে ব্যাংকাস্যুরেন্স। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০৭টি বীমা পলিসি বিক্রি হয়েছে। এসব পলিসির আওতায় বীমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১৪৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং সংগৃহীত প্রিমিয়াম ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো কমিশন আয় করেছে প্রায় ১ কোটি টাকা। পরিমাণ এখনো খুব বড় না হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিংব্যবস্থার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বীমাকে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে বীমা ব্যবসা : বিশ্বব্যাপী বীমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে অনলাইন পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং স্বয়ংক্রিয় দাবি নিষ্পত্তির ব্যবহার বাড়ছে। এআই ভবিষ্যতে ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পণ্য নকশা এবং দ্রুত গ্রাহকসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জনই শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ধারণ করবে।

সামনে কোন পথ? বাংলাদেশের বীমা খাত এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান এখনো অনেক বড়। একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতি, তরুণ জনগোষ্ঠী, মধ্যবিত্তের বিস্তার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি খাতটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে অনুপ্রবেশ হার, গ্রাহক আস্থা, পণ্যের সীমাবদ্ধতা এবং সুশাসনের ঘাটতি সেই সম্ভাবনা আটকে রেখেছে। আগামী দশকে দেশের বীমা শিল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন পলিসি বিক্রির ওপর নয়; বরং দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভাবনী পণ্য, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং সর্বোপরি মানুষের বিশ্বাস অর্জনের ওপর। কারণ বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় মূলধন প্রিমিয়াম নয়, আস্থা।

অর্থনীতির আকার যত দ্রুত বেড়েছে, বীমা খাতের বিস্তার ততটা হয়নি। জিডিপির তুলনায় বীমা অনুপ্রবেশ এখনো বিশ্বের নিম্নতম পর্যায়ের একটি। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় যে ভূমিকা থাকার কথা, তা এখনো সীমিত।

কেন পিছিয়ে আছে বীমা খাত? : বাংলাদেশে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা মূলধনের অভাব নয়, বরং আস্থার সংকট। অনেক গ্রাহক দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার কারণে অনীহা তৈরি করেছেন। একটি শিল্পের প্রতি জন-আস্থা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠন করতে অনেক সময় লাগে।

পণ্যে বৈচিত্র্যের ঘাটতি : বাংলাদেশের জীবন বীমা বাজার এখনো প্রধানত সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আধুনিক বিশ্বে মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি সুরক্ষা। স্বাস্থ্য বীমা, ক্যানসার ও জটিল রোগের কভারেজ, আয় সুরক্ষা, অবসরভাতা (পেনশন) পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার এবং পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা পণ্যের চাহিদা আগামী দশকে দ্রুত বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষি ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্যও নতুন ধরনের বীমা পণ্য প্রয়োজন।

দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর লাখ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বীমা শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করছে। আজকের তরুণ পেশাজীবীরা ভবিষ্যতে বাড়ি কিনবেন, পরিবার গড়বেন, সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করবেন এবং অবসর পরিকল্পনা করবেন। এই প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন রয়েছে বীমার। ফলে সঠিক পণ্য ও কার্যকর বিপণন কৌশল থাকলে বাংলাদেশের বীমা বাজার আগামী এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রযুক্তি হবে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি : বিশ্বজুড়ে বীমা শিল্প দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল আন্ডাররাইটিং এবং স্বয়ংক্রিয় দাবি নিষ্পত্তি গ্রাহকসেবার মান পরিবর্তন করছে। বাংলাদেশেও অনলাইন পলিসি, ডিজিটাল প্রিমিয়াম সংগ্রহ, মোবাইলভিত্তিক সেবা এবং ই-কেয়াইসি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বীমা পণ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যাংকাস্যুরেন্সও দেশের বীমা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দেশের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচে লাখো নতুন গ্রাহকের কাছে বীমা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তবে এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে গ্রাহকের প্রয়োজনভিত্তিক পরামর্শ, স্বচ্ছ বিক্রয় প্রক্রিয়া এবং বিক্রয়ের পর মানসম্মত সেবার ওপর।

নিয়ন্ত্রকের করণীয় : শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

প্রাধান্য পাওয়া উচিত-

১. অনাদায়ী দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি; ২. ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বাস্তবায়ন; ৩. করপোরেট গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী করা; ৪. আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন; ৫. অ্যাকচুয়ারিয়াল দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; ৬. গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা চালু করা; ৭. ডিজিটাল রূপান্তরকে উৎসাহ দেওয়া।

লেখক : এমডি জেসিএক্স গ্রুপ ও উদ্যোক্তা বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা

এ এইচ এম ফারুক
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা : প্রয়োজন জিয়া ও খালেদা সরকারের মতো দৃঢ়তা
এ এইচ এম ফারুক। ছবি : সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ক্ষত। গত এক দশকে এটি কেবল মানবিক বিপর্যয় হয়ে থাকেনি। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য এক বহুমাত্রিক হুমকি। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েছেন। এর পরপরই মিয়ানমারের জান্তা প্রধান জেনারেল (অব.) মিন অং হ্লাইং ‘বেসামরিক’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একই সঙ্গে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ভূ-রাজনৈতিক মাত্রাকে বদলে দিয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রথাগত ও মন্থর কূটনীতি পরিহার করা জরুরি। এখন ‘হার্ড পাওয়ার’ ও ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’র সমন্বয় ঘটানো সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন তথা সাবেক আরাকান রাজ্যের কোনো বহিরাগত জনগোষ্ঠী নয়। তারা ওই ভূমিরই আদি সন্তান। অষ্টম শতাব্দী থেকে আরাকানের উপকূলে যে মানববসতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকেই এই জাতিসত্তার বিকাশ। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত স্বাধীন আরাকানে মুসলিম ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনন্য সহাবস্থান ছিল। 

রাজদরবারে বাংলা ও ফারসি সাহিত্যের চর্চা হতো। মহাকবি আলাওল ও মাগন ঠাকুরের মতো মনীষীরা সেখানে স্থান পেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের অন্যতম জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। 

১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত তারা পার্লামেন্ট সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোডাওপায়া কর্তৃক স্বাধীন আরাকান দখলের পর থেকে নিগ্রহের সূচনা হয়। এর চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে। এই আইনের ফলে প্রাচীন জনগোষ্ঠীটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘রাষ্ট্রহীন’ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, যখনই ক্ষমতায় জাতীয়তাবাদী শক্তি থেকেছে, তখনই মিয়ানমারের উসকানি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’-এর নামে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালায়। তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথাগত মিনতির কূটনীতিতে যাননি। তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করেন। অন্যদিকে সীমান্তে সামরিক ও কৌশলগত দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। ফলে যুদ্ধবাজ মিয়ানমার সরকার অনমনীয় অবস্থানের মুখে নতি স্বীকার করে। তারা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সসম্মানে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে ১৯৯১-৯২ সালেও মিয়ানমার পুনরায় সীমান্ত আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়। তৎকালীন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার একই ধরনের বলিষ্ঠ ও প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করে। সফল প্রত্যাবাসন ফ্রেমওয়ার্ক নিশ্চিত করে। ২০০১-২০০৬ আমলেও সীমান্ত উত্তেজনা ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের যেকোনো চেষ্টাকে কঠোর অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছিল।

বিপরীতভাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশক আওয়ামী সরকারের আমলে চরম কৌশলগত বিভ্রান্তি লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে বর্বর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের ‘ভাবমূর্তি’ ও রাজনৈতিক প্রচারণাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।

‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাব অর্জনের সস্তা আবেগে কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি বা টেকসই শর্ত ছাড়াই সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়। প্রায় ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতে সরকার চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে। যার খেসারত হিসেবে আজ কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অঞ্চলে জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটা ভূমিকা ছিল। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের ইফতারের টেবিলে নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ছাড়া এই অঞ্চলের শান্তি অধরাই থেকে যাবে। সেই মাহফিলে ড. ইউনূস রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘আগামী ঈদ আপনারা নিজ দেশে করবেন।’

শান্তিতে নোবেলজয়ী একজন বিশ্ববরেণ্য নেতার মুখে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক মহলে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে মাঠের বাস্তবতায় এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটি নিছক একটি অলীক কূটনৈতিক আশ্বাস বা ‘বাত কা বাত’ হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।

ড. ইউনূস সরকার বিশ্ববিবেকের সামনে বিষয়টিকে তুলে ধরলেও কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে পারেনি। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে তারা ব্যর্থ হয়। যার ফলে তার দেওয়া সেই বড় ওয়াদা আজ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী চরম হতাশায় নিমজ্জিত রয়েছেন।

২০১৫ সালের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। স্থানীয় মগ সম্প্রদায়ের সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’ মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। জান্তা বাহিনীকে পরাজিত করে তারা রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। সেখানে কার্যত একটি আলাদা সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহীদের মধ্যকার এই তুমুল লড়াইয়ের সময়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কৌশলগত সুযোগ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। জান্তা বাহিনী যখন সীমান্ত ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিল, তখন বাংলাদেশ শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করতে পারত।

সীমান্তের ওপারে নিজের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কিংবা ‘বাফার জোন’ তৈরির উদ্যোগ নিলে আজ সংকটের চিত্র ভিন্ন হতো। রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক আরাকান আর্মির সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকলেও, রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো জান্তার মতোই চরম বর্ণবাদী।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বার্মিজ মগদের আরাকান আর্মির অপতৎপরতা বাংলাদেশের জন্য নানাভাবে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মগ বা মারমাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের আরাকান আর্মিতে রিক্রুটের ভয়াবহ তথ্য উঠে আসছে।

বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, এই রিক্রুটমেন্টের ফলে আমাদের সীমান্ত নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি আরাকান আর্মির মাদককারবার পরিচালনা এবং কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি আরও বিপজ্জনক। তারা বাংলাদেশে মাদক পাচারের জন্য নতুন রোড ও সিন্ডিকেট তৈরি করছে। এই অপতৎপরতা বাংলাদেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল একটি শরণার্থী বা মানবিক সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সঙ্গে যুগ্মভাবে এক নম্বর ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট’ বা জাতীয় নিরাপত্তার প্রধানতম ঝুঁকি। উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ, অস্ত্র চোরাচালান ও মাদক পাচারের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার চলমান গোলাগুলি ও সীমান্ত উত্তেজনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ওপার থেকে আসা গোলা আমাদের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর পাশাপাশি রয়েছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ইউক্রেন, ফিলিস্তিন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকটের দিকে সরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক তহবিল দিন দিন সংকুচিত হয়ে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ৮ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিধন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের আশঙ্কাজনক পতনের ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।

এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কেবল সুবিধাই দিচ্ছে। তাই সময় এসেছে ঘরের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তিকে এক টেবিলে বসে একটি ‘জাতীয় ঐক্য সনদ’ তৈরি করার। এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থানে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। একই সঙ্গে, প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষ রোহিঙ্গা কমিশন’ বা ডেডিকেটেড টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগ ঘটাতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ডেস্কের বাইরে গিয়ে চীন ও ভারতের মতো প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে কাজে লাগাতে হবে। ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি বা সরাসরি মাঠপর্যায়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষির পথ উন্মুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে নতুন নেতৃত্ব আসা মানেই একটি ‘ক্লিন স্লেট’ বা নতুন করে সাহসী কৌশল গ্রহণের সুযোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐতিহাসিক দৃঢ়তাকে পুঁজি করে বাংলাদেশ যদি তার বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে পারে, তবেই এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো উসকানিকে বাংলাদেশ আর বরদাশত করবে না—এই কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং-এর কাছে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তদারকিতে রাখাইনের অভ্যন্তরে সেফ জোন বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরির কার্যকর গ্যারান্টি আদায় করতে হবে। আরাকান আর্মির রিক্রুটমেন্ট ও মাদক সিন্ডিকেটের মতো অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কেবল মৌখিক সহমর্মিতা বা অতীতের ফাঁকা আশ্বাস নয়, রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিশ্ববিবেকের জাগ্রত ভূমিকার সঙ্গে বাংলাদেশের এই বলীয়ান পদক্ষেপই হোক এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তির রক্ষাকবচ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
(পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)

উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

জিল্লুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক
উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

প্রতিশ্রুতি, প্রতিষ্ঠান, প্রজন্ম ও একটি অনন্ত শূন্যতা

একটি সপ্তাহে কখনো এমন কিছু ঘটনা পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, যাদের মধ্যে প্রথম দেখায় কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিকে দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে পাকিস্তানের তথাকথিত সেফ সিটি মডেল অনুসরণের আগ্রহ; একদিকে আড়িপাতা, বাগিং ডিভাইস এবং সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোকে ঘিরে উদ্বেগ, অন্যদিকে আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বেদনা—আমার কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। বিষয় চারটি আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় এসে তারা এক হয়ে যায়। সেটি হলো নিরাপত্তা, আস্থা ও দায়িত্বের প্রশ্ন। একজন তরুণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চান, একজন নাগরিক নিরাপদ নগর ও কার্যকর রাষ্ট্র চান, একটি প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব ও কমান্ডের নিরাপত্তা চায়, আর একজন বাবা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতির মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরেন। রাষ্ট্রও এক অর্থে একটি বড় পরিবার। আর পরিবার এক ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। শুধু আশ্বাসে এদের কোনোটিই টিকে থাকে না; টিকে থাকে যত্ন, বিশ্বাস এবং দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

১. উদ্বিগ্ন তরুণ, শূন্য হয়ে যাওয়া জনপদ

বাংলাদেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। এমনকি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তরুণদের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণরা বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ যাদের শক্তিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা, তারাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত। তরুণদের উদ্বেগ শুধু একটি চাকরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবার, বিয়ে, সন্তান এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা। গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখ মানুষের। দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। যুব বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশই স্নাতক।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় এমন এক রেস্তোরাঁর মতো, যেখানে মেন্যুতে বিরিয়ানি লেখা থাকে, পরিবেশন করা হয় সেমাই, আর বিল নেওয়া হয় পাঁচতারকা হোটেলের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তরুণরা দেখছেন, তাদের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে পরিচয়টাই ঠিকমতো হয়নি। তাই শিক্ষিত ও সক্ষম তরুণরা গ্রাম ছাড়ছেন, জেলা শহর ছাড়ছেন, দেশও ছাড়ছেন। আইসিডিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিংহামটন ইউনিভার্সিটির ২১ বছরের গবেষণা বলছে, তুলনামূলকভাবে সুস্থ, শিক্ষিত ও সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যেই অভিবাসনের প্রবণতা বেশি। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং তথ্যের সহজলভ্যতা—এই তিনটি কারণ তাদের গ্রাম ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

তারা শহর বা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান, পরিবারে সচ্ছলতা আসে। কিন্তু গ্রাম হারায় শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। গবেষকরা একে বলেছেন নীরব প্রস্থান। জনপদ থেকে মেধা চলে যায়, সঙ্গে চলে যায় পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার মানুষও। জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।’ আমাদের তরুণরাও হয়তো ফিরতে চান। কিন্তু ফিরে এসে তারা কী করবেন? ধানসিঁড়ির তীরে বসে চাকরির ওয়েবসাইটে আবেদন করবেন?

২. ডেলিভারি স্টেট এবং পাকিস্তানের সেফ সিটি

তরুণদের এই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রের কার্যকারিতার সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের নীতির অভাব নেই। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই বড় বড় পরিকল্পনা আছে। অভাব হচ্ছে ফলের।বাংলাদেশে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কমিটি হয়, উপকমিটি হয়, কর্মশালা হয়, পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা হয়। শেষে ছবিও হয়। সমস্যাটি শুধু ছবির ফ্রেমের বাইরে থেকে যায়। এই কারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির রাষ্ট্র নয়, একটি ডেলিভারি স্টেট। যে রাষ্ট্র পরিকল্পনাকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দিতে পারে। প্রকল্প কত বড়, বাজেট কত, বিদেশি প্রযুক্তি কত আধুনিক— এসব নয়; প্রশ্ন হবে মানুষ বাস্তবে কতটা উপকার পেল।

সম্প্রতি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের সেফ সিটি উদ্যোগকে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও দিয়েছে। সেফ সিটি প্রকল্পে স্মার্ট ক্যামেরা, ফেসিয়াল রিকগনিশন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারের মতো প্রযুক্তি থাকে। প্রযুক্তির প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তানের মডেল কেন? যে দেশটি নিজেই সন্ত্রাসী হামলা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, অপহরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধের সংকট মোকবেলা করছে, সেই দেশের মডেলকে আমরা অনুকরণীয় বলছি কোন ফলাফলের ভিত্তিতে? পাকিস্তানের লাহোর, ইসলামাবাদ, করাচি ও মুলতানে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো হলেও দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তাসংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। ক্যামেরা বসালেই শহর নিরাপদ হয় না। প্রয়োজন দক্ষ পুলিশ, কার্যকর গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, দ্রুত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। নইলে সেফ সিটি প্রকল্প হবে দামি ক্যামেরার প্রদর্শনী—অপরাধী ধরা পড়বে কি না জানা নেই, তবে নাগরিকের মুখটি বেশ পরিষ্কারভাবে রেকর্ড হবে।

এখানে আরো বড় প্রশ্ন নাগরিক স্বাধীনতার। শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন, বিচারিক অনুমোদন এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ব্যাপক সিসিটিভি নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যামেরার পেছনে ব্যয় করার আগে ফরেনসিক ল্যাব, পুলিশি দক্ষতা, সাইবার অপরাধ দমন, জরুরি সেবা ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বিনিয়োগ করলে বেশি ফল পাওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। ডেলিভারি স্টেট অন্য দেশের প্রকল্প হুবহু নকল করে না। সে নিজের সমস্যার প্রকৃতি বোঝে, ফলাফল যাচাই করে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করে সমাধান তৈরি করে।

৩. আড়িপাতার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক স্থিতি

এই জায়গা থেকেই বাগিং ডিভাইসের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কারো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কথোপকথন গোপনে ধারণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা গুরুতর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা থাকলে আইন ও যথাযথ অনুমোদনের অধীনে নজরদারি হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে নয়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বা কমান্ড কাঠামোর মধ্যে বাগিং ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর। এতে অধস্তনদের মধ্যে দ্বিধা, সন্দেহ ও বিভক্তি তৈরি হতে পারে। একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; তার কমান্ড, শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা। এ ধরনের কার্যক্রম গণতান্ত্রিক সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের সামনে সরকারকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে দেখানোর অপপ্রয়াস হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি নিজের কার্যালয়েই নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে সেটি শুধু গোপনীয়তার নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সংকট।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ফোনে আড়িপাতা, ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার নামে এই ব্যবস্থা বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর। এক সময় ঢাকায় দুজন মানুষ ফোনে কথা বললে তারা সন্দেহ করতেন, তৃতীয় একজন নীরব শ্রোতা হয়তো লাইনে আছেন। সুবিধা ছিল একটাই, সেই তৃতীয় ব্যক্তি কথোপকথনে বাধা দিতেন না!

কৌতুকের আড়ালের বাস্তবতা ভয়াবহ। নাগরিক যখন মনে করেন তার প্রতিটি কথা রেকর্ড হতে পারে, তখন তিনি নিজেই নিজের কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। নজরদারির আসল সাফল্য সেখানেই, মানুষকে গ্রেপ্তার না করেও নীরব করে দেওয়া। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর একই সংস্কৃতি চলতে পারে না। বাগিং ডিভাইস কোথা থেকে এলো, কার নির্দেশে ব্যবহৃত হলো এবং তথ্য কার কাছে গেছে তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আড়িপাতা স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার; গণতন্ত্রের দায়িত্ব সেই উত্তরাধিকার বহন করা নয়, তার অবসান ঘটানো।

৪. নাজাহ : চার মাস ছয় দিনের অনন্ত উপস্থিতি

এই রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা লিখতে লিখতেই ১৫ জুলাইয়ের ব্যক্তিগত শোক ফিরে আসে। দিনটি ছিল আমার প্রিয় কন্যা নাজাহ জায়ানের আঠারোতম মৃত্যুবার্ষিকী। সে আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল মাত্র চার মাস ছয় দিন বয়সে। পৃথিবীতে একটি পূর্ণ ঋতুও কাটাতে পারেনি। অথচ তার অনুপস্থিতি আঠারো বছর ধরে আমাদের প্রতিটি ঋতুর অংশ হয়ে আছে। মানুষ বলে, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কথাটি সম্ভবত তারা বলেছেন, যারা সন্তান হারাননি। সময় ক্ষত সারায় না। সময় শুধু ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায়। মানুষ কাজে যায়, কথা বলে, হাসে, অনুষ্ঠান করে। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু হৃদয়ের একটি কক্ষ চিরকাল বন্ধ থাকে। সেখানে ছোট্ট হাত, নিষ্পাপ চোখ, শিশুর গন্ধ এবং একটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ জমা থাকে।

নাজাহ বড় হলে কেমন হতো? সে কি বই পড়তে ভালোবাসত? গান শুনত? খুব অভিমানী হতো? ভাইবোনদের সঙ্গে ঝগড়া করত? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবু প্রশ্নগুলো আঠারো বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা শুধু একটি শিশুকে হারাইনি। হারিয়েছি তার শৈশব, কৈশোর, প্রথম স্কুল, প্রথম লেখা এবং একটি সম্পূর্ণ সম্ভাব্য জীবন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।’ নাজাহকে আমরা দেখি না, কিন্তু সে আমাদের দেখার ভিতরেই রয়ে গেছে। কেউ কেউ খুব অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে আসে, কিন্তু হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করে যায়।

শেষ কথা

চারটি বিষয়ের কেন্দ্রে একই প্রশ্ন—আমরা কি মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও ভবিষ্যৎকে যথেষ্ট যত্নে ধারণ করতে পারছি? তরুণের জন্য নিরাপত্তা মানে কাজ ও মর্যাদা। নাগরিকের জন্য নিরাপত্তা মানে শুধু ক্যামেরায় ঘেরা শহর নয়, অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মানে আস্থা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা। আর একজন বাবা-মায়ের কাছে নিরাপত্তা মানে সন্তানকে বুকে ধরে রাখার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা। একটি দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প কোনো সেতু, টানেল কিংবা সেফ সিটি নয়। সবচেয়ে বড় প্রকল্প তার মানুষ, তার তরুণ, শিশু, নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠান। নাজাহর স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবন খুব ছোট। যে দায়িত্ব আজ পালন করা দরকার, তা আগামীকালের প্রতিশ্রুতি হিসেবে রেখে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। প্রতিশ্রুতি কিছু দিন আশা জাগায়, প্রযুক্তি কিছু দিন মুগ্ধ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ ফল চায়। কারণ প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে একজন মানুষ আছে, প্রতিটি ব্যর্থ নীতির পেছনে একটি হারানো সম্ভাবনা আছে, আর প্রতিটি ছোট জীবনেরও অসীম মূল্য আছে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ