পুনের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়াল হত্যার ঘটনা তদন্তে নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। কেতনের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল ও তার প্রেমিক চেতন চৌধুরী মিলে পরিকল্পিতভাবে পুনের লোহাগড় দুর্গ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করে কেতন আগরওয়ালকে।
গত ফেব্রুয়ারিতে কেতনের সঙ্গে সিয়ার বাগদান হয়। আগামী নভেম্বরে জয়পুরে জমকালো আয়োজনে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিয়ার এ বিয়েতে মত ছিল না। সে ভালোবাসত চেতন চৌধুরীকে। বিয়েতে মত না থাকলেও পরিবারের সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে তাদের মুখের ওপর না বলতে পারেননি সিয়া। এমনকি পরিবারের মর্যাদা রক্ষায় চেতনের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ের কথাও ভাবেননি সিয়া। কিন্তু কৌশলে বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতে নানা পরিকল্পনা আঁটেন সিয়া আর তার প্রেমিক চেতন। প্রথমে অবশ্য হবু বর কেতন আগরওয়ালকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল না সিয়া গোয়েলের। সিয়া ও চেতনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, কোনো একটা দুর্ঘটনায় কেতনকে আহত করা, যাতে বিয়ের আয়োজন পিছিয়ে যায় এবং তারা কিছুটা সময় পান। কিন্তু বেঁচে থাকলে কেতন সন্দেহ করতে পারেন এবং তারা ধরা পড়ে যেতে পারেন; এই ভয়ে তারা আহত করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। বরং তাদের প্রেমের বাধা হয়ে দাঁড়ানো কেতনকে দুনিয়া থেকে একেবারে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাই চূড়ান্ত করেন। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব কথা জানিয়েছে।
হত্যা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সিয়া ও চেতন মিলে কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক গবেষণা করেন। ঘটনার আগে ও পরের সব কিছু ছিল তাদের নিখুঁত পরিকল্পনায়। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে তারা প্রচুর থ্রিলার সিনেমা দেখেন। ইন্টারনেটে নানা হত্যা পরিকল্পনার সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করেন। পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পর তারা স্পট চূড়ান্ত করতে মাঠে নামেন। তাদের প্রাথমিক তালিকায় লোনাভালা টাইগার পয়েন্ট, ভিসাপুর দুর্গসহ আশপাশের আরো কয়েকটি দুর্গও ছিল। তারা আলাদাভাবে কিছু স্পট সরেজমিনে পরিদর্শনও করেছেন এবং নিজেদের মধ্যে ছবি বিনিময় করেছেন। তবে অনেক যাচাই-বাছাই শেষে লোহাগড়কেই তারা বেছে নেন নিরাপদ ভেন্যু হিসেবে। ঘটনার পর যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে, স্পট নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটাই ছিল তাদের মূল ভাবনা।
গত ৩১ মে প্রথম কেতনকে নিয়ে লোহাগড় যান সিয়া। তবে সেদিন হত্যার পরিকল্পনা ছিল না তার। প্রথম দিন সিয়া একটা ভালো স্পট খুঁজে বের করেন কেতনকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য। পরিকল্পনা ছিল ৩ জুন আবার লোহাগড় যাবেন তারা। সেদিনই সিয়া কেতনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবেন। কিন্তু কেতনের পরিবারের আপত্তির কারণে সেদিন তাদের যাওয়া হয়নি। কারণ ৬ জুন প্রিওয়েডিং ফটোশুটের জন্য তাদের ইন্দোনেশিয়ার বালিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বালিতে গেলে তাদের পরিকল্পনা পিছিয়ে যাবে। তাই অন্য ফন্দি আঁটেন সিয়া। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে এক হোটেলে নাশতা খেতে নামেন তারা। সেখানেই কেতনের ব্যাগ থেকে তার পাসপোর্ট চুরি করে ছিঁড়ে টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দেন সিয়া। ফলে তাদের আর বালি যাওয়া হয়নি। ১৪ জুন কেতনকে নিয়ে আবার লোহাগড় যান সিয়া। সেদিন ধাক্কা দিয়েছিলেনও। কিন্তু ঝোপঝাড় ধরে বেঁচে যান কেতন। আর সিয়া কেতনকে জড়িয়ে ধরে ‘সাপ সাপ’ বলে চিৎকার করেন। ফলে কেতন আর তাকে সন্দেহ করেননি। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও ১৮ জুন কেতনকে নিয়ে আবার লোহাগড় যান সিয়া। এবার আর ঝুঁকি নেননি। ডেকে নেন তার প্রেমিক চেতন চৌধুরীকে। ১৮ জুন সিয়া আর চেতন মিলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করেন কেতন আগরওয়ালকে।
হত্যা পরিকল্পনাকে নিশ্চিদ্র করতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন সিয়া ও চেতন। ঘটনার পরপরই সিয়া ও চেতন দুজনের ফোনের সব ডাটা মুছে ফেলেন। চেতন নিজের ফোন পুনের দোকানে রেখে এক কর্মচারীর ফোন নিয়ে লোহাগড় যান, যাতে ফোন ট্র্যাক করলে মনে হয় তিনি পুনেতেই আছেন। টোল প্লাজায় যাতে কোনো রেকর্ড না থাকে জন্য গাড়ি ব্যবহার না করে মোটরসাইকেলেই লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে লোহাগড় যান চেতন। সিসিটিভিতে যাতে চেনা না যায়, সে জন্য চেতন হুডিতে মুখ ঢেকে কেতন ও সিয়াকে অনুসরণ করেন। কিন্তু তীব্র গরমে হুডি পরার বিষয়টিই পুলিশকে ভাবায়। সেই সন্দেহ থেকেই আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিয়া প্রথমে পরিবার ও পুলিশের কাছে জানিয়েছিল ছবি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেছে কেতন।
প্রাথমিকভাবে কেতনের বোন ছাড়া সবাই সেটা মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু বোনের সন্দেহের কারণেই পুলিশ তদন্তে নামে এবং প্রাথমিক তদন্ত শেষে ২৩ জুন সিয়া ও চেতনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে কেতনের সঙ্গে বাগদানের পর সিয়া ও চেতন গোপনে মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেছেন বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। সত্যি সত্যি তারা বিয়ে করেছিলেন কি না, তা জানতে পুলিশ রাজস্থানের খাতু শ্যাম মন্দির পরিদর্শন করেছে।
তবে কেতনের মা রাখি আগরওয়াল সন্তান হত্যার দ্রুত বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে এক আবেগঘন চিঠি পাঠিয়েছেন। ই-মেইলে পাঠানো চিঠিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে রাখি লিখেছেন, ’আমি কোনো সহানুভূতি বা বিশেষ সুবিধা চাই না। খালি সন্তান হত্যার দ্রুত ও ন্যায়বিচার চাই। যাতে ছেলের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, তুমি ন্যায়বিচার পেয়েছো।’ রাখি আগরওয়াল লিখেছেন, ‘আমার ছেলেকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে আমার দুনিয়াও চলে গেছে। ঘরের কোনায় কোনায় তার স্মৃতি, তার রুম, তার পোশাক, তার ছবি আমাকে প্রতিদিনই সব মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আমার হাসিখুশি ছেলেটা আর কোনো দিন ফিরবে না।’ রাখি লিখেছেন, ‘অন্য সব মায়ের মতো আমারও স্বপ্ন ছিল কেতনের বিয়ে হবে, সংসার হবে। আমরা একসঙ্গেই আনন্দে থাকব। কিন্তু তার বদলে আমাকে ছেলের শেষকৃত্য করতে হয়েছে। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে।
এর আগে কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়াল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদি মুর্মুর কাছে এত চিঠিতে ছেলের হত্যার দ্রুত ও ন্যায়বিচার চেয়ে আবেদন জানান।