• ই-পেপার

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

কঠোরভাবে তেল ষড়যন্ত্র বন্ধ করুন

সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতায় বন্যার্ত মানুষের পাশে রাষ্ট্র

সিরাজুল ইসলাম
সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতায় বন্যার্ত মানুষের পাশে রাষ্ট্র

প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়, কিন্তু মানুষের কাছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অসীম। একটি সরকার কত বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, কত বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করেছে- এসব যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিক চেহারা প্রকাশ করে।

বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। নদীমাতৃক এই দেশে বর্ষা যেমন আশীর্বাদ নিয়ে আসে, তেমনি কখনো কখনো ভয়াবহ বিপর্যয়ও ডেকে আনে। নদীর পানি উপচে পড়লে শুধু মাঠ-ঘাট ডুবে যায় না, ডুবে যায় মানুষের স্বপ্ন, কৃষকের বছরের পরিশ্রম, নিম্নআয়ের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। ঘরের ভেতর পানি, মাথার ওপর আকাশ, ঘরে খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট—এই বাস্তবতায় একজন সাধারণ মানুষের কাছে তখন রাষ্ট্রই শেষ ভরসা।

চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে সরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সমন্বয় করা হচ্ছে।

দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে- রাষ্ট্র কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে? কারণ বন্যার ক্ষতি শুধু পানির উচ্চতায় মাপা যায় না; মাপতে হয় মানুষের দুর্ভোগ দিয়ে। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ যখন দিনের পর দিন পানিবন্দি থাকে, তখন তার কাছে বড় কোনো ঘোষণা নয়, প্রয়োজন হয় বাস্তব সহায়তা।

এই জায়গায় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খবরের কাগজের শিরোনাম- ‘পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেনা ও নৌবাহিনী’- শুধু একটি খবর নয়, এটি দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রতি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ও ভালোবাসার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা অন্য কোনো জাতীয় সংকটে সেনা ও নৌবাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের রয়েছে দ্রুত মোতায়েনের সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর বিশেষ ব্যবস্থা।

বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় সড়ক ডুবে যায়, নৌযান ছাড়া চলাচল সম্ভব হয় না। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরের ছাদে আশ্রয় নেয়। এসব জায়গায় নৌবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা এবং সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তা মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে আসে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত এলাকাতেও ত্রাণ পৌঁছে দিতে সব বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগ মোকাবিলা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এখানে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।

একটি দুর্যোগের সময় সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় ব্যবস্থাপনায়। কোথায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, কোন এলাকায় খাদ্য প্রয়োজন, কোথায় চিকিৎসা জরুরি, কোথায় উদ্ধার অভিযান চালাতে হবে- এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে ক্ষতি বাড়ে, মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘ হয়।

তবে বন্যার ক্ষতি শুধু বর্তমানের দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।

একজন কৃষকের কাছে একটি ফসল মানে শুধু জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ধান বা সবজি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, ঋণ পরিশোধ এবং জীবনের নিরাপত্তা। কয়েক দিনের বন্যায় অনেক কৃষকের পুরো বছরের পরিকল্পনা ভেসে যায়।

কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার। এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ ত্রাণ দিয়ে একজন কৃষকের তাৎক্ষণিক ক্ষুধা মেটানো সম্ভব, কিন্তু তাকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার, কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রয়োজন। কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে শুধু গ্রামীণ অর্থনীতি নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সরকার যে সহায়াত দেবে তারও সদ্ব্যবহার ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণসামগ্রী লুট করা কিংবা ত্রাণের অর্থ মেরে দেয়া এই দেশে নতুন কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে এই বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তা নাহলে সরকারকে বড় রকমের দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়তে হবে যা রাজনীতিতে তাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে।

বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক দশকে অনেক উন্নতি হয়েছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার সক্ষমতা- অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বন্যার ধরণ আরো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু দুর্যোগের সময় প্রতিক্রিয়া দেখালে হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ একটি দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো- দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া।

রাজনৈতিকভাবেও দুর্যোগ একটি বড় পরীক্ষা। কারণ জনগণ সংকটের সময় সরকারের কার্যকারিতা বিচার করে। সাধারণ মানুষ দেখতে চায়, সরকার শুধু বক্তব্য দিচ্ছে নাকি বাস্তব মাঠে কাজ করছে। তাই ত্রাণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সঠিক মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

একটি সরকার তখনই মানুষের আস্থা অর্জন করে, যখন মানুষ সংকটের মুহূর্তে অনুভব করে- রাষ্ট্র তাকে ভুলে যায়নি। বন্যার পানিতে আটকে থাকা একজন মানুষ যখন নৌকায় করে সরকারি সহায়তা পায়, তখন সেটি শুধু খাদ্য বা ওষুধ নয়; এটি রাষ্ট্রের উপস্থিতির একটি বার্তা হয়ে যায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো- উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটি পূরণ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো সংকটের সময় তার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

আজ বন্যার্ত মানুষের চোখে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা- রাষ্ট্র যেন তাদের পাশে থাকে। সেনা, নৌবাহিনী, প্রশাসন ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই আস্থাই তৈরি করতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয় উন্নয়নের সংখ্যায় নয়, বরং বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি বন্যার্ত মানুষের কাছে ছুটে যান তাহলে সেটি হবে অনেক বড় কাজ, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারি জোটের জন্য হবে বড় রাজনৈতিক পুঁজি।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর

প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ছাড়া কি শুধু সংযোগই যথেষ্ট?

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ছাড়া কি শুধু সংযোগই যথেষ্ট?
সংগৃহীত ছবি

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডর গ্রহণের আগে বাংলাদেশের উচিত এর অর্থনৈতিক, নিরাপত্তাগত এবং কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ করিডরের সম্ভাবনা আবারও আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উঠে এসেছে। এর সম্ভাব্য সুফল আকর্ষণীয়—পরিবহন ব্যয় কমবে, বাণিজ্য বাড়বে, আঞ্চলিক সংহতি জোরদার হবে এবং বিনিয়োগ ও পর্যটনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তখন এ ধরনের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বের দাবি রাখে।

তবে সংযোগ (কানেক্টিভিটি) নিজেই কোনো অর্থনৈতিক কৌশল নয়। সড়ক ও রেলপথ বাণিজ্যকে সহজ করে, কিন্তু নিজেরা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সৃষ্টি করে না।

বাংলাদেশ এই করিডর থেকে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশের উৎপাদনক্ষম অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, প্রকল্প অর্থায়নের টেকসইতা এবং করিডর যে অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে তার নিরাপত্তার ওপর। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সতর্কভাবে এগোনোর যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসে চীন থেকে।

সংযোগ বৃদ্ধির সমর্থকদের যুক্তি, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা রপ্তানি বাড়াবে। এটি সম্ভব, তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কাঠামোগত বাণিজ্য বৈষম্য দূর করা যায় না। বরং যেসব দেশের উৎপাদন খাত শক্তিশালী, প্রযুক্তি উন্নত এবং শিল্পভিত্তি বৈচিত্র্যময়, তারাই বেশি লাভবান হয়।

বাংলাদেশ যদি তার রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে না পারে, তাহলে নতুন করিডর হয়তো চীন থেকে আরো বেশি আমদানি সহজ করবে এবং বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়িয়ে দেবে।

সমস্যাটি আরো জটিল, কারণ বাংলাদেশের ও চীনের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে সাদৃশ্য ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানির মূল ভিত্তি তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জুতা এবং অন্যান্য শ্রমনির্ভর শিল্প। অন্যদিকে চীন এসব শিল্পে এখনও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, পাশাপাশি উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্পের পরিসর, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত লজিস্টিকস, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সহজ মূলধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেচীনের বিশাল সুবিধা রয়েছে। শুধু উন্নত সংযোগব্যবস্থা এসব কাঠামোগত ব্যবধান দূর করতে পারবে না।

কানেক্টিভিটি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সেবা দেয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবু পণ্যবাহী রেল, লজিস্টিক পার্ক, গুদামজাতকরণ, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব দুর্বলতা দূর না হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান সুবিধাভোগী হওয়ার পরিবর্তে কেবল একটি ট্রানজিট দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

প্রকল্পটির আর্থিক দিকও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের বড় ব্যয় থাকে। এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবসম্মত যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস, বাণিজ্যিকভাবে টেকসই পরিচালনা এবং স্বচ্ছ অর্থায়নের ওপর। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ঋণের বোঝা এখনও সহনীয় হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমাহীন নয়।

আন্তর্জাতিক করিডরে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার মানে বন্দর উন্নয়ন, রপ্তানি লজিস্টিকস, জলবায়ু সহনশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিল্প উদ্ভাবনে বিনিয়োগের জন্য কম অর্থ। তাই প্রশ্নটি শুধু সংযোগ ভালো কি না, তা নয়; বরং এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পর্যটনকেও সম্ভাব্য বড় সুফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। উন্নত সড়ক যোগাযোগ ভ্রমণ সহজ করবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পর্যটন শুধু সড়কের ওপর নির্ভর করে না। পর্যটন অবকাঠামো, আতিথেয়তা খাত, গন্তব্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সমান্তরাল বিনিয়োগ না হলে পর্যটনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক বিষয়ই পুরো চিত্র নয়। প্রস্তাবিত করিডরটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাবে, যেখানে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের বড় অংশ আরাকান আর্মির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবাধীন। এমন অস্থিতিশীল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনা নিরাপত্তা, আইনগত এবং পরিচালনাগত ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক uncertainty (অনিশ্চয়তা), কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং চলমান সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য মোটেই অনুকূল পরিবেশ নয়।

এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু—অমীমাংসিত রোহিঙ্গা সংকট। বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে শরণার্থী প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই বড় আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নিলে এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, মানবিক দায়বদ্ধতার চেয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ধারণা বাস্তব হোক বা না হোক, এটি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

আরো একটি উদ্বেগ হলো, করিডর-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। যদি করিডর থেকে রাজস্ব, কর আদায় বা রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতি অনিবার্য নয়, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত।

বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে এবং চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। তাই চীন প্রস্তাবিত এই করিডর, যা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ও ভারতের সংবেদনশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী এলাকা অতিক্রম করবে, স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক কৌশলগত নজরদারির বিষয় হবে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রায় ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত চীন–লাওস রেলপথ আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করেছে, তবে এর অর্থায়ন কাঠামো এবং তা কতটা টেকসই তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি), যার প্রাথমিক মূল্য ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং পরে বেড়ে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নিরাপত্তা সমস্যা, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দরের প্রথম ধাপ নির্মাণে প্রায় ৩৬১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যার বড় অংশই ছিল চীনা ঋণ। যদিও শ্রীলঙ্কার ঋণ সংকটের পেছনে বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণ ছিল, তবুও প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায় এই প্রকল্পটি সেখানে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এসব উদাহরণ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, চীনা অর্থায়নে নির্মিত সব অবকাঠামো প্রকল্প সমস্যাজনক। বরং এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সফল সংযোগ শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং কঠোর প্রকল্প মূল্যায়ন, স্বচ্ছ অর্থায়ন, শক্তিশালী institution (প্রতিষ্ঠা), বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে।

সুতরাং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে নেওয়া উচিত, ভূ-রাজনৈতিক আবেগের ভিত্তিতে নয়। স্বাধীন অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, স্বচ্ছ অর্থায়ন, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ—এসবই যেকোনো প্রতিশ্রুতির পূর্বশর্ত হওয়া উচিত।

সংযোগ নিঃসন্দেহে উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি আগে নিজের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন সুরক্ষিত করতে না পারে, তবে নতুন এই করিডর হয়তো দেশকে আঞ্চলিক সমৃদ্ধির চেয়ে আঞ্চলিক ঝুঁকির সঙ্গেই আরো দ্রুত যুক্ত করবে।

বাঙালি আর মার্কিনদের সংস্কৃতির দুই ধারার মেলবন্ধন ঘটে যেভাবে

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
বাঙালি আর মার্কিনদের সংস্কৃতির দুই ধারার মেলবন্ধন ঘটে যেভাবে

কালচারাল শক বা ‘সাংস্কৃতিক অভিঘাত’ শব্দ দুটির সাথে আমার পরিচিতি বহুদিনের। চার দশক আগে মার্কিন সরকারের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার বৃত্তি বাগিয়ে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের জন্য উড়াল দিয়েছিলাম হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের অভিমুখে। সেটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম বিদেশ যাত্রা। নবীন বরন উৎসবে ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার কর্তৃপক্ষ আমাকেসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন মার্কিন সংস্কৃতির আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তারা জানিয়েছিলেন মার্কিনদের জীবনধারার বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের কাছে অপরিচিত এবং অস্বস্তিকর লাগতে পারে, সৃষ্টি করতে পারা আমাদের ওপর অনাবশ্যক মানসিক চাপ। তবে তারা আশ্বস্ত করেছিলেন, আমরা দ্রুত মার্কিন সংস্কৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবো। তাদের এ উপদেশের প্রতিফলন তৎক্ষণাৎ পেয়ে গিয়েছিলাম। জনা পঁচিশেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ছিল এক রাজসিক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। ভোজ শেষে দেখি অর্ধেকের বেশি দামি দামি খাবার; যেগুলোর বেশির ভাগ জীবনে প্রথম দেখলাম, অথচ তা ধরাই হয়নি। কিছুক্ষণ পরে আমার সামনে দিয়ে পরিছন্নকর্মীরা এসে সে অছোঁয়া খাবারগুলো ‘গারবেজ ব্যাগে’ ভরে ‘বিনে’ ফেলার জন্য নিয়ে গেলো। সে সময় আমার দেশের অর্ধভুক্ত মানুষের কথা ভেবে মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম।

দিন গড়িয়ে যেতে লাগলো আর বিস্ময় নিয়ে দেখতে পেলাম আমরা যা জানি আর ভাবি, সব কিছুরই বিপরীতধর্মী চিন্তা মার্কিনদের মগজে স্থিতু হয়ে আছে। তারা তারিখ লিখতে গিয়ে দিনের আগে মাসটা লিখে দেয়, গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরে বাম সিটে বসে, ফুটবলকে বলে সকার, ফুটপাথকে বলে সাইড ওয়াক, সিনেমাকে বলে মুভি, রেস্তোরাঁর বিলকে বলে চেক ইত্যাদি আরও কত শত নাম! সেই প্রথম (১৯৮৫ সালে) দেখলাম ক্যাশের পরিবর্তে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, টাকা উত্তোলনের জন্য এটিএম মেশিন, টাইপিং সহজ করে দেওয়ার জন্য ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রিন্টার। দ্রুত ধাবমান গাড়ি, বিশাল বিশাল উড়াল সড়ক, নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা, সুশাসন, শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য আর সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠেছিল। এর সাথে ছিল স্কিন কালারের সমস্যা। চারিদিকে ভিন্ন বর্ণের লোকজন দেখে নিজেকে একাকী এবং অসহায় লাগত। তবে সাদা চামড়ার মার্কিন সহকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা মার্কিন মুলুকে আমার জীবন ধারা দিনে দিনে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।

1

সংস্কৃতি হোল একটা জাতির জীবনযাপন, মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও বিশ্বাসের সমষ্টি। বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য, নদী-মাটি-কৃষি ও উপনিবেশ-উত্তর ইতিহাসের ফসল। অন্যদিকে মার্কিন সংস্কৃতির ইতিহাস মাত্র আড়াইশো বছরের পুরোনো, যেখানে বহু জাতের অভিবাসী এসে নানা ধাঁচের সংস্কৃতির মিলন ঘটিয়ে আমেরিকা মহাদেশে নতুন ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পূর্ব পট ভিন্ন হবার কারণে বাঙালি ও মার্কিন সংস্কৃতির দর্শন ভিন্ন। বাঙালি সমাজ এখনো সমষ্টিকেন্দ্রিক; যৌথ পরিবার ভেঙে নিউক্লিয়ার হলেও মা-বাবা, দাদা-দাদি, আত্মীয় স্বজনের সাথে নিবিড় বন্ধন এ সমাজে এখনও প্রত্যাশিত। বড়দের মতামতকে সম্মান করা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে সবার অংশগ্রহণ স্বাভাবিক নিয়ম। বিয়েতে পরিবারের সম্মতি, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান করা আর দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া প্রথাগত ব্যাপার। কিন্তু মার্কিনদের সংস্কৃতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সন্তানদের বয়স ১৮ পার হলে পিতা-মাতা তাদের স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ দেয়। তাদের কাছে পরিবার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যক্তির পছন্দ, ক্যারিয়ার ও স্বাধীনতা অগ্রাধিকার পায়। বাবা মা এবং বড়দের সাথে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয় আর বিয়েতে ব্যক্তিগত পছন্দ হয়ে থাকে শেষ কথা। পরিবারের বাকিরা পালন করে সাক্ষী গোপালের ভূমিকা। 

বাঙালিদের আতিথেয়তা সমাজ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কেউ বাড়ি এলে না খাইয়ে ছাড়া হয়না, কারণ বাঙালির কাছে অতিথি হচ্ছে নারায়ণ। সময় জ্ঞানে, নিয়ম অনুসরণে এবং প্রতিশ্রুতি পালনে বাঙালির চারিত্রিক দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। সমাজে আবেগ প্রকাশ করা,গল্প আড্ডায় মেতে থাকা, পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করা বাঙালির গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; আর ইশারা ইঙ্গিতে মনোভাব প্রকাশ করা সামাজিক ভাবে বাঙালিদের কাছে গ্রহণযোগ্য। বাঙালিরা সরাসরি না বলাকে অভদ্রতা মনে করে আর সামাজিক কর্মকাণ্ডে ‘লোকে কি বলবে’ এ চিন্তা তাদের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মার্কিনদের কাছে সময়ানুবর্তিতা, স্পষ্ট কথা ও ব্যক্তিগত পরিসর বা পার্সোনাল স্পেস খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইনিয়ে বিনিয়ে কথা না বলে টু দ্য পয়েন্ট কথা বলাটা পছন্দ করে এবং মনে করে সরাসরি ‘না’ বলাটা সৎ ও পেশাদার আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তাদের কাছে সমাজের চেয়ে আইন ও ব্যক্তিগত অধিকার বড়। আতিথেয়তা নিয়ে তাদের মধ্যে বাড়াবাড়ি নেই এবং আতিথেয়তার জন্য তারা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে সময় নির্ধারণ করে।

বাঙালিদের বছর ঘোরে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, দুর্গা পূজা, নবান্ন ঘিরে। উৎসব মানেই একসাথে খাওয়া, নতুন জামা, গান বাজনা ও সামাজিক মিলন। পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানি ছাড়াও বাঙালি জীবনে ভাত, মাছ, ডাল অবিচ্ছেদ্য অংশ। রান্নায় তেল-মশলা আর অতিথি আপ্যায়নে বাঙালির ভালবাসা প্রকাশ পায়। আমেরিকান উৎসব ফোরথ অফ জুলাই, হ্যালোইন, থাঙ্কস গিভিং, ক্রিসমাস। টার্কি, বারবিকিউ, পাম্পকিন পাই, ফাস্ট ফুড মার্কিনদের কাছে আচার অনুষ্ঠানের জন্য প্রিয় খাবার। তাদের মধ্যে আছে পট লাক কালচার, যেখানে খাবার আয়োজনে সবাই কিছু না কিছু অবদান রাখে। ব্যক্তিগত ডায়েটে ভেগান, কিটো স্বাভাবিকভাবে মানা হয়। বাঙালি পরিবারে শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদার সিঁড়ি ভাবা হয়। বাঙালির কাছে এখনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরি নিরাপদ পছন্দ। মুখস্থ বিদ্যা,পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনা ও শিক্ষকের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা চালু আছে। চাকরিতে সিনিয়রটি ও ক্ষমতা বাঙালিদের কাছে মূল্যবান। মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রশ্ন করা, ক্রিটিকাল থিঙ্কিং ও ‘নিজের পথ বেছে নেওয়া’ শেখায়। ‘গ্যাপ ইয়ার’, মেজর বদলানো, উদ্যোক্তা হওয়া তাদের কাছে সন্মানজনক। কাজের ক্ষেত্রে জীবনযাপন ও চাকরির ভারসাম্য বজায় রাখা, চাকরি বদল এবং সরাসরি ফিড ব্যাক তাদের সংস্কৃতির অংশ; মার্কিনদের ভাষায় ব্যর্থতা হোল শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা।

2

বাঙালির জীবনে ধর্ম ও লোকাচার মিশে আছে, সব ধর্মের লোক নিজ নিজ পার্বণ পালন করলেও সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্র-নজরুল-বাউল-লালন সবাইকে ছুঁয়ে যায়। তবে ধর্ম ব্যক্তিগত হলেও, তা বাঙালির সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পক্ষান্তরে মার্কিনরা সাংবিধানিকভাবে সেকুলার, তাদের চার্চ-ষ্টেট আলাদা। খ্রিষ্ট ধর্ম সংখ্যা গরিষ্ঠ হলেও, ধর্মীয় ভাবে তারা গোঁড়া নয়, কিন্তু চিন্তা ভাবনায় তারা আধ্যাত্মিক। যদিও আমেরিকান রাজনীতিতে ধর্মীয় লবিগুলোর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, মার্কিনরা সাধারণত কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করে না। বাঙালিরা হোল আবেগপ্রধান, কবিতা, গান, আড্ডা ছাড়া বাঙালির জীবন অসম্পূর্ণ; সিনেমা নাটকে মেলো ড্রামা তাদের পছন্দনীয়। বাঙালির যুক্তি-তর্কে, আবেগ, উপমা, গল্প ঢুকে পরে। অপর দিকে মার্কিনরা কথা ও যুক্তি দিয়ে জীবন যাচাই করে, তারা সরাসরি কথা বলে এবং ব্যক্তিগত গল্প বলতে ভালবাসে। তাদের মধ্যে পলিটিক্যাল কারেক্টনেস ও ফ্রি স্পিস নিয়ে টানা পোড়ান থাকলেও মত প্রকাশের অধিকার সাংবিধানিক।

বাঙালি সংস্কৃতি শিকড়, আবেগ, সমষ্টি ও ঐতিহ্যের গল্প বলে। আমেরিকান সংস্কৃতি চিন্তা শক্তি, যুক্তি, ব্যক্তি ও উদ্ভাবনের কথা বলে। একটা মাটির মত জীবনযাপনকে ধারণ করে, অন্যটা মানুষকে হাওয়ার মত উড়তে শেখায়। এখানে শ্রেষ্ঠ-নিকৃষ্ট বিচার্য নয়, বরং দুই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পারস্পরিকভাবে শেখার অঢেল সুযোগ আছে। বাঙালিরা মার্কিনদের কাছ থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের চিন্তা-ভাবনা নিতে পারে, আর মার্কিনরা বাঙালির পারিবারিক বন্ধন ও আন্তরিকতা থেকে শিখতে পারে। তরুণ বাঙালি এখন নেটফ্লিক্স দেখে, স্টার্টআপ খোলে, নানা ধরনের কফির স্বাদ নেয়, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে, ইন্টারনেট সারফ করে অজানাকে জানার চেষ্টা করে। আবার আমেরিকান শহরগুলোতে পহেলা বৈশাখ, বাঙালি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ভোজ, যোগ ব্যায়াম, বাংলা ছবি ইত্যাদি ধীরে ধীরে মার্কিনদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বর্তমানকালে অভিবাসী বাঙালিরা ‘দেশি’ ও ‘আমেরিকান’ পরিচয় মিলিয়ে তৃতীয় একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলছে। কর্মক্ষেত্রে আমেরিকানদের দায়িত্ববোধ, কর্ম পর্যালোচনা ও সরাসরি ফিডব্যাকের ধারণা শিখছে বাঙালি, আর আমেরিকানরা শিখছে বাঙালির পারিবারিক মূল্যবোধ ও আতিথেয়তা। দিন শেষে নদীর মত চলতে চলতে সংস্কৃতির দুই ধারা মিলে মিশে অন্তহীন নতুন মোহনা সৃষ্টি করে চলেছে।   
লেখক: বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায়

রাশেদুল হাসান
মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায়
[ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, জন্ম ১ ডিসেম্বর ১৯৩১ - মৃত্যু ১২ জুলাই ২০২৬]

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম পুরোধা ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের আইন অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ছিলেন।

জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স ছিলেন একজন জোতদার (ধনী কৃষক)। তার শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ অনার্স এবং এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

১৯৬০ সালের ২৭ মে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আইন পেশা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট থেকে শুরু পরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। আইন অঙ্গনে তার পাণ্ডিত্য শুধু সাধারণ ওকালতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্প ও বাণিজ্য আইন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন। তার নেতৃত্বে সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গতি পেয়েছিল।

পড়ুন: ব্যতিক্রমী স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একজন সচেতন পেশাজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ওই সময় হাইকোর্টের আইনজীবীদের ক্ষুদ্র ও সাহসী দলটির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। আইনজীবীদের এ গ্রুপটি তখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠন এবং আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

রাজনীতিতে জমির উদ্দিন সরকারের হাতেখড়ি হয় ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দল গঠনের উদ্যোগ নেন, তখন জমির উদ্দিন সরকার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের (জাগদল) গঠনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব পান। পরে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।

জমির উদ্দিন সরকার পাঁচবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার এবং পরে ঢাকা-৯ ও পঞ্চগড়-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন এবং জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সালে শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ প্রণয়ণের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার তত্ত্বাবধানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে স্বল্পকালীন বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলের খসড়া প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। 

অষ্টম জাতীয় সংসদে (২০০১-২০০৯) জমির উদ্দিন সরকার জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময় তিনি পদাধিকার বলে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। সংসদীয় রীতিনীতি রক্ষায় তার নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা দল-মত নির্বিশেষে প্রশংসিত হয়েছে। সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনে তিনি অত্যন্ত সংযম, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

তার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি উপকূলীয় দেশগুলোর অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন।

পড়ুন: ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখক। ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘স্ট্রংগার ইউনাইটেড ন্যাশনস ফর পিসফুল ওয়েলফেয়ার ওয়াল্ড’, ‘পাল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’, ‘গ্লিমপেসেস অব ইন্টারন্যাশনাল ল’, ‘অষ্টম সংসদে স্পিকার’, ‘দি ল অব দি সি’, ‘ল অব দি ইন্টান্যাশনাল রিভারস এ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্রস’, ‘লন্ডনে বন্ধু-বান্ধব’, ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’ ও ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’ উল্লেখযোগ্য বই।

রাজনীতির নানা সংকটময় সময়ে জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন ভারসাম্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তিনি সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দলীয় অবস্থান থেকে বক্তব্য দিলেও তার অনেক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্ব পেয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে তিনি সাদাসিধে জীবনযাপন, ভদ্রতা ও শালীন আচরণের জন্য পরিচিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তার সৌজন্যপূর্ণ আচরণ এবং যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তাকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। দেশের আইনজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন।

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন জমির উদ্দিন সরকার। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

কঠোরভাবে তেল ষড়যন্ত্র বন্ধ করুন | কালের কণ্ঠ