প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়, কিন্তু মানুষের কাছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অসীম। একটি সরকার কত বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, কত বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করেছে- এসব যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিক চেহারা প্রকাশ করে।
বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। নদীমাতৃক এই দেশে বর্ষা যেমন আশীর্বাদ নিয়ে আসে, তেমনি কখনো কখনো ভয়াবহ বিপর্যয়ও ডেকে আনে। নদীর পানি উপচে পড়লে শুধু মাঠ-ঘাট ডুবে যায় না, ডুবে যায় মানুষের স্বপ্ন, কৃষকের বছরের পরিশ্রম, নিম্নআয়ের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। ঘরের ভেতর পানি, মাথার ওপর আকাশ, ঘরে খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট—এই বাস্তবতায় একজন সাধারণ মানুষের কাছে তখন রাষ্ট্রই শেষ ভরসা।
চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে সরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সমন্বয় করা হচ্ছে।
দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে- রাষ্ট্র কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে? কারণ বন্যার ক্ষতি শুধু পানির উচ্চতায় মাপা যায় না; মাপতে হয় মানুষের দুর্ভোগ দিয়ে। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ যখন দিনের পর দিন পানিবন্দি থাকে, তখন তার কাছে বড় কোনো ঘোষণা নয়, প্রয়োজন হয় বাস্তব সহায়তা।
এই জায়গায় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খবরের কাগজের শিরোনাম- ‘পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেনা ও নৌবাহিনী’- শুধু একটি খবর নয়, এটি দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রতি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ও ভালোবাসার জলজ্যান্ত উদাহরণ।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা অন্য কোনো জাতীয় সংকটে সেনা ও নৌবাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের রয়েছে দ্রুত মোতায়েনের সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর বিশেষ ব্যবস্থা।
বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় সড়ক ডুবে যায়, নৌযান ছাড়া চলাচল সম্ভব হয় না। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরের ছাদে আশ্রয় নেয়। এসব জায়গায় নৌবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা এবং সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তা মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে আসে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত এলাকাতেও ত্রাণ পৌঁছে দিতে সব বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগ মোকাবিলা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এখানে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সশস্ত্র বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
একটি দুর্যোগের সময় সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় ব্যবস্থাপনায়। কোথায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, কোন এলাকায় খাদ্য প্রয়োজন, কোথায় চিকিৎসা জরুরি, কোথায় উদ্ধার অভিযান চালাতে হবে- এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে ক্ষতি বাড়ে, মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘ হয়।
তবে বন্যার ক্ষতি শুধু বর্তমানের দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।
একজন কৃষকের কাছে একটি ফসল মানে শুধু জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ধান বা সবজি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, ঋণ পরিশোধ এবং জীবনের নিরাপত্তা। কয়েক দিনের বন্যায় অনেক কৃষকের পুরো বছরের পরিকল্পনা ভেসে যায়।
কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার। এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ ত্রাণ দিয়ে একজন কৃষকের তাৎক্ষণিক ক্ষুধা মেটানো সম্ভব, কিন্তু তাকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার, কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রয়োজন। কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে শুধু গ্রামীণ অর্থনীতি নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সরকার যে সহায়াত দেবে তারও সদ্ব্যবহার ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণসামগ্রী লুট করা কিংবা ত্রাণের অর্থ মেরে দেয়া এই দেশে নতুন কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারকে এই বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তা নাহলে সরকারকে বড় রকমের দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়তে হবে যা রাজনীতিতে তাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে।
বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক দশকে অনেক উন্নতি হয়েছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার সক্ষমতা- অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বন্যার ধরণ আরো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু দুর্যোগের সময় প্রতিক্রিয়া দেখালে হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ একটি দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো- দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া।
রাজনৈতিকভাবেও দুর্যোগ একটি বড় পরীক্ষা। কারণ জনগণ সংকটের সময় সরকারের কার্যকারিতা বিচার করে। সাধারণ মানুষ দেখতে চায়, সরকার শুধু বক্তব্য দিচ্ছে নাকি বাস্তব মাঠে কাজ করছে। তাই ত্রাণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সঠিক মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।
একটি সরকার তখনই মানুষের আস্থা অর্জন করে, যখন মানুষ সংকটের মুহূর্তে অনুভব করে- রাষ্ট্র তাকে ভুলে যায়নি। বন্যার পানিতে আটকে থাকা একজন মানুষ যখন নৌকায় করে সরকারি সহায়তা পায়, তখন সেটি শুধু খাদ্য বা ওষুধ নয়; এটি রাষ্ট্রের উপস্থিতির একটি বার্তা হয়ে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো- উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটি পূরণ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো সংকটের সময় তার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।
আজ বন্যার্ত মানুষের চোখে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা- রাষ্ট্র যেন তাদের পাশে থাকে। সেনা, নৌবাহিনী, প্রশাসন ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই আস্থাই তৈরি করতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয় উন্নয়নের সংখ্যায় নয়, বরং বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি বন্যার্ত মানুষের কাছে ছুটে যান তাহলে সেটি হবে অনেক বড় কাজ, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারি জোটের জন্য হবে বড় রাজনৈতিক পুঁজি।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক






