সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর আবারও একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এসেছে, কেন বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসন ক্যাডার প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন? চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আর্থিক বিনিয়োগের পরও তাদের একটি বড় অংশ নিজ নিজ পেশায় না গিয়ে প্রশাসনে যোগ দিচ্ছেন।
বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের নয়, এটি মানবসম্পদ পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রীও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, যেসব শিক্ষার্থীর জন্য রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করছে, তাদের বড় অংশ যদি অন্য পেশায় চলে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, সেটি নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাস্তবতা হলো, একজন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। উন্নত ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণাসুবিধা, দক্ষ শিক্ষক এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হয়। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য দক্ষ চিকিৎসক ও প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং গবেষণায় অবদান রাখবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, তুলনামূলক দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার আকর্ষণ এবং কর্মপরিবেশের কারণে অনেক মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী প্রশাসনে চলে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল খাতে অনেক সময় জনবল সংকট, কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার স্বল্প সুযোগ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার বাধ্যবাধকতা এবং পেশাগত নানা চ্যালেঞ্জও তাদের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে এটি একটি যৌক্তিক ক্যারিয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সামষ্টিকভাবে রাষ্ট্রের জন্য এটি দক্ষ মানবসম্পদের অপ্টিমাল ব্যবহারের প্রশ্ন উত্থাপন করে।
বিগত কয়েক বছরের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে (যেমন ৪০তম থেকে ৪৩তম বিসিএস) প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট কর্মকর্তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩০-৩২%) ছিলেন চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী। যেমন ৪৩তম বিসিএসে শুধু প্রশাসন ক্যাডারে ১৮৩ জন প্রকৌশলী এবং ২৫ জন চিকিৎসক সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
এর আগের ৪০তম বিসিএসে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র, এই তিন সাধারণ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া মোট ৩৪২ জনের মধ্যে ১০২ জনই ছিলেন চিকিৎসক ও প্রকৌশলী। তবে বিষয়টিকে একপক্ষীয়ভাবে দেখা উচিত নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী প্রশাসনে গিয়েও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
স্বাস্থ্যনীতি, অবকাঠামো পরিকল্পনা, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো ক্ষেত্রে তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আরো কার্যকর করতে পারে। তাই তাদের প্রশাসনে প্রবেশকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক বলা যায় না। তবে প্রশ্ন হলো—সংখ্যাটি কতটা হওয়া উচিত। যদি অধিকাংশ মেধাবী চিকিৎসক ও প্রকৌশলী নিজ নিজ পেশা ছেড়ে প্রশাসনে চলে যান, তাহলে হাসপাতাল, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দক্ষ জনবলসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে; চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়, গবেষণার গতি কমে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র যে উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছিল, সেই উদ্দেশ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয় না।
উদ্বেগের বিষয় যে, এই প্রতিযোগিতায় সফল হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাইব্রেরিতে একটি আসন দখল করাকে কেন্দ্র করেও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে বিসিএস ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গাইডবই, নোট কিংবা প্রশ্নব্যাংক পড়ায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিগুলোতে নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক অসংখ্য মূল্যবান বই, গবেষণা জার্নাল ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা রয়েছে, যা গভীর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য।
এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে চাকরিমুখী প্রস্তুতির কাছে আড়াল হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণা সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রশাসন ক্যাডারের সুযোগসুবিধা দেশের অধিকাংশ সরকারি পেশার তুলনায় বেশি। সরকারি বাসভবন, গাড়ি, চালক, সুসজ্জিত অফিস, সহায়ক কর্মচারী, দেশবিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা, এসব কারণে প্রশাসন ক্যাডার চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ফলে অনেক মেধাবী চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষার্থীরাও প্রথম পছন্দ হিসেবে প্রশাসন ক্যাডার নির্বাচন করেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ জরুরি। প্রথমত চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের নিজ নিজ পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য বেতন, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান, আধুনিক কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করা দরকার। দ্বিতীয়ত সরকারি অর্থায়নে উচ্চব্যয়ের পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ পরিকল্পনা আরো বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত, যাতে দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি ও ধরে রাখা যায়।
তৃতীয়ত প্রশাসনে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হলে সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে স্বাস্থ্য প্রশাসন, প্রকৌশল প্রশাসন বা প্রযুক্তিনির্ভর নীতিনির্ধারণী পদ আরো সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, যেখানে তাদের বিশেষায়িত দক্ষতা সরাসরি কাজে লাগবে। পাশাপাশি দক্ষতা, মেধা ও জনস্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল তখনই নিশ্চিত হবে, যখন একজন চিকিৎসক সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেবেন, একজন প্রকৌশলী দেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন এবং যারা প্রশাসনে যাবেন, তারা তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে নীতিনির্ধারণকে আরো কার্যকর করবেন। তাই এটি কোনো ব্যক্তি বা পেশার সমালোচনার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবসম্পদ পরিকল্পনা, শিক্ষায় বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার বিষয়।
লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










