পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের নেতা ও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান লাভলুর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর লুটপাট শেষে অগ্নিসংযোগের অভিযোগও উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাতে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের কাঠালতলী বাজারের পাশে এ ঘটনা ঘটে। ওই বাড়ির লোকজন ঢাকাতে থাকায় বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল। ফলে কারোর আহতের ঘটনা ঘটেনি।
আওয়ামী লীগের ওই নেতার নাম কাজী মিজানুর রহমান (লাভলু)। তিনি মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মিজানুর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে আছেন।
আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, ‘শনিবার সকাল ৬টা ৮ মিনিটে ফোন পেয়ে তাদের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দেখতে পান, কাজী মিজানুর রহমানের বসতঘরে আগুন জ্বলছে এবং বাড়ির সামনের অংশ ভাঙা। পরে তারা চারটি কক্ষের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘরে থাকা আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে গেছে। কিছু মালামাল ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়রা জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মিজানুর রহমান লাভলু কাজী সপরিবারে এলাকা ছেড়ে চলে যান। তার মা বাড়িতে একা বসবাস করতেন। শুক্রবার বিকালে অসুস্থ হয়ে তার মা একটি হাসপাতালে ভর্তি হলে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে যায়। এ সুযোগে রাতে এক্সকাভেটর দিয়ে একতলা ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে মালামাল লুট করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।
ওই বাড়ির বাসিন্দাদের অভিযোগ, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অনুসারী শাহীন চৌধুরী এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
কাজী মিজানুর রহমানের স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পী জানান, তার বৃদ্ধা শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় পরিবার নিয়ে তারা ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এই সুযোগে মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে পলাশ হাওলাদার এবং সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের নেতৃত্বে প্রায় আড়াইশ মানুষ বুলডোজার দিয়ে তাদের পাকা বসতঘরটি ভেঙে ফেলেন। ভবন ভাঙার পর ঘরে থাকা চারটি রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, এসি, স্বর্ণালংকারসহ পরিবারের ব্যবহার্য প্রায় সব মালামাল লুট করা হয়। লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। ভবনটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর পরে ছয় কক্ষের প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বাড়িতে পৌঁছান। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, হামলার আগে কাঁঠালতলী বাজার ও আশপাশের এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। কেউ ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তাদের কাছ থেকে মোবাইলফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
তিনি জানান, তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ ফুট দূরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে । গভীর রাতে বুলডোজারের শব্দ শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও হামলাকারীরা তাদের ধাওয়া দিলে পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার কারণে সরে যান। এ ঘটনার পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছে।
খবর পেয়ে দেখতে আসেন লাভলুর ফুফাতো বোন মুকুল বেগম। তিনি বলেন, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এ কাজ করেছে।
ঘটনার সময় লাভলু কাজীর ভাই মশিউর রহমান বাবলু কাজী ফেসবুকে বাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের কয়েকটি ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি ফেসবুকে দাবি করেন, প্রশাসনের কাছে সহায়তা চেয়ে পাওয়া যায়নি।
লাভলু কাজী অভিযোগ করে বলেন, জমি কিনে আমি বাড়ি করেছি। কী কারণে আমার বাড়ি ভাঙা হয়েছে জানি না । যারা আমার বাড়ি ভাঙায় জড়িত, তাদের সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই। (পটুয়াখালী-১ আসনের) সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অনুসারীরা ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন।
তার দাবি, প্রথমে এক্সকেভেটর দিয়ে ভবনটির সামনের অংশ ভেঙে ঘরের আলমারিতে থাকা স্বর্ণালংকার, মূল্যবান কাগজপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়েছে। পরে ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় শেষে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অনুসারী ও মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরীর নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন লাভলু কাজী।
দেশের বাইরে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত না। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বিভ্রান্ত ছড়ানো হচ্ছে। তাকে জড়িয়ে মিথ্যা অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার তিনি ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরেছেন, তাই ঘটনার বিষয়ে অবগত নন। ২০০৩ সালে পাবলিক লাইব্রেরির জন্য রেজিস্ট্রি করা জমি দখল করে চেয়ারম্যান বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছিলেন। জমি বা বাড়ি ভাঙচুরের বিষয়ে আমার বা আমাদের কোনও আগ্রহ নেই।’
অভিযুক্ত মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মনির খন্দকার বলেন, ‘মিজানুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরির জমি দখল করে ঘর তুলেছেন, যা ভূমি অফিসের মাধ্যমে প্রমাণিত, সেখানে তার এক টুকরো জমিও নেই।’
মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহাবুদ্দিন নান্নু মুন্সী বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনও নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনও অপরাধ করে থাকলে তার দায় দল নেবে না।’
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললেও কেউ ঘটনার বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমির মালিকানা-সংক্রান্ত একটি আবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি তদন্ত করছেন ‘






