• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

শাসকের আনুগত্য করার গুরুত্ব

প্রথম জাতীয় তাফসির প্রতিযোগিতা শুরু করছে সরকার, পুরস্কার সাড়ে ৪ লাখ টাকা

অনলাইন ডেস্ক
প্রথম জাতীয় তাফসির প্রতিযোগিতা শুরু করছে সরকার, পুরস্কার সাড়ে ৪ লাখ টাকা

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় তাফসির প্রতিযোগিতা ২০২৬’। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই মেগাপ্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।

শনিবার (১৮ জুলাই) ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সমন্বয় বিভাগের পরিচালক মো. মহিউদ্দিনের স্বাক্ষর করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। যোগ্য প্রার্থীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, প্রতিযোগিতাটি বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু হয়ে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে। যোগ্য ও আগ্রহী বাংলাদেশী নাগরিকদের কাছ থেকে ইতিমধ্যে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতার গ্রুপ ও বিষয়

গ্রুপ ‘ক’ (অনূর্ধ্ব ৩০ বছর) : ফাজিল, জালালাইন, দাওরায়ে হাদিস, কামিল এবং আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারবেন। তাফসিরের বিষয় : সুরা ফাতিহা, সুরা বাকারা ও সুরা আলাক।

গ্রুপ ‘খ’ (অনূর্ধ্ব ৪০ বছর) : কামিল, দাওরায়ে হাদিস এবং আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মাদরাসা শিক্ষক, খতিব, ইমাম, গবেষক, দাঈ, ইসলামী লেখক, ওয়ায়েজ ও সংস্কৃতিকর্মীরা এই গ্রুপে আবেদন করতে পারবেন। তাফসিরের বিষয়: সূরা আন-নূর, সূরা ইয়াছীন, সূরা হুজরাত, সূরা আর রাহমান ও সূরা ওয়াকিয়াহ।

আবেদনের যোগ্যতা

আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং আরবি ভাষায় কথা বলায় পারদর্শী হতে হবে। এছাড়া পবিত্র কুরআনের শাব্দিক অর্থসহ তরজমা করার যোগ্যতা এবং উলুমুল কোরআন, উসুলুত তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইলমুন নাহু, ইলমুস সরফ ও বালাগাতসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে।

আকর্ষণীয় পুরস্কারের মূল্যমান

জাতীয় ও বিভাগীয়—উভয় পর্যায়েই বিজয়ীদের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ও সম্মাননা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন (একজন) পাবেন ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ১ম রানার্স আপ (দুই জন) পাবেন দেড় লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ২য় রানার্স আপ (দুই জন) পাবেন ১ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র।

এদিকে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম পুরস্কার বিজয়ী পাবেন নগদ ২০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ২য় পুরস্কার বিজয়ী পাবেন নগদ ১৫ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ৩য় পুরস্কার বিজয়ী পাবেন নগদ ১০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র।

আবেদনের নিয়মাবলী ও নির্বাচন প্রক্রিয়া

১। আগ্রহী প্রার্থীদের আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে অনলাইনে এই লিঙ্কের (https://tinyurl.com/tafsircompetition26) মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে।

২। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৮টি বিভাগীয় কার্যালয়ের (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ) যেকোনো একটিকে বেছে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে এবং তা অনলাইন আবেদনে উল্লেখ করতে হবে।

৩। বিভাগীয় পরীক্ষার সময়সূচি পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে।

৪। বিভাগীয় পর্যায়ের বিজয়ীদের নিয়ে রাজধানী ঢাকায় এক সপ্তাহের বিশেষ গ্রুমিং বা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এরপরই অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা।

৫। নির্বাচনী পরীক্ষায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

সহায়ক গ্রন্থাবলী : প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য সাফওয়াতুত তাফাসীর, কালিমাতুল কুরআন, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে মাজহারী, তাফসীর ইবনে কাছীর ও তাফসীরে মারেফুল কুরআনকে সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।


 

বন্যা পরবর্তী সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে করণীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বন্যা পরবর্তী সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে করণীয়
সংগৃহীত ছবি

বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন রহমতের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি অতিবৃষ্টি ও বন্যা অনেক সময় তা দুর্ভোগে পরিণত করে। চলমান বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বহু এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সংকট—সাপের উপদ্রব।

বন্যার পানিতে সাপের গর্ত ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ডুবে গেলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা, বিদ্যালয়, আশ্রয়কেন্দ্র, এমনকি বিছানার নিচেও আশ্রয় নিতে পারে। ফলে অসতর্কতার কারণে সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় নয়, সচেতনতা, সঠিক জ্ঞান এবং দ্রুত চিকিৎসাই হতে পারে জীবন রক্ষার সর্বোত্তম উপায়।

মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা
ইসলাম মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

যদিও এই আয়াতের মূল প্রসঙ্গ আল্লাহর পথে ব্যয়, তবু এর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে না ফেলা ইসলামের একটি সাধারণ নীতি। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭১)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা ঈমানদারের কর্তব্য।

সাপ-বিচ্ছুর দংশন থেকে বাঁচার দোয়া
প্রিয় নবী (সা.) ছিলেন সাপ-বিচ্ছুসহ বিষাক্ত প্রাণীর দংশন থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দোয়া শিখিয়েছেন। এর মধ্যে একটি দোয়া হলো-

اِنَّا نَسْئَلُكَ بِعَهْدِ نُوْحٍ وَبِعَهْدِ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاؤُدَ اَنْ لَا تُؤْذِيْنَا

উচ্চারণ : ইন্না নাসআলুকা বিআহদি নুহ, ওয়া বিআহদি সুলাইমানাবনি দাউদা আল্লা তুযিনা।

অর্থ : ও হে সাপ! আমরা নূহ্ আলাইহিস সালাম এবং সুলাইমান আলাইহিস সালামের অঙ্গীকারের কথা তোদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তোরা আমাদের কোন ক্ষতি করিস না এবং আমাদের কষ্ট দিস না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৬০)

চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি নবীজির উৎসাহ
রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা নেই।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫; জামে তিরমিজি, হাদিস : ২০৩৮)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দুর্ঘটনা বা রোগব্যাধির ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং ইসলামের নির্দেশনা।


সাপে কামড়ালে কী করবেন?
সাপে কামড়ানোর পর অনেকেই ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে, কামড়ানো অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। বিষ চুষে বের করা, ক্ষত কেটে রক্ত বের করা বা শক্ত করে দড়ি বাঁধার মতো ভুল পদ্ধতি পরিহার করতে হবে।

প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা
বন্যার সময় কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে। রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করা, খালি পায়ে না হাঁটা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জুতা ও কাপড় ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করা, মেঝেতে না শুয়ে উঁচু খাটে ঘুমানো এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ ও ইসলামের ভারসাম্য
ইসলাম অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা সমর্থন করে না। সাপ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ। তবে নিরাপদভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই উত্তম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপেরও একটি ভূমিকা রয়েছে, কারণ তারা ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাপ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি, বনাঞ্চলসংলগ্ন ও জলাবদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এই সচেতনতা আরো বেশি প্রয়োজন। কারণ সামান্য অবহেলা একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বন্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ধৈর্য, দোয়া, সতর্কতা এবং যথাযথ ব্যবস্থা—সবকিছুর প্রয়োজন।

মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে পঠিতব্য দোয়া

মুফতি ওমর বিন নাছির
মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষের জীবনে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি হলো মা-বাবা। আমাদের অস্তিত্ব, লালন-পালন, শিক্ষা, আদর্শ ও ভালোবাসার পেছনে তাদের ত্যাগের কোনো তুলনা নেই। একটি সন্তান যখন নিজের অসহায়ত্বের কথা ভুলে যায়, তখনও মা-বাবা তার জন্য নিঃস্বার্থভাবে দোয়া করে যান, কষ্ট সহ্য করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। তাই ইসলাম আল্লাহর ইবাদতের পরই মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব আরোপ করেছে।

প্রকৃতপক্ষে, মানুষের পক্ষে কখনোই মা-বাবার ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবে তাদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, সেবা এবং আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করতে পারে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা এমন একটি মহান দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা আমাদের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে এবং পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের তাওফিক প্রার্থনা করতে শেখায়। দোয়াটি হলো-

رَبِّ أَوْزِعْنِىٓ أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ ٱلَّتِىٓ أَنْعَمْتَ عَلَىَّ وَعَلَىٰ وَالِدَىَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَـٰلِحًا تَرْضَـٰهُ وَأَدْخِلْنِى بِرَحْمَتِكَ فِى عِبَادِكَ الصَّـٰلِحِينَ

উচ্চারণ : রাব্বি আওজিনি আন আশকুরা নিমাতাকাল্লাতি আনআমতা আলাইয়া ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়া, ওয়া আন আমালা সালিহান তারদাহু, ওয়া আদখিলনি বিরাহমাতিকা ফি ইবাদিকাস সালিহীন।

অর্থ : ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার মা-বাবাকে দান করেছ। আর আমাকে এমন সৎকাজ করার তাওফিক দাও, যা তুমি পছন্দ করো। আর তোমার রহমতে আমাকে তোমার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৯)

জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় পিতা-মাতার প্রতি আমাদের দায়িত্ব ভুলে যাই। অথচ তাদের একটি দোয়া আমাদের জীবনকে বরকতময় করে তুলতে পারে, আর তাদের একটি দীর্ঘশ্বাস আমাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আসুন, আমরা নিয়মিত এই কোরআনি দোয়াটি পাঠ করি, পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও সদাচার প্রদর্শন করি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন আমাদের এমন সন্তান হিসেবে কবুল করেন, যারা কৃতজ্ঞ, দায়িত্বশীল এবং পিতা-মাতার হক আদায়ে সচেষ্ট। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার যথাযথ সেবা করার, তাদের জন্য দোয়া করার এবং তাদের সন্তুষ্টির মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ
সংগৃহীত ছবি

মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে প্রদত্ত এক হৃদয়স্পর্শী জুমার খুতবায় শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ আল-মুয়াইকলি মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া, ইখলাস, সুন্নাহর অনুসরণ এবং আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের তাৎপর্য অনুধাবনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান হলো নিজের রবকে জানা। আর আল্লাহকে জানার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো তাঁর পবিত্র নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা। কেননা একজন বান্দা যত বেশি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জানবে, তত বেশি সে তাঁর মহিমা উপলব্ধি করবে, তাঁকে ভালোবাসবে, তাঁর ভয় অন্তরে ধারণ করবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে। কারণ আল্লাহকে যথাযথভাবে চেনাই প্রকৃত ঈমানের ভিত্তি।

ইয়া হাইয়্যু ও ইয়া কাইয়্যুম: আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দুই নাম
খুতবায় বিশেষভাবে আল্লাহর দুটি মহান নাম—ইয়া হাইয়্যু (চিরঞ্জীব) এবং ইয়া কাইয়্যুম (স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক)—এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘ইয়া হাইয়্যু’ নামটি আল্লাহর পরিপূর্ণ, চিরন্তন ও অনন্ত জীবনের পরিচয় বহন করে। তাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই, শেষও নেই। তিনি কখনো ক্লান্ত হন না, তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। তাঁর জীবন পূর্ণাঙ্গ; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাঁর অসীম জ্ঞান, সীমাহীন ক্ষমতা, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, অসীম দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং পরিপূর্ণতার সব গুণ।

অন্যদিকে ‘ইয়া কাইয়্যুম’ নামটি নির্দেশ করে যে, আল্লাহ নিজে কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল। আকাশ, পৃথিবী ও মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয় তাঁর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন পরিচালিত হয়। তিনি জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান, মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, মর্যাদা হ্রাস করেন, বিপদ দূর করেন, রোগমুক্তি দান করেন, তওবা কবুল করেন এবং অসহায়ের আহ্বানে সাড়া দেন।

আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নামের মর্যাদা
তিনি উল্লেখ করেন, বহু আলেমের মতে ‘ইয়া হাইয়্যু’ ও ‘ইয়া কাইয়্যুম’-ই আল্লাহর ‘ইসমে আজম’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ নাম; যে নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি দোয়া কবুল করেন এবং তাঁর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা দান করেন। এই দুটি নামের ফজিলত সম্পর্কে মুসনাদ আহমাদ ও সুনান ইবনে মাজাহ-সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে বর্ণনা এসেছে। এছাড়া আয়াতুল কুরসি, সুরা আলে ইমরানের শুরু এবং সুরা ত্ব-হা-তেও এই মহান দুই নামের উল্লেখ রয়েছে।

কোরআনের আলোকে আল্লাহর চিরন্তন সত্তা
ইমাম আল-মুয়াইকলি স্মরণ করিয়ে দেন, একমাত্র আল্লাহই চিরঞ্জীব; তাঁর ছাড়া সবকিছুই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী তুলে ধরেন, ‘আর তুমি সেই চিরঞ্জীবের ওপর ভরসা করো, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৮)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংসশীল। কেবল তোমার প্রতিপালকের মহিমান্বিত ও সম্মানিত সত্তাই চিরস্থায়ী।’(সুরা : রহমান, আয়াত : ২৬–২৭)

তিনি নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় ঈমানের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন। তখন তিনি কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে মুসলিমদের স্থিরতা ফিরিয়ে আনেন, ‘মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন..।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৪)

আয়াতুল কুরসি : আল্লাহর মহিমার সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা
খুতবায় আয়াতুল কুরসির তাৎপর্যও ব্যাখ্যা করা হয়। এই আয়াতে আল্লাহর পরিপূর্ণ জীবন, স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সর্বময় কর্তৃত্ব, অসীম জ্ঞান ও অপরিসীম শক্তির ঘোষণা রয়েছে। ‘আল্লাহ! তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তাঁর...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৫)

এই আয়াত ঘোষণা করে যে, আকাশ ও পৃথিবীর সংরক্ষণ আল্লাহকে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত করে না। কারণ তিনিই সর্বোচ্চ, সর্বমহান এবং সর্বশক্তিমান।

ঈমানের বাস্তব শিক্ষা
ইমাম আল-মুয়াইকলি বলেন, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে আল্লাহই চিরঞ্জীব, তিনিই সবকিছুর মালিক, সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনাকারী—তখন তার অন্তরে তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা), ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়। সে মানুষের ওপর নয়, একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে। সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে-বিপদে সে আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।

নবী (সা.)-এর শেখানো মহামূল্যবান দোয়া
খুতবার শেষাংশে মুসলিমদের সকাল-সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়। বিশেষভাবে তিনি এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ার আহ্বান জানান,

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ

উচ্চারণ : ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আসতাগিছ। আসলিহ লি শানি কুল্লাহু, ওয়া লা তাকিলনি ইলা নাফসি তারফাতা আইন।
অর্থ : ‘হে চিরঞ্জীব! হে সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক! আমি আপনার রহমতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমার সব বিষয় সংশোধন করে দিন এবং এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের ওপর ছেড়ে দেবেন না।’ এছাড়া তিনি বেশি বেশি ইস্তিগফার করারও আহ্বান জানান। বিশেষ করে এই দোয়াটি পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ الَّذِي لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহ ইল্লা হুয়াল হায়্যিুল কায়্যিুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি। 
অর্থ : ‘আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির ধারক-বাহক; আর আমি তাঁর কাছেই তওবা করছি।’

এই জুমার খুতবার মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহকে তাঁর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে জানা এবং সেই জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। যখন একজন মুমিন উপলব্ধি করে যে আল্লাহই আল-হাইয়্যু এবং আল-কাইয়্যুম, তখন তার অন্তর থেকে ভয়, হতাশা ও নির্ভরতাহীনতা দূর হয়ে যায়। সে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে, বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করে, তাঁর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করে। আর এভাবেই আল্লাহর নামের জ্ঞান মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথে পরিচালিত করে।